ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

অপরাধ

অবক্ষয়ের ভয়াল রূপ

নিরপরাধ শিশুর ঘাতক মা

০৭ নভেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৬:০১ | আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৫:০৯


প্রিন্ট
আয়শা হুমায়রা

আয়শা হুমায়রা

সমাজে একের পর এক ঘটছে নিষ্ঠুর আর পৈশাচিক ঘটনা। বের হয়ে পড়ছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পচনের ভয়ঙ্কর রূপ। আঁতকে উঠছে মানুষ। ছড়িয়ে পড়ছে ভীতি, আতঙ্ক আর নানামাত্রিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কে কখন শিকার হয়ে যায় এসব নিষ্ঠুরতার সেই ভয় কুরে কুরে খাচ্ছে অনেককে। কে জানে কখন কার পাশের চেনা মানুষটা হয়ে উঠে হিংস্র দানব আর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে তারই ওপর। যেখানে মায়ের কাছে আর নিরাপদ নয় নিরপরাধ শিশুসন্তান সেখানে কে কার থেকে নিরাপদ এ সমাজে? মানবিকতার পতন কোন স্তরে নামলে মা তার গোপন পাপ ঢাকতে গলাটিপে হত্যা করতে পারে নিজেরই সন্তানকে। একবার নয়, দুইবার নয়, বারবার দেখছে মানুষ সমাজ পচনের এ ভয়ঙ্কর রূপ। প্রতিবার ঘটে যাওয়া একেকটি বীভৎস ঘটনা ম্লান করে দিচ্ছে আগের বীভৎসতার সব রেকর্ড। ক্ষমতা, সম্পদ এবং যৌনতাকেন্দ্রিক মানুষের লোভ আর হিংস্রতার তুলনা করা যায় পশু জগতেও এমন কোনো হিংস্র প্রাণী নেই। কল্পিত হিংস্র দানব আর পিশাচের সাথেই কেবল তুলনা চলে এর। প্রতিবারের এসব পৈশাচিক ঘটনা ছাড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের বিস্ময়ের সব মাত্রা। একমাত্র ‘আহ’ শব্দে আর্তনাদ করে ওঠা ছাড়া এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানানোর যেন আর কোনো ভাষা নেই অনেকের কাছে।
আজ থেকে সাত বছর আগে ২০১০ সালের ২১ জুন রাজধানীর আদাবরে মা আয়শা হুমায়রা নিজ হাতে গলাটিপে হত্যা করে তার সাড়ে পাঁচ বছরের শিশুসন্তান খন্দকার সামিউল আজিমকে।

কারণ মায়ের অনৈতিক সম্পর্ক দেখেছিল সামিউল এবং সে তা বাবাকে বলে দেয়ার কথা বলেছিল। এরপর ঘরে স্বামী ঘুমন্ত থাকা অবস্থায় হুমায়রা তার প্রেমিক আরিফকে ডেকে আনে বাসায়। এরপর রাতে দুইজনে মিলে যেভাবে হত্যা করে শিশু সামিউলকে ঠিক একই কায়দায় একই কারণে গত ৩১ অক্টোবর মধ্যরাতে রাজধানীর বাড্ডায় মা আরজিনা আর তার প্রেমিক শাহীন মিলে হত্যা করল ৯ বছরের নিরপরাধ সন্তান নুসরাতকে। ২০১০ সালের পর থেকে গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত জাতি একের পর এক প্রত্যক্ষ করেছে এ ধরনের আরো অনেক হৃদয়ে দাগকাটা মর্মান্তিক ঘটনা। নুসরাত হত্যার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে রাজধানীর কাকরাইলে আলমগীর কবিরের নির্দেশে হত্যা করা হয় তার স্ত্রী শামসুন্নাহারকে। আর মাকে হত্যার দৃশ্য দেখে ফেলায় হত্যা করা হয় ছেলে শাওনকেও। এখানেও আলমগীরের নির্দেশে স্ত্রী হত্যা ও সন্তান খুনের পেছনে রয়েছে ভিন্ন নারীর সাথে অবাধ মেলামেশা আর পারিবারিক কলহ। গত বছর বনশ্রীতে মাহফুজা নামে এক মা হত্যা করে তার ১২ ও সাত বছর বয়সী সন্তান যথাক্রমে অরনী ও আলভীকে। পরকীয়া দেখে ফেলায় গত ২৭ অক্টোবর নরসিংদীতে চাচী তমুজা বেগম হাত পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করে ১৩ বছরের কিশোরী আজিজাকে।


মা-বাবার হাতে সন্তান হত্যার ঘটনায় যেমন জাতি বিস্মিত তেমনি হতভম্ব হয়েছে সন্তানের হাতে মা-বাবা হত্যার অনেক ঘটনায়। ফরিদপুরে মুগ্ধ নামক এক কিশোর মোটরসাইকেল কিনে না দেয়ায় বাবাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে সম্প্রতি।


পরকীয়ার কারণে মা-বাবা শুধু সন্তান হত্যা নয়, অহরহ ঘটছে স্বামী ও স্ত্রী হত্যার ঘটনা। কয়েক বছর ধরে সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ শেষে হত্যার বীভৎস অনেক ঘটনা। কয়েক দিন আগে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে আত্মঘাতী ব্লু হোয়েল গেমের আতঙ্ক। বনানীর সাফাত এবং পরিবাগের কার্লোসদের নারীকেন্দ্রিক ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর বের হয়ে পড়ে সমাজের উচ্চবিত্ত আর শোবিজ জগতের কদর্য চিত্র। এর আগে কয়েক বছর ধরে সারা দেশে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে ইভটিজিং আর কিশোরীদের একের পর এক আত্মহননের ঘটনা। এসবের পেছনে দায়ী করা হয় দ্রুত অবাধে ছড়িয়ে পড়া তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারকে। এর মধ্যে সারা দেশে ঘটতে থাকে একের পর শিশু পিটিয়ে হত্যার ঘটনা।


এভাবে কয়েক বছর ধরে ঘটে চলেছে ভয়ঙ্কর সব ঘটনা, যা সার্বিকভাবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অশনিসঙ্কেত হিসেবে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকেরা। তারা প্রতিটি ঘটনার পর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানান, এর কোনোটিই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এসবই এ সমাজের বাস্তবতা এবং এ ধরনের ভয়ঙ্কর ঘটনা একের পর এক ঘটতেই থাকবে যদি আমরা এখনই পুরো মাত্রায় সচেতন না হই এবং সমাজের গুণগত পরিবর্তনের উদ্যোগ না নেয়া হয় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।


বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে যদি লুটপাট, অনিয়ম, নৈরাজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, দমনপীড়ন চলতে থাকে, জবাবদিহিতা না থাকে প্রত্যেকেই তখন নিজ নিজ বলয়ে ক্ষমতার দম্ভ দেখাবে, ক্ষমতার অপ্রয়োগ করবে। এতে অবস্থা ক্রমশ: খারাপ হবে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রযুক্তির অপব্যবহার, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, নৈতিক আদর্শহীন শিক্ষাব্যবস্থা, ভোগবাদিতার প্রসার এবং সম্পদের প্রতিযোগিতার কারণে সর্বত্র পশুত্বের বিকাশ ঘটছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা চলমান সামাজিক অবক্ষয়কে মানবিকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।


প্রফেসর ড. এম শমশের আলী
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ভিসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর ড. এম শমশের আলী বলেন, বর্তমানে যেভাবে অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ছে তাকে মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধের সাথে তুলনা করা যায়। যুদ্ধের সময় যেমন সব কিছু থেকে মনোযোগ সরিয়ে কেবল যুদ্ধের দিকে মনোনিবেশ করা হয় তেমনি আমাদের এ অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। এটাকে যুদ্ধ মনে করে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে এ দিকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। মানবিকতার বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে রাষ্ট্রকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এর বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে একই সাথে সে ব্যাপারে মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণের কাজে নামতে হবে। গণমাধ্যমের ক্ষতিকর বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা না হলে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে পারব না। তাদের থেকে ভালো কিছু পাব না। আর আমরা নিজেরাও এ থেকে রেহাই পাব না। তিনি বলেন, যেভাবে আজ সমাজে প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে, গণমাধ্যমে যেসব অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, যেভাবে সমাজে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে তাতে এখনই আমাদের জেগে উঠতে হবে। পরিবারকে সচেতন হতে হবে।


তিনি বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরকে ধ্বংস করে দিতে পারে। প্রযুক্তিতে মানুষ যেভাবে ডুবে আছে তাতে ভবিষ্যতে আমরা একটি মানবিকতাশূন্য প্রজন্ম পেতে পারি। প্রযুক্তি ডিভাইস আবিষ্কৃত হয়েছিল জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য। সারারাত ধরে কথা বলার জন্য নয়।


প্রফেসর ড. এম শমশের আলী বলেন, প্রযুক্তি বন্ধ নয়, তবে কিছু কিছু বিষয় অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং এটা সম্ভব। মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য যেমন মাদকের সরবরাহ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হয় তেমনি প্রযুক্তির খারাপ জিনিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মোবাইলে একজন মানুষ কতটুকু কী দেখতে পারবে, কী কী কাজে এর ব্যবহার হবে সে ক্ষেত্রেও একটা নিয়ন্ত্রণ ও সীমা আরোপ করা উচিত। সব কিছু সবার হাতে তুলে দেয়া উচিত নয়। এখন মোবাইলের মধ্যে সব কিছু ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। একটি ছেলে বা মেয়ে যদি সারাক্ষণ হিংস্র আর খারাপ ছবি দেখে তবে তাদের মনে সেসব হিংস্রতা আর খারাপ জিনিসই প্রভাব বিস্তার করে। তাদের মন থেকে কোমলতা হারিয়ে যায়। আজ টেলিভিশনে যেসব নাটক অনুষ্ঠান দেখানো হয় তাতে কী থাকে? প্রেম আগেও দেখানো হতো। কিন্তু এখন টিভি নাটকে যা দেখানো হয় তা সিনেমার চেয়েও খারাপ বলে কেউ কেউ বলছেন বলে শুনেছি। সেখানে পরকীয়া, হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।


নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ১৯৮৫ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড সবার জন্য একটি বিষয় বাধ্যতামূলক করেছিল আর তা হলো ধর্মীয় শিক্ষা। আজো সেটি আছে তাদের। আজ আমাদের সমাজে এর প্রয়োজন আরো বেশি আকারে দেখা দিয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষায় কেবল ধর্ম কর্ম শেখানো হয় না ইংল্যান্ডে। নৈতিক গুণাবলি, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে এমন বিষয় শেখানো হয়। যেমন কথা দিয়ে কথা রাখা, মানুষের ক্ষতি না করা এসব বিষয়ের প্রতি জোর দেয়া হয়।


প্রফেসর শমশের আলী বলেন, রাষ্ট্রের ওপরের পর্যায়ে যদি দুর্নীতি-অনিয়ম ছড়িয়ে পড়ে তাহলে নিচের পর্যায়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা-ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো আইনের প্রতি বিশ্বাস হারানো। এটি ঘটলে মানুষ তখন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে থাকে এবং সমাজে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাস অটুট রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।


প্রফেসর ড. এ এস এম আমানউল্লাহ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এ এস এম আমানউল্লাহ বলেন, পাশ্চাত্য সমাজে আধুনিকতা এসেছে অনেক ধাপে ধাপে। কিন্তু আমাদের সমাজে এটা প্রবেশ করেছে রাতারাতি অন্যের অনুকরণে। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শূন্যতা থেকে গেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ রয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের যা শেখানোর কথা ছিল, তা শেখানো হচ্ছে না। শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধরনের নৈতিক মানবিক গুণাবলি সংক্রান্ত বিষয় থাকার কথা ছিল তা নেই। শিক্ষকতা মহান পেশা হলেও এখন এটা নিতান্ত চাকরি এবং দুর্নীতি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগের কথা এখন আর কল্পনাই করা যায় না।


প্রফেসর আমানউল্লাহ বলেন, মানুষ একটি প্রাণী। পশুর মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য আছে তা মানুষের মধ্যেও আছে। কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় ধর্ম ও আদর্শ শিক্ষা দিয়ে। তা নাহলে মানুষ ও অন্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য থাকে না। প্রকৃত শিক্ষার অভাবে মানুষ ও অন্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য কমে এসেছে। মানুষকে সত্যিকার অর্থে ধর্মীয় ও আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হলে পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনা দরকার।


পরিবার ও সমাজে আকাশ সংস্কৃতির কু প্রভাব বিষয়ে তিনি বলেন, পাশ্চাত্যের অনেক দেশ রয়েছে যেখানে পাঁচটির বেশি চ্যানেল দেখতে দেয়া হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে দুনিয়ার সব কিছু খোলা। পাশের একটি দেশের কয়েকটি চ্যানেল রয়েছে, যা আমাদের জন্য অতিশয় ধ্বংসাত্মক। সেখানে যা দেখানো হচ্ছে, তা আমাদের পরিবার, সমাজে নানা বিকৃতি আর অস্থিরতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের ধ্বংসের দ্বারাপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে এসব। তিনি বলেন, বিস্ময়ের বিষয় হলো ওইসব চ্যানেলে যা দেখানো হয় তা ভারতীয় সমাজেও নেই। কিন্তু তারা এসব পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে সমাজে।
সামাজিক অস্থিরতা বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের সমাজ যেন এখন লক্ষ্যহীন উদ্দেশ্যহীন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দম্ভ, বিচারহীনতা, বিশ্বায়ন, সম্পদের প্রতিযোগিতার প্রভাব রয়েছে আজকের অস্থিরতার পেছনে।


এ ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি যেভাবে অবাধ আর সহজ করে দেয়া হয়েছে পৃথিবীর কোনো দেশে এটা নেই। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার এখানে মহামারী আকার ধারণ করেছে। বিশ্বের কোনো দেশে এত সহজে, এত সস্তায়, এত বিষয় কারো হাতের মুঠোয় নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ১৮ বছরের নিচের ছেলেমেয়েদের ফেসবুক ব্যবহারের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে ঘরে ঘরে ওয়াইফাই ঢুকে গেছে আর শিশুর হাতে রয়েছে এর পাসওয়ার্ড।
প্রতিকারের উপায় হিসেবে প্রফেসর আমানউল্লাহ বলেন, রাষ্ট্রকে সবার আগে ঠিক করতে হবে আমরা আসলে কি চাই, কোথায় যেতে চাই। সেজন্য আজ দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি ঐক্যের জায়গায় আসতে হবে এবং সবাই মিলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসাত্মক প্রবণতা ও পরিণতি থেকে রক্ষা করতে হবে।


প্রফেসর ড. শাহ এহসান হাবীব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. শাহ এহসান হাবীব সমাজের বর্তমান অবক্ষয় সম্পর্কে বলেন, সমাজে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মানুষের কাছে এখন চাহিদা পূরণই আসল বিষয়। কিভাবে পূরণ করা হলো সেটা মুখ্য বিষয় নয়। নৈতিকতা আর মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে মানুষ তার আকাক্সা পূরণের ক্ষেত্রে এখন সামনে কোনো বাধা এলেই হত্যাকে বেছে নিচ্ছে সহজ পথ হিসেবে। ভোগের আকাক্সা তীব্র আকার ধারণ করছে আমাদের মধ্যে। আজকে অবাধে ছড়িয়ে পড়া তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম নানামুখী চাহিদা এবং ভোগের আকাক্সা সৃষ্টি করছে মানুষের মধ্যে। পাশাপাশি সন্তানদের প্রতি মা-বাবার মনোযোগের অভাব, ধর্মীয় এবং নীতি-নৈতিকতা চর্চার অভাবে ছড়িয়ে পড়ছে নানাবিধ অনাচার। বিপরীতক্রমে পর্নোগ্রাফিসহ অশ্লীলতা এবং যৌনতার জোয়ারে ভেঙে যাচ্ছে ধর্মীয় পারিবারিক, সামাজিক এবং নৈতিক মূল্যবোধ। অনেকে যৌনতাকে গ্রহণ করছে একটি বাড়তি বা বোনাস বিনোদন হিসেবে। বিভিন্ন চ্যানেল সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে অনেক খারাপ জিনিস। এতে ভেঙে পড়েছে পারিবারিক বন্ধন।
এসব নৈরাজ্য অনাচার বন্ধে রাষ্ট্রের পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
প্রফেসর এহসান হাবীবও মনে করেন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে অনিয়ম, নৈরাজ্য বিরাজ করলে তার প্রভাব পড়ে সমাজের সর্বত্র। বিশেষ করে নানা কারণে অনেকের মধ্যেই আজ এ ধারণা বদ্ধমূল যে, অপরাধ করে পার পাওয়া যায় এখানে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ড. কাজী মুহাইমিন-আস-সাকিব বলেন, আমরা তথ্যপ্রযুক্তি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের কথা বলতে পারি না। আমরা এর ভালো দিক বলতে পারি। আর বলতে পারি এটা যেন খারাপ কাজে ব্যবহার করা না হয়। এ থেকে ভালো জিনিস যেন মানুষ পায় সে দিকে মনোযোগী হতে হবে। সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তানের হাতে বিকল্প হিসেবে ভালো কিছু দিতে হবে। ছেলেমেয়েরা যেন সারাক্ষণ তথ্যপ্রযুক্তির মধ্যে ডুবে থেকে হারিয়ে না যায়, সেজন্য তাদের খেলাধুলার মাঠ থাকা দরকার। কিন্তু তাতো তেমন নেই শহরে। এর আয়োজন করা দরকার।
চীন, ইরানসহ বিভিন্ন দেশে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সে ধরনের কোনো কাঠামো বাংলাদেশে নেই।


প্রেম, পরকীয়া, নগ্নতা। পরিণতি খুন বা আত্মহত্যা। পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের এমন নির্মম পরিণতি ঘটছে অহরহ। সচেতন মহলের অভিযোগ দিনের পর দিন সরকার ব্যস্ত রয়েছে বিরোধীদের দমন এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টায়। ফলে সমাজের নানা স্তরে অনাচার, পাশবিকতা এবং অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নৈরাজ্য বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ছে। সমাজের ভেতরে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। তাই অনেকের আশঙ্কা বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রকাশ ঘটতেই থাকবে। অবক্ষয়ের যে জোয়ার চলছে, তাতে ভবিষ্যতে আরো নানা ধরনের অনাচার, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা এবং শিউরে ওঠার মতো অনাকাক্সিত ঘটনা ঘটতে থাকবে একের পর এক।


ভোগবাদিতা, অধিক পাওয়ার আকাক্সা, সবকিছুতে তীব্র প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক অনিয়ম অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা, পরিবারে ধর্ম ও নৈতিকতা চর্চার অভাব, সমাজে ছড়িয়ে পড়া অন্যায়-অনাচারের কম বেশি শিকার আজ সবশ্রেণীর মানুষ। ফলে মানুষ সহজেই বিবেকশূন্য হয়ে হিংস্রতায় লিপ্ত হয়ে পড়ছে। জড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের অনৈতিকতায়। পদে পদে পরাজিত হচ্ছে মানুষের বিবেক ও স্বাভাবিক বিচার-বিবেচনা। মানুষের সামনে নেই কোনো আদর্শ। কদর্যতায় ভরপুর শোবিজ জগতের দৌরাত্ম্য সমাজের সর্বত্র। বিভিন্ন মহল যেন পরিকল্পিতভাবেই এসবকে তরুণ-তরুণীদের সামনে মডেল হিসেবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এসবের বিপরীতে পরিবারের মা-বাবা থেকে শুরু করে শিক্ষকেরা শিশু, তরুণ ও যুবকদের সামনে আদর্শ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পারছেন না। শিক্ষকদের বলা হতো মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু এখন সত্যিকার অর্থে ক’জন শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগরের দায়িত্ব পালন করছেন, তা চিন্তার বিষয়। কারণ একের পর এক বেরিয়ে পড়ছে শিক্ষকদের ন্যক্কারজনক ঘটনা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫