ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

গল্প

ইসমান্দির হেমন্ত উপাখ্যান

শামসুদ্দোহা চৌধুরী

০২ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:১৮ | আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:১৮


প্রিন্ট

সাম্প্রতিক কালে অবসরে যাওয়া ইসমান্দি চরের মেন্দু মিয়ার পুত ইসমান্দি মিয়ার দিনকাল হেমন্তের আকাশের মতো থাকে সারাক্ষণ। অবসরজীবন, কাজকাম তেমন নেই, রাত কাটে নির্ঘুমে, এক আধটু সময় চোখ মুদে এলে মাঝে মধ্যে খারাপ খোয়াব দেখে চিক্কুর দিয়ে ওঠেন, ছ্যাপের আঠা মুখের দুই কোণ দিয়ে কষের মতো বের হয়ে বালিশ ভেজায়। পরক্ষণে দোয়া-কালাম পড়ে শরীরে ফুঁ-ফা দিয়ে শয়তাইন্যা আজরটাকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করেন। সে সময় দুপুর রাত গড়াতে থাকে, দূরে পাকুড়গাছের ঘন পাতার নিচে জিংলাপোড়া সাপটি পরম নিশ্চিন্তে ঘুমায়, হেমন্তের নিশির শিশির টুপটাপ মিহিন শব্দে হেমন্তের নদীতীরের লকলকা ঘাসগুলোকে চুমো খায়। ভোরের শিশির হেমন্তের সুবাসিত সাবান মেখে দূর্বাকে গোসল করায়। দূর্বা, নলখাগড়ার নিচে কুণ্ডুলি পাকানো ঢোঁড়ার গা গলিয়ে গড়ানো শিশির থ্যাকথ্যাকে পলিমাটিতে মিশে একাকার হয়ে যায়, তখন হয়তোবা ইসমান্দি মিয়া হেমন্তের মৃদু শীতকে ঠেকানোর জন্য আলিমুন বিবির দেয়া ঝকঝকে কাঁথাখানি বুকের ওপরে টেনে নেন। ভোরের হিম হিম বাতাসের সাথে বকুলের গন্ধ একাকার হয়ে মিশে যাওয়ার মুহূর্তে ছুরুতালি মৌলভির কণ্ঠ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। আলিমুন বিবি খড়মের ঠক ঠক আওয়াজ তোলে বুড়ো ইসমান্দি মিয়াকে সজাগ করার জন্য মৃদু ধাক্কা দিয়ে ফজরের নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ইসমান্দি মিয়া দুঃস্বপ্নের বেড়িবাঁধ ভেঙে গলাখাঁকারি দিয়ে জেগে ওঠেন।

সে সময় আলিমুন বিবির প্রিয় মুরগিগুলো খোঁয়াড়ের ভেতর থেকে কুকুরুক শব্দে ডাকতে থাকে, খোঁয়াড় থেকে বের হয়ে হেমন্তের পাকা ধান খাওয়ার জন্য বেচইন হয়, হাঁস-মুরগিগুলো টের পায়, কারো না কারো উঠোনে গোছা গোছা পাকা ধানে উঠোন ভরা থাকবে, দলবেঁধে বড় মোরগটা কুকুরুক ধ্বনি তুলে আনন্দে ঝলমলে ডানা ঝাপটাবে, সবাই মিলে হামলে পড়ে নাচতে নাচতে পাকা ধান খাওয়ার মহৌৎসবে মেতে উঠবে। কোব্বাত শেখের বউ তা দেখে মহাবিরক্ত হবে, খাটো জিংলার কঞ্চি দিয়ে মুরগি তাড়ানোর জন্য হুস-হাস করবে ‘ইসমান্দি মিয়ার মরার মুরগি ধান খাইলরে হুস... হুস।’ এ সময়ে ‘কাতি মাইয়া কাইত্যানের’ ছিপছিপা ছাগল তাড়ানো বৃষ্টি নামে, হেমন্তের মরা সকালে ছিপছিপা বৃষ্টি দেখে হাঁস-মুরগি, গরু, ছাগল একটু হলেও নাখোশ হয়। কাইত্যানের ছিপছিপা বৃষ্টিতে ভিজে মুরগিগুলো কলাগাছের ওপরে বসে কলাপাতার সবুজ ডিগগুলো ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে হাপুসহুপুস করে খেতে থাকে। সকালের চা-মুড়ি খেয়ে ভাঙা চেয়ারটাকে উঠোনে টেনে এনে ইসমান্দি মিয়া বসেন, ফ্যালফ্যালে চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আলিমুন বিবি মাঝে মধ্যে বুড়োর এই উদাসীনতা দেখে বগর বগর করেন, লুঙ্গিটাকে টেনে ঠিকঠাক করে দেন, ইসমান্দি মিয়া কিছুটা হলেও লজ্জা পেয়ে চুপচাপ থাকেন। তার চার পাশে তখন ডিমঅলা মুরগিগুলো কক কক শব্দে অবিশ্রাম ডেকেই চলে। খুদের বাটিটা চেয়ারের নিচেই থাকে। মুরগিগুলো খুদের সন্ধান পেয়ে আনন্দে ডানা ঝাপটাতে থাকে। হেমন্তের মরা আলোয় ইসমান্দি মিয়া ক্রমে ডুবে যেতে থকেন। এই নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য উঠোনের কোণে জমানো হেমন্তের স্তূপিকৃত মরা পাতায় আগুন ধরিয়ে দেন। মরাপাতা জ্বলতে থাকে, আগুনের লেলিহান শিখায় ইসমান্দি মিয়া নির্বাণ হতে চান, এ যেন অবকাশ জীবনের গ্লানিকে পুড়ে ছাই করার এক চিরায়ত সুখ।
ইসমান্দি চরের হেমন্তের ধান নিয়ে ওপারের মতলবকান্দির মানুষের প্রতি বছরই কাইজ্যা হয়। হেমন্তের মাঠ ভরা পাকা লাল ধান দেখে দুই গাঁয়ের মানুষের চোখও লাল হয়ে যায়। সারা বছর মানুষগুলো চুপচাপ থাকে, ফুরফুরে তহবন-টুপি পরে সাংসারিক কাজকামে মেতে থাকে, মাঠ ভরা পাকা ধান দেখে এই ঠাণ্ডা মাথা গরম হয়ে যায়। এই নিয়ে বারকয়েক হাঙ্গামা যে হয়নি তা নয়, এসব হাঙ্গামার বিচার-আচার ইসমান্দি মিয়ারই করতে হয়। কিন্তু এ বিচার-আচার দুই গাঁয়ের কোনো পক্ষের মানুষই মানতে চায় না। দুই গাঁয়ের মানুষই নদীর এপার-ওপারে দাঁড়িয়ে গলার শক্তি নিয়ে চিল্লায়, হুঙ্কার ছাড়ে। কিন্তু অবস্থাটা এমনি বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনীর মতো। দুই দলই রামদা, বল্লম শান দেয়, বাঁশ শলাকা দা দিয়ে চেঁছে চেঁছে সূচের মতো চিকন করে, তীর-ধনুক, কোঁচ, জুইত্যা, টেঁটা নিয়ে প্রস্তুত হয়। ইসমান্দির চরের আলিমুনবিবি, জরিফুল, মহিলা বেগমরাও বসে থাকে না। লাল মরিচ পুড়িয়ে ফাঁকি করে কলসি ভরে রাখে। চর দখলের জন্য এটা উত্তম অস্ত্র। বাতাসে মরিচের গুঁড়ো উড়িয়ে দাও বিপক্ষের শত্রুদের চোখ আন্ধা হয়ে যাবে। এর ফাঁকে আচ্ছা করে একহইল্যা, বল্লম, টেঁটা শরীরের সব শক্তি নিয়ে ছুড়ে মারো, বল্লম, একহইল্যা মুক্ত আকাশে বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে ওপারের লবার চোখে আঘাত করবে, লবার বউয়ের চিক্কুর দেখে মতলবকান্দির শালেমস্ত জোয়ান বারেক্যা রামদা নিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে দৌড়াতে থাকবে পেছনে থাকবে শত মানুষ। ধানের জমিতে তখন রক্ত চুঁইয়ে পড়বে। পরক্ষণে শত শত মানুষ বককাঁচি নিয়ে ধানের গোছাতে পোঁচাতে থাকো, লুঙ্গি গোজকাছা মেরে পাজা পাজা ধান উঠোনে নিয়ে ফেলো, সে সময় নদীর কোল ঘেঁষে খণ্ডযুদ্ধ চলছে, রক্তে লাল হচ্ছে নদীর পানি। জান যায় যাক সবার মুখে এক কথা ইসমান্দির চরের সোনার ধান চাই। হেমন্তের এই ধানে গোলা ভরার জন্য দুই গাঁয়ের মানুষই হিংস্র্র হয়ে যায়। একসময় থানা পুলিশের হুইসেল বেজে ওঠে। মারমুখো উন্মত্ত মানুষের রক্তচোষা বয়ান তখনো থেমে যায় না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ইসমান্দি মিয়ার উঠোনের এক কোণে বাঁশের আগায় হারিকেন মিটমিট করে জ্বলে ওঠে। দড়িতে হাতবাঁধা মানুষ কাঁচুমাচু মুখে দারোগা সাহেবের সামনে এসে দাঁড়ায়। দারোগার রাশভারী শব্দে উঠোন কাঁপে ‘হউরের পোলারা সব নাওমারা ডাকাত, মামদার পোলাগো সব বাইন্ধ্যা লও, সেরের উপরে সোয়াসের দিলে এক্কেবারে বাইল্যা মাছের মতো সোজা অইয়া যাইবো।’ আর এ দিকে সোনার ধানের মালিক বনে যায় ইসমান্দি চরের আরজু মাতাব্বর।
হেমন্তের সোনার ধানের এই কাইজ্যা-ফ্যাসাদ নিয়ে দিনকয়েক ইসমান্দির চর চুপচাপ হয়ে যায়। খালি হয়ে যায় সারা গ্রাম। থানা পুলিশের ভয়ে গাঁয়ের মানুষ দিন কয়েকের জন্য হাওয়া হয়ে যায়। গাই-বাছুর-বকরি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, কখনো হাম্বা হাম্বা চিৎকার জুড়ে দেয়। হেমন্তের ধানের মজা গন্ধ ম ম করে সুবাস বিলায়, মেঠো ইঁদুরেরা জনমনিষ্যির অস্তিত্ব টের না পেয়ে মহানন্দে মুখে ধান পুরে মাটির গর্তের বাসভবনে ফিরে যায়। গর্তের মাঝে লুকিয়ে থাকা পান্নসের লকলকা ফনায় চুরমার হয়ে যায় হেমন্ত ইঁদুরের মহাভোজের স্বপ্ন। জমিজিরেত, ভিটিমাটি, ফসলের স্বপ্নে বিভোর মানুষেরা ফিরে আসে গাঁয়ে। সন্ধ্যার অন্ধকারে ইসমান্দির চরের সিকিম আলীর চায়ের দোকান ফুসুরফাসুর আলাপ-আলোচনায় ভরে ওঠে। নদীতে জেলেরা মাছ ধরায় বেহুঁশ হয়, আগুনি ধান খোলায় তুলে মুড়ি ভাজার শব্দে চর সরগরম হয়। তখন নদীতে সারিবাঁধা পুঁটিগুলো যদ্যার জালে আটকা পড়ে জান বাঁচানোর জন্য নৌকায় লাফাতে থাকে। ইসমান্দি মিয়া হেমন্তের প্রতি সকালেই তা দেখে। চেয়ারে বসে দরদাম হাঁকায় ‘নিয়াশা ভালো একখাড়ি পুঁটিমাছ দিস তো, তর ভাবী পুঁটিমাছের শুঁটকি দিবে।’ ইসমান্দির চরের হেমন্তের জমিনের লকলকা ঘাসে গরুর ওলান দুধে ভরে যায়। কাঁচা ঘাস, আগুনি ধানের খড়ের দুধের স্বাদ কি আর কোনো সময়ে মেলে? মেলে না। প্রতি সকালে ওলান থেকে নেমে আসা কাঁচা দুধের গন্ধে ভরে যায় ইসমান্দির চর। ইসমান্দির চরের এই দুধের জন্য গঞ্জের গোয়ালেরা নিত্যদিনই ভিড় জমায় চরের ঘাটে। যেন দুধহাটের মজমা জমে যায়। তখন হেমন্তের নিশির শিশির পাতলা হতে হতে শেষ হয়ে যায়। ইসমান্দি মিয়া সত্তর বছর ধরে হেমন্তের এই দৃশ্য দেখে আসছেন। মেদুর আলো গড়াতে গড়াতে একসময় হারিয়ে যায়। আলিমুন বিবির মুরগিগুলো খোঁয়াড়ে ফেরার জন্য বেহুঁশ হয়। মাগরিবের আজানধ্বনি ভেসে আসে। ইসমান্দি মিয়ার অজুর বদনাটা এগিয়ে দেন আলিমুন বিবি। তখন হেমন্তের হিমহিম বাতাস বয়ে যায়। ঝিরি ঝিরি বাতাসে গোরক্ষণাথের চৌকাঠের মালিশোলার লক্ষ্মী ফুল দুলে, হবিচুন্নি মাসির মেয়ে ভজনীর বিয়ের মুরোলি বাঁশির মিহি সুর মন আনচান শব্দে বেজে ওঠে ‘পেপ্যের পেপ্যের... পোঁ....... পেপ্যের....পোঁ।’
কয়েক বছর পর। ইসমান্দি মিয়ার এখন হাঁটা-চলার শক্তি নেই। আলিমুন বিবিরও তো বয়স হয়েছে। দুই বুড়োবুড়িই এখন ঘরের কোণে চুপচাপ বসে থাকেন। তাদের খোঁজখবর নেয়ার মানুষও নেই। দুইজনের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়। জীবনের এতগুলো হেমন্ত কিভাবে যে পার হয়ে বিদ্যুতের মতো মিলিয়ে গেল! হেমন্তের আগমন এখন আর হেমন্ত বাংলার মতো হয় না। আর হয়তো হবেও না। সেই ধান নেই, ধানের জমিতে কাইজ্যা-ফ্যাসাদ নেই। চরের জমিতে এখন কলকারখানা বসেছে, কলকারখানার গলগলে কালো ধোঁয়ায় বিষাক্ত ইসমান্দির চরের আকাশ-বাতাস। চরের মানুষগুলো ছুটছে জমি বেচার জন্য, সেখানে হেমন্তের ধান এখন সোনার হরিণ। বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস ভারী হয়ে আসছে ইসমান্দি মিয়ার। খুক খুক করে ক্রমে কেশেই চলছে, কখনো গলা দিয়ে তুপা তুপা রক্ত বের হয়। আহ নিঃশ্বাস নিতে এত কষ্ট।
এ দিকে ভূমিদস্যুদের জিগিরে ইসমান্দি চরের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে ‘জমি কেনার কোম্পানি আইয়া পড়ছেরে... আইয়া পড়ছে...।’ হেমন্তের দুপুরে ভূমিদস্যুদের জিগিরের আওয়াজ শুনে ঘরের ভেতরে তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন ইসমান্দি মিয়া।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫