ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ নভেম্বর ২০১৭

অর্থনীতি

শোরুমগুলোয় মণে মণে স্বর্ণ : এলো কোত্থেকে?

আলমগীর হোসেন

১৪ নভেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৫:২১


প্রিন্ট
শোরুমগুলোয় মণে মণে স্বর্ণ : এলো কোত্থেকে?

শোরুমগুলোয় মণে মণে স্বর্ণ : এলো কোত্থেকে?

দেশব্যাপী জমজমাট ব্যবসা করে যাচ্ছে ২০ হাজারের বেশি স্বর্ণের দোকান। ঝকঝকে-তকতকে করে সাজানো হয়েছে দোকানগুলো। ক্রেতা-বিক্রেতার উচ্ছল উপস্থিতিতে রমারমা পরিস্থিতি দোকানের অভ্যন্তরে। গণমাধ্যমে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিয়ে চলেছেন জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা। বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন করেন তারা। অথচ পুরো এই কর্মযজ্ঞে চোরাচালানই প্রধান ভরসা। অনুমতি থাকলেও কাগজ-কলমে স্বর্ণের আমদানি হয় না বললেই চলে। ফলে এ উৎস থেকে কোনো রাজস্বও পায় না সরকার। অথচ শোরুমগুলোয় রয়েছে মণে মণে স্বর্ণ।


শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উদ্ধার করা স্বর্ণের পরিমাণ ৬৯ দশমিক ২৪ কেজি, যার দাম ৩৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে এ রেকর্ড অতিক্রম হয়ে যায় চার মাসের মধ্যেই। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উদ্ধার করা স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৫ দশমিক ৯৮ কেজি। ২০১৫ সালে উদ্ধার করা হয় ৬৭ দশমিক ২১ কেজি স্বর্ণ। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে ৪৯টি চালানে জব্দ করা হয় ১৯১ দশমিক ২৯০ কেজি স্বর্ণ। ২০১৩ সালে এ পরিমাণ ছিল ২১০ কেজি।


গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দেশের স্বর্ণের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের স্বর্ণালঙ্কারের চাহিদা মেটাতেও দুবাই, মালয়েশিয়া, ওমান, সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে সোনার বার আনা হয়। এসব বার পরে বেনাপোল স্থলবন্দর ও ভোমরা স্থলসীমান্ত দিয়েও পাচার করা হয়। চোরাচালান চক্রগুলোর মধ্যে দেশে অবস্থান করা চক্রগুলো সরাসরি জড়িত থেকে মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে, মানি চেঞ্জারের ব্যবসার আড়ালেও স্বর্ণ চোরাচালান করছে। শুল্ক গোয়েন্দারা বলছেন, মূলত চোরাচালানের মাধ্যমেই স্বর্ণ আসছে দেশে। এর ভিত্তিতেই চলছে দেশের বিপুল অঙ্কের স্বর্ণের ব্যবসা।


প্রশ্ন রয়েছে উদ্ধার করা স্বর্ণের বিষয়েও। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে যে স্বর্ণ আটক করে সেগুলো ঢাকা কাস্টমস হাউজের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি জিআরো নম্বরের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়। ঢাকা কাস্টমস হাউজ উদ্ধার করা ওই স্বর্ণের নিষ্পত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংকে। উদ্ধার করা স্বর্ণের মালিকানা দাবি করে কেউ যদি ওই স্বর্ণ নির্ধারিত শুল্ক পরিশোধ করে তাহলে তারা তা নিয়ে যেতে পারে। তবে কেউ যদি দাবি না করে তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ওই স্বর্ণ নিলাম করে। এরপর বাংলাদেশে জুয়েলারি ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যরা তখন ওই স্বর্ণ নিলামে কিনে বিক্রি করে। আর নিলামে বিক্রি করা ওই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া হয়। তবে কি পরিমাণ স্বর্ণ নিলাম হয় তার কোনো হিসাব নেই তাদের কাছে।


যদিও এমনটি মানতে নারাজ বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) সহ-সভাপতি এনামুল হক খান। তার দাবি, স্বর্ণের দোকানগুলোয় মূলত পুরনো স্বর্ণই বিক্রি হয়। সাথে যুক্ত হয় লাগেজ রুলে আনা কিছু শুল্কমুক্ত স্বর্ণ। তিনি বলেন, ব্যাগেজ রুলের আওতায় দেশে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার ভরি স্বর্ণ আসে। সে স্বর্ণগুলো মানুষ প্রয়োজনে বিক্রি করছে। সেগুলোই আমাদের দোকানে আসে। তিনি বলেন, দেশে প্রতিদিন বৈধভাবে যে পরিমাণ স্বর্ণ আসছে সেটির চাহিদাও দেশে নেই। সুতরাং অবৈধ-পথে স্বর্ণ আনার কোনো প্রয়োজন নেই।

বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার

নাসির উদ্দিন চৌধুরী
সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে গত মাসে বাংলাদেশেও উদযাপিত হলো বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০১৭। ২ অক্টোবর থেকে ৮ অক্টোবর বেশ ধুমধামের সাথে এ সপ্তাহটি পালন করে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারদের এক প্লাটফর্মে এনে রাজধানীসহ দেশব্যাপী পালন করা হয় এটি। আর বলতে গেলে এর মাধ্যমে এই প্রথমবারের মতো সরকারি পর্যায়েপুঁজিবারের বিনিয়োগকারীরা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। এর আগে বিভিন্ন সময় দেশের পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারিদের বিভিন্ন নেতিবাচক বিশেষণেও ডাকা হয়েছে।


গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও অর্থনীতির অপরিহার্য এ খাতটি সরকারের বলার মতো আনুকূল্য পায়নি। ২০১০ সালের পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের পর সৃষ্ট অস্থিরতা সারা দেশকে নাড়া দেয়। পুঁজিবাজারের এ অস্থিরতা নজর কাড়ে সরকার প্রধানের। অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে নিয়ে সভা করে পুঁজিবাজারের সমস্যা সমাধানে তিন ধাপে ১১টি পদক্ষেপের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। পুনর্গঠিত হয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন।


প্রধানমন্ত্রীর এ হস্তক্ষেপের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে অস্থিরতার অবসান হলেও পুঁজিবাজার আস্থা ফিরে পেতে আরো অপেক্ষা করতে হয় প্রায় চার বছর। দেশের দুই পুঁজিবাজারের ডিমিউচুয়ালাইজেশনসহ এ সময় নেয়া বেশ কিছু সংস্কার কার্যক্রমের ফলে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরে আসে পুঁজিবাজারে। ২০১৫ সাল থেকে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে শুরু করলেও বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিশেষ করে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর অবস্থানের কারণে যথাযথ গতি পাচ্ছিল না পুঁজিবাজার।


কিন্তু অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহের উৎস হিসাবে দেখার ইচ্ছা শেষ পর্যস্ত বাংলাদেশ ব্যাংককে কিছুটা হলেও নমনীয় করে তোলে। একক গ্রাহক হিসেবে পুঁজিবাজারে পরিশোধিত মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ বিনিয়োগের যে শর্ত তাতে শিথিলতা দেয়া হয়। এভাবে ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে কিছুটা ছাড় পায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। এরপরই গতি ফিরে আসে পুঁজিবাজারে।


২০১৬ সালের অক্টোবর থেকেই বলতে গেলে লেনদেন ও সূচকের তলানিতে থাকা পুঁজিবাজারে আগমন ঘটতে শুরু করে বিনিয়োগকারীদের। মূলত প্র্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তার ফলেই এটি সম্ভব হয়। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে সক্রিয় না হলে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের দ্বারা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক গতি ধরে রাখা সম্ভব নয়। এ সময় দীর্ঘ দিন ধরে সাইড লাইনে থাকা ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বাজারে সক্রিয় হন। বাজারের লেনদেনে তার প্রভাব পড়ে ১ নভেস্বর ২০১৬ তারিখে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের টার্নওভার ছিল ৩৭৯ কোটি টাকা।

সেখানে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ১ জানুয়ারি তা পৌঁছে যায় হাজার কোটি টাকায়। পুঁজিবাজারের হঠাৎ ফিরে পাওয়া এ গতি সামাল দিতে আগে থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার বেশ কিছু উদ্যোগ ছিল। এর মধ্যে পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ে বিনিয়োগ সচেতনতা কার্যক্রম চলে আসছিল। এ কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ৮ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। সরকার প্রধানের এ ভূমিকা আরো আস্থাশীল করে তোলে পুঁজিবাজারকে। ১৭ জানুয়ারি বাজারটির লেনদেন ছাড়িয়ে যায় দুই হাজার কোটি টাকা।


সারা বিশ্বের পুঁজিবাজারের মতো দেশের পুঁজিবাজারকে দেশের অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্প উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে হলে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ আমাদের পুঁজিবাজারের জন্য সে সুযোগটিই এনে দিয়েছে। সরকার প্রধানসহ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, দুই স্টক এক্সচেঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারকে এনে দিয়েছে একই প্লাটফর্মে যেখানে তৈরি হয়েছে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ। ব্যাংকিং খাতের বাইরেও যে মূলধন সংগ্রহের আরো সহজ ও দীর্ঘমেয়াদি একটি উৎস হিসেবে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তারা যাতে পুঁজিবাজারকে বেছে নিতে পারে তার পরিবেশ তৈরি করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।


বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০১৭ তাই দেশের পুঁজিবাজারের জন্য নিয়ে এসেছে নতুন বার্তা যা বাস্তবায়নে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে। এরই মধ্যে নেয়া নানা সংস্কারের পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে যেমন পুঁজিবাজারকে পরিচিত করে তুলতে হবে তেমনি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কারসাজিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন আবার যেন ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের মতো বিপর্যয় সৃষ্টি না হয় তা পদক্ষেপ নিতে হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে হবে এ বাজারে কারসাজি করে পার পাওয়া যাবে না।


আবার শুধু বিনিয়োগকারীদের সচেতন বা সতর্ক করলে পুঁজিবাজারের বিকাশ ঘটবে না। উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজার থেকে দুরে থাকলে আর এ বাজারের প্রয়োজনই থাকে না। তাই বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তাদের সচেতন করা দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের। প্রয়োজন দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পুঁজিবাজারকে ব্যবহার করা। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ও দেশী-বিদেশী কোম্পানির সরকারের হাতে থাকা শেয়ার ছেড়ে মূলধন সংগ্রহের মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থার ভিত তৈরি করা। যাতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ব্যাংকের পরিবর্তে পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের স্বাচ্ছন্দ্য ও সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে নিতে পারে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫