ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

প্রিয়জন

নবান্নের ধান আর নতুন বধূ

মো: মাঈন উদ্দিন

১১ নভেম্বর ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট


এই সাতসকালে কোথায় যাচ্ছ? কিছু একটা মুখে দিয়ে যাও।
কাঁচি হাতে ঘর হতে বের হতে যাচ্ছিল দেলোয়ার। দৌড়ে এসে তার হাত ধরল শিলা।
-আরে পাগলী। দক্ষিণের ক্ষেতে সামান্য কিছু ধান কাটার বাকি। ওগুলো কাটা লাগবে না?
শিলার কপালে আলতো চুমু দিয়ে ঘর হতে বের হয়ে যায় দেলোয়ার।
-তাড়াতাড়ি চইল্যা আইসো কিন্তু। মুচকি হাসে শিলা।
দেলোয়ার যখন হাঁটতে শিখছে তখনই তার বাবা পাগল হয়ে যায়। দেলোয়ার মা তাকে নানীর বাড়িতে রেখে আবার বিয়ে করেন। নতুন স্বামী, সংসার রেখে দেলোয়ারকে দেখতে আসার মতো সময় তার হয় না। দেলোয়ার নানীর ছত্রছায়ায় বড় হতে থাকে। তিন বছর হলো নানীও তাকে ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন। সব হারিয়ে দেলোয়ার যখন চরম হতাশায় ভুগছে, ঠিক সেইসময় বধূ হয়ে আসে শিলা। ম্রিয়মাণ দেলোয়ার শিলার আদর-সোহাগে উদ্দিপনা ফিরে পায়। সজীব হয়ে ওঠে পত্রঝরা ক্ষীয়মাণ গাছটি। দেলোয়ার একজন বর্গাচাষি। পরের জমি সে বর্গায় চাষাবাদ করে।
ধানের আঁটি আঙিনায় রেখে পাক ঘরে প্রবেশ করে দেলোয়ার। শিলা নতুন ধানের পিঠা তৈরি করছে।
-শিলা, তুমি পিঠা খেয়েছো?
-স্বামীকে রেখে স্ত্রী খাবার খেলে যে সংসারে অমঙ্গল হয়। আমি কি করে খাই বলো?
-দূর পাগলী। আগেকার দিনের এই রীতি এখন কেউ মানে নাকি?
খেজুর রস আর চিতই পিঠা। আহ! কতদিন পর এমন স্বাদের পিঠা খাচ্ছে দেলোয়ার। চুলার আগুনে শিলার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিল সেই আলো আঁধারী খেলা।
-বাহ! আজকের খেজুর রস আর চিতই পিঠা খুবই স্বাদ হয়েছে গো। ঠিক যেন তোমার মতো।
-যা, দুষ্টু কোথাকার। মুখ বাঁকা করে সদ্য কৈশোর ছেড়ে আসা যুবতী শিলা।
-তুমি এত ভালো পিঠা তৈরি করতে পার? আমার জানাই ছিল না।
-জানো প্রতি বছর নবান্নে নতুন ধান আসলেই মা আমাদের খেজুর রস আর চিতই পিঠা, মেরা পিঠা, ভাঁপা পিঠা আরো কত রকম পিঠা তৈরি করে খেতে দিতেন, আজো মনে পড়ে সে সব। আরেকটা কথা খুব মনে পড়ে।
- আরেকটা কথা? কী বলোতো? নতুন বউয়ের স্মৃতিকথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে দেলোয়ার।
-ছোটবেলা এই নবান্নে বাবা ধান কাটত আর আমরা ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে অনেক ধান পেতাম। পরে ওই ধানগুলো দিয়ে জিলাপি কিনে খেতাম।
-জি বুঝেছি। ইঁদুর ধান চুরি করে নিত। আর তোমরা সেই ধান ডাকাতি করে আনতে। মানে চুরের ওপর বাটপারি।
খিলখিল করে হেসে উঠে দেলোয়ার-শিলা।
-নবান্নের নতুন ধানের পিঠা খেয়ে বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলত-জানো তোমার মা আমার দেখা সেরা গিন্নী। আমরা ভাইবোনেরা হাসতাম। অথচ দেখতে দেখতে আজ আমিও গিন্নী হয়ে গেলাম।
দুপুর হতে না হতেই নতুন ধানে ভরে উঠে সারা উঠান। মাড়ায়ের পর মহাজনকে অর্ধেক ধান ভাগ করে দেয়। বাকি অর্ধেক ধান দেলোয়ার ঘরে নিয়ে আসে। নবান্নের নতুন ধানের ম ম গন্ধে ভরে গেছে সারা ঘর।
আরো একটা কর্মকান্ত দিনের সূর্য অস্তমিত হলো। কুপি বাতির মিটিমিটি আলোতে শেষ হলো রাতের খাবার। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর এবার একটু বিশ্রামের পালা। দেলোয়ার-শিলার চার চোখের দৃষ্টি মিলিত হয় এক বিন্দুতে। পুরনো দিনের জরাজীর্ণতা, দুঃখ বেদনা, অবহেলা তুচ্ছতাচ্ছিল্য, সব কিছুকে পেছনে ফেলে এবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর দেলোয়ার। দেলোয়ার-শিলা বিছানায় গা এলিয়ে মানস-চক্ষে হাজার বছরের স্বপ্নের বীজ বুনে। চার চোখের মিটমিটে আলো কল্পনার সুতো দিয়ে আল্পনা আঁকে। একটু বিশ্রাম শেষে আবার নতুন সূর্যের উদয় হবে। আরো একটি নতুন দিনের সূচনা হবে। হাজারো লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য নব উদ্যমে আরো একটি দিনের শুরু করবে এই নবদম্পতি।
প্রিয়জন-১৬৩৮
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫