৭ নভেম্বর প্রসঙ্গে আহ্বান
৭ নভেম্বর প্রসঙ্গে আহ্বান

৭ নভেম্বর প্রসঙ্গে আহ্বান

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

আজকের কলামের প্রেক্ষাপট
আজ বুধবার ১ নভেম্বর। আলাপ-আলোচনা ও ধ্যানধারণা পুনর্গঠনে সহায়তার নিমিত্তে, বুধবারের সাপ্তাহিক কলামেই ৭ নভেম্বরের ছয় দিন আগে এ প্রসঙ্গে লিখেছি। ’৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলিকে কাছে থেকে দেখেছি বা অনুভব করেছি। আমার লেখা একাদশ বইয়ের নাম ‘মিশ্র কথন’। নিজের কথা, পরের কথা, বাংলাদেশের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর কথা, একসঙ্গে মিলেমিশে আছে বিধায় বইটির নাম মিশ্র কথন। প্রকাশক ‘অনন্যা’। চট্টগ্রামে প্রেস ক্লাবের বাতিঘরে, ঢাকার বেইলি রোডের সাগর পাবলিশার্সে, পুরনো বিমানবন্দরে বুক ওয়ার্মে এবং (অনলাইন পুস্তক বিক্রেতা) রকমারি ডটকমে বইটি পাবেন। ই-বুক হিসেবে কিংবা গুগলে সার্চ দিলে পাবেন। এই পুস্তকের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের নাম : ‘১৯৭৫ ...বাংলাদেশের রাজনীতির বিভাজনরেখা’। অধ্যায়টিতে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে মূল্যায়ন করেছি। ১৯৭৫ সালের ঘটনা বাস্তবেই বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন পার্লামেন্ট বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও সিদ্ধান্তেই বহুদলীয় রাজনীতি পরিবর্তন করে একদলীয় তথা বাকশাল রাজনীতির সূত্রপাত করেছিল। একই সাথে মুক্ত মিডিয়া ‘নিহত’ হয় এবং নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া জন্ম নেয়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু নিহত হন এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে লুক্কায়িত বঙ্গবন্ধুর বিরোধী শক্তি (খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে) দেশের শাসনভার গ্রহণ করে। ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত মোশতাকের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগই বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ছিল। ১৯৭৫-এর আগস্টেই খন্দকার মোশতাক আহমদ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সামরিক শাসন জারি করেন। ১৯৭৫-এর ২৪ আগস্ট তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম (তিন বছর চার মাস দায়িত্ব পালন শেষে) সসম্মানে অপসারিত হন এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত হলেন।

একই বছর ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে; এই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য কী ছিল, এটা নিয়ে বহুবিধ মত আছে। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিকেরা একটি বিপ্লব সাধন করেন; সেই বিপ্লবে ঢাকা মহানগরের জনগণ ব্যাপকভাবে যোগ দিয়েছিলেন। অতি স্বাভাবিক প্রশ্ন, এই ৭ তারিখে কেন বিপ্লব সংঘটিত হলো? এই বিপ্লবের কারণ পেছনের দিকে মাত্র চার দিন বা মাত্র চার মাসের ঘটনাবলির মধ্যে লুক্কায়িত নেই; বরং বিপ্লবের কারণগুলো ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ থেকে পেছনের দিকে তিন বছর ১০ মাসের ঘটনাবলির মধ্যে প্রোথিত। গত আট-নয় বছর যাবত পত্রপত্রিকায় এবং টেলিভিশন টকশোতে এমনভাবে কথাগুলো লেখা বা বলা হচ্ছে যে, ‘জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বিদ্রোহ করেই ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং তার আগে বাংলাদেশে আর কোনো কিছু ঘটেনি!’ এরূপ বর্ণনা বা ধারণা প্রচার করা ইতিহাসের সঙ্গে ইচ্ছাকৃত বৈরিতা। আমি সবাইকে আহ্বান জানাই, ১৯৭২ থেকে ৭৫ সময়কালে বাংলাদেশের অবস্থা কেমন ছিল, শাসনে ও রাজনীতিতে কী কী সুবিধা-অসুবিধা ছিল, দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র কী ছিল ইত্যাদি জানতে। তা হলেই ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য বোঝা যাবে।

বঙ্গবন্ধুর সামনে উপস্থাপিত প্রশ্ন
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, সন্দেহাতীতভাবে, প্রধান স্থপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিনশেষে মধ্যরাত্রে তিনি গ্রেফতার হন। তার প্রকাশ্য ভূমিকার সেখানেই সমাপ্তি। ১৯৭১-এর মার্চের ২৭ তারিখ চট্টগ্রামে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাও তিনি শুনতে পারেননি। বিজয় অর্জনের পরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিতেই মাত্র তিনি তার সাবেক সহকর্মীদের দেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রণাঙ্গনের দেশপ্রেমিক যোদ্ধাদের সাহসিকতা কিংবা পরিশ্রমী সাহসী রাজনৈতিক নেতাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা তিনি দেখার সুযোগ পাননি; অথবা দেশের বিরুদ্ধে বা দেশের বন্ধুদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রও তিনি দেখেননি। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত তরুণদের যুদ্ধে যাওয়ার আকুতি শোনার সুযোগও তার ছিল না।

মুজিবনগর সরকার পরিচালনার সময় সুবিধা-অসুবিধা কী ছিল, সেটা তার জানার বাইরে ছিল। এতদসত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নামেই, এটাই বাস্তবতা। কারণ, তাঁর কোনো বিকল্প ছিল না। স্বাধীন দেশে ১০ জানুয়ারির পর সেই বঙ্গবন্ধু একটি কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন। প্রশ্নটি হলো, নতুন বাংলাদেশের নতুন সরকার কি শুধু আওয়ামী লীগ দলীয় হবে, নাকি মুক্তিযুদ্ধের পরে সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হবে? বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের দলীয় সরকারের পক্ষেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণকারীরা ময়দানে থেকে যান এবং তারাই জাসদ সৃষ্টি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের চারটি নীতিমালার একটি ছিল সমাজতন্ত্র; জাসদ এটিকে পরিমার্জিত করে নীতিমালা বানায় : ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’। জাসদের জন্ম ও নেতৃত্ব নিয়ে বই লেখা হয়েছে; আগ্রহী পাঠককে তা পড়ার জন্য অনুরোধ রাখছি।

জাসদ এবং গোপন সৈনিক সংস্থার যোগসূত্র
১৯৭২-এর শেষাংশ এবং ১৯৭৩ সালে জাসদ তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকায় প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে লিপ্ত ছিল। অপরপক্ষে সরকারের পুলিশ এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনী ব্যস্ত থাকে জাসদের কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে কঠোর অপারেশনে। এমন প্রেক্ষাপটে জাসদ আত্মসমালোচনায় লিপ্ত হয়েছিল। জাসদ চিন্তা করল, সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কিংবা কিছুসংখ্যক সৈন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে জাসদকে সহযোগিতা না করলে ক্ষমতাসীন সরকারকে হটানো যাবে না। সুতরাং সিদ্ধান্ত হলো, ‘ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে বন্ধু খোঁজ করো।’

১৯৭২-৭৩-৭৪-এর কথা। নতুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাকিস্তান থেকে যারা ফেরত এসেছেন তারা এবং যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন তারা, সম্মিলিতভাবে সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন- এই কথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য হলো, উভয়ের মধ্যে প্রচণ্ড মতপার্থক্য এবং মানসিক দমন-নিপীড়নের প্রক্রিয়াও ছিল। কিছু মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা সৈনিক, দেশ পরিচালনার নিয়ম, বিদ্যমান পরিস্থিতি বিশেষ করে দুর্র্নীতি ও স্বজনপ্রীতিÑ ইত্যাদি ব্যাপারে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিল। তারা আওয়ামী লীগ সরকারের পরিবর্তন চায়। তারা সমাজতান্ত্রিক এবং মেহনতি মানুষের সরকার চায়। তারা অফিসারবিহীন সামরিক বাহিনী এবং শ্রেণিবিহীন সমাজ চায়। তারা নিজেদের গোপনে সংগঠিত করল। নাম দিলো বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। সুবেদার-নায়েব সুবেদার-হাবিলদার-নায়েক-সৈনিক ইত্যাদি বিভিন্ন র‌্যাংকের সাধারণ সৈনিক গোপনে নিজেদের তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে। অবসর নিয়েছে- এমন সমমনা কিছু সৈনিক সাহায্য-সহযোগিতা করত। প্রায় বছরখানেক পর, গোপন সৈনিক সংস্থা মনে করল, তাদের দিয়ে একা একা সরকার পরিবর্তনের কাজ সম্ভব নয়। তাই রাজনৈতিক বন্ধু প্রয়োজন। অতএব ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বন্ধু খোঁজা শুরু হলো। এভাবেই জাসদ এবং সৈনিক সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত এবং বন্ধুত্ব সৃষ্টি হলো।

কর্নেল তাহের সমাচার
অমিত সাহসে মুক্তিযুদ্ধ করা একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম; ব্যতিক্রমী চিন্তাধারার ব্যক্তি ছিলেন এবং যুদ্ধের পরে বঙ্গবন্ধু সরকারের সমালোচনা করেছিলেন প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে। চাকরি চলে গেল তাহেরের। তিনি যোগ দিলেন বাঘের মতো তেজোদীপ্ত জাসদে। আবু তাহের বীর উত্তমকে পেয়ে, জাসদের সংগ্রামী ও ব্যতিক্রমী চিন্তায় জোয়ার এলো। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, গণবাহিনী সৃষ্টি করা হবে যা সামরিক বাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর বিকল্প বা সমান্তরাল। জাসদ ক্ষমতায় যাওয়ার পথে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই যেন মাঠে-ময়দানে শক্তি পায়, সে জন্যই গণবাহিনীর সৃষ্টি।

সার্বিক জাসদের অতি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে গণবাহিনীর বিশেষ দায়িত্বে নিয়োজিত হন কর্নেল আবু তাহের। হাসানুল হক ইনু ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও জ্যেষ্ঠ নেতা। গণবাহিনী এবং গোপন সৈনিক সংস্থার মধ্যে বন্ধুত্ব জোরদার হলো। উভয়ের লক্ষ্য মাত্র একটি, আওয়ামী লীগ তথা বাকশাল সরকারকে হটাও। যেহেতু সাংবিধানিক পদ্ধতিতে সরকার পরিবর্তনের কোনো রাস্তা তারা খুঁজে পাচ্ছিল না তাই জাসদ, জাসদের গণবাহিনী এবং গোপন সৈনিক সংস্থা সিদ্ধান্ত নিল যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটিই মাত্র রাস্তা খোলা আছে, সেটাই অবলম্বন করতে হবে, যদিও রাস্তাটির নাম বিপ্লব বা রক্তাক্ত বিপ্লব।

১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বর
১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর ঘটনার জন্য জাসদ প্রস্তুত ছিল না। ঘটনা ঘটানোর মূল নায়ক খন্দকার মোশতাক এবং কয়েকজন মেজর বা লেফটেন্যান্ট কর্নেল। মেজররা ১৫ আগস্টের সাফল্যের পর বঙ্গভবনে স্থান করে নিলেন এবং সেখান থেকে বের হয়ে সেনানিবাসে ফেরত এসে মূল দায়িত্বে যোগদান করতে চাইলেন না। তাদের থেকে যারা জ্যেষ্ঠ অফিসার ছিলেন, তারা মনে করলেন এটা তো সাংঘাতিক বিশৃঙ্খলা। যেকোনো নিয়মেই হোক না কেন বিদ্রোহী মেজরদের সেনানিবাসে ফেরত আনতে হবে। ২৪ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে নতুন সেনাবাহিনী প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। জিয়ার কাছে এসব বক্তব্য যখন উপস্থাপিত হতো, তিনি ধৈর্য ধরে শুনতেন কিন্তু সমাধান দিতে সময় নিচ্ছিলেন।

অন্য জ্যেষ্ঠ অফিসাররা অস্থির এবং অধৈর্য হয়ে উঠলেন। অস্থির এবং অধৈর্য হয়ে তারা তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একগুচ্ছ হলেন। তৎকালীন ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল বীর বিক্রম খালেদের সহায়তায় এগিয়ে এলেন। জিয়াউর রহমান যেমন ক্যারিশমেটিক যোদ্ধা ও নেতা ছিলেন, তেমনি খালেদ মোশাররফেরও একটি নিজস্ব ক্যারিশমা ছিল, যদিও উভয়ের মধ্যে দারুণ পার্থক্য। খালেদ মোশাররফ ও তার সঙ্গীরা ঠিক করলেন, একটি ক্যু-দ্য-তা বা সেনাবিপ্লব ঘটাবেন। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এ, ১৫ আগস্টের বিপরীতে প্রতি বিপ্লব (কাউন্টার ক্যু) ঘটে গেল। জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হলো সেনানিবাসের বাসায়, সেনাপ্রধানের পদ থেকে পদচ্যুত করা হলো। দুই দিন পর, খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম নিজে প্রমোশন নিয়ে মেজর জেনারেল হলেন এবং সেনাবাহিনী প্রধান হলেন। ৬ তারিখ সন্ধ্যায় নতুন প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সায়েম।

উল্লেখযোগ্য চারটি পয়েন্ট
প্রথম, খালেদ মোশাররফের ভাই এবং মা ঢাকা মহানগরে মিছিল করলেন এবং এমন কিছু কথাবার্তা বললেন যে, সবাই ধরে নিলো ৩ তারিখের সেনাবিপ্লব ভারতপন্থী; আওয়ামী লীগকে আবারো ক্ষমতায় স্থাপনের জন্য করা হয়েছে। ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে, অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে এই ধারণা ব্যাপক প্রচার পেল যে, খালেদ মোশাররফ এবং তার সঙ্গীরা ভারতপন্থী এবং ভারত তাদের কর্মকে স্বাগতম জানায়। দ্বিতীয়, ৩ তারিখেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ওই সময় বন্দী বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী স্তরের চারজন জাতীয় নেতা, মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি নিহত হলেন। তাৎক্ষণিক চিন্তা শুরু হলো কে হত্যা করাল, কে সহযোগিতা করল হত্যাকাণ্ডে, কে বেনিফিশিয়ারি এই হত্যাকাণ্ডের পরে? তৃতীয়, সর্বস্তরের সাধারণ সৈনিকেরা বললেন, জিয়াউর রহমানকে পদচ্যুত ও বন্দী করা অত্যন্ত অন্যায় কাজ এবং এর বিহিত চাই। তারা তাদের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকলেন। চতুর্থ, ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখের ঘটনায়, জাসদ ও গোপন সৈনিক সংস্থা নিজেরাই রাজনৈতিকভাবে অপ্রস্তুত হয়ে গেল। জাসদ দেখল, দুই দুইবার সরকার পরিবর্তন হলো ঠিকই; কিন্তু বুর্জোয়া পুঁজিবাদী শক্তির প্রতিনিধিরাই ক্ষমতায় রয়ে গেছে। অতএব, আরো নতুন কিছু ঘটার আগে, কিছু একটা করতেই হবে।

দ্বিমুখী বিপ্লব আর বিভীষিকাময় রাত
ত্বরিত গতিতে জাসদ এবং গোপন সৈনিক সংস্থা সিদ্ধান্ত নিল বিপ্লব করার। প্রচার করা হল, অফিসার মারতে হবে; কারণ অফিসাররা প্রথাগত শৃঙ্খলা ও নিয়মকানুনে বিশ্বাস করে। এ দিকে বন্দী অবস্থায় জিয়াউর রহমান চিন্তা করলেন, বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে প্রথম কাজ হলো বন্দিত্ব থেকে নিজে মুক্ত হওয়া। একই সময় জাসদ অনুভব করল, জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে হবে এবং জিয়ার ভাবমর্যাদাকে কাজে লাগাতে হবে। ৬ নভেম্বর দিনশেষে, আন্তর্জাতিক নিয়ম মোতাবেক ৭ তারিখ শুরু হওয়া মাত্রই, অর্থাৎ মধ্যরাত ১২টা ১মিনিটে ‘বিপ্লব’ শুরু হলো। অফিসারদের বাসায় বাসায়, অফিসে অফিসে হামলা হলো। হত্যা করা হলো অনেককেই। নারী (ডাক্তার) অফিসারদের হত্যা বা অপদস্ত করা হলো। অফিসারদের অমান্য করার জন্য, বন্দী করার জন্য বা হত্যা করার জন্য প্রকাশ্যে মাইকে আহ্বান জানানো হলো। অফিসারদের বিরুদ্ধে সৈনিকদের বিক্ষুব্ধ হওয়ার জন্য জাসদের উত্তেজনামূলক প্রচারণা ছাড়াও আরো কিছু সংশোধনযোগ্য কারণ ছিল, যেগুলো এখানে উল্লেখ করছি না।

ওই রাতে আমার সিদ্ধান্ত
বহু অফিসার যে যে দিকে পারে, সে দিকে পালিয়ে নিরাপত্তা খুঁজলেন; যেমন ক্যান্টনমেন্টের চার দিকে বহির্মুখী গ্রাম, ধানক্ষেত, কলোনি ইত্যাদিতে। আমি নিজে বেঙ্গল রেজিমেন্টের যে ব্যাটালিয়নে ১৯৭০ সালে ‘জন্ম নিয়েছিলাম’ এবং যাদের সাথে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, সেই দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টেই যোগদান করলাম রাত ১২টা ৩০ মিনিটে। দ্বিতীয় বেঙ্গলের সৈনিকরা আমাকে হত্যা করেনি, অপমান করেনি বরং তাদের আহ্বানেই তাদের নেতৃত্ব দিলাম এবং সৈনিক বিপ্লবের উজ্জ্বল পথে তাদেরকে নিরাপদ দিকনির্দেশনা দিলাম। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের সৈনিকেরা জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসতেন। তাদের নেতৃত্ব দিলাম ভোর ৬টা ৩০মিনিট পর্যন্ত। আমার সাথে ছিলেন আর মাত্র দুইজন অফিসার, তৎকালীন ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন এনামুল হক; তারা উভয়েই পাকিস্তান থেকে ফেরত আসার পর দ্বিতীয় বেঙ্গলে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

বিপ্লবের অগ্রগতি ও জিয়ার মুক্তি
ঢাকা সেনানিবাসের অনেকগুলো ইউনিট বা রেজিমেন্ট বা ব্যাটালিয়ন যেখানে গোপন সৈনিক সংস্থা সক্রিয় ছিল, তারা অন্ধকার রাতে সেনানিবাসের রাস্তায় নেমে এলো। হাজার হাজার অস্ত্র থেকে বের হওয়া গুলির আওয়াজ কত প্রকট ছিল, তা কোনো শব্দ দিয়ে বোঝাতে পারব না। জাসদপন্থী সৈনিকদের সাথে হাজার হাজার সাধারণ সৈনিকও বের হয়ে পড়ে। অনেক সৈনিক জেনারেল জিয়ার বাসায় গিয়ে তাকে মুক্ত করে আনে। জিয়া পুনরায় দায়িত্ব নিলেন সেনাবাহিনীর। জাসদপন্থী সৈনিকেরা এবং সাধারণ সৈনিকেরা সেনানিবাসের বিভিন্ন জায়গায় মুখোমুখি হয়ে গেলেন। বিদ্যুৎবিহীন সেনানিবাসে ছিল অকল্পনীয় ভীতিকর পরিস্থিতি। এখন ২০১৭ সালের পরিবেশে বর্ণনার অসাধ্য যে, ১৯৭৫-এর ওই রাত কেমন ছিল?

বঙ্গভবন ঘেরাও এবং পরিণতি
সাধারণ সৈনিকদের একটি বড় দল বঙ্গভবন ঘেরাও করে। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর থেকে যেসব সৈনিক বঙ্গভবন পাহারা দিয়েছিল, তারাও আনুগত্য বদলিয়ে ফেলল সাধারণ সৈনিকদের অনুকূলে। বঙ্গভবনে অবস্থানকারী খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম এবং তার জ্যেষ্ঠ সঙ্গীরা গোপনে বা ছদ্মবেশে বঙ্গভবন ত্যাগ করলেন জীবন বাঁচানোর জন্য। কর্নেল শাফায়াত জামিল রওনা দিলেন মুন্সীগঞ্জের দিকে, অপরদিকে জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার তিনজন এক গাড়িতে ঢাকা থেকে দূরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পথে অশনিসঙ্কেত। বিদ্যুৎ গতিতে গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুত গতিতে এসে ঢাকা শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় নেন। এই তিনজন অফিসার এবং দশম বেঙ্গলের মধ্যে আন্তরিকতা ও হৃদ্যতার কোনো কমতি ছিল না; কিন্তু ব্যাটালিয়নে সৈনিকদের মধ্যে এই তিনজন মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে বৈরী প্রচারণা ইতোমধ্যে হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর, এই ব্যাটালিয়নেই তারা তিনজন নিহত হন। এই মর্মান্তিক হত্যার রহস্য এখন পর্যন্ত পূর্ণভাবে উদ্ঘাটিত হয়নি।

অভ্যন্তরীণ সঙ্কট এবং সফল জিয়া
ঢাকা সেনানিবাসের সীমিত পরিসর থেকে সৈনিকেরা ভোর ৪-৫টার মধ্যেই মহানগরীর রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। সূর্য-উদয়ের আগে-পরে হাজার হাজার সাধারণ নাগরিক সৈনিকদের অনুকূলে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অনুকূলে এবং জিয়াউর রহমানের অনুকূলে সেøাগান দিতে দিতে সৈনিকদের গাড়িতে উঠে সৈনিকদের নিয়ে আবেগ প্রকাশের উৎফুল্লতায় মেতে ওঠে। সাধারণ মানুষ, বাংলাদেশ, সেনাবাহিনী এবং জিয়াউর রহমানের অনুকূলে ভালোবাসা ও আনুগত্য উজাড় করে দিয়ে রাজপথ দখল করে রাখে। জাসদ ওই বিপ্লবের জন্য, প্রধান অস্ত্র বিবেচনা করেছিল জিয়াউর রহমানকে। তাকে নিজেদের আয়ত্তে বা নিয়ন্ত্রণে না পেয়ে জাসদ হতবিহ্বল ও কর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। কিন্তু ইতোমধ্যে জাসদপন্থী সৈনিকেরা, যারা এত দিন গোপন ছিলেন, তারা চিহ্নিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ সৈনিকদের কাছে। বহু অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে, অফিস-আদালত তছনছ করা হয়েছে, গোলাগুলির আঘাতে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেÑ এর দায় জাসদপন্থী সৈনিকদের ওপরেই বর্তে গেল। অপর পক্ষে জাসদপন্থী সৈনিকেরা, রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ব্যর্থতার দরুন যুগপৎ হতাশ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। যেসব সাবেক সেনাকর্মকর্তা জাসদে জড়িত ছিলেন বা যে গুটিকয়েক চাকরিরত সেনাকর্মকর্তা জাসদের প্রতি সহমর্মী ছিলেন, তারা সাংঘাতিক বেকায়দায় পড়ে গেল।

জাসদপন্থী, বামপন্থী বিপ্লব ব্যর্থ করেছে কারা? ব্যর্থ করে দিয়েছিল সাধারণ সৈনিক ও সাধারণ নাগরিকেরা। সৈনিক ও নাগরিকের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সংহতি অভূতপূর্ব ছিল, মুক্তিযুদ্ধকালেই এর একমাত্র উদাহরণ ছিল। তাই ৭ নভেম্বরের একটি নাম ‘জাতীয় সংহতি ও বিপ্লব দিবস’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা পেয়েছে সে দিন। জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে এনেছেন। নৈরাজ্যবাদীরা দমিত হলো, দেশের বাইরে থেকে ইন্টারভেনশন বা হস্তক্ষেপ রহিত হয়, স্বাধীনতা রক্ষা পায়। জিয়ার নেতৃত্বে সরকারি কাঠামো এবং জনগণ দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। তাই জিয়া ৭ নভেম্বরের জাসদপন্থী বিপ্লবীদের চরম শত্রু। জিয়া আজ পৃথিবীতে নেই, কিন্তু ৭ নভেম্বরের বিপ্লবীদের অনেকেই আছেন।

৭ নভেম্বর জাসদের ভূমিকা প্রভাব
৭ নভেম্বর যেসব অফিসার নিহত হয়েছেন, তাদের হত্যাকারী কে? বেশির ভাগের হত্যাকারী জাসদপন্থী সৈনিক সংস্থা বা জাসদের গণবাহিনী? হত্যাকারীদের নির্দেশদাতা কে? এর উত্তর নিয়ে এই কলামে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারলাম না। ৭ নভেম্বর তারিখে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় সৈনিক বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিল কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বাধীন জাসদ। সেনানিবাসের অভ্যন্তরে সৈনিকদের পুনরায় সংগঠিত করা শুরু করেছিলেন, জিয়াউর রহমানকে উৎখাত করার লক্ষ্যে। সৈনিকদের মধ্যে রাজনীতি ঢুকিয়েছিল তৎকালীন জাসদ।

৭ নভেম্বরের আগে এবং পরে- দুই কিস্তিতে সেনাবাহিনীর সৈনিকদের মধ্যে রাজনীতি ঢোকানোর কাজটি রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ ছিল। ৭ নভেম্বরের পরের চেষ্টা, আগের চেষ্টা অপেক্ষা বেশি বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়েছিল। জাসদের ওইসব কাজের কুফল পরবর্তী পাঁচ বছর তো বটেই, তিরিশ-চল্লিশ বছর পর্যন্ত লক্ষণীয় ছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে সেনাবাহিনীর যে ক’টি ব্যর্থ অভ্যুত্থান বা বিমানবাহিনীর ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়, প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে জাসদ কর্তৃক শিক্ষা দেয়া শ্রেণিবিহীন সমাজব্যবস্থা এবং অফিসারবিহীন সামরিক ব্যবস্থার মন্ত্র কাজ করেছে। অফিসারদের হত্যা করার যে নজির ৭ নভেম্বর স্থাপিত হয়েছে, তার কুফল ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা পিলখানা পর্যন্ত এসেছে। ১৯৭৭-এ বগুড়ায় ব্যর্থ বিদ্রোহে সেনাবাহিনীর অফিসার হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৭৭-এ ঢাকায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সৈনিকদের ব্যর্থ বিদ্রোহে, বিমানবাহিনীর অনেক অফিসারকে হত্যা করা হয়। প্রত্যেকটি ব্যর্থ বিদ্রোহ দমন করার কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকেই দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে আদেশপ্রাপ্ত হয়ে। ১৯৭৫-এর পর, পরবর্তী পাঁচ বছরের রক্তাক্ত ইতিহাসের পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছে ‘১৯৭৫’।

পিলখানায় ৫৭ জন অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে, যার রহস্য সন্তোষজনকভাবে এখনো উদঘাটন হয়নি। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর জাসদপন্থী বিপ্লবীরা, সৈনিক হোক বা সাধারণ নাগরিক হোক, যদি বিপ্লবে সফল হতেন, তাহলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কী হতো, বাংলাদেশ সরকারের কী হতো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার কী হতো? আলোচনা কঠিন, উত্তর ততোধিক কঠিন। নিজে সবজান্তা নই, আমি জানতে আগ্রহী, অন্যদের ও জানতে আহ্বান জানাই। 

লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
যোগাযোগ : mgsmibrahim@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.