ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

মিউজিক

গানের সমালোচনার আগে ভালো শ্রোতা হতে হবে

আলমগীর কবির

০৫ নভেম্বর ২০১৭,রবিবার, ২০:৩৪


প্রিন্ট

গানের বাজারে মন্দা। সেভাবে এখন আর জনপ্রিয় গান নিয়ে আলোচনা হয় না। ইউটিউবে প্রকাশ হওয়া গানগুলোর হিট দেখেই মূল্যায়ন হয় গানে জনপ্রিয়তা। এইক্ষেত্রে দ্বন্দ্বটা তৈরী হয় ভিউয়ার্সের সংখ্যা কোটি ছাড়ানোর পরও যখন, পাড়ার মোড়, খেলার মাঠ, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডায় এ নিয়ে কোন আলোচনা হয় না।

আলোচনা করতে শোনতে হয়, বুঝতে হয়। এ জন্য সবার আগে প্রযোজন ভালো শ্রোতা হওয়া। যা আমাদের এখানে বড় অভাব। গানতো আমরা সবাই শুনি, দরকারে-অদরকারে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়। গান শুনলাম আর শ্রোতা হয়ে গেলাম বিষয়টা কি এতো সহজ? দুইটা দল, একদল গান করে আরেকদল শোনে। আবার যারা গান করে তারা একই সাথে দুই দলেরই। যারা গান করে তাদের অনেক সাধনা করতে হয়। আমরা যারা দ্বিতীয় শ্রেণিতে তাদের কিছুই করতে হয় না, শুধু শুনলাম আর শ্রোতা হয়ে গেলাম! বিষয়টা একদমই তা নয়, আমরা যেভাবে ভাবছি। শ্রোতারও সাধনা করতে হয়, শ্রোতারও লেভেল বা গ্রেড আছে যা আমরা সাধারণ চোখে দেখি না, একজন শিল্পী যেমন পৃথিবী বদলাতে পারেন একই ভাবে একজন ভালো শ্রোতাও বদলাতে পারেন চারপাশ। শিল্পীর চেয়ে শ্রোতার গুরুত্ব কমতো নয়ই বরং বেশি। সবচেয় বড় কথা, ভালো শ্রোতা না থাকলে ভালো গান হয় না। শ্রোতাই আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন শিল্প-সংস্কৃতির গতিপথ।

অবাক হচ্ছেন? ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই, ক্রিকেটে আমরা এখন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখি এবং তা সম্ভবও কিন্তু ফুটবলে আমরা দক্ষিণ এশিয়া জয়েরও গ্যারান্টি দিতে পারি না, কেন? একমাত্র কারণ আমাদের দর্শক। দর্শক ক্রিকেট ভালোবাসে আর যেখানে মানুষের আগ্রহ আছে, সেখানে পৃষ্ঠপোষক আছে, যেখানে পৃষ্ঠপোষক আছে সেখানে উন্নতি হয়ই হয়।

দেশের একজন জনপ্রিয় শিল্পী গানের বর্তমান শ্রোতাদের নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, একসময় বেতারে সিনেমার গান শুনে আমার শ্রোতা হওয়ার হাতেখড়ি। এরপর আজম খান, সোলস, ফিলিংস, ফিডব্যাক, নোভা, এলআরবি হয়ে যাত্রা করলাম ওপার বাংলায়। মান্না দে, লতা, হেমন্ত শুনে শুনে যখন নতুন কিছুর খোঁজে মন, তখনই পেলাম সেই গান, প্রথমত আমি তোমাকে চাই।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘যে সময় আমি সুমনের গান রোজ দুবেলা খেতাম আমার বন্ধুরা তখনও ফিলিংস আর এলআরবিতেই বন্দি। এরপর ধরেন, ভূপেন, অঞ্জন, সলিল চৌধুরী হয়ে বব ডিলান, জিম মরিসন, পিঙ্ক ফ্লয়েড, পীট সীগার, আলি প্রিমেরো হয়ে আরো নতুন নতুন কিছুর তালাসে আছি রোজ।’ তিনি বলেন, সুমনের গান শুনলে আমার নেশা হয়ে যায়, একদম বাড়িয়ে বলিছ না। লালন, রবীন্দ্রনাথের গান শুনলে আমার কেমন যেনো আউলা আউলা লাগে। গান যদি আপনাকে না ভাবালো, ভাসিয়ে নিয়ে না গেলো, আপনার ভিতরের সত্ত্বাকে যাদু বাস্তবতায় ফেলে না দিলো তবে আর কিসের শ্রোতা। মজার ব্যপার হলো, শিল্পী প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরী করা যায় হয়তো, শ্রোতা হয়ে উঠতে হয় আপন তাগিদে।’

স্যোশাল মিডিয়ার কল্যাণে রোজই তো কত পোষ্ট পড়ি, নাহ আর হচ্ছে না। এসব কোনো গান হলো? বাংলা গান আর শোনার মতো নয়, তাই বাংলা গান শুনি না। অথবা বলছেন, পুরানা বাংলা গানই শুনতে হয় বাধ্য হয়ে, নতুন ভালো গান কই? আছে, নতুন ভালো গান আছে। এসব প্রশ্নকারীদের উত্তর হলো, মুক্তোর খোঁজ পেতে হলে অনেক মুক্তোহীন সাধারণ ঝিনুক কুড়ানোর পরিশ্রম আপনাকে করতে হবে। উপর থেকে আসলে বুঝতে পারবেন না, কোন ঝিনুকে মুক্তো আছে।

ভালো গান হারিয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র ভালো শ্রোতার অভাবে। আপনি তাকিয়ে থাকেন মিডিয়ার দিকে। মিডিয়া বলবে, বাজারের এই গানটা শ্রেষ্ঠ, অমনি আপনি চেখে দেখতে যাবেন। লালনের কানার হাটবাজারের মতো অবস্থা।
শুধু শুধুই আমরা গানের দোষ দেই, দোষ আমাদের। একবার ভাবুন তো সস্তা গান যদি আমরা না শুনি তাহলে, কি কোম্পানি তাদের পেছনে লগ্নি করবে? করবে না। ওরা রাজার হালে আছে আমাদের নিষিক্রিয়তায়। বাজার আছে বলেই না ওরা টিকে আছে। ভালো একটা গান ভিউ হয় কয়েকশ আর সস্তা গানের বাজার কয়েক কোটি। আপনি কোম্পানির মালিক হলে কার পিছনে লগ্নি করতেন। তরুণরা স্বাভাবিকভাবেই অনুসরণ করে। ধরেন, তরুণ একজন শিল্পী সবে এ পথে হাঁটা শুরু করতে যাচ্ছে। সে দেখবে কোন ধরণের গান করলে কদর পাওয়া যায়, পয়সা পাওয়া যায়। এবং সে সেধরণের গানই গাইতে শুরু করবে। এটা দোষের কিছুও না। ভালো শিল্পীর সামনে যখন বাজারি শিল্পী প্রাডো হাঁকিয়ে আচমকা ব্রেক কষে বলবে, আরে ব্রো, কেমন আছো? কই যাচ্ছো? চলে তোমাকে নামিয়ে দেই। এর চেয়ে বড় লজ্জার কিছু হতে পারে না। তাই ভালো গান পেতে হলে ভালো শ্রোতা হওয়ার বিকল্প নাই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫