ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

প্রণব মুখার্জি, নির্বাচন ও ব্যাংকিং খাতে লুটপাট

সৈয়দ আবদাল আহমদ

০৯ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:০২


আবদাল আহমদ

আবদাল আহমদ

প্রিন্ট

ব্যাংক খাতে এই যে বিশৃঙ্খলা, লুটপাট ও জালিয়াতি চলছে; এ ঘটনা ১৯৭৪-৭৫ সালের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তখনো ব্যাংকিং খাতে চলছিল অরাজকতা। এই অরাজকতা এখন বহুগুণে বেড়েছে। ব্যাংকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি টাকার অঙ্কে দুর্নীতিও বেড়েছে বহুগুণ। আসলে যখন কোনো জবাবদিহিতা থাকে না তখন অরাজকতা চলতেই থাকে। এতে রাষ্ট্র বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হয়। বর্তমানে দেশ এ ধরনের বড় ঝুঁকির মধ্যেই আছে। নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত জবাবদিহিমূলক সরকার না আসা পর্যন্ত এই ঝুঁকি রয়েই যাবে। ব্যাংকিং খাতের বড় ধস ঠেকিয়ে রাখা যাবে না


ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি আগামী জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তার আসন্ন এই সফরে আমরা খুশি। বাংলাদেশে তিনি বেড়াতে আসতেই পারেন, এতে দোষের কিছু নেই। ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি সর্বপ্রথম বিদেশ সফর হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেন। অবসরের পর জানুয়ারির মধ্যে অন্য কোনো দেশে বেড়াতে না গেলে বাংলাদেশেই তিনি প্রথম আসবেন। আসন্ন সফরকে সামনে রেখে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সবার কাছ থেকে আমি ভালোবাসা পেয়ে আসছি।’ এ কথা ঠিক, আমরা তাকে ভালোবাসি। একে তো তিনি বাঙালি, আবার বাংলাদেশের যশোর অঞ্চলে রয়েছে তার শ্বশুরবাড়ি। তাই এবারো বাংলাদেশে বেড়াতে এলে আমরা তাকে স্বাগত জানাব। আতিথেয়তারও কোনো কমতি থাকবে না। তবে প্রণব মুখার্জিকে নিয়ে আমাদের ভয়ও আছে!

শোনা যাচ্ছে, প্রণব মুখার্জির আসন্ন এই সফরের নেপথ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ। নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে আবার তার সহযোগিতা পেতে আগ্রহী তারা। আওয়ামী লীগ বুঝতে পারছে প্রশাসনসহ সর্বত্র তাদের যে একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, সেখানে চির ধরেছে। প্রণব মুখার্জির সফরের ফলে হয়তো এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা যাবে। জনগণের ভয় সেখানেই। কারণ ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’। ব্যক্তি প্রণব মুখার্জির প্রতি বাংলাদেশের মানুষের কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই। তারা সবাই তাকে ভালোবাসেন। তবে আমরা লক্ষ করেছি, দেশের মানুষ তাকে ভালোবাসলেও বরাবরই প্রণব মুখার্জির ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকুক এবং ক্ষমতায় আসুক, এটা সব সময়ই তিনি চেয়ে এসেছেন। শেখ হাসিনা যে তার ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু, প্রণব মুখার্জি বইতে লিখেছেন। শুধু বই কেন, প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সাথে তাদের পারিবারিক বন্ধুত্বের কথা। তিনি বলেছেন, ‘আমার স্ত্রী বিয়োগে শেখ হাসিনা ফোনে কেঁদে ফেলেন। বললেন, আমি আসছি। আমি বারণ করেছি। তবুও তিনি চলে এসেছেন (ভারতে)।’ অবশ্য জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও সাইফুর রহমানের সাথে তার সম্পর্কের কথাও বলেন প্রণব মুখার্জি। এটাও বলেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকায় এলে খালেদা জিয়া সাক্ষাৎ না করায় তিনি মনে কিছু করেননি। কারণ, তার ভাষায় এদের একটা রাজনীতি আছে।


যা হোক, বলছিলাম ভয়ের কথা। সামনে জাতীয় নির্বাচনের কথাবার্তা চলছে। বিগত নির্বাচনটি হয়নি। ৫ জানুয়ারির ওই নির্বাচন হাইজ্যাক হয়ে গিয়েছিল। বিষয়টি দেশের জনগণই নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও সবার জানা। আর এই হাইজ্যাকের পেছনে প্রতিবেশী ভারত বিশেষ করে প্রণব মুখার্জির যে আশীর্বাদ ছিল, সে কথা কে না জানে? প্রণব মুখার্জি নিজের লেখায়ও এ ব্যাপারে ইঙ্গিত করেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রণব মুখার্জির ‘কোয়ালিশন ইয়ার্স’ বইতে তিনি স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা, ১৯৯৬ সালে নির্বাচন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার পেছনে তার ভূমিকা ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় প্রণব মুখার্জি ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। তখন কংগ্রেস ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। ওই নির্বাচনের আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকায় ২৬ ঘণ্টার ঝটিকা সফরে এসে আওয়ামী লীগের পক্ষে যে ভূমিকা রাখেন, সেটা কারো নজর এড়ায়নি। ফলে ভয়টা সেখানেই।

বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনে আর ঠকতে চায় না। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দেশের মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে। অতীতে যা হওয়ার হয়েছে। আগামী নির্বাচনটি অন্তত ভালোভাবে হোক, সেটা সবাই চাচ্ছে। অর্থাৎ জনগণের চাওয়া শুধু একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন। এ ক্ষেত্রে ভারত কিংবা সে দেশের কোনো প্রভাবশালী নেতা তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ান, সেটা কাম্য নয়। প্রণব মুখার্জি অত্যন্ত প্রাজ্ঞ, সজ্জন রাজনীতিক ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তার বাংলাদেশ ভ্রমণে কারো দ্বিমত থাকতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ চায় তিনি ভালোবাসা নিতেই এখানে বেড়াতে আসুন। এ দেশের মানুষ ইলিশ খাইয়ে তাকে উজাড় করেই ভালোবাসা দেবে। শুধু বিনয়ের সাথে তার প্রতি অনুরোধ থাকবে, নির্বাচনটির দিকে তিনি বা তার দেশ যেন নেতিবাচক একচোখা দৃষ্টিতে না তাকায়। বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনটি যাতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়। এমন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন হয়, যাতে মানুষ অবাধে নিজের পছন্দনীয় প্রার্থীকে তার ভোটটি দিতে পারে এবং ফলাফল যাতে সেই ভোটের প্রতিফলন হয়।

মান্যবর প্রণব মুখার্জি সমীপে আরেকটি নিবেদন, ভারতের নানা বিতর্কিত ভূমিকার কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভারতবিরোধী। এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই ভারতও অবহিত। এটাও কাম্য নয়। ভারত আমাদের নিকটপ্রতিবেশী। প্রতিবেশীকে কখনো ত্যাগ করা যায় না। প্রতিবেশীর সাথে সদ্ভাব রেখেই চলতে হয়। আমরাও চাই ভারতের সাথে আমাদের সদ্ভাব অটুট থাকুক, আমরা তাদের ত্যাগ করতে চাই না। ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল। তিস্তার পানি সমস্যার সমাধান এখনো আমরা পাইনি। ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হচ্ছে তৃতীয় নম্বর দেশ। এ নিয়েও আমাদের আক্ষেপ নেই। শুধু এতটুকুই বলতে চাই, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করা ভারতের জন্য ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারারই শামিল’।

নির্বাচন নিয়ে নানা ভাবনা
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এবার খালেদা জিয়া নির্বাচন করবেন। এই নির্বাচন হবে প্রতিযোগিতামূলক। এই প্রতিযোগিতায় আমাদের অনেক এমপিকে পাস করতে বেগ পেতে হবে। কারণ আমাদের অনেক এমপি অত্যাচারী ও অসৎ। তারা মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা আদায় করেন। এদের সংখ্যা কম নয়। বেশ কয়েকজন। আমিই জানি কয়েকজনের কথা। নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হলে তারা শিক্ষাটা পাবেন’ (প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর ২০১৭)।

৬ নভেম্বর চট্টগ্রামে এক স্মরণসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপিকে কোনোভাবেই দুর্বল ভাবা যাবে না। বড় দল হিসেবে বিএনপির জনসমর্থন রয়েছে। আবার আওয়ামী লীগবিরোধী সব ভোট ধানের শীষই পাবে।’
এ দিকে জাতিসঙ্ঘের বিদায়ী আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট ডি ওয়াটকিন্স ২ নভেম্বর কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সাথে মতবিনিময়ে বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।’

এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচন হওয়ার একটা আলামত দেখা যাচ্ছে। তবে সেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক বা নিরপেক্ষ কতটা হবে, অর্থাৎ কী ধরনের নির্বাচন হবে এখনো সে বিষয়ে কোনো কিছু আঁচ করা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের নেতা কিংবা মন্ত্রীদের বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তাদের যে ভরাডুবি হবে, সেটা তারা বুঝতে পারছেন। অর্থমন্ত্রী তো খোলামেলাভাবেই সে কথা বলে দিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, এ ধরনের একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কেন তারা দেবেন? হারার জন্য তো তারা নির্বাচন দেয়ার কথা নয়। একটি কথা আলোচনায় আছে, তারা বাঘের পিঠে চড়ে বসেছেন। সেখান থেকে নিরাপদে নামতে চান। এ ক্ষেত্রেও তো সমঝোতার লক্ষণ থাকার কথা, কিন্তু সমঝোতা বা সংলাপের আহ্বান আওয়ামী লীগ বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছে।

তাহলে কী চাচ্ছে আওয়ামী লীগ? অনেকেরই ধারণা, নির্বাচন একটা হবে। সেই নির্বাচনটি হাতের মুঠোয় রেখেই করা যায় কি না তার উপায় উদ্ভাবন করছে আওয়ামী লীগ। দলের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ইদানীং খুব চুপচাপ। তিনি অলস সময় কাটাচ্ছেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। ওই উপায় নিয়েই হয়তো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।


ইসির তিন মাসব্যাপী সংলাপ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ২২ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘সরকার যেভাবে আইন করে দেয়, নির্বাচন কমিশনকে সেভাবেই নির্বাচন করতে হয়। সে আইন বা সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ তার এই কথায় তাৎক্ষণিক সায় দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সিইসি সঠিক কথাই বলেছেন। আইনের বাইরে যাওয়া তাদের কাজ নয়। সিইসির বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এ বার্তাই পাওয়া যায় যে, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তাদের মতো করেই নির্বাচন হবে। অর্থাৎ নির্বাচনে সরকার একটি বড় ফ্যাক্টর বা নিয়ামক। নির্বাচন কমিশনের সংলাপে বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা এ বিষয়টির প্রতিই গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হলে নির্বাচনকালীন সরকারটি হতে হবে নিরপেক্ষ। তাহলে সবার জন্য সমান সুযোগ, অর্থাৎ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে। বর্তমান সংসদ বহাল রেখে কিংবা বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন না করে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যাবে না।

জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দেশ বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনটি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে দেখতে চান। জাতিসঙ্ঘ ইতোমধ্যেই বলেছে, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলের সাথে জাতিসঙ্ঘ কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী। সফররত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি টমাস শ্যানন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে আগামী নির্বাচন সম্পর্কে দলটির মনোভাব জানতে চেয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের অধীনে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনে সন্ত্রাস, কেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপির নজির তুলে ধরে ক্ষমতাসীনদের অধীনে কোনোভাবেই যে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় তা উল্লেখ করা হয়।
কানাডীয় সংসদীয় প্রতিনিধিদলও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে খালেদা জিয়ার সাথে আলোচনা করেছে।

ব্যাংকিং খাতে ধস
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ধস নামছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন এক ডুবন্ত খাতের নাম। সেখানে চলছে ‘হরির লুট’। আর্থিক শৃঙ্ঘলা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। অবস্থা যে খুবই খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে তা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বক্তব্যেই প্রমাণ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাত ভালো চলছে না। ঘুষ-দুর্নীতি কম না। প্রধান দুর্বলতা সরকারি ব্যাংকে। কিছু লুটপাট বেসরকারি ব্যাংকেও হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার খুব বেশি। এর কারণও আছে। সরকারি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কম। বেশি নিয়ন্ত্রণ সরকারের।’

ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, বেসরকারি ব্যাংকে হঠাৎ মালিকানা পরিবর্তন, ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন করে কয়েকটি পরিবারের হাতে ব্যাংকে জিম্মি করা, বিনিয়োগ বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে বিদেশে টাকা পাচার এবং রাজনৈতিক স্বার্থ ও স্বজনপ্রীতির কারণে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের ৪৮টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ১৩ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাই বেশ খারাপ। খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। বেড়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতি। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বেসরকারি খাতের বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এবং সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা হঠাৎ পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতে আস্থার সঙ্কটই সৃষ্টি করেনি, আতঙ্কও সৃষ্টি করেছে। গত ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংক এবং ৩১ অক্টোবর এসআইবিএল ব্যাংকে হঠাৎ পরিবর্তনের পর প্রশ্ন উঠছে, এরপর কোন ব্যাংক?

কোনো কোনো ব্যাংক মালিকের চাপে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাতে ব্যাংক খাতের মালিকানা কয়েকটি পরিবারের হাতে কুক্ষিগত হয়ে গেছে। ব্যাংকের পর্ষদে একই পরিবার থেকে চারজন থাকা এবং একটানা ৯ বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ এটাকে পাকাপোক্ত করেছে। চট্টগ্রামের একটি ব্যবসায়ী গ্রুপ সাতটি ব্যাংকের মালিকানা কব্জায় নিয়েছে। কী জাদুর কারণে সরকার তাদের এই পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, এ প্রশ্ন এখন মুখে মুখে।


দলিলপত্র যাচাই না করে ঋণ দেয়া, আইন না মেনে একক গ্রাহককে সীমার বাইরে ঋণ দেয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এখন সাধারণ ঘটনা। এ প্রবণতা বেসরকারি ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে খেলাপি ঋণও বাড়ছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই খেলাপি ঋণের টাকা আদৌ পাওয়া যাবে কি না, নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছেন না। সাম্প্রতিককালে রাষ্ট্রায়ত্তসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে বড় বড় দুর্নীতিও ধরা পড়েছে। সোনালী ব্যাংকের চার হাজার কোটি টাকার হলমার্ক কেলেঙ্কারি, প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ডেসটিনি কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির পাশাপাশি প্রায় ৮০০ কোটি টাকার (১০ কোটি ১০ লাখ ডলার) বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি দেশের আলোচিত ঘটনা। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীরা জড়িত।

এসব কেলেঙ্কারির সাথে এখন যোগ হচ্ছে বিনিয়োগের নামে বিদেশে টাকা পাচার। দেশের কার্যকর কোনো বিনিয়োগ নেই। অথচ দেখা যাচ্ছে, এ বছর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত তিন মাসে টাকার অঙ্কে ২৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বেড়েছে বলে দেখানো হয়। এই বিনিয়োগ কোথায় হচ্ছে? টাকা যাচ্ছে কোথায়? কেউ কিছু জানে না। নয়া দিগন্তের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে ছয় লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে গেছে ৭৩ হাজার কোটি টাকা। গড়ে প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি পাচার হচ্ছে।
ব্যাংকাররা নতুন বিনিয়োগকারী পাচ্ছেন না, অথচ গত জুন পর্যন্ত পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ সাত লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তিন মাসেই হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকার তথাকথিত বিনিয়োগ। বিপুল অঙ্কের টাকায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হচ্ছে বলে বিনিয়োগ দেখানো হচ্ছে।

আদৌ মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করা হচ্ছে কি না কে খবর রাখে? আসলে টাকা পাচারের ভালো মাধ্যম হচ্ছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির অজুহাত দেখানো। দেশে বিনিয়োগ নেই। অথচ এভাবে বিনিয়োগ দেখিয়ে চলছে হরির লুট। বর্তমানে দেশে ৫৭টি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংক আটটি। বাকিগুলো বেসরকারি ব্যাংক। সরকারি হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নাজুক অবস্থা। এই হস্তক্ষেপে বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংক খাতও অস্থির। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছে না। ব্যাংক খাতে এই যে বিশৃঙ্খলা, লুটপাট ও জালিয়াতি চলছে; এ ঘটনা ১৯৭৪-৭৫ সালের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তখনো ব্যাংকিং খাতে চলছিল অরাজকতা। এই অরাজকতা এখন বহুগুণে বেড়েছে। ব্যাংকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি টাকার অঙ্কে দুর্নীতিও বেড়েছে বহুগুণ। আসলে যখন কোনো জবাবদিহিতা থাকে না তখন অরাজকতা চলতেই থাকে। এতে রাষ্ট্র বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হয়। বর্তমানে দেশ এ ধরনের বড় ঝুঁকির মধ্যেই আছে। নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত জবাবদিহিমূলক সরকার না আসা পর্যন্ত এই ঝুঁকি রয়েই যাবে। ব্যাংকিং খাতের বড় ধস ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫