ঢাকা, মঙ্গলবার,২১ নভেম্বর ২০১৭

এশিয়া

৪৫ দিন আটকে রোহিঙ্গা নারীকে বারবার ধর্ষণ বর্মি বাহিনীর

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

১৩ নভেম্বর ২০১৭,সোমবার, ০৬:১৪ | আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৮:০৭


প্রিন্ট
মিয়ানমার সামরিক বাহিনী

মিয়ানমার সামরিক বাহিনী

জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত প্রামিলা প্যাটেন বলেছেন, ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতার জন্য মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের চিত্র পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।


কক্সবাজার সফর শেষে গতকাল ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। প্যাটেন জানান, মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী পরিকল্পিতভাবে এই যৌন সহিংসতা চালিয়েছে। দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং রাখাইন বৌদ্ধদের দিয়ে গঠিত মিলিশিয়ারাও এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করেছে।


তিনি বলেন, ‘এক ভুক্তোভোগী আমাকে জানিয়েছে, তাকে ৪৫ দিন বন্দী করে রেখেছিল মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী। এ অবস্থায় তাকে বারবার ধর্ষণ করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার অন্যরাও দৃশ্যমান ত বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের শরীরে তচিহ্ন, আঘাতের দাগ, কামড়ের ছাপ রয়েছে, যা তাদের ওপর হওয়া নিপীড়নের স্যা দেয়।


যৌন সহিংসতার জন্য অপরাধীদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবেÑ প্রশ্ন করা হলে প্যাটেন বলেন, জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে এ বিষয়ে তদন্তের জন্য বলতে পারে। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদ এখনো বিভক্ত রয়েছে।


প্যাটেন বলেন, আমি কোনো তথ্যানুসন্ধান মিশন নিয়ে বাংলাদেশে আসিনি। আমি এসেছি যৌন সহিংসতার ধরনটা বোঝার জন্য। এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবকে আমি প্রতিবেদন দেবো।
প্যাটেন এর আগে মিয়ানমার যেতে চেয়েছিলেন। তবে মিয়ানমার সরকার তার ভিসা অনুমোদন করেনি।

সীমান্ত— ও নৌপথে দেড় হাজারের বেশি রোহিঙ্গা এসেছে

গোলাম আজম খান কক্সবাজার (দক্ষিণ) সংবাদদাতা

উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে গতকাল দেড় হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। এদের মধ্যে পালংখালীর আন্জুমানপাড়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এক হাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে নৌকায় পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা এসেছে। এর আগে শনিবার ১৫টি রোহিঙ্গা পরিবারের ৭৫ জন দু’টি ভেলায় চড়ে নাফ নদী দিয়ে টেকনাফের সাবরাং কেওড়া বনে এসে পৌঁছে। তারা মিয়ানমারের মংডু সুদা পাড়া ও সাংগু পাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তারা আরো জানিয়েছেন, ধাওনখালী চরে অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের অনেকের খাদ্য শেষ হয়ে যাওয়ায় অনাহারে-অর্ধাহারে মানবেতর দিন পার করছে।


পালংখালী ইউনিয়নের মেম্বার সোলতান আহমদ জানান, রাতে এক হাজারের মতো রোহিঙ্গা নাফ নদীর আনজুমান পাড়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। ভেলায় চড়ে আসা রোহিঙ্গা সোলতান আহমদ জানান, তিনিসহ একই গ্রামের ৭৫ জন বাঁশের ভেলায় নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে আসেন। রাখাইনের যেসব গ্রামে এখনো রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন, সেনাবাহিনী ও রাখাইনরা মিলে প্রতি রাতে ওইসব গ্রামে ঢুকে গুলিবর্ষণ করছে যাতে লোকজন ভয় পায়।

দুই দিন আগে সন্ধ্যায় তার গ্রামের চার যুবক পানি আনতে বাড়ি থেকে বের হলে সৈন্যরা তাদের ধরে নিয়ে যায়, তখন থেকে তাদের কোনো খোঁজখবর নেই। হয়তো তাদের মেরে ফেলা হয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা আগে দুই দেশের মধ্যে নৌকায় যাতায়াত করত কিন্তু সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে নৌকা চলাচল এখন বন্ধ। নৌকা না পেয়ে এখন সাঁতরে, বুকে জারিকেন বেঁধে ও বাঁশের ভেলায় চড়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। তিনি বলেন, ২০ দিন আগে সেনাবাহিনীর ভয়ে মংডুর দংখালী চরে আশ্রয় নেই। সেখানে প্রায় ১৬ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছেন। নৌকা না পেয়ে ভেলায় তারা বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেন। ৮ ঘণ্টা পর তারা এপারে পৌঁছান। ভেলায় ৩৩ টির বেশি শিশু ছিল। অন্যরা নারী ও পুরুষ।


স্বামীকে হারিয়ে পাঁচ সন্তান নিয়ে ভেলায় চড়ে পালিয়ে আসেন রোহিঙ্গা নারী দিলবাহার বেগম (৩৫)। তিনি জানান, সেনারা এখনো লোকজনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না কাউকে। এখনো যারা ওপারে বসবাস করছে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু তাদের তাড়া করছে। ভেলায় চড়ে সদ্য অনুপ্রবেশকারী মোহাম্মদ ফয়সাল ও আবদুল হামিদ জানান, বাংলাদেশে আসার জন্য দংখালী চরে থাকা রোহিঙ্গারা বাঁশের ভেলা তৈরি করছে।


ভেলায় চড়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, রাখাইনে সেনাদের চাপের মুখে ঘরবন্দী জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার উদ্দেশ্যে কেউ এক সপ্তাহ আগে আবার কেউ দু-তিন সপ্তাহ আগেই ঘর ছেড়ে দক্ষিণ রাখাইনের ধাওনখালী চরে আসে। কিন্তু সেখানে এসে বাংলাদেশে ঢুকতে কোনো নৌকা না পাওয়ায় তারা হতাশ হয়। পরে তাদের মধ্যে কিছু যুবক জারিকেন বুকে নাফ নদী সাঁতরে বাংলাদেশে আসেন।


স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়মবহির্ভূতভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও মানবিক কারণে বিজিবি তাদের উদ্ধার করে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠাচ্ছে।


টেকনাফ-২ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম জানান, সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে বলতে গেলে নৌকা চলাচল এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তিনি রোহিঙ্গাদের বরাত দিয়ে বলেন, তারা নৌকা না পেয়ে ভেলায় চড়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ অব্যাহত রেখেছে। এমনকি সাঁতরেও অনেকে আসছে। তাদেরকে মানবিক সহযোগিতা দিয়ে রোহিঙ্গা শরাণার্থীশিবিরে পাঠানো হচ্ছে।


রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সহযোগিতার দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের কচুবুনিয়া এলাকা থেকে তিন যুবককে আটক করে ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক এই সাজা দেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫