ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

আলোচনা

কবিতা আলোকের আগামী

মতিন বৈরাগী

২৬ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৫৭


প্রিন্ট

‘সত্যের আনন্দরূপ এ ধূলিতে নিয়েছে মুরতি / এই জেনে এ ধুলায় রাখিনু প্রণতি’ ‘মধুময় পৃথিবীর ধূলি’ (রবীন্দ্রনাথ)

সত্যই আনন্দ, সত্যই অনিন্দ্য, সত্যই জীবন জয়যাত্রা তার প্রকাশের বিস্তারে। কবির উপলব্ধিতে আবেগ যদি এই রূপে বাহিত হয় তবেই তা হয়ে ওঠে শান্তি-প্রগতি-স্থিতির চেতনা। তাই কবিতামাত্রই শান্তির সপক্ষ নির্মাণ সুন্দরে, সুন্দরের আরাধনায়। সঙ্গত কারণে শান্তির উচ্চারণ কখনো কখনো বিশেষ হয়ে ধ্বনিত না হলেও কাব্যে প্রতিষ্ঠিত এই সত্যকে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। সেকাল থেকে একালে কাব্য শরীরের নানা বিবর্তন ঘটলেও মৌলিক বিষয়গুলোর অপসৃয়মানতা আমরা লক্ষ করি না। বরঞ্চ বিশেষ সময়ে বিশেষভাবে ধ্বনিত হয়েছে শান্তি-সম্প্রীতির বাণী কবিদের কণ্ঠেই। কবিরা সব সময়ই স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বপ্নের নির্মাতা এবং মনেপ্রাণে স্বপ্নকে লালন করেন, থাকেন সত্যের কাছাকাছি, উচ্চারণ আনন্দে সোচ্চারÑ সব ন্যায়ে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ‘তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে,/পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন/মানুষ র’বে না আর, র’বে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখনঃ/সেই মুখ আর আমি র’বো সেই স্বপ্নের ভিতরে’। ‘স্বপ্ন’ ‘জীবনানন্দ দাশ’। কিংবা ‘কখনো ভোরের রোদে শিশিরের রেণু মেখে পায়/সে পুরুষ হেঁটে যায় কুয়াশায় দেহ যায় ঢেকে/আবার দুপুরে দেখি ঘুমিয়েছে প্রাচীর ছায়ায়/কি জানি কি স্বপ্ন নিয়ে কঠিন পাথরে মাথা রেখে’ ‘প্রকৃতি’ ‘আল মাহমুদ। এই স্বপ্ন ঘুমের ঘোরের নয়, এই স্বপ্ন অলস মুহূর্তের নয়, এই স্বপ্ন জাগরণের, জাগৃতির যা মানুষের মনোজগতে নিত্য উপস্থিত হয় কেবল বিনোদনের জন্য নয়, [যদিও প্রকৃত বিনোদন সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায়] তাদের চেতনাকে জাগ্রত করতে। কোনো অন্যায় অসামঞ্জস্য প্রকৃত কবিরা মেনে নিতে পারেন না তার বৈশিষ্ট্যগত কারণে এমনকি ফ্যাসিবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধেও তারা দাঁড়ান নিশঙ্ক, অতীত শুধু নয় আজো তা রয়েছে বর্তমান, তারা লিখেছেন, বলেছেন। কোথাও কোথাও নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন; জীবন দিয়েছেন, তবু লিখেছেন। তবু রুখে দাঁড়িয়েছেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধকালে কবিরা পালন করেছেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ভিয়েতনামের মাইলাই হত্যাকণ্ডে তারা লিখেছেন দাঁড়িয়ে যাওয়ার কবিতা, অন্যায় আক্রমণের বিরুদ্ধে, ধর্ষিত মানবতার পক্ষে এবং এমনকি বাংলাদেশের ওপর নগ্ন হামলা চালিয়ে জাতিকে ধ্বংস করে দিতে তার নেতৃত্ব শূন্য করতে যারা ভূমিকা নিয়েছিল সেই দেশের কবিরাও সোচ্চার হয়েছিল তাদের কবিতায় মানবিকতার পক্ষে। এ রকম নানা সময়ের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে নানা প্রকাশকে উপজীব্য করে আধুনিকতার সিঁড়ি বেয়ে নানাভাবে কবিতার শরীর ভেঙে কবিতাকে দাঁড় করিয়েছেন কবিরা আরো স্পষ্টতর অবস্থানে, শান্তির পক্ষের মানবিক আশ্রয়। এসব কারণে দিনে দিনে কবিতাকে বিশেষ হয়ে উঠতে হয়েছে। স্বাধীনতার জন্য, নিজেকে স্বাধীন করার জন্য, বাকস্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্র পাওয়ার জন্য, অধিকতর মানবিক গণতন্ত্র সংহত করার জন্য, শুভ রাষ্ট্রের স্বপ্নের জন্য এবং অশুভ শক্তির পাঁয়তারা প্রতিহত করার জন্য, কবিতাকে বিশেষ হয়ে উঠতে হয়েছে তার সহজাত স্বভাবভঙ্গিতে। তাই আমরা দেখি ভালোবাসার কবিতায়, দ্রোহের কবিতায়, বিদ্রোহের কবিতায়, যুদ্ধের কবিতায়, রাজনৈতিক চেতনার কবিতায়, শান্তির ধারণাকে ধারণ করে শরীরী হয়ে উঠেছে কবিতা। সে চিৎকার করে বলেছে, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে’। হ্যাঁ এই তার নিয়তি এই তার বিস্তার।
কবিরা কখনোই এমন ভাবেন না যে, তাদের বহু হয়ে অল্পের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, বরং এমনই ভাবেন যে একক থেকে বহুত্বের যাত্রায় তারা সাহসী মানুষের মতো তার উচ্চারণকে ঋদ্ধ-হৃষ্ট রাখবেন, কেউ না আসুক কেউ না থাকুক তিনি তো আছেনই আর এটা তার কাজ আবার সত্তার বিশুদ্ধতাকে শাণিত করার জন্য গেয়ে যান ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’, ‘বলে না কাতর স্বরে বৃথা জন্ম এ সংসারে’ কিংবা বলতে পারেন ‘বল বীর/বল চির উন্নত মম শির/শির নেহারি আমি নতÑশির ওই শিখর হিমাদ্রির/বল বীর... ‘বিদ্রোহী’ কাজী নজরুল। এটা এমন নয় যে, এ রকম উচ্চারণ মাত্র কয়েক দিন আগে উচ্চারিত হয়েছে, না আরো আগ থেকে কবিতার উচ্চারণ এমনই। কবিতা সামন্ত যুগের রাজাবাদশাহর অপশাসনের বিরুদ্ধে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী নগ্নতার বিরুদ্ধে, যুদ্ধবাজদের নির্মমতার বিরুদ্ধে, সম-মাত্রায় উচ্চারিত হয়েছে। হয়েছে ধর্মীয় অপতৎপরতার বিরুদ্ধে, কলুষতার বিরুদ্ধে, অন্যায় রক্তপাতের বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে কাব্যপঙ্ক্তিমালা। কবিতা কখনো কখনো গভীর ধ্যানীর মতো বলেছে, ‘আমাদের মধুর সঙ্গীতগুলো আমাদের বেদনার কথাই বলে।’ কারণ দুঃখগুলোকে সঠিকভাবে চিনিয়ে দেয় কবিতা, জানিয়ে দেয় অবয়ব বিধানের উপশম।
দার্শনিকেরা নানাভাবে পৃথিবীর ব্যাখ্যা করেছেন, যার মূল লক্ষ্য জানা এবং বোঝার মধ্য দিয়ে মানবকল্যাণ লক্ষ্যকে স্পষ্ট করা। সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা যার প্রয়োজন রয়েছে গণনাতীতভাবে। কাব্য তার অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে একটা বোধ যা প্রতিনিয়ত প্রকাশের মধ্য দিয়ে সত্যকেই দেখতে চায়, প্রেমে-ধ্যানে-গানে জীবনে সমাজে রাষ্ট্রেÑ যাতে শুভরাষ্ট্রের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানব বিকাশে মানবিকতা পুষ্পের শতদলের মতো সুন্দর শোভন হয়ে ফুটতে পারে। স্বাধীনতা পূর্ণ মাত্রায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। জাতি বিকশিত হয়, তার আত্ম-অহঙ্কারের চিহ্নগুলো স্পষ্ট হয় এবং এই উপলব্ধি বোধ, এই প্রত্যয়, এই আত্মপরিচয়ের গৌরব তাকে শেখায় নতুনের দিকে যেতে এবং তার হারানো দিন খুঁজে আবার সামনের যাত্রায় শামিল হতে, যা শান্তির, প্রগতির, মানবমুখী বন্দনা। ঠিক তেমনি আরো একটি কবিতার দুটো পঙ্ক্তি থেকে আমাদের সমাজের প্রকৃত মানুষগুলোর আনন্দ বেদনা উপলব্ধি বোধকে কত সুন্দর করে জানতে পারি ‘মুগুর উঠছে মুগুর নামছে/ভাঙছে মাটি ঢেলা/আকাশে মেঘের সাথে সূর্যের/জমেছে মধুর খেলা’ [ক্ষেতমজুরের কাব্য, নির্মলেন্দু গুণ] কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী তার খেলা কবিতায় কী ভয়ানক চাবুকের ভঙ্গি দিয়েছেন কয়েকটি পঙ্ক্তিতেÑ ‘আমি বাংলা লেখা নিয়ে/ইংরেজিতে তোমার সঙ্গে খেলছি/তোমাকে দেখার মধ্যে ফুটে উঠেছে প্লøাস ও মাইনাস/আলোর মধ্যে বিস্তীর্ণ চর।’ এভাবে প্রকৃত কবি ও তার কবিতা কখনো আগামীর, কখনো অতীত স্মরণের, কখনো নীরব বোধের, কখনো ইতিহাসের যাত্রায় ঐতিহাসিক, কখনো হয়ে ওঠে প্রবল শক্তিমান সুউচ্চ পর্বত। কবিতা কখনো কোনো শক্তিমানের স্তবস্তুতি গায় না, মোসাহেবি করে না, নিজ স্বার্থকে উচ্চমূল্য দেয় না। তা সে পারে না, সে যে তার স্বভাবের নয়, সে কেবলই সেই সুন্দরের স্বপ্ন দেখায় যা সত্য হয়ে উঠবে।
আজকের পৃথিবী সামগ্রিক, রাষ্ট্রিক, পারস্পরিক, সমাজ আন্তঃসাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুধা বিস্তৃতিক, তাই অস্তিত্বমান কোনো সমাজের অস্থিরতা অন্য সমাজকে এমনকি আন্তঃসমাজকেও অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দেয়, খাটো করে মানুষ মানুষের স্বাধীনতা, বিস্তার পায় স্বৈরতন্ত্রের। বিস্তার পায় নানা অশুভ তৎপরতার।
১০ পৃষ্ঠার পর

স্বেচ্ছাচারিতায় শাসক জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, মিথ্যে হয়ে ওঠে সমাজের ভাষা যা শাসক বলে। ফলে যে শুভরাষ্ট্র মানুষের কামনা তা হয়ে ওঠে তার বিকাশের অন্তরায়। যদিও পৃথিবী নানা বিশ্বাস দ্বারা বিভক্ত, তবুও মানুষ চায় শুভের আলোক, সুন্দরের লাবণ্যময় মুখ, বিশ্বাসের নির্ভরতা। সে চায় মুছে যাক ভেদাভেদ ক্ষমতার লোভ, সঙ্কীর্ণতা, হিংসার চতুরতা। আকাক্সক্ষার পৃথিবী তার চোখে হাতছানি দেয়। আর কবিরা তো সমাজে অত্যন্ত সংবেদনশীল মানুষ, কল্পনায় অগ্রগামী। তাই তার প্রকাশ সব সময়ই থেকে যায় অগ্রগামী হয়ে শান্তির সপক্ষে। কারণ শান্তি ছাড়া এবং পরস্পরের প্রতি আস্থা ছাড়া এবং অটুট সম্প্রীতি ছাড়া শুভ রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না।
কবিতা চলমান সময়ের উদ্ভাস, সময়কে কবিতা ধারণ করে এবং প্রবহমান থাকে সামনের দিকে। যে কবিতায় সময়ের চাহিদাকে ব্যবহারে আক্কেল দেখায় না, কেবল নিজের দিকে স্বার্থগামী করে এবং এর প্রয়োজনে স্বৈরাচারের সেবাদাস হতে দ্বিধা করে না তা অনর্থের অনর্থক এক ক্রিয়া, যা মানুষের স্বার্থকে, তার বিশ্বাসকে, তার বিকাশকে রুদ্ধ করে এবং হয়ে যায় তিতবিরক্তি উদ্রেককারী এক প্রকাশ, যা পাঠকের মনকে নৈতিকতায় বিকশিত করার পরিবর্তে লোভের রাজ্যে ঠেলে দেয়, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর আমাদের কাব্যাঙ্গন তেমনি অসুখাক্রান্ত। আজকের পৃথিবীতে সাম্প্রদায়িকতা এক বড় ব্যাধি যা স্থিতি, বিকাশ ও শান্তিকে বিনষ্ট করছে, জাতিতে জাতিতে বিভেদ আনছে, শুভকে কালিমালিপ্ত করে নিয়ে যাচ্ছে অশুভের কানাগলিতে, মানুষের জীবনযাপনকে এবং তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও স্বাতন্ত্র্যকে বলবান করে এক শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থার আশাকে ধূলিসাৎ করছে। তারা কবিতাকে প্রিয় ও প্রিয়ার বাহুবন্ধনে যুক্ত করে একধরনের যৌনতার ভাষা কবিতার শরীরে লেপ্টে দিয়ে কবিতাকে করে তুলছে যৌনতার গান আর তা হয়ে উঠছে শাসকের অন্যায়গুলো আড়াল করবার হাতিয়ার। কখনো কখনো কোনো কবি শান্তির নামে নানা বাহানা করছে, যা মূলত শান্তিপ্রত্যাশী কর্ম নয়, ব্যক্তির প্রাপ্তিকেই মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়া। প্রকৃত কবিদের বিকাশে সুস্থতা চাই। মানবিক ও নৈতিক আচরণ ও প্রকাশ দ্বারা কেবল তা সম্ভব। আজ দরকার সৃষ্টিকে নব নবরূপে শান্তির অভিলাষে অভিযাত্রী করা এবং সম্মিলিত বুননে তৈরি করা সেই কাব্য শক্তি, যা মিছিল হয়ে উঠবে সমাজ নির্মাণের পক্ষে। দৃঢ় করবে বিশ্বমানব সঙ্ঘ সংহতি।
‘ইতিহাস অর্ধসত্য কামাচ্ছন্ন এখনো কালের কিনারায়;
তবুও মানুষ এই জীবনকে ভালোবাসে; মানুষের মন
জানে জীবনের মানে : সকলের ভালো করে জীবনযাপন
সেই শুভ রাষ্ট্র ঢের দূরে আজ’

অথচ তা আমাদের চাই-ই চাই সকলের জন্য।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫