ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

আলোচনা

লোক-ঐতিহ্যের ঘ্রাণ

সৈয়দ মুলতাজিম আলী বখতিয়ার

১৬ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৪৯


প্রিন্ট

আমাদের ঋতুচক্রের হিসাবে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ- এই দুই মাস হেমন্ত কাল। মূলত হেমন্তের শেষভাগ অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাসেই ধান কাটা শেষ হয়। এ সময় শীতের পরশ আলতো করে মাখে প্রকৃতি। মাঠে মাঠে আভা ছড়ানো সোনালি ধান। ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চলে গাছিরা রসের জন্য খেজুর গাছ কাটতে শুরু করে। অস্থির এই সময়েও কৃষকের মুখে ফোটে হাসি, চার দিকে আসে নবান্নের মৌভাত। ধন্য অগ্রহায়ণ মাস, ধন্য অগ্রহায়ণ মাস : বিফল জন্ম তার নাহি যার চায়’ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের গৌরব কবি কংকন মুকন্দরাম প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে বিখ্যাত চণ্ডী মঙ্গল কাব্যে এভাবেই ‘অগ্রাণ’ তথা অগ্রহায়ণ মাসের স্তুতি গেয়েছেন। সে যুগের কৃষিজীবী বাংলার গোলাঘর এ মাসে ধানে ভরপুর হয়ে উঠত।
নদীমাতৃক এ দেশের প্রধান কৃষি ফসল ধান, আর তা থেকে প্রক্রিয়াজাত প্রস্তুতকৃত ভাত ও জনপদবাসীর প্রধান খাদ্য। এখানকার মানুষের সমাজ গ্রামভিত্তিক, কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যবহ। নতুন ধান উঠতে শুরু করলে আর্থ-সামাজিক দৃশ্যপটও বদলে যেতে থাকে। সঙ্গত কারণেই তাই শুধু কবি সাহিত্যিকরাই নন, কৃষকসহ সাধারণ মানুষ তো অগ্রাণ বন্দনায় বিভোর থাকে।
কার্তিকের শেষ দিনটির সমাপনীর মাধ্যমে ‘মরা’ কার্তিকের পর বাংলাদেশের সব মানুষ প্রবেশ করে সর্বজনীন শোকজ উৎসবে, নবান্নে। ‘অগ্র’ ও ‘হায়ণ’ এ অংশের অর্থ যথাক্রমে ‘ধান’ ও ‘কাটার’ মৌসুম। কার্তিকের মাঝামাঝিতেই ধান পাকা শুরু হয়, মাঠ সোনালি রঙ ধারণ করে। পণ্ডিতদের অগ্রহায়ণ নামকরণের তাৎপর্য সার্থকতায় উল্লসিত। সুবজ শ্যামল ঢেউ খেলানো মাঠ পাকা ধানের বিপুল বিস্তারে মিশে যায় দিগন্তের নীলিমায়। শিশিরমাখা ধানের সুষ্ঠু সন্ধ্যার সোনালি রোদের ছটায় ঝলমল করে ক্ষেতপ্রান্তরে। পাকা ধানের অনির্বাচনীয় অভাবগ্রস্ত কৃষকের চোখে আঁকে স্বপ্নের অরুণিমা। ঠোঁটে লাগে মহা সুখের হাসি। ধান ফসলে ভরে ওঠে কৃষকের শূন্য আঙ্গিনা; আর হতাশা দূর করে নিয়ে আসে আশাভরা সুখময় ভবিষ্যৎ।
প্রখ্যাত মনীষী আবুল ফজলের আইন-ই আকবরিতে উল্লেখ আছে, সম্রাট আকবরের শাসনামলে অগ্রহায়ণ মাস থেকে বাংলা বছরের গণনা করা হতো এবং এ জন্য বাংলা সালকে ‘ফারসি সাল’ বলা হতো। পরবর্তী সময়ে তারই নির্দেশক্রমে সম্রাট আকবরের মন্ত্রিসভার সদস্য বিখ্যাত পণ্ডিত, জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজি সন গণনা ও সময়ের বিভিন্ন জটিল সমস্যার সমাধান করে বাংলা সন গণনায় বৈশাখ মাসকে বছরের প্রারম্ভিক মাস নির্ধারণ করেন। হিজরি সনের সাথে মিল রাখার জন্যই বাংলা মাস গণনায় বর্তমান রেওয়াজ চালু হয়েছে। হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররম এবং বাংলা বর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ তাই দু-একদিনের ব্যবধানে প্রায় একই সময়ে আসে।
পাঁচ হাজার বছর আগে চীন সম্রাট চিনসিং স্বয়ং মাঠে ধান বপন করে দেশব্যাপী একটি সার্বিক উৎসবের প্রবর্তন করেন। জাপানে অতি প্রাচীনকাল থেকেই মহা আড়ম্বরের সাথে নবান্ন উৎসব পালিত হয়। বঙ্গীয় এলাকায় প্রাচীণকাল থেকেই বঙ্গি আর্যরা বাঙালি নবান্ন উৎসব উদযাপন করতেন। অধ্যাপক আলী রেওয়াজের মতে- তথাকথিত সত্য আর্যরা এ দেশে এসে অর্চনের সংস্কৃতির বারোআনাই এনে দিয়েছিল। তেমনি নবান্ন উৎসবটিও বাদ দেয়নি, সে রেওয়াজ আজও বাংলাদেশে চলছে। ইতোমধ্যে ফসল উঠবে গানে গানে কৃষকের ঘরে ঘরে সাড়া জেগেছে সামাজিক আনন্দ-উৎসবের। নবান্নের আমেজ লেগেছে পল্লীর পরতে পরতে।
এক অগ্রহায়ণের দিন বিকেল শুরু হতো ভুলা ছাড়ানো/বাড়িতে ছেলেমেয়েরা তখন দিনের বেলায় পাতাসহ মথার আগা কেটে আঁটি আঁটি করে বেঁধে রাখত। বিকাল হলে সে মুর্তার আঁটি দিয়ে শুরু হতো যুদ্ধ। বাড়ির ছেলেমেয়েরা সম্পর্কে ভাবী কিংবা দাদী-নানীদের বেঁধে রাখার মুর্তার মাটি দিয়ে ঝুপঝাপ শব্দে তাদের গায়ে আঘাত করে ভুলা ছাড়াত। তাই প্রায়ই দেখতাম ভাবী কিংবা দাদী-নানীরা ভয়ে ঘরে কোথাও নিভৃতে লুকিয়ে থাকতেন। ভুলা ছাড়াতে উৎসাহীরা তখন তাদের যেখানে যেভাবে লুকান না কেন, খুঁজে বের করতই। আর অমনি শুরু হয়ে যেত
‘ভুলা ছাড়, ভুলি ছাড়/বাবা মাইয়া পিছারি ছাড়
ভাত খাইয়া নড়চর/পানি খাইয়া পেট ভর।’
বিকাল হওয়া মাত্রই প্রতিটি বাড়িতেই ভুলা ছাড়ানোর ‘ঝকু ঝুপঝাপ’ শব্দ প্রায় এক সাথেই বেজে উঠত। তারাও তখন আত্মরক্ষার্থে ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দুমথার আঁটি কেড়ে নিয়ে প্রত্যুত্তরে মেতে উঠতেন। সে কি আনন্দ, সে কী লড়াই। কেবল ঝুপঝাপ শব্দের গায়ের পরশ মাখা সে কী মায়ার লড়াই। সে লড়াইয়ে ছিল না কোনো প্রতিহিংসা, ক্রোধ ধ্বংস ও তাণ্ডব। এ ছিল উৎসবের লড়াই। এ ছিল মধুর এক লোক উৎসব। সে লড়াই ছিল স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা আর হৃদ্যতার মূর্ত প্রতীক। হারিয়ে গেছে আজ ওসব।
এক অগ্রহায়ণে আরেকটা ব্যাপার ছিল খুবই মজার। তা হলো- সন্ধ্যার পর গ্রামের উঠতি বয়সের তরুণেরা সবাই একসাথে মিশে মাঠে গিয়ে বানুটি ঘারানে খেলা। বানুটি সম্পর্কে একটু লেখা দরকার। এই বানুটি উৎসব তরুণদের কাছে ছিল খুবই আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য। নীবর ছেলেরা বাঁশের শুকনো অসংখ্য খোল কুড়িয়ে রাখত। তারপর বাঁশের কাঁচা কঞ্চির গোড়ার দিকটা হাত দিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করে ধরা যায় মতো অংশটুকু খালি রাখত। একে বলা হতো বানুটি। প্রতিটি ছেলেই কমপক্ষে পাঁচ-সাতটি কিংবা অনেকে আবার ২০-২৫টি পর্যন্ত বানুটি বানিয়ে রাখত। মাঝে মাঝে একজনের বানুটি অন্যজন লুকিয়ে কিংবা চুরি করে নিয়ে নিজের বানুটি বৃদ্ধি করত। লুকানো কিংবা চুরিতেও ছিল এক আনন্দ। সন্ধ্যার পরই বানুটি তৈরি করা গ্রামের প্রায় সব ছেলেই বানুটি নিয়ে খেলার মাঠে খালি গায়ে যেত। তারপর বানুটিতে আগুন লাগিয়ে হাত দিয়ে মাথার উপর দিয়ে ঘোরাতে থাকত। একসাথে জ্বলত প্রায় কয়েকশ’ বানুটি, লালে লাল হয়ে যেত পুরো মাঠ। এটি চলত প্রায় ঘণ্টাখানেক। অগ্রহায়ণের দিন থেকে এভাবে বানুটির আগুন পোহানোর মাধ্যমে শুরু হতো আসন্ন শীতে খড়কুটো দিয়ে গ্রামের গরিব মানুষদের আগুন পোহানো হতো।
অগ্রহায়ণের শেষে ধান কাটা শেষ হলে গ্রামে গ্রামে চলত রুটি তৈরির ধুম। এটি হলো এক অতি সুস্বাদু পিঠা জাতীয় খাবার।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি এবং আমাদের মনে রাখা উচিত যে, এক অগ্রহায়ণ কী পয়লা বৈশাখ বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ে শিকড়ের সঙ্গে গ্রথিত। বাংলা সনের উদ্ভাবক ছিলেন ফতেহ উল্লাহ, আর সেই নামটি বহু বছর পর সংস্কারের দায়িত্ব প্রদান করা হয় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ওপর। বিস্ময়কর হলেও দুজনই কেবল পণ্ডিতই ছিলেন না, ছিলেন উচ্চস্তরের সুফি।
বাংলা একাডেমি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে সভাপতি করে বাংলা পত্রিকা সংস্কারের উপসঙ্ঘ গঠন করে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে এই উপসঙ্ঘ ১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা সন সংস্কার করেন। তাতে বাংলা সনের বৈশাখ মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ৩০ দিনে গণনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত এটাও স্থির হয় যে, অধিবর্ষ অর্থাৎ চৈত্র মাস ৩১ দিনে হবে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫