ঢাকা, শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭

আমেরিকা

ইসলামী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ছেলের খুনিকে ক্ষমা করলেন বাবা

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১৩ নভেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৭:০১ | আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৭,সোমবার, ২০:৩১


প্রিন্ট
ইসলামী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ছেলের খুনিকে ক্ষমা করলেন বাবা

ইসলামী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ছেলের খুনিকে ক্ষমা করলেন বাবা

ইসলামী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ছেলের খুনিকে ক্ষমা করেছেন বাবা। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির ফেয়েতে কাউন্টি সার্কিট আদালতে ৩১ বছর বয়সী খুনির অপরাধ প্রমাণিত হয়ে ফাঁসির রায়ের পর এই ঘটনা ঘটান ছেলেহারা বাবা আবদুল মুনিম সোমবাত জিতমউদ। রায় ঘোষণার পর খুনি আলেকজান্ডার রেলফোর্ড কান্নায় ভেঙ্গে পরেছিলেন। 

খুন করার শাস্তি খুনিকে দিতে বিচার কাজ চলছে আদালতে। বিচারক রায় দেয়ার জন্য তৈরি । হঠাৎ সেই সময় সাক্ষীর স্ট্যান্ড থেকে বিচারকের দিকে তাকিয়ে করজোড়ে ৬৬ বছরের আবদুল মুনিম সোমবাত জিতমউদ বলে উঠলেন, ‘অল্প বয়সের ছেলে। ওকে ক্ষমা করে দিলাম। ইসলাম ধর্ম ক্ষমার কথাই বলে।’ জিতমউদের কাছে ক্ষমা চাইল অভিযুক্ত। জিতমউদ জড়িয়ে ধরলেন আসামির স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো ট্রে আলেকজান্ডার রেলফোর্ডকে।

২০১৫ সালে লেক্সিনগটন এর অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। আদালত সালাহুদ্দিন এর মৃত্যুর জন্য রেলফোর্ডের যুক্ততা ও ভূমিকা খুঁজে পান। ঘটনার জন্য অভিযুক্ত তিনজনের মধ্যে রেলফোর্ডকেই দোষি সাব্যস্ত করা হয়। স্থানীয় পুলিশ জানান, রেলফোর্ডই সালাহুদ্দিনকে হত্যার পরিকল্পনার ছক আঁকেন ও বাস্তবায়ন করেন।

নিহতের বাবা খুনিকে সালাহুদ্দিন এবং তার মায়ের পক্ষ থেকে ক্ষমা করে দেন। নিহতের মা তার হত্যাকাণ্ডের দুই বছর আগে ইন্তেকাল করেন। নিহতের পিতা বলেন তিনি ইসলামের চেতনা থেকেই খুনিকে ক্ষমা করেছেন। যাতে সে সত্যের পথ সম্পর্কেক জানা-বুঝার সুযোগ পায়। পুত্র হারা পিতার ছেলের খুনিকে ক্ষমা করার এমন নজির দেখে চোখে পানি আসে আদালতের বিচারক জজ কিমবার্লি বানেলেরও। কিছুক্ষণের জন্য আদালত মুলতবি ঘোষণা করে নিজের ঘরে চলে গেলেন বিচারক বানেল।

পিৎজা খেতে গিয়ে আড়াই বছর আগে জিতমউদের ছেলে সালাউদ্দিনকে ছুরি মেরে খুন করার অভিযোগ রয়েছে ২৪ বছর বয়সী অভিযুক্ত রেলফোর্ডের বিরুদ্ধে। রয়েছে পিৎজার দোকানে ডাকাতি, তথ্য-প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ। তদন্ত, তথ্যাদিতে তা প্রমাণিতও হয়েছে আদালতে। এত কিছুর পরেও বাবা হয়ে তাকে ক্ষমা করে দিলেন জিতমউদ! আইনজীবী থেকে শুরু করে আদালত কক্ষে হাজির সকলেই অবাক হয়েছিলেন।

বিচারক ও আইনজীবীরা দেখলেন, রেলফোর্ডকে ক্ষমা করে সাক্ষীর স্ট্যান্ড থেকে আসামীর স্ট্যান্ডে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেই থেমে থাকলেন না জিতমউদ, আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরে রেলফোর্ডের কানে কানে সালাউদ্দিনের বাবা বললেন, ‘কোনো চিন্তা করো না। ইসলামকে স্মরণ করবে সব সময়।তোমাকে ক্ষমা করার জন্য সৃষ্টিকর্তার দরজা খোলা রয়েছে। স্রষ্টার পক্ষ থেকে ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ যেহেতু রয়েছে, তাই তাকে পাওয়ার চেষ্টা কর। তোমার জন্য সুন্দর জীবনের একটি নতুন অধ্যায় অপেক্ষা করছে।’

রেলফোর্ডের বিরুদ্ধে যে যে ধারায় অভিযোগ ছিল, তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি হয় মৃত্যুদণ্ড, না হলে ৩১ বছরের কারাদণ্ড। জিতমউদের বক্তব্য শুনে কিছুক্ষণ পর আদালতে ফিরে এসে বিচারক বানেল ৭ বছরের কারাদণ্ড দিলেন রেলফোর্ডের। তারপর আসামীর স্ট্যান্ডে গিয়ে রেলফোর্ডকে আরো একবার আবেগে জড়িয়ে ধরলেন জিতমউদ। তার পাশে গিয়ে বললেন, ‘ভাবছ কেন? সময়টা দেখতে দেখতে কেটে যাবে। এরপর তোমার জীবনটা আবার নতুন করে শুরু হবে। একেবারে অন্যভাবে এবার গড়ে তোল জীবনটাকে। শুধু ভালো ভালো কাজ করবে, আর সকলকে ভালো কাজ করতে উৎসাহ জোগাবে। সঠিক পথে চলবে সব সময়। ইসলামকে স্মরণ করে চলার মাধ্যমে সেটা তুমি জেল থেকেই শুরু করে দাও না। এই করতে করতে ৭ বছর পর তোমার ৩১ বছর বয়সে যখন তুমি জেল থেকে বেরিয়ে আসবে তখন জীবনটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য নিজেকে তৈরি করতে পারবে।’

শুনে চোখে জল এসে গেল আসামী রেলফোর্ডের। জিতমউদ তখনও তাকে ধরে রয়েছেন বুকে। চোখের জল মুছতে লাগল রেলফোর্ড। ক্ষমা পেয়ে অভিভূত খুনি নিহতের পরিবারের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি যাই বলি না কেন যথার্থ হবে না। আমি সেইদিনের ঘটনার জন্য অত্যন্ত দু:খিত ও অনুতপ্ত। আমি কিছুই আপনাদেরকে ফিরিয়ে দিতে পারব না।’

জিতমউদ তাঁর পরিবার পরিজন নিয়ে এখন থাকেন তাইল্যান্ডে। আগে অবশ্য তিনি বহু বছর কাটিয়েছেন মার্কিন মুলুকে। আমেরিকার বিভিন্ন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। প্রধান ছিলেন লেক্সিংটন ইউনিভার্সাল অ্যাকাডেমিরও। এই লেক্সিংটনেই একটা পিৎজার দোকান ছিল জিতমউদের ছেলে সালাউদ্দিনের। সেখানে ২২ বছর বয়সী সালাউদ্দিনকে ছুরি মেরে খুন করেছিল রেলফোর্ড। তারপর তার দোকান লুঠপাট করে ক্যাশবাক্স ভাঙচুর করেছিল, আড়াই বছর আগে।

বিচারক রেলফোর্ডকে ৭ বছর কারাদণ্ড দেয়ার পর তাকে জড়িয়ে ধরে জিতমউদ বলেছেন, ‘আমি তোমাকে দোষ দিই না। দোষ সেই শয়তানটার।যে তোমাকে ওই জঘন্য অপরাধ করতে প্ররোচনা দিয়েছিল। সেই শয়তানটা আমাদের সকলের মধ্যেই আছে। আমরা কেউ কেউ তাকে বাড়াবাড়ি করতে দিই, কেউ দিই না।’

রায় দেওয়ার আগে বিচারক রেলফোর্ডের মা গেল কুট বার্ডের সাক্ষ্যও শুনেছেন। রেলফোর্ডের মা বলেছেন, জিতমউদ যে তাঁর ছেলেকে ক্ষমা করে দেবেন, তিনি তা ভাবতেও পারেননি। তিনি অভিভূত। ছেলে রেলফোর্ড যে ছোটবেলা থেকেই মাদকাসক্ত, আদালতে সে কথাও বলেন তার মা কুট বার্ড।

জিতমউদ জানিয়েছেন, আদালত কক্ষে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি রেলফোর্ডের মা। জিতমউদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য তাঁর ই–মেল অ্যাড্রেস নিয়েছেন রেলফোর্ডের মা। আর ইসলাম সম্পর্কে তিনি আরো জানতে চেয়েছেন জিতমউদের কাছে। কথা দিয়েছেন, তিনি নিয়মিত মেল পাঠাবেন জিতমউদকে, ইসলামের আদর্শ জানতে, বুঝতে।

৭ বছরের জন্য জেলে গেল রেলফোর্ড। থাইল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছেন জিতমউদও। আর জিতমউদ ও রেলফোর্ডের পরিবার পরিজনদের কাছে থেকে গেল আদালত কক্ষের বাইরে দুই পরিবারের গ্রুপ ফোটোগ্রাফ। ক্ষমায় জুড়ে গেল পৃথিবীর দুই গোলার্ধের দু’টি পরিবার।

সূত্র :  জিও টিভি, কলকাতা ও আনন্দবাজার

আলোচিত ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজানদার কেমন আছেন?

বৃক্ষমানব আবুল বাজানদারের কথা শুনেছেন সবাই। জানেন তিনি ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বরে হালিমা বেগমকে বিয়ে করেছেন। কিন্তু সবাই জানেন না আবুল বাজানদারের বোন হাসিনার বাসায় দেখা-সাক্ষাৎ থেকেই দু’জনের মন দেয়া নেয়ার শুরু হয়েছিল। দেড় থেকে দুই বছর প্রেমের পর দু’জনের বিয়ে হয়ে যায়, যখন আবুল বাজানদারের শরীর ছিল রোগাক্রান্ত।

দু’জনের পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়নি, বিয়ে মেনেও নেয়নি। হালিমা তখন বলেছিল, আবুলের কেউ নেই। ওর জন্য আমি আছি। এখন তাদের সংসারে রয়েছে ফুটফুটে একটি কন্যা শিশু। নাম জান্নাতুল ফেরদৌস তাহেরা। আবুল বাজানদারের স্ত্রী জানান, ‘যাকে দেখলে মানুষ একসময় ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতো তিনি এখন সুস্থ। এটাই আমার প্রেমের সার্থকতা।ওর জীবন এভাবে ফিরে পাব কোনোদিন ভাবতে পারিনি। সত্যি এতো ভালোলাগার কথা প্রকাশ করতে পারব না। ’ ‘বৃক্ষমানব’ বাজানদারের নতুন জীবনের শুরু থেকেই স্ত্রী আনন্দেই আছেন। মুখে তার হাসি লেগেই থাকে।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনিস্টিটিউটে চাকরির আশ্বাস পেয়েছিলেন আবুল বাজনদার। একজন স্যার একখণ্ড জমি কিনে দিয়েছেন তাকে। ওই জমির ওপর ঘরবাড়ি তুলে বসবাস করবেন তিনি। চাষাবাদের জন্য জমি কিনতে টাকাও পেয়েছেন। কিশোর বয়সে বাবার সঙ্গে ভ্যান চালিয়ে সংসারের ঘানি টানছিলেন যিনি, তিনিও ব্যবসায়ী হওয়া স্বপ্ন দেখছিলেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। বলেছিলেন “সুস্থ হয়ে গ্রামের বাড়িতে চালের ব্যবসা করব। আমাদের ওখানে চালের ব্যবসাটা ভালো ব্যবসা। আমি চিকিৎসার জন্য এত ভোগান্তিতে পড়েছি। তাই মেয়েকে ডাক্তার বানাব।”

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫