ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

শেষের পাতা

সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের দিকদর্শন : প্রধানমন্ত্রী

সংসদ প্রতিবেদক

১৫ নভেম্বর ২০১৭,বুধবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৭,বুধবার, ০০:৫৮


প্রিন্ট

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সাথে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িত। এটি শুধু একটি ভাষণই ছিল না, বাঙালি জাতিসহ সারা বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে এই ভাষণ আজও শক্তি, অবলম্বন ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে আবারো তা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ৭৫ পরবর্তী পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল, ৭ মার্চের ভাষণকে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সৈনিকদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না। ইতিহাস সত্যকে তুলে ধরবে, ইতিহাস সত্যকে তুলে ধরেÑ ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতির মাধ্যমে সেটাই আজ প্রমাণিত হয়েছে।
গত রাতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে কার্যপ্রণালীর ১৪৭ বিধিতে আনীত একটি ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে সংস্থাটির ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ইউনেস্কোসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাতে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপন করেন। প্রায় ৬ ঘণ্টাব্যাপী এ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সরকার ও বিরোধী দলের ৫৭ জন সংসদ সদস্য বক্তব্য রাখেন। তাদের মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, শিক্ষামন্ত্রী নুরল ইসলাম নাহিদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, জাপার কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, পীর ফজলুর রহমান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর, ডা: দীপু মনি, আসম ফিরোজ, মঈনুদ্দিন খান বাদল, ফজলে রাব্বি মিয়া, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, শহীদুজ্জামান সরকার, জাহাঙ্গীর কবির নানক, নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, অধ্যাপক আলী আশরাফ, আবদুল মতিন খসরু, মেজর (অব:) রফিকুল ইসলাম, গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, কাজী নাবিল আহমেদ প্রমুখ। আলোচনা শেষে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতক্রমে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবটি সমর্থন করে বলেন, এই ভাষণের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য উজ্জীবিত হয়েছিল। বাঙালি জাতির সাথে বঙ্গবন্ধুর আত্মার যে গভীর একাত্মতা ছিল এই ভাষণে মর্মে মর্মে তা ফুটে উঠেছে।
তিনি বলেন, বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছেন। মাতৃভাষার অধিকার সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ছিল চরম মুহূর্ত। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতারই ঘোষণা দেননি, বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের কথাও বলেছিলেন। একটা জাতিকে কিভবে গড়ে তোলা হবে, তার সব কিছুই বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহাসিক এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু এক দিকে যেমন বাঙালি জাতির শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেছেন, অন্য দিকে অসহযোগ আন্দোলন এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করতে কী কী করতে হবে সে নির্দেশনাও দিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন, পাকিস্তানের শাসকেরা তাকে হয়তো আর কথা বলতে নাও দিতে পারে, সে জন্যই বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো।’ বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতি বাক্য এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস্য ছিল। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, অর্থনৈতিক মুক্তির পথে দেশকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীরা তা হতে দেয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি শাসকেরাও কিন্তু বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ বন্ধ করতে পারেনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা দখলকারীরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো বন্ধ করে দিয়েছিল। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা ওই সময় স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। মনে হচ্ছিল পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা এসে দেশ চালাচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুর নাম, নিশানা মুছে ফেলতে চেয়েছিল, ভাষণ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি। ইতিহাস সত্যকে তুলে ধরবে, ইতিহাস সত্যকে তুলে ধরেÑ আজকে এটিই প্রমাণ হয়েছে।
সংসদ নেতা বলেন, পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যে, সে দেশে একটি ভাষণ ৪৬ বছর ধরেই মানুষ শুনে যাচ্ছেন। যা এখনো এতটুকু পুরনো হয়নি, আবেদন হারায়নি। বরং মানুষ এই ভাষণ শুনে নতুন করে অনুপ্রেরণা পাচ্ছে।
ইউনেস্কোকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত তাদেরও ধন্যবাদ জানাই।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী বক্তব্য প্রদানের আগে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেসা মুজিবের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ দেয়ার আগে বঙ্গবন্ধুকে অনেক নেতা অনেক কথা বলেছেন। অনেকে অনেক কিছু লিখেও দিয়েছেন। জনসভায় যাওয়ার আগে আমার মা (বেগম মুজিব) বাবাকে (বঙ্গবন্ধু) ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন কিছু সময় রেস্ট নাও, তোমার সামনে অনেক দায়িত্ব। বঙ্গবন্ধুর বিছানার পাশে মোড়া নিয়ে বসে আমার মা বললেন, অনেকে অনেক কথা বলবে। এ দেশের মানুষের কিসে ভালো হবে তোমার থেকে কেউ বেশি জানে না। জনগণের হাতে বাঁশের লাঠি, আর হানাদারদের হাতে বন্দুকের নল। লাখো মানুষের জীবন তোমার হাতে। তাই কারোর কথা শোনার দরকার নেই, তোমার মনে যা আসবে সেটিই তুমি বলবে। ৭ মার্চের ভাষণের সময় বঙ্গবন্ধুর কাছে কোনো লিখিত বা পয়েন্ট ছিল না। তিনি অলিখিত এই কালজয়ী ভাষণ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আবেদন যুবসমাজের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। প্রতি বছর ৭ মার্চের ভাষণ উপলক্ষে একটি স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হচ্ছে। ওই সব বক্তব্য দিয়ে বই প্রকাশ করা হচ্ছে।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ অগ্রগতির পথে ধাবমান হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর দু’টি স্বপ্ন ছিলÑ এক বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অন্যটি বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি। প্রথমটা বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন। তার দ্বিতীয় স্বপ্ন অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তারই কন্যা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা সারা বিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ। এই ভাষণের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে উঠে এসেছে বাঙালি জাতির ইতিহাস, শোষণ-বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজনৈতিক কবি। ধর্ম-বর্ণ ও জাতির নামে বাঙালি জাতি ছিল বঞ্চিত। হাজার বছরের ইতিহাসে একমাত্র বঙ্গবন্ধুই বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫