ঢাকা, সোমবার,২০ নভেম্বর ২০১৭

আলোচনা

কাজী মোতাহার হোসেন : তাঁর সাহিত্য জীবন

আবুল হোসেন আজাদ

০৯ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৫২


প্রিন্ট

একটি কাননে কুঁড়ি থেকে অসংখ্য কুসুম পাঁপড়ি মেলে প্রস্ফুটিত হলেও সব কুসুম মনোরম সৌন্দর্য ও সৌরভে সবাইকে আকৃষ্ট করে না। তন্মধ্যে কিছু কিছু কুসুম তার মনোরম অনাবিল সৌন্দর্য ও সৌরভে পতঙ্গকুলসহ মানবের হৃদয়কে আকৃষ্ট করে যেমন, ঠিক তেমনি এই বিপুল বিশ্বের কোটি কোটি মানবের জন্ম হলেও সব মানবই সবার হৃদয় জয় করতে পারেন না বা সমাজের বুকে তাদের প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকার কোনো মজবুত ভিত তৈরি করে যেতে পারেন না। তবে কিছু কিছু মানব আছেন এ ধারার ব্যতিক্রম। তাদের জীবন ও কর্ম জাতির জন্য উৎসর্গকৃত। তারা সমাজের আলোকবর্তিকা হয়ে অন্ধকার দূরীভূত করার কর্মে সারাজীবন ব্যাপৃত থাকেন। তারা মানবের হৃদয়কুঞ্জে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার আসন অলঙ্কৃত করে থাকেন। ঠিক এমনই এক ক্ষণজন্মা মনীষী কাজী মোতাহার হোসেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তচিন্তার একনিষ্ঠ সাধক। উদার জ্ঞানতাপস, মননশীল ও চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক।

কাজী মোতাহার হোসেনের সাহিত্যচর্চা শৈশবে শুরু হলেও তার প্রথম লেখা ছাপা অক্ষরে প্রকাশিত হয় মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সম্পাদিত ‘সওগাত’ পত্রিকায়। এটি ছিল একটি প্রবন্ধ। নাম গ্যালিলিও। অতঃপর ১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজ বার্ষিকী থেকে তার ‘সুন্দর’ নামের একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। এরপর থেকে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। প্রথম অবস্থায় তিনি গল্প-কবিতা লেখা শুরু করলেও পরে সামাজিক প্রবন্ধ রচনায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। এরপরও একটি অন্তর্নিহিত কারণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। উনিশ শতকের দ্বিতীয় পর্ব থেকে আধুনিক শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। বাঙালি মুসলিম সমাজে তারই ফলে ১৯২৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। এই সাহিত্য সমাজের অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল একটি সংস্কারমুক্ত আধুনিক গ্রগতিবাদী সমাজ গড়ে তোলা, যা কিনা গতানুগতিক পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণামুক্ত হয়ে মুক্তবুদ্ধি চর্চায় সমাজ জাগরণে ভূমিকা রাখা। আলোচ্য মুসলিম সাহিত্য সমাজই কাজী মোতাহার হোসেনকে মুক্তচিন্তার একনিষ্ঠ সাধক ও অগ্রপথিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ করে।
তিনি বুঝেছিলেন একজন লেখকের কিছু সামাজিক দায়িত্ব থাকে। আর সেই দায়িত্বরোধ থেকেই তিনি তার লেখার উপাদান সংগ্রহ করে লিখতে শুরু করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর সঞ্চরণ প্রবন্ধ গ্রন্থে ‘লেখক হওয়ার পথে’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘আমার চিন্তা, কর্ম এবং লেখা যেন জীবনের একটা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল। এতে সফলতা যতটা হোক না হোক, একটা আদর্শ অনুসরণের সহজ আনন্দ যেন পেতে লাগলাম। তার সঙ্গে সঙ্গে একটা অস্পষ্ট আশা রইল যে, অন্ধকার ক্ষীণ আলো ভবিষ্যতে শক্তি সঞ্চয় করে যখন প্রখর সূর্যে পরিণত হবে তখন আর তাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারও থাকবে না’।
তাঁর সঞ্চরণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। এ গ্রন্থটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রমথ চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লেখেন- আপনার বিচিত্র ভাবকে এবং আলোচনার বিষয়কে স্বচ্ছ প্রাঞ্জল ভাষায় রূপ দিয়ে যে প্রবন্ধগুলো আপনার সঞ্চরণ গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন তা পড়ে পরিতৃপ্ত হয়েছি।
১৯৫১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর মৌলিক প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘সেই পথ লক্ষ্য করে’। এরপর ১৯৫৫ সালে নজরুল কাব্য পরিচিতি, ১৯৬৫ সালে অনুবাদগ্রন্থ প্লেটোর সিম্পোজিয়াম প্রকাশিত হয়। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় হজরত দাতাগঞ্জ বখশের জীবনী। এ ছাড়াও তাঁর অনুবাদ গ্রন্থ (হিন্দি থেকে) কাজী আশরাফ মাহমুদের কবিতা প্রকাশিত হয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অনেক পাঠ্যপুস্তক তিনি প্রণয়ন করেন। তন্মধ্যে ১৯৬৯ সালে তথ্যগণিত। ১৯৭০ সালে গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস। ১৯৭৫ সালে আলোক বিজ্ঞান। ১৯৭৬ সালে নির্বাচিত প্রবন্ধ (১ম খণ্ড) প্রকাশিত হয়। তিনি বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু গল্প ও কবিতা লিখেছিলেন, যেগুলো বাংলা একাডেমি থেকে আবদুল হক ও আবুল আহসান চৌধুরীর সম্পাদনায় চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
সুসাহিত্যিক মোহিতলাল মজুমদার, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অন্নদা শঙ্কর রায়, কাজী আবদুল ওদুদ, চারু বঙ্গোপাধ্যায় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। কবি নজরুল কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে তাঁর বাসাতেই উঠতেন। ফজিলাতুন্নেসার সাথে কবির সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যম ছিলেন তিনি। কবি নজরুল কাজী মোতাহার হোসেনকে ‘মতিহার’ বলে সম্বোধন করতেন।
কাজী মোতাহার হোসেন মুক্তচিন্তার সাহিত্য চর্চা ছাড়াও তিনি ছিলেন পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক। ১৯২১ সালে এম এ পাস করার বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি ওই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। তিনি পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যান- তিন বিভাগেই অধ্যাপনা করেছেন কৃতিত্বের সাথে। তিনি ১৯৫০ সালে ‘ডিজাইন অব এক্সপেরিমেন্টাল’ বিষয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ‘হোসেনস চেইন রুল’ নামে স্বীকৃতি লাভ করে তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতি। তাঁর গবেষণাকর্মের পরীক্ষক স্যার রোনাল্ড ফিশার ভূয়সী প্রশংসা করেন তাঁকে।
ক্রীড়া ক্ষেত্রে তাঁর ছিল দারুণ দক্ষতা। ছাত্রাবস্থায় তিনি দাবা, ফুটবল, টেবিলটেনিস, ব্যাডমিন্টন ও একজন সাঁতারু ছিলেন। তবে দাবায় তাঁর ছিল অসাধারণ কৃতিত্ব, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দাবাগুরু হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন সবার কাছে। ক্রীড়াক্ষেত্র ছাড়াও তাঁর অনুরাগ ছিল সঙ্গীত জগতেও। যার ফলে তিনি ওস্তাদের কাছে শিখেছিলেন উচ্চাঙ্গসঙ্গীত। তন্মধ্যে খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরী ও সেতার। সঙ্গীত বিষয়েও তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন তৎকালীন সময়ে। রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ তাঁর প্রতি কটাক্ষ করলেও তিনি তাতে ভ্রুক্ষেপ করেননি। যার কারণে তিনি নিজ কন্যাদের সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে পেরেছিলেন এবং ঢাকার সঙ্গীত কলেজের সভাপতি পদে আসীন হতে পেরেছিলেন। বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সানজিদা খাতুন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা, যিনি ঢাকার ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তাই তো তিনি রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা প্রবন্ধে লিখেছিলেন- পূর্ব পাকিস্তানের রাজভাষা বা রাষ্ট্রভাষা বাংলাই হওয়া স্বাভাবিক ও সমীচীন। তার এ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র এক মাস পর। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।
১৯৭১ সালে আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে তিনি জোরালো বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদান অব্যাহত রেখেছিলেন।
তিনি ছিলেন নিরহঙ্কার, গুণী ও উদারমনা মুসলমান; সৎ স্বভাবের চরিত্রবান মানব। তিনি মুক্তমনা প্রগতিশীল ছিলেন বলে ধর্মহীন ছিলেন না। ধর্মকে তিনি লালন করেছেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শুদ্ধভাবে।
কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর কর্মজীবনের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তন্মধ্যে ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রীয় খেতাব, ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৭৭ সালে নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক, ১৯৭৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার, ১৯৮০ সালে বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ, ১৯৮১ সালে শেরেবাংলা জাতীয় পুরস্কার ও ভাসানী পুরস্কার। এ ছাড়াও তিনি ১৯৭৪ সালে ডিএসসি ও ১৯৭৫ সালে পান জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা।
তিনি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে ১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন মাতুলালয়ে। তাঁর পৈতৃক আবাস ছিল ফরিদপুর জেলার পাংশা উপজেলার বাগমারা গ্রামে। তাঁর বাবা কাজী গওহর উদ্দীন ছিলেন একজন আমিন ইন্সপেক্টর ও মা তমিরুন্নেছা ছিলেন গৃহবধূ। তাঁর বাবার অঢেল অর্থবিত্ত না থাকলেও সৎ ও ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে দশ গ্রামের লোকের কাছে সুখ্যাতি ছিল। প্রাচুর্যের মধ্যে না থেকেও কাজী মোতাহার হোসেন প্রাথমিক পর্যায় থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অত্যন্ত মেধা ও কৃতিত্বের সাথে পড়াশোনা চালিয়েছেন। তিনি ছিলেন মা-বাবার জ্যেষ্ঠ সন্তান।
মুক্তমানসের প্রতিকৃতি কাজী মোতাহার হোসেনের বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান হয় ৮৫ বছর বয়সে ১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর। আমাদের সমাজে তিনি যে উদার জীবনবোধ ও মানবিক আদর্শের দিশা দিয়ে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোর পথ দেখাবে নিঃসন্দেহে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫