ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

জন্মভূমি যখন নগ্ন বিভীষিকা

সৈয়দ আবদাল আহমদ

০২ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২৩ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০৮:৩৮


আবদাল আহমদ

আবদাল আহমদ

প্রিন্ট

রোহিঙ্গারা যেন নীড়হারা ঝড়ের পাখি। ঝড়ের তাণ্ডবে বাসা হারিয়ে পাখির যে করুণ দশা হয়, রোহিঙ্গা মুসলমানদের অবস্থা এখন তার চেয়েও করুণ। তারা এখন রাষ্ট্রহীন নাগরিকের উদাহরণ, স্বদেশহারা এক জনগোষ্ঠী।

ছোটবেলায় স্কুলে পড়েছি- ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরীয়সী।’ সংস্কৃত এই উক্তির অর্থ হচ্ছে- জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও গরিয়ান। জন্মভূমি কার না প্রিয়? কবি আ ন ম বজলুর রশীদ জন্মভূমিকে বলেছেন, ‘মা আমার, জন্মভূমি।’ রজনীকান্ত সেন জন্মভূমিকে নানা বিশেষণ দিতে গিয়ে উচ্চারণ করেছেন- জননী, শোণিত ধমনি, হীরক মুক্তা, মণিময় হার, মুকুটমণি ইত্যাদি। মীর মশাররফ হোসেন লিখেছেন- ‘জন্মভূমি কাহার না আদরের, জন্মভূমির জন্য কে না লালায়িত?’


প্রত্যেক মানুষের কাছেই তার জন্মভূমির চেয়ে প্রিয় কোনো দেশ নেই। মানব সন্তান যে চোখ দিয়ে তার মাকে দেখে, যে মন দিয়ে মায়ের স্নে-মমতা ও ভালোবাসা অনুভব করে; সেই চোখ এবং সেই মন দিয়েই ভালোবাসে জননীসদৃশ জন্মভূমিকেও। সে জন্যই দেখা যায়, দেশের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে কেউ কুণ্ঠিত হয় না। স্বদেশের প্রতি হৃদয়ের এই যে টান, এই যে মায়া- সেটাই দেশপ্রেম। নিজের দেশের স্বাধীনতার সুখ আসলেই স্বর্গসুখ।

কিন্তু হায়! রোহিঙ্গারা আজ সেই স্বর্গসুখ থেকে বঞ্চিত। সেই জন্মভূমির নাম উচ্চারণ করতেও তারা ভয় পায়। জন্মভূমি থেকেও নেই। জন্মভূমির প্রতি সামান্য অধিকার খাটানোর অবস্থাও নেই তাদের।
মানুষ কখন তার প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে পালায়? তখনই, যখন সেখানে তার আর বেঁচে থাকার সামান্য নিশ্চয়তাটুকুও থাকে না। জন্মভূমিকে তখনই সে বিদায় জানায়, যখন প্রাণ নিয়ে থাকা দায় হয়ে দাঁড়ায়। এমন এক পরিস্থিতিইে পলিয়ে এসেছে রোহিঙ্গারা।

মদিনায় আমাদের প্রিয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর হিজরত করার কথা নিশ্চয়ই সবার জানা। ইসলামের একাত্মবাদ প্রচার করতে গিয়ে মক্কায় টানা তেরো বছর অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল নবীজীকে। এত অত্যাচারের পরও তাঁকে যখন ইসলামের বাণী প্রচারের কাজ থেকে বিরত করা যায়নি, তখন মক্কার কুরাইশরা তাকে চিরতরে শেষ করে দেয়ার জন্য হত্যার পরিকল্পনা করে। এ অবস্থায় মহান আল্লাহর হুকুমে তিনি মদিনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন। জন্মভূমি মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশে বের হওয়ার মুহূর্তে তিনি ‘হাজওয়ারে’ নামক স্থানে তার বাহন উটকে একটু থামিয়ে কাবা শরিফের দিকে মুখ করে জন্মভূমিকে এক পলক দেখে নেন। এ সময় জন্মভূমির জন্য তাঁর অন্তর কেঁদে ওঠে। দরদভরা কণ্ঠে তিনি প্রিয় জন্মভূমিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন- ‘হে মক্কা, আমার প্রিয় শহর! আল্লাহর কসম, সকল মৃত্তিকা থেকে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে পবিত্রতম হচ্ছে তোমার মৃত্তিকা। তোমার লোকেরা যদি আমাকে বের করে না দিত, তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না, হে মক্কা!’ এরপর তিনি বন্ধু-সহচর হজরত আবু বকর রা:কে সাথে নিয়ে ধীরে ধীরে সওর পর্বতের দিকে রওনা হন।

জনম জনম ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা জেনে এসেছে, মিয়ানমারের আরাকান তাদের মাতৃভূমি, এখনকার রাখাইনই তাদের স্বদেশভূমি। কিন্তু আজ শুনতে হচ্ছে এই দেশ নাকি তাদের দেশ নয়। মিয়ানমারের অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠী তাদের দেশছাড়া করেছে। সেখানে হত্যা-নির্যাতনের এমন নৃশংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে, যার কারণে দলে দলে রোহিঙ্গারা মাতৃভূমিকে বিদায় জানাতে বাধ্য হয়েছে। অবস্থা এমন যে, জন্মভূমির নাম শুনলেই তারা এখন আঁতকে ওঠে। জন্মভূমির জন্য অন্তর কাঁদলেও সাহস করে তারা বলতে পারছে না- ‘আমার মাতৃভূমি আমাকে ফিরিয়ে দাও।’ কারণ এই মাতৃভূমি এখন তাদের কাছে এক নগ্ন বিভীষিকার নাম! তবে এ অবস্থা নিশ্চয়ই একদিন কেটে যাবে। কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজের কবিতার লাইন উদ্ধৃত করে বলতে ইচ্ছে করছে-
‘হে আরাকানবাসী, রোহিঙ্গা ভাই আমার
তুমি ঘুরে দাঁড়ালেই কাপুরুষ হন্তারক থমকে দাঁড়াবে।’

রোহিঙ্গারা রাখাইনের অদিবাসী
মিয়ানমারের বর্তমান শাসকেরা রোহিঙ্গাদের বিদেশী ও বাঙালি বলে প্রচার করলেও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মুসলিম রোহিঙ্গারা বার্মা বা রাখাইনের অন্যতম প্রাচীন গোষ্ঠী বা আদিবাসী। ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিমের দি রোহিঙ্গা : শর্ট অ্যাকাউন্ট অব দেয়ার হিস্টোরি অ্যান্ড কালচার বইয়ের তথ্যানুযায়ী, হাজার বছর ধরে আরাকানে রোহিঙ্গারা বসবাস করে আসছে। ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিল্টনের বার্মিজ এম্পায়ার (প্রথম সংস্করণ, ১৭৯৯) বইয়েও উল্লেখ আছে, আরাকানে দীর্ঘকাল ধরে মুসলিমরা বসবাস করে আসছে এবং তারা নিজেদের রোহিঙ্গা বলে মনে করে।
১৭৮৪ সালের আগে আরাকান রাজ্য স্বাধীন ছিল। সেটি বার্মার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ১৮২৬ সাল থেকে প্রায় ৫০ বছর সেটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের অংশ। ১৮৮৬ সালে ব্রিটিশরা আরাকানকে বার্মার অন্তর্ভুক্ত করে। সেই থেকে আরাকান, যা এখন রাখাইন রাজ্য বার্মা বা মিয়ানমারের অংশ।

ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, আরাকানের মুসলমানেরা অষ্টম শতকের প্রবাসী আরব ও স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলিম বংশোদ্ভূত। পরে পারস্য, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও ভারত থেকে বহু লোক ধর্ম প্রচার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আরাকানে এসে বসতি স্থাপন করে। তাদের বংশধররাই আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নামে পরিচিত। আরাকানের আদি নাম ছিল রোহাং বা রোসাং।

রোহিঙ্গা শব্দটি রোহাং বা রোসাঙ্গি শব্দ থেকেই এসেছে। চৌদ্দ শতক থেকে আঠারো শতকে মারুফ ইউ বংশের রাজত্বের সময় আরাকান অনেক বিস্তৃত হয়। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নারামেইখলা, যিনি সুলাইমান শাহ নামে পরিচিত ছিলেন। এরপর ১৩২৯ সালে বাংলার সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহের সহযোগিতায় আরাকান রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। পত্তন করেন ‘মারুফ ইউ’ রাজবংশ। একাধারে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত শাসন করেন আরাকান। কারো কারো মতে, এ রাজবংশ মুসলিম ছিল।

আবার কারো মতে, ধর্মের দিক থেকে বৌদ্ধ হলেও তারা গভীরভাবে ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তারা বহু ভারতীয় ও বাঙালি মুসলমানকে রাজকীয় উচ্চপদে নিয়োগ দান করেন। মহাকবি আলাওল ও দৌলত কাজীসহ বহু মুসলিম কবি-সাহিত্যিক আরাকানের রাজদরবার অলঙ্কৃত করেন। ১৭৮৪ সালে বার্মার শাসকেরা আরাকান রাজ্য দখল করে নেন। ১৮২৬ সালে বার্মা-ব্রিটিশ যুদ্ধের সূত্র ধরে ইংরেজরা আরাকানকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে। ১৮৮৬ সালে ইংরেজরা গোটা বার্মা অধিকার করে এবং দেশটিকে ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশে পরিণত করে। ১৯৩৭ সালে বার্মা ভারত থেকে পৃথক হয়ে সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হয়। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হয়। এটাই মোটামুটি ইতিহাস।

গণহত্যায় রোহিঙ্গাশূন্য রাখাইন
২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাখাইনে যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে, তা ছিল ভয়ঙ্কর এবং গা শিউরে ওঠার মতো। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বলে যে একটি জনগোষ্ঠী ছিল, তার চিহ্ন চিরতরে মুছে ফেলার কাজটিই করেছে তারা। ১০ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ প্রতিবেশী পাঁচটি দেশের রাষ্ট্রদূতকে রাখাইনে নিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান বিবিসিকে তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, গোটা অঞ্চলজুড়ে আমি মাইলের পর মাইল ধরে যে পোড়া বাড়িঘর দেখেছি, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশন তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল, মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী সে দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বিতাড়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে, বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। মেয়েদের ধর্ষণ করার পর গুলি করে মেরেছে। পালানোর সময় অনেককে পেছন দিক থেকে গুলি করেছে। এমনকি এক অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীকে ধর্ষণের পর পেটে ছুরি চালিয়ে হত্যা এবং তার স্তন কেটে ফেলার বীভৎস বর্ণনাও রয়েছে ওই রিপোর্টে।

এই নিষ্ঠুর গণহত্যার পর রোহিঙ্গারা এতটাই ভীত হয়ে পড়ে যে, শুধু বেঁচে থাকার জন্য তারা পালাতে থাকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশ স্ট্রাটেজিক ইনস্টিটিউটে (বিম) দেয়া এক বক্তৃতায় উল্লেখ করেন, এই প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মূল অংশ বাংলাদেশে চলে এসেছে। বড়জোর আর চার-পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা উত্তর রাখাইনে অবশিষ্ট থাকতে পারে। বুচিডং ও মংডুকে রোহিঙ্গাশূন্য করে ফেলা হয়েছে। হত্যার শিকার হয়েছে তিন হাজারের মতো। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ছয় লাখ সাত হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এ নিয়ে এখন বাংলাদেশে ১০ লাখের ওপর রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে।

রাখাইনকে রোহিঙ্গামুক্ত করার নীলনকশা শুরু হয় ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক জান্তা সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে। ১৯৬৬ সালে গণহত্যার নীলনকশা তৈরি হয়। সে বছর সামরিক বাহিনী উত্তর আরাকানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কৃত্রিমভাবে বৌদ্ধ জনসংখ্যা বাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের সংখ্যালঘু করার উদ্যোগ নেয়। কালক্রমে এটা গণহত্যার পটভূমি তৈরি করে। এরপর ১৯৭৮ সালে ব্যাপক ভিত্তিক নির্যাতন করে গণহত্যার প্রথম বছরটি শুরু করা হয়। ১৯৮২ সালে নতুন নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। জাতীয় রেজিস্ট্রেশনের বদলে তাদের বিদেশী রেজিস্ট্রেশন কার্ড দেয়া হয়। ২০১৫ সালে আদমশুমারি থেকে তাদের বাদ দেয়া হয়। ২০১২ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থেইন সেনের বক্তব্য ছিলÑ রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো কিংবা ইউএনএইচসিআরের শিবিরে আটকে রাখা (তার ভাষায় ‘কনটেইন’ করা)।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা
রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে চরম ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মিয়ানমার গণহত্যা চালিয়ে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ঠেলে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। এত অল্প সময়ে এত বিপুল শরণার্থী বিশ্বের কোনো দেশে যায়নি, যা রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গা সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের তৎকালীন সরকার শক্ত হাতে তা মোকাবেলা করে। এক দিকে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা, অন্য দিকে গৃহীত সামরিক অ্যাকশনের ফলে মিয়ানমার জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে এ সমস্যা সমাধানে বাধ্য হয়। তখন নাগরিকত্ব দিয়ে মিয়ানমার দুই লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়। ১৯৯২ সালেও এ সমস্যার উদ্ভব হলে খালেদা জিয়ার সরকার কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে এবং সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ফলে মিয়ানমার কয়েক ধাপে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। ওই সময় মাত্র ৩০ হাজার রোহিঙ্গা থেকে যায়। বর্তমান সরকারের সময় ২০১২ সালে মিয়ানমার রাখাইনে হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। এরপর ২০১৪ ও ২০১৬ সালেও একইভাবে রোহিঙ্গারা আসতে থাকে। আর গত ২৫ আগস্টের পর তো রোহিঙ্গা ঢল নামে বাংলাদেশে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাকে তেল দিয়ে শুধু ঘুমিয়েছে। ২০১২ সাল থেকে যদি জোর কূটনৈতিক তৎপরতা ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হতো তাহলে ২০১৪, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের ঘটনা ঘটত না। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রী বলতে থাকেন, রোহিঙ্গাদের জন্য বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা নতুন চর নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেখানে তাদের রাখা হবে। ফলে মিয়ানমার বাংলাদেশের দুর্বলতার এই সুযোগগুলো গ্রহণ করে। এখনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগবাড়িয়ে বলছেন- ‘আমরা যুদ্ধ করব না, যুদ্ধ করব না।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কোনো মহল থেকে কি কেউ বলেছে, আপনি যুদ্ধ করুন। আসলে দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন তারা। জনগণের কাছে সরকারের কোনো জবাবদিহিতা নেই বলেই তারা বিষয়টি হালকাভাবে নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ আজ এত বড় বিপদে পড়েছে। এ বিপদ বলা যায় সরকার অনেকটা ডেকেই নিয়ে এসেছে।

সু চির সেই সদয় দেশ ও মানবিক গণতন্ত্র!
মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি আনতে গিয়েছিলেন। ডিগ্রি গ্রহণ করে দেয়া ভাষণে তিনি অধিকতর মানবিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সু চি বলেছিলেন- ‘আমি একটি অধিকতর দায়িত্বশীল চেহারাবিশিষ্ট গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলতে চাই। আমার দেশকে আমি এমন সদয় দেশ হিসেবে দেখতে চাই, যে দেশ মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব দেবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের রাস্তায় উঠতে গিয়ে এ ধরনের মূল্যবোধ হারিয়ে গেছে বলে আমার মনে হয়েছে।’ সু চি আরো বলেন- ‘সমবেদনা, অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলতা ও সম্প্রীতি হচ্ছে আজকের দিনের আমাদের বিশ্বের জন্য অত্যাবশ্যক।’ (প্রথম আলো, ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)।

এখন কী বলবেন সু চি? তিনি এখন মিয়ানমারের কর্ণধার, স্টেট কাউন্সিলর হিসেবে সরকারের প্রধান। আজ মিয়ানমার সদয় দেশ হওয়ার বদলে নির্দয় গণহত্যার যে নজির সৃষ্টি করল, কোথায় সু চির মানবিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান? কোথায় তার সদয় দেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার? সমবেদনা, অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলতা ও সম্প্রীতির কথা বলার যে ফুলঝুরি তিনি বইয়ে দিয়েছিলেন, কোথায় আজ তার সেই ললিত বাণী? প্রতিটি বাক্য ও শব্দের বিপরীতে গিয়ে তিনি কাজ করেছেন। মানুষের প্রতি নৃশংসতা এবং মানুষের নির্মম মৃত্যু আজ তার কাছে বড় নয়। রাখাইনে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য আজ তিনিই অর্থনৈতিক উন্নয়নের রাস্তায় ওঠাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, একদিন যার সমালোচনা করেছিলেন তিনি।

নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সু চি সম্পর্কে আলজাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকার যথার্থই বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সব দায় সেখানকার ক্ষমতাসীন ডিফ্যাক্টো সরকারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির। তিনি রাখাইনের সেনা নিপীড়নকে অনুমোদন ও বৈধতা দিয়েছেন। সু চি যদি সেনাবাহিনীর চাপেই কোনো ভূমিকা নিতে না পারেন, তার পদত্যাগ করা উচিত। তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্ব এখন সু চির ভিন্নরূপ দেখছে। নিজ দেশের মানুষের গণহত্যায় নিজের নাম জড়াচ্ছেন সু চি। রোহিঙ্গারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেখানে অবস্থান করছে। অথচ সু চি নিজ মুখে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনা নির্যাতনের সাফাই গেয়েছেন।’ একই কথা বলেছেন, মিয়ানমারের নাগরিক মানবাধিকার প্রবক্তা এক সময়ের অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড ও লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের শিক্ষক ড. মং জার্নি। মালয়েশিয়ায় গণ-আদালতের শুনানি চলাকালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, সু চিকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। সু চি তার এক মন্ত্রীকে পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশে। এটাও তার প্রতারণা। মিয়ানমারে এখন যারা মন্ত্রী, তাদের জীবন কেটেছে আন্তর্জাতিক ফোরামে সামরিক বাহিনীর পক্ষে নির্লজ্জ দালালি করে। তারা প্রত্যেকে ধূর্ত ও মুসলিমবিদ্বেষী বর্ণবাদী। তাদের কারো হৃদয়ে এক তোলা নীতিবোধ নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর আড়াল করা এবং বাংলাদেশের সাথে প্রতারণা করা এর লক্ষ্য। তাদের চূড়ান্ত কৌশলগত লক্ষ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের জাতিসত্তা, তার ইতিহাস, পরিচিতি ও আইনগত অবস্থান ধ্বংস করা।

হতাশা নিয়ে ফিরলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
মিয়ানমার থেকে অনেকটা হতাশা নিয়েই ফিরলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান খুব সহজে হবে বলে তিনি মনে করেন না। মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লে. জেনারেল সোয়ের ও স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির সাথে বৈঠকের পর তার মনে হয়েছে- খুব সহজে এরা কিছু করবে না। গত ২৩-২৫ অক্টোবর তিনি মিয়ানমারে তিন দিনের সফর করেন। সফরের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রথম আলোতে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সুস্পষ্টভাবেই বলেন, মিয়ানমারের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ সরে গেলে তারা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কিছুই করবেন না।

আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন আদৌ হবে কি না, এ নিয়েও তিনি সন্দিহান। কারণ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই সুপারিশকে একতরফা বলে মনে করে। তারা কাটছাঁট করে তাদের মনমতো সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে চায়। বাংলাদেশে অবস্থান নেয়া ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের মনোভাব হচ্ছে- ‘তারা যে মিয়ানমারের নাগরিক, সেটা আগে যাচাই করে দেখতে হবে।’ অং সান সু চি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, আইডিপি ভিলেজ করে নাকি তারা রোহিঙ্গাদের নিয়ে রাখবেন। সু চির কথায় এটা স্পষ্ট যে, রোহিঙ্গাদের কিছুসংখ্যক ফিরিয়ে নিলেও তারা সেখানে বসতভিটা-বাড়িঘর ফিরে পাবে না। অনেকটা বন্দিদশার মতোই থাকতে হবে। তার কথা অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কিছু সুযোগ সুবিধা দিয়ে তাদের রাখা হবে। নাগরিকের সুযোগ তারা পাবে না। যদিও আনান কমিশনের সুপারিশে তাদের নাগরিকত্ব প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে।

খালেদা জিয়ার আহ্বান ও আন্তর্জাতিক চাপ
পরম মমতায় কোলে তুলে নেয়ার পর রোহিঙ্গা শিশুটি অবাক বিস্ময়ে দেখছিল খালেদা জিয়াকে। সে যে এক উদ্বাস্তু শিশু, তার বোঝার বয়স হয়নি। কিছু দিন আগেও সে ছিল তার জন্মভূমিতে। সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে আজ সে উদ্বাস্তু। এ ক’দিন শিশুটির ওপর দিয়েও ঝড় বয়ে গেছে। হয়তো খালেদা জিয়ার কোলে ওঠার পর মমতা ও কিছুটা শান্তির পরশ পেয়ে অবাকই হয়েছে শিশুটি।
তার মতো অনেক শিশু এখন জন্ম নিচ্ছে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ক্যাম্পে। অনেক অন্তঃসত্ত্বা মায়ের ঘরে জন্মেছে সন্তানেরা। ওরা হয়তো একদিন জানবে তাদের একটি দেশ ছিল, ছিল ঐতিহ্য সম্পদ। সে দেশটি নেই। তাই তারা উদ্বাস্তু, শরণার্থী।

কক্সবাজারের উখিয়ায় এই বিপুল রোহিঙ্গা শরণার্থীর মাঝে ত্রাণ বিতরণের মানবিক কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। পথে ফেনীতে তার গাড়িবহরে সরকারি দলের ক্যাডাররা হামলা করেছে। বেশ কয়েকটি গাড়ি ও কর্তব্যরত সাংবাদিকেরা আহত হয়েছেন। খালেদা জিয়া তবুও এই মানবিক কর্মসূচি স্থগিত করেননি। যাওয়ার পথে আর কোনো ঘটনা অবশ্য ঘটেনি। তিনি রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু ত্রাণ বিতরণ করেন। বাকি ত্রাণের মধ্যে ১১০ টন চাল, পাঁচ হাজার প্যাকেট শিশুখাদ্য ও পাঁচ হাজার প্রসূতি মায়ের খাদ্যের প্যাকেট সেনাবাহিনীর কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেন।

তবে ত্রাণ বিতরণ শেষ করে সেখানে তিনি তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সরকারের প্রতি যে আহ্বান জানান, তা অনেকেরই নজর কাড়ে। তিনি তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সম্মানের সাথে তাদের দেশ মিয়ানমারের রাখাইনে ফেরত পাঠাতে জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আইসিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বড় দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শুধু মিয়ানমারকে নিন্দা ও রোহিঙ্গাদের সহানুভূতি জানালেই হবে না। রোহিঙ্গারা যাতে অতি দ্রুত দেশে ফিরে যেতে পারে এবং নিরাপদে থাকতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশ ধনী দেশ নয়। ছোট একটি গরিব দেশ। এই দেশ এমনিতেই জনবহুল দেশ। রোহিঙ্গাদের এত বড় বাড়তি চাপ বেশি দিন বাংলাদেশ বহন করতে পারবে না।
তা ছাড়া বর্ষা বৃষ্টির পর শীত এসে পড়েছে। সমস্যার দ্রুত সুরাহা না হলে রোহিঙ্গারা শীতে চরম দুর্দশায় পড়বে। একই সাথে তিনি সরকারকে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর আহ্বান জানান।

খালেদা জিয়া সঠিক কথাই তুলে ধরেছেন। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আরো বুঝতে জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি কালক্ষেপণের নীতি গ্রহণ করে তাহলে মানবিক বিপর্যয় ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কিছু দেশ মিয়ানমারের ওপর যে সীমিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তা পর্যাপ্ত নয়। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, তারা গণহত্যার বিষয়টি হজম করে ফেলেছেন। খুব একটা চাপ তাদের সহ্য করতে হচ্ছে না। মিয়ানমারের অভিবাসনমন্ত্রী জেনারেল থেইন সু ইতোমধ্যে বলেছেন, প্রত্যাবাসনে রাজি হওয়ায় অর্থ নাগরিক হিসেবে মানা নয়। অর্থাৎ গণহত্যা নীতি থেকে তারা এক চুলও নড়েননি। এ অবস্থায় মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ না রাখলে এবং জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে সুদূরপরাহত।

তাই রোহিঙ্গা সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে হলে জাতিসঙ্ঘকে তার সামর্থ্য দেখাতে হবে। এটা ঠিক, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা বিষয়ে সদস্য দেশগুলো আলোচনা করেছে। মিয়ানমারের দমনপীড়নের বিষয়ে সোচ্চার হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদেও কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস করতে না পারলে কোনো লাভই হবে না, কিন্তু সেখানে সে ধরনের কোনো প্রস্তাব এখনো পাস হয়নি। মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে একমত হলেও নিরাপত্তার বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছতে পারেনি। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস তিন দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। এগুলো হলো- রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, সব শরণার্থীকে ফেরত নিতে হবে এবং জাতিসঙ্ঘ প্রতিনিধিদলকে রাখাইনে যেতে দিতে হবে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ পড়বে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক,
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫