ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

বিবিধ

ব্যয় বাড়লেও জীবনযাপনের মান কমছে

সুমনা শারমিন

১৩ নভেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৯:২২


প্রিন্ট

ঢাকার পরিবেশ, অপরাধ, যানজট অস্বাভাবিক হলেও এখানে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি। আসছে জানুয়ারিতে আবারো বাড়িভাড়া বাড়াবে বাড়িওয়ালারা। চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম বাড়ায় বাজারে গিয়ে হিসাব মেলাতে পারে না সাধারণ মানুষ। সবকিছু মিলিয়ে প্রতিনিয়ত ঢাকায় মানুষের খরচ বাড়লেও সে হারে সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। উচ্চ ব্যয় করেও নিম্নমানের জীবনযাপন রাজধানীবাসীর কষ্টকে বাড়িয়ে দিচ্ছে আরো কয়েক গুণ। লিখেছেন সুমনা শারমিন

জীবিকার তাগিদে বা ভালোমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে প্রতিদিন ঢাকায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। এসব মানুষের নাগরিক সুবিধার বিবেচনায় ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যোগ হচ্ছে তিন শতাধিক যানবাহন। এতে শব্দদূষণের মাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বাতাসে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম বস্তুকণা বেড়েছে পাঁচ গুণ। ফলে হাঁপানিসহ নানা রোগ ভর করেছে ঢাকায় বসবাসরত এক কোটি ৮০ লাখ মানুষের ওপর। এতে বেড়ে গেছে স্বাস্থ্য খাতে খরচ। একটি আধুনিক নগরীতে যতটুকু সড়ক থাকার কথা, এর ধারেকাছেও নেই ঢাকায়। ফলে তীব্র যানজটে প্রতিদিনই নাকাল হতে যাচ্ছে নাগরিকদের। ছিনতাই, খুন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসাবাড়িতে কখনো গ্যাস থাকে না, কখনো থাকে না বিদ্যুৎ। পানির জন্য রাস্তায় নামতে হয় নাগরিকদের। তিন হাসপাতাল ঘুরে কোথাও ভর্তি হতে না পেরে রাজপথে সন্তান প্রসবের ঘটনাও ঘটেছে ঢাকা শহরে। এভাবেই সারা বিশ্বের কাছে ঢাকা এখন এক নিকৃষ্ট নগরী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

ঢাকা ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনই ঢাকায় মানুষের চাপ বাড়ছে। যানজটে শত শত ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হলেও যানজট কমেনি। পরিকল্পিতভাবে এই শহর গড়ে ওঠেনি। যত ধরনের নাগরিক সেবা পাওয়ার কথা নাগরিকদের, সেটা পাচ্ছে না ঢাকাবাসী। রাজধানীতে গড়ে ওঠা আবাসনের ৬০ শতাংশই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে।

ঢাকায় আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হয় সাধারণ মানুষকে। বৈশ্বিক মানে নিকৃষ্টতম নাগরিক সেবা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে ঢাকার নাগরিকদের। বৈশ্বিক বসবাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকা বিশ্বের চতুর্থ নিকৃষ্ট শহর। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও অবকাঠামোর বিচারে ১০০ নম্বরের মধ্যে ছয় বছর ধরে বাংলাদেশ পেয়ে আসছে ৩৮.৭। অথচ এই শহরেই জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছে নাগরিক জীবন। চাল, পেঁয়াজ, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ার সাথে যোগ হচ্ছে বাড়তি গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাসাভাড়া, যাতায়াত ও শিশুদের পড়াশোনার খরচ। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, গত বছর ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ৬.৪৭ শতাংশ বেড়েছে। এবার যে হারে বাড়ছে চলতি বছর শেষে তা ১০ বছরের বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

চলতি বছর হু হু করে ব্যয় বেড়েছে খাদ্যপণ্যের। সাধারণ মানুষের সহনীয় সীমা পার হয়ে যাচ্ছে খাদ্যপণ্যের দাম। চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চালের দাম। গত বছর যে মোটা চাল ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো এখন সেটা ৪৬-৪৮ টাকা। চিকন চাল প্রতি কেজি ৬৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ওই চাল গত বছরের এই সময়ে ৫৫-৫৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাসখানেক ধরে অস্থির আছে পেঁয়াজের বাজার। আমদানি করা পেঁয়াজ ৭০ টাকা এবং দেশী পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকায়। অথচ ঈদুল আজহার পরে এর দাম ২৫-৩০ টাকায় নেমে এসেছিল। চলতি বছরেই দুইবার বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। লবণও কিনতে হচ্ছে ৪০-৪২ টাকা কেজি দরে। আর সবজির বাজারে তো আগুন লেগে আছে। প্রতি কেজি গরুর গোশত বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়, যা গত বছরের চেয়ে অন্তত ১০০ টাকা বেশি। ক্রেতাদের অভিযোগ, সব জায়গায়ই ব্যবসায়ীরা বলছে নেই। অথচ বাজারে সবই পাওয়া যাচ্ছে। কোনোটার কমতি নেই। এই জিনিসটাই যারা মনিটর করবে তারা চুপচাপ বসে রয়েছে। কোনো কথা বলতে বা কাজ করতে দেখা যায় না তাদের।

জরিপে ঢাকার অবস্থান
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান তালিকার শীর্ষপর্যায়ে। একটি শহরের বাসযোগ্যতা পরিমাপের জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি পাঁচটি বিষয়ের ওপর মোট ৪০টি সূচক ব্যবহার করে দেখতে পেয়েছে, অপরাধের মাত্রা ও সঙ্ঘাতের ঝুঁকি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো এবং সংস্কৃতি ও পরিবেশ বিষয়ে বিশ্বের ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম। একটি দেশের পরিবহনব্যবস্থা কতটা উন্নত, সেটি জরিপের সময় মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু এই সূচকে ঢাকার অবস্থান নিচের দিকে। অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান নিয়েও একটি সূচক রয়েছে। সে সূচকেও বাংলাদেশ নি¤œগামী। আবাসনের ব্যবস্থাও নাজুক। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে ঢাকায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারসার কনসাল্টিং গ্রুপের এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের ২২৩টি শহরের মধ্যে বসবাসের দিক দিয়ে ঢাকার অবস্থান ২০৮ নম্বরে। একটি শহরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অপরাধ, দূষণসহ বেশ কয়েকটি সূচক বিবেচনায় নিয়ে তালিকাটি তৈরি করেছে মারসা কনসাল্টিং গ্রুপ। তাতে দেখা গেছে, নিকৃষ্ট শহরের মধ্যে এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।
বিশ্বের ১৩৩টি নগরীতে জীবনযাত্রার খরচের হিসাব করেছিল যুক্তরাজ্যের দ্য ইকোনমিস্ট সাময়িকীর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। গত বছরের সেই জরিপে বৈশ্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় সারণিতে ঢাকা ও মন্ট্রিয়লের অবস্থান ছিল ৭১। ব্যয়ের দিক থেকে কানাডার সবচেয়ে বড় শহর টরন্টোও পিছিয়ে ঢাকা থেকে। শহরটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় ঢাকার চেয়ে কম, সারণিতে শহরটির অবস্থান ৮৮। মেক্সিকো সিটি, ক্লিভল্যান্ড, ইস্তাম্বুলের মতো শহরেও থাকা-খাওয়ার খরচ ঢাকার চেয়ে কম দেখা গেছে ওই জরিপে। সবচেয়ে সস্তা ১০টি শহরের তালিকায় ভারতের নয়াদিল্লি, মুম্বাইসহ চারটি নগর এবং পাকিস্তানের করাচি থাকলেও বাংলাদেশের রাজধানীর নাম নেই। প্রবাসী ও বাণিজ্যিক পর্যটকদের খরচের হিসাব ধরে ডলারের মানের ভিত্তিতে ওই জরিপ করেছে ইআইইউ। এর অর্থ একজন বিদেশী পর্যটকের টরন্টো, মুম্বাই বা করাচিতে থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য সেবা পেতে যা ব্যয় হয়, ঢাকায় ওই সেবার জন্য ব্যয় হবে তার চেয়ে বেশি। তবে অন্তহীন নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত ঢাকার মানুষের জন্য জীবনযাত্রার এ ব্যয়ের ফারাক আরো বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনভিত্তিক সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট (এইচইআই) চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষণের নগরী।

হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউটের (এইচইআই) গবেষণায় জানা গেছে, ঢাকায় শব্দদূষণের সর্বোচ্চ মাত্রা ১৩০ ডেসিবলের মতো। এক কর্মকর্তা জানান, শব্দদূষণের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পেতে ২০০৬ সালে একটি বিধিমালা তৈরি করা হলেও সেটা কোনো কাজে আসছে না। বরং প্রতিনিয়তই বাড়ছে শব্দ দূষণের মাত্রা। ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় করা এক জরিপে পরিবেশ অধিদফতর রাজধানীতে শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ১৩৫ ডেসিবল পর্যন্ত রেকর্ড করেছে। এসব জায়গায় বাস করা মানুষের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। জরিপে শব্দদূষণের জন্য দায়ী করা হয়েছে যানবাহনকে। এতে প্রথম স্থানে আছে প্রাইভেট কার, এরপরে আছে মোটরসাইকেল ও বাস। শব্দদূষণের কারণে ঢাকার মানুষকে শুধু উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, মনঃসংযোগ কমে যাওয়া, মাথাব্যথা ও মাথা ধরার জটিলতায় অস্বাভাবিক আচরণ করার মতো নানা সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতর বলছে, ৬৫ ডেসিবলের ওপরে শব্দ হলে হৃদরোগ, ৯০ ডেসিবলের ওপরে শব্দ আলসার এবং ১২০ ডেসিবলের বেশি শব্দে স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তিহীন অর্থাৎ বধির করতে পারে। রাজধানীর প্রায় সব জায়গায় ১২০ ডেসিবলের ওপর শব্দের মাত্রা রেকর্ড করেছে পরিবেশ অধিদফতর।
ঢাকায় বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। বৈষম্য থাকলে বড় ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়। তিনি বলেন, গণপরিবহনের অবস্থা খুবই খারাপ। ব্যক্তিগত গাড়ির আধিপত্য বাড়ছে। নাগরিক সেবার মানও ভালো নয়। ঢাকার অনেক মানুষ এখনো সুপেয় পানি পাচ্ছে না, বিশেষ করে বস্তি এলাকায়। পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য অপসারণের অবস্থা খুবই খারাপ। পরিবেশদূষণও বেশি। শিক্ষার প্রসার হয়েছে; কিন্তু গুণগত মান বাড়েনি। এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানুষের ঢাকামুখী হওয়ার কারণ অর্থনীতি। ঢাকায় অর্থনৈতিক সুবিধা বেশি। অন্য জায়গায় তা নেই। তাই মানুষ ঢাকায় আসে।

ঢাকা নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি জানিয়েছেন, ঢাকা এক ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। সরকারি সব সংস্থা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে। যদিও সরকারের একার পক্ষে ঢাকার সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে দাবি করতে চাইলে রাস্তায় চলাচল, ময়লা-আবর্জনা ফেলার ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। এ ছাড়া পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার না করার বিষয়ে নিজেদের সচেতন করে তুলতে হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫