ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রাম

ভেলায় চড়ে আরো চার শতাধিক রোহিঙ্গা টেকনাফে

গোলাম আজম খান, কক্সবাজার (দক্ষিণ)

১০ নভেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ২০:৩১


প্রিন্ট
আজ শুক্রবার বেলা ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আবারও মিয়ানমার থেকে বাঁশের ভেলায় পালিয়ে এসেছেন চার শতাধিক রোহিঙ্গা।

আজ শুক্রবার বেলা ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আবারও মিয়ানমার থেকে বাঁশের ভেলায় পালিয়ে এসেছেন চার শতাধিক রোহিঙ্গা।

সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা নৌকা ও ভেলায় করে কিংবা সাঁতরিয়ে নাফ নদী পেরিয়ে অনুপ্রবেশ অব্যাহত রেখেছে।

আজ শুক্রবার বেলা ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আবারও মিয়ানমার থেকে বাঁশের ভেলায় পালিয়ে এসেছেন চার শতাধিক রোহিঙ্গা। তারা ছয়টি ভেলায় শাহপরীর দ্বীপের নাজির পাড়া ও সাবরাং নয়াপাড়া পৌঁছান। এনিয়ে গত তিন দিনে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু ভেলায় চড়ে রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছেন। এছাড়া বাংলাদেশে ঢুকার অপেক্ষায় তিন শতাধিক রোহিঙ্গা নিয়ে আরো চারটি ভেলা নাফ নদীতে ভাসছে।

এদিকে উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণসহ সার্বিক কার্যক্রমের সমন্বয় করতে সেখানে দায়িত্ব পালনরত সেনা ককর্মকর্তাদের সভা হয়েছে।

ভেলায় করে আসা আবদুল গফুর জানান, নৌকার সংকটের কারণেই নিজেরা বাঁশের ভেলা বানিয়ে ভেসে এসেছি পারিবার নিয়ে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন এখনো অব্যাহত রয়েছে। যুবকদের নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করছে ও যুবতীদের ধর্ষণ করে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এসব অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নৌকা না পেয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। এখনও কয়েক হাজার রোহিঙ্গা আসার অপেক্ষায় রয়েছে। শুক্রবার ভোরে টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়া পয়েন্ট দিয়ে শতাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।

টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নাফ নদীতে চার শতাধিক রোহিঙ্গা ভেলায় করে সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপে এসেছেন। তাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে নির্ধারিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় কড়াকড়ি আরোপ করায় রোহিঙ্গারা এখন ভেলায় বাংলাদেশে আসছেন। নাফ নদীতে নৌকার চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নৌকা সংকটের কারণে রোহিঙ্গারা প্লাস্টিক ও তেলের জারিকেন, কাঠ ও রশি দিয়ে ভেলা বানিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পাড়ি দিচ্ছেন।

এদিকে, টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর তদন্ত কেন্দ্রের আইসি উপ-পুলিশ পরিদর্শক কাঞ্চন কান্তি নাথ গত বৃহস্পতিবার বলেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের এনে সমুদ্র উপকুলে নামিয়ে দিয়ে পালানোর সময় ৮ নভেম্বর দুটি ট্রলার জব্দ করা হয়েছে। ট্রলার দু’টিই পুরানো জরাজীর্ণ। ভাগ্যক্রমে মাঝসাগরে ডুবে যায়নি। বিষয়টি ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে প্রশাসন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও আনসারের সহায়তায় নিয়মিত চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩৬৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়েছে। এপিবিএনসহ প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য, ২২০ জন ব্যাটালিয়ান আনসার এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মকর্তা আইন-শৃংখলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদবীর এক হাজার সাতশ’জন সদস্য পর্যায়ক্রমে ত্রাণ বিতরণ কাজে সহযোগিতা করছেন।

কক্সবাজার সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে ৩৬টি মেডিক্যাল টিম ক্যাম্পগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। এ পর্যন্ত চার লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৪ জনকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে।

মিয়ানমার নাগরিকদের জন্য এ পর্যন্ত এক লাখ ৩৪ হাজার ঘর নির্মাণ সম্পন্ন এবং পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে নতুন এলাকায় আশ্রয় দেয়া হয়েছে। নতুন ক্যাম্প এলাকায় অগ্নি নির্বাপন কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে উখিয়ার রাবার বাগান এলাকায় একটি এবং টেকনাফের উনচিপ্রাং এলাকায় একটি অস্থায়ী ফায়ার সার্ভিস ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে উখিয়া, টেকনাফ ও রামুর ১১টি স্থানে পুলিশ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজার থেকে উদ্ধারকৃত ৩২ হাজার ৮১৮ জন ও অন্যান্য জেলা হতে উদ্ধারকৃত ৭০৯ জন রোহিঙ্গাকে ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। নৌকা ডুবিসহ নৌ দুর্ঘটনায় ১৯০ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে।

বান্দরবানে থাকা ১৭ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে সাত হাজার জনকে উখিয়ায় স্থানান্তর করা হয়েছে। বাকী ১০ হাজার জনের স্থানান্তর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বাস্তবায়িত নতুন ক্যাম্প এলাকায় এ পর্যন্ত নয় কিলোমিটার লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ক্যাম্প এলাকায় ৪০টি নিরাপত্তা বাতি বসানো হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ৯৯টি বাতি সংবলিত ৩৩টি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। আরো ১৭টি প্যানেল স্থাপন কার্যক্রম চলছে। নতুন ক্যাম্প এলাকায় এলজিইডি বাস্তবায়িত ২৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে একটি সড়কের শতকরা ৮০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে।

সেনাবাহিনীর সমন্বয় সভা
উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণসহ সার্বিক কার্যক্রমের সমন্বয় করতে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দ্বায়িত্বরত সেনা কর্তৃপক্ষের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় নানা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উখিয়া অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পে সমন্বয় সভায় দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন সম্পন্ন, কাঠের বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা, শিশু সুরক্ষাসহ নানা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়াও নতুন করে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের একটি ট্রানজিট পয়েন্টে রেখে টিকা, ভ্যাকসিন, স্বাস্থ্য সেবা, রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্ন করে ক্যাম্পে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় লেঃ কর্নেল রাশেদ, লেঃ কর্নেল মঈন, লেঃ কর্নেল সাইফ, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫