ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ নভেম্বর ২০১৭

শিক্ষা

হতাশায় মেধাবীদের মধ্যে পেশা ত্যাগের ভাবনা

সমাপনী পরীক্ষা শেষে আবারো আন্দোলনে যাচ্ছেন প্রাথমিক শিক্ষকেরা

আমানুর রহমান

১০ নভেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০৬:১২


প্রিন্ট
সমাপনী পরীক্ষা শেষে আবারো আন্দোলনে যাচ্ছেন প্রাথমিক শিক্ষকেরা

সমাপনী পরীক্ষা শেষে আবারো আন্দোলনে যাচ্ছেন প্রাথমিক শিক্ষকেরা

সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ অসন্তোষ ক্ষোভ ও হতাশার মধ্যে তারা আসন্ন প্রাথমিক শিক্ষক সমাপনী পরীক্ষার পর আবারো আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।


দেশে পুরাতন ও নতুন জাতীয়করণকৃত মিলে ৭৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক স্কুলে সাড়ে চার লাখ প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক আছেন। গত দুই বছরে প্রধান শিক্ষকদের সাথে সহকারী শিকদের বেতনবৈষম্য ও মর্যাদার বিষয়টি সমাধান হয়নি। এ ছাড়া প্রধান শিকেরা দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা পেলেও বেতন স্কেলে গ্রেড-বৈষম্যে পড়েছেন। এ জন্য বিসিএস থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নন-ক্যাডার প্রধান শিক মনোনীত করা হলেও তাদের বেশির ভাগই এখনো চাকরিতে যোগদান নিশ্চিত করেননি বলে জানা গেছে।


শিক্ষক নেতারা জানান, নানা বৈষম্যের কারণে মেধাবীরা প্রাথমিকের শিক্ষক হিসেবে আসছেন না। সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে যারা মেধাবী তারা অনেকেই এখন আর এ পেশায় থাকতে নারাজ। অনেকেই পেশা পরিবর্তনও করেছেন। নন-ক্যাডার পদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য যাদের মনোনীত করেছে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) তাদের মধ্যেও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।


প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের শুরু থেকেই সহকারী শিক্ষকের বেতন স্কেল প্রধান শিক্ষকের এক ধাপ নিচে। কিন্তু ২০০৬ সালের ২৯ আগস্ট থেকে তাদের বেতন স্কেলের ব্যবধান দুই ধাপ নিচে নির্ধারণ করা হয়। এ ব্যবস্থা এখনো বিরাজমান। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম ও সর্বশেষ পে- স্কেলেও এ ধাপ বজায় রাখা হয়। ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেলে প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকের বেতন স্কেল করা হয় ১২তম গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ টাকা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকের বেতন স্কেল ১৫তম গ্রেডে সাত হাজার ৯০০ টাকা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা ১৪তম গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ টাকা। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মধ্যে বেতন ব্যবধান দাঁড়ায় দুই হাজার ৩০০ টাকা।

এই হিসেবে একজন প্রধান শিক্ষক ১২তম গ্রেডে চাকরি শুরু করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্কেল এবং ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাবেন নবম গ্রেডে ২২ হাজার টাকার স্কেল। অপর দিকে একজন সহকারী শিক্ষক ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ টাকায় চাকরি শুরু করে প্রশিক্ষণ এবং ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পে-স্কেলের ১২তম গ্রেডে পাবেন ১১ হাজার ৩০০ টাকা। এই অবস্থায় প্রধান শিক্ষকের সাথে সহকারী শিক্ষকের বেতন ব্যবধান দাঁড়াবে তিন ধাপ ব্যবধান (২২০০০-১১৩০০) ১০,৭০০ টাকা। বেতনভাতা মিলিয়ে একই সময়ে যোগদানকারী প্রধান শিক্ষকের সাথে সহকারী শিক্ষকের বেতনের প্রার্থক্য দাঁড়াবে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকেরা দ্বিতীয় শ্রেণীর সুযোগ-সুবিধা ও সহকারী শিক্ষকেরা তৃতীয় শ্রেণীর সুযোগ-সুবিধা পাবেন।


সর্বশেষ গত ৮ নভেম্বর উচ্চ আদালত প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদার পাশাপাশি বর্তমান বেতনের সাথে আগের টাইম স্কেল ও করোসপন্ডিং সুবিধা প্রদানের বিষয়ে একটি রায় প্রদান করেন। এই বিষয়ে জারি করা রুলে চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি মো: আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের বেঞ্চ ওই নির্দেশ প্রদান করে। প্রধান শিক্ষকেরা করোসপন্ডিং সুবিধা ও টাইম স্কেল পেলে যে বেতন পাবেন তাতে সহকারী শিক্ষকদের সাথে তাদের বেতনবৈষম্য হবে আকাশ ছোঁয়া।


এ নিয়ে প্রায় পৌনে চার লাখ সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম হতাশা। ২০১৪ সালে ৯ মার্চ জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন ও পদমর্যাদা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণায় প্রধান শিক্ষকেরা তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তায় উত্তীর্ণ হন। সহকারী শিক্ষকেরা তৃতীয় শ্রেণী কর্মচারী হিসেবে থেকে যান।

প্রধানমন্ত্রী ঘোষণায় একজন প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকের বেতন নির্ধারিত হয় ১২তম গ্রেডে ৫ হাজার ৯০০ টাকা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১১তম গ্রেডে ছয় হাজার ৪০০ টাকা। একই সাথে প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকের বেতন নির্ধারিত হয় ১৫তম গ্রেডে চার হাজার ৯০০ টাকা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৪তম গ্রেডে পাঁচ হাজার ২০০ টাকা। বেতেনের ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার ২ ০০ টাকা। এবার বেতন স্কেলের ব্যবধান হয় তিন ধাপ। সহকারী শিক্ষকেরা এই বৈষম্যমূলক পদমর্যাদা ও বেতন স্কেল তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন।

২০১৪ সালে ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গেলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান সহকারী শিক্ষকদের বেতনবৈষম্যের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী তা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।


প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে সমস্যা সমাধান না হওয়ায় সহকারী শিক্ষকেরা ২০১৫ সালে জোটবদ্ধ হয়ে কর্মবিরতি, অনশন, মানববন্ধনসহ বছরব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষকদের আন্দোলনের একপর্যায়ে ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সহকারী শিক্ষক সমিতির নেতাদের সাথে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেন।


বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের সহকারী শিক্ষক প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রীর কাছে বেতনবৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরলে মন্ত্রী তা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন। কিন্তু দুই বছর পার হলেও কোনো সমাধান না হওয়ায় সহকারী শিক্ষকেরা হতাশ।


দুই বছর ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা আশ্বাস পূরণের অপেক্ষায় চুপ ছিলেন বলে জানান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাধিক সহকারী শিক্ষক সংগঠনের নেতারা। নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে সহকারী শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতারা বলেন, প্রধান শিক্ষকদের রিটের রায়ের পর আর চুপ করে বসে থাকার সুযোগ নেই। সারা দেশের সহকারী শিক্ষকেরা ব্যাপারটি নিয়ে চরমভাবে ুব্ধ ও হতাশ। শিক্ষক নেতারা জানান, সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে যারা মেধাবী তারা অনেকেই এখন আর এ পেশায় থাকতে নারাজ। অনেকেই পেশা পরিবর্তনও করেছেন।


শিক্ষক নেতারা বলেন, আসন্ন প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শেষে শিক্ষকেরা আবারো আন্দোলনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আন্দোলন ছাড়া বিকল্প নেই শিক্ষকদের সামনে। সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে (প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী) আশ্বাস দেয়ার পরও যখন তা আটকে থাকে, তখন আন্দোলনের পথেই যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।


সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আন্দোলনের পাশাপাশি উচ্চাদালতে এ ব্যাপারে রিট আবেদন করার কথাও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। আন্দোলনের পাশাপাশি বিকল্প সব পথই অবলম্বন করা হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫