ঢাকা, মঙ্গলবার,২১ নভেম্বর ২০১৭

অপরাধ

মাদক মাফিয়াদের টার্গেট তরুণীরা

আবু সালেহ আকন

১০ নভেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০৬:১৬


প্রিন্ট
মাদক মাফিয়াদের টার্গেট তরুণীরা

মাদক মাফিয়াদের টার্গেট তরুণীরা

মাদক মাফিয়াদের টার্গেট এখন কিশোরী-তরুণীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি এড়াতে মাদক কারবারে এখন ব্যাপকহারে কিশোরী ও তরুণীরা ব্যবহৃত হচ্ছে। এ দিকে বিপথগামী কিশোরী-তরুণী ও নারীরাও স্বল্প পরিশ্রমে বেশি রোজগারের জন্য মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। অভিজাত হোটেল-রেস্তোরাঁতেও কৌশলে মাদক কারবার চলছে এবং সেসব স্থানেও নারীরা এই কারবারের সাথে জড়িত রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাদক কারবারে কিশোরী, তরুণী ও নারীরা ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক এলাকায় নারীরাই এখন মাদক মাফিয়া। ওই সব এলাকার মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রয়েছে।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, দৃষ্টি এড়াতেই এখন মাদক কারবারে বিপুল নারীকে যুক্ত করা হয়েছে। কেনাবেচা থেকে শুরু করে মাদক আনানেয়ার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে নারী। নিরাপদে কারবার চালিয়ে নিতেই মাদক মাফিয়াদের এই কৌশল বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওই কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, নারী মাদক কারবারিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা গ্রেফতার এড়িয়ে নির্বিঘেœ এই কারবার চালিয়ে নিতে পারে। অনেক নারী মাদক কারবারি আছে যারা কখনোই গ্রেফতার হয়নি। কিন্তু ঠিকই তারা বছরের পর বছর এই কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর এমন অনেক নারী মাদক কারবারি রয়েছে যারা বছরের পর বছর গ্রেফতার এড়িয়ে এই কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।


রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জয়নাল আবেদিন বাচ্চু ওরফে পাচুর স্ত্রী পাপিয়া দীর্ঘ দিন ধরে এই এলাকায় মাদক কারবার করছে। মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, আদাবর, শ্যামলী ও মিরপুর এলাকার মাদক কারবারিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের অন্যতম হোতা এই পাপিয়া। সর্বশেষ গত বছরের ৪ ডিসেম্বর আদাবরের শেখেরটেকের শ্যামলী হাউজিং সোসাইটির বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় পাপিয়াকে। এ সময় তার বাসা থেকে একটি পিস্তল ও লাধিক টাকা মূল্যের ইয়াবা জব্দ করা হয়। ওই এলাকার ইশতিয়াকের স্ত্রী ও তার ভাইয়ের স্ত্রী মাদক সরবরাহ করে বিভিন্ন বাসা ও পাঁচ তারকা অভিজাত হোটেলের পার্টিতে। বিভিন্ন সময় গ্রেফতার করা হলেও তাদের বেশি দিন জেল খাটতে হয় না।


গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাজধানীর পান্থপথে হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেন থেকে এক মাদক বিক্রেতা পরিবারের চারজনসহ মোট ছয়জনকে আটক করেছে র‌্যাব-২। তাদের কাছ থেকে ইয়াবা বিক্রির অগ্রিম দুই লাখ ছয় হাজার ৬০০ টাকা ও পরবর্তী সময়ে অভিযান চালিয়ে আট হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ওই পুরো পরিবারটিই মাদকের সাথে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এমন অনেক পরিবারই রয়েছে; এসব পরিবারের সব সদস্যই মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত।


মাদকের আরেক ডিলার পারভিন আক্তার। রাজধানী ও বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তার মাদকের পসরা। কালিগঞ্জ বড় মসজিদ রোডের ইউনুস বেপারী লেনের বাসিন্দা পারভিনকে এক নামেই চেনে এলাকার সবাই। সায়দাবাদের মাদক সম্রাজ্ঞী সুফিয়া। মাদারীপুরের মেয়ে মুক্তার হোসেনের স্ত্রী সুফিয়া দীর্ঘ দিন থেকে সায়দাবাদের ওয়াসা রোডে গড়ে তুলেছে মাদকের আস্তানা। কুমিল্লা সদরের খেতাশা গ্রামের আলমগীরের স্ত্রী পারভিন। যাত্রাবাড়ীর বিবিরবাগিচায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করে ওই এলাকার মাদক কারবার। ঢাকার কেগ্রণীগঞ্জের শহীদনগরের বাবা রাশিদা। যে একজন চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি। ইয়াবার কারবার করতে গিয়ে তাকে এখন সবাই বাবা রাশিদা হিসেবেই চেনে। কেরনীগঞ্জের ঢাকাপাড়া এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে মাদক কারবার করছে মাজেদা ও সুফিয়া। গোলামবাজার এলাকায় মাদক কারবারে জড়িত রয়েছে নাজু ও রাশিদা। মোহাম্মদপুরের রানী, মাহিনা আক্তার সাথী, নার্গিস, সায়রা, রেশমা, কুলসুম, সায়দাবাদ এলাকার ময়না, শ্যামপুরের পোস্তগোলা রাজাবাড়ির হাছিনা বেগম, ইসলামবাগের ছাফি, শিলামণি, পূর্ব রামপুরার এনএস সড়কের মর্জিনা বেগম, উত্তরার আশকোনার জ্যোতি, কাওরানবাজারের মিনা, শাহিদা, পারভিন, নিশি, গুলশান নিকেতনের অঞ্জনা, উত্তরার বাসিন্দা এক সময়ের চলচ্চিত্রের নায়িকা নদী, লালবাগের মনোয়ারা, আনন্দবাজার বস্তির বানু, নিমতলী বস্তির সাবিনা, পারুল, খুনখারাবি, মহাখালীর ইভা ও রওশন আরা, বনানীর আইরিন, কড়াইল বস্তির রিনা, বিউটি, গুলশানের মৌ, বারিধারার নাদিয়া, উত্তরার গুলবাহার, মুক্তি, গণকটুলীর মনোয়ারা, নাছিমা, শ্যামপুরের ফজিলা, রানী বেগম এবং পারুলী। শাহীনবাগের পারভীন, তেজকুনিপাড়ার সনি, হিরা, রাজেদা, হাজারীবাগের স্বপ্না, কলাবাগানের ফারহানা ইসলাম তুলি, চানখাঁরপুলের পারুল, বাড্ডার সুমি, রামপুরার সীমা, শাহজাহানপুরের মুক্তা, মহাখালীর আলোচিত মাদকসম্রাজ্ঞী জাকিয়া ওরফে ইভা ও রওশন আরা বানু, বনানীর আইরিন, কড়াইল বস্তির রিনা, জোসনা, বিউটি, বারিধারার নাদিয়া, উত্তরার গুলবাহার ও মুক্তি, বারিধারা, গুলশান-বনানীর অভিজাত এলাকার জ্যোৎস্না, জবা, লিপি, রূপা, তানিয়া, শোভা, জয়া, মলি, বিউটি, রিতা, ন্যান্সি-কুমকুম, মনি ওরফে হাসি তারা সবাই নারী মাদক কারবারি।


প্রত্যন্ত গ্রামেও মাদক কারবারে নারীরা জড়িয়ে পড়ছে। মাগুরার জাহানারা বেগম। নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর ফকিরপাড়া এলাকার শাহিনা বেগম, ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার শশীভূষণ থানাধীন খাসপাড়ার ফাতেমা, পিরোজপুর শহরের রাজারহাট এলাকার সাদিয়া আফরোজ দোলা, রংপুরের বদরগঞ্জের আমরির ডাঙ্গা গ্রামের আ: সালামের স্ত্রী এসনেহারা বেগম ও একই এলাকার মোসলেম আলির স্ত্রী আমেনা খাতুন, কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর বোয়ালমারী গ্রামের নাসরিন আক্তার ময়না, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার জোড়বাগান মহল্লার রিপা বেগম (২৩), কুড়িগ্রামের রৌমারীর গ্রামের মামুদ মিয়ার স্ত্রী আঞ্জুয়ারা বেগম (৩০), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের মনোয়ারা বেগম (৫৫)।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর অনেক অভিজাত হোটেল রেস্তোরাঁয় এখন মাদক বিক্রি হচ্ছে। ওই সব হোটেল রেস্তোরাঁর ভেতরে বসেই ইয়াবা ও শিসা সেবনের ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলো সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে সুন্দরী তরুণীরা। ওই সব হোটেল রেস্তোরাঁয় সাধারণের প্রবেশাধিকারও নেই। এসব হোটেল-রেস্তোরাঁর দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও কোনো নজর নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫