ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

মতামত

শেয়ারবাজারে আক্কেল আলীদের গুরুত্ব

আবু আহমেদ

২৬ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৫২ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৩০


প্রিন্ট
শেয়ারবাজারে আক্কেল আলীদের গুরুত্ব

শেয়ারবাজারে আক্কেল আলীদের গুরুত্ব

শেয়ারবাজারে আক্কেল আলীরা সবার সামনে কমই আসে। তাদের একটি দল আছে, যেখানে তাদের আনাগোনা। তারা শেয়ারবাজারের সূচকের নির্মাতা, বলা চলে মূল্যসূচক কোন দিকে ঊর্ধ্বে উঠবে না নামবে তা তারাই ঠিক করে দেয়। তাদের অনেক কদর শ্রেষ্ঠ হাউজগুলোতে। দুই-একজন আক্কেল আলী কোনো ব্রোকার হাউজের ট্রেডিংয়ে থাকলে ওই ব্রোকার হাউজের পোয়াবারো। কমিশন আয় নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। কারণ হলো- আক্কেল আলীরা একেকজন হাজার হাজার শেয়ার কেনাবেচা করে। শতকরা দশমিক ২৫ ভাগ কমিশন দিলেও ব্রোকারের অনেক লাভ। কখনো কখনো ব্রোকার হাউজ আক্কেল আলীদের কাছে মার্জিন ঋণও বিক্রয় করে। আক্কেল আলীরা যত ঋণ চায় তত পায়।

এতে ব্রোকার হাউজের লাভ দু’দিকেই। এক. ঋণ বেচা থেকে সুদ আয়। দুই. ঋণ পেলে আক্কেল আলীরা বেশি ভলিউমে ট্রেড করবে এবং এতে হাউজের কমিশন আয় বাড়বে। তবে আক্কেল আলীরা অনেক সময় অশ্রুবানিতে শেয়ারে বেশি বেচাকেনা করে। তাদের কথা হলো- প্রচলিত শেয়ারে সুবিধা করা যায় না। কারণ হলো ওই শেয়ার মৌলিকভাবে শক্ত বলে অন্য অনেকের কাছে আছে এবং একটু মূল্য বাড়লে তারা বেচে বের হয়ে যাবে। তাই আক্কেল আলীদের টার্গেট ছোট ইস্যুটির শেয়ার। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারী কর্তৃক অবহেলিত। তা হলে আক্কেল আলীরা কি ‘ত’ গ্রুপের তথা স্টক (junks) শেয়ারের পেছনে ছুটে। হ্যাঁ, ছুটেই বটে। তাদের একটা গ্রুপ আছে। আত্মবিধ্বস্ত গ্রুপ। তারা শেয়ার মূল্যকে একদিকে নেয়ার জন্য জোটবদ্ধ হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা সফল হয়। তাদের অভিজ্ঞতা হলো তাদের শিক্ষা। এমনিতে তারা শেয়ার বাজার সম্পর্কিত কোনো বইপুস্তক পড়তে আগ্রহী নয়। তাদের কথা হলো- শেয়ারবাজার বইয়ের কথায় চলে না, চলে অনেক আক্কেল আলী একসঙ্গে কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তার ওপর। যেহেতু তারা জোটবদ্ধ, সেহেতু তারা জিতবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকলে ওই শেয়ার কেনায় ঢুুকবেই। তাদের ঢুকানোই তাদের কাজ। বলতে পারেন গ্রুপে আবদ্ধ করা। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঢুকলে আক্কেল আলীরা বের হয়ে পড়ে। বা সরতে শুরু করে। অন্তত ৭২-৭৫ ভাগ শেয়ারও অফলোড করতে পারলে তারাই জিতে। মার্জিন ঋণের সুদ দিয়েও বহুত থাকে। কিছু দিন আক্কেল আলীরা চুপ থাকে।

তারা আবার আরেক প্রজেক্ট নিয়ে নেমে পড়ে। তাদের কথা হলো- শেয়ারবাজার যতদিন আছে, তত দিনেই তাদের প্রজেক্ট চলবে। লোকজন জুয়া খেলা বা এর আপত্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানে নাড়া দিয়ে তাদেরকে তাদের দিকে টানাই বড় সাফল্য। আসলে তো তাই। আমাদের শেয়ারবাজারটা তো আক্কেল আলীদের দখলে। তাদেরকে মুক্ত করে শেয়ারবাজার বিনির্মাণ কি সম্ভব? অনেকে মনে করেন, তা সম্ভবও নয়, উচিতও নয়। তাদের তথ্য হলো- আক্কেল আলীরা না থাকলে শেয়ারবাজারে যতটুকু প্রাণ আছে ততটুকুও থাকত না। কিন্তু এইভাবে শেয়ারবাজার চললে তো প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে দূরেই থাকবে।

আক্কেল আলীদের কাছে ওয়ারেন বাফেটের (Warren Buffet) বিনিয়োগতত্ত্বের কোনো মূল্য নেই। বাফেট বলেছেন, তোমরা শেয়ারের মধ্যে ভবিষ্যৎ খোঁজো। যে শেয়ারের ভবিষ্যৎ ভালো সে শেয়ার আজকে উঠতি মূল্যে কিনে রেখো। কিন্তু আক্কেল আলীদের কাছে কোম্পানির ভবিষ্যতের কোনো মূল্য নেই। তারা বলতে চায়, তাদের অপেক্ষা করার সময় নেই। তারা হলো এক ধরনের জুয়াড়ি। আক্কেল আলীদের এই নামে অভিহিত হতে আপত্তি নেই। তারা বলতে চায়, জুয়া খেলাতেও একটা ঝুঁকি আছে। তারা সেই ঝুঁকি নিতে রাজি। তবে কথা হলো- আক্কেল আলীদের জুয়াড়ি পথে শেয়ারবাজার এগুলে এই বাজারে সুস্থিতি ফেরত আসতে অনেক সময় লাগবে। আমি জানি আমাদের শেয়ারবাজারটাকে জুয়ামুক্ত করা যায় কিভাবে। জুয়ামুক্ত করতে না পারলেও আক্কেল আলীদের কর্তৃক সূচক উঠানো-নামানো কিভাবে কমানো যায়। এটার একটাই উত্তর আমার কাছে ঘুরে ফিরে এসেছে, তা হলো- ভালো শেয়ার এবং অনেক কোম্পানির শেয়ারের জোগান দিলে জুয়ার কনস্টেন্টটা কমে যাবে।

তখন আক্কেল আলীরা চাইলেও শেয়ারবাজারকে এক দিকে নিতে পারবে না। কিন্তু বাজারে ভালো শেয়ারের জোগান বৃদ্ধি পাচ্ছে কি? পাচ্ছে না। যে সব উদ্যোক্তা গত তিন বছর আইপিও বিক্রয় করেছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের নিয়তই কারো বা ছিল ওই সব আইপিও বিক্রেতাদের ক্যাস্টরি এখন বন্ধ। বন্ধ হলে এটা নোটিশ দিয়েও জানায়নি। আর রেগুলেটর ইঝঊঈ যেন ওচঙ এর অনুমোদন দিয়ে কাজ শেষ করেছে। আইপিও বিক্রেতা কোম্পানিকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনার কোনো ব্যবস্থা ইঝঊঈ করতে পারেনি। জনগণের অর্থ লোপাট করার জন্য আইপিও মার্কেট একটা ভালো হাতিয়ার এখন! শুধু কি অবস্থা ওইখানেই থেমে গেছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে উদ্যোক্তারা নিজেদের প্রায় সব শেয়ারই আক্কেল আলীদের মাধ্যমে বাজারে বেচে দিয়েছে। এভাবে স্টার আইপিও এখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পরিত্যায্য শেয়ার। কিন্তু ততক্ষণে উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়ে গেছে। যে শেয়ারকে তারা ১০ টাকা বেচতে পারত না, সে শেয়ারকে আইপিওতে বেচেছে ২৫ টাকায় আর সেকেন্ডারি বাজারে বেচেছে ৩৫ টাকায়। তারপর দুই বছর পার হয়ে গেছে। এখন ওই শেয়ারের মূল্য মাত্র ৮.৫০ টাকা। তাও আক্কেল আলীরা আছে বলে। খুদে আক্কেল আলীরা এখনো আশায় থাকে, কখন ৮.৫০ টাকার শেয়ার ১০ টাকা হয়। কখন কোম্পানি পাচ্ছে ১৫ ভাগ ক্যাশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। আর এক ধরনের আক্কেল আলী আছে, তারা ভবিষ্যতে কোম্পানি কিছু দেবে ভাবেই না। তারা নগদ সবকিছুতে বিশ্বাস করে। তারা মনে করে, অন্য বড় আক্কেল আলীরা ওই শেয়ারের মূল্যকে ১০ টাকায় নিবেই এবং তারা ১০-১৫ ভাগ মুনাফা নিয়ে বের হয়ে যেতে পারবে। এভাবে এক আক্কেল আলী আরেক আক্কেল আলীকে বোকা মনে করছে। কিন্তু তাজ্জবের বিষয় হলো- ৮.৫ ভাগ টাকার শেয়ার ঠিকই ১০ টাকায় উঠছে। বন্ধ এয়ারলাইনস কোম্পানির শেয়ারমূল্য মাঝেমধ্যে টপটেনের এক নম্বরে থাকে। এটা কিভাবে সম্ভব!

ওয়ারেন বাফেট যদি এটা জানতেন তাহলে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে ক্যাসিনোই বলতেন এবং নিজে ওই বাজার থেকে দূরে থেকে অন্য ব্যবসা করতেন। কিন্তু আক্কেল আলীদের সাথে আমার দেখা হয়। তবে তারা আমার কাছে মুখ খোলে না। কারণ হলো- তারা জানে আমি ফান্ডামেন্টালদের পক্ষে। আক্কেল আলীদের চিন্তায় ফান্ডামেন্টালস কোনো দিন ঠাঁই পায়নি। ওরা বলতে চায়, বাংলাদেশে যারা ফান্ডামেন্টাল চিন্তা করেছে ওরা ঠকেছে। কিন্তু ওদের কথা কি ঠিক? না ঠিক নয়। যদি পাঁচ-ছয় বছরের মূল্যের গড় দেখা যায়, তা হলে যারা ফান্ডামেন্টাল মেনে বিনিয়োগ করেছে ওরাই জয়ী হয়েছে। কিন্তু আক্কেল আলীরা হলো ট্রেডারস-জুয়াড়ি। তাদের কাছে পাঁচ-ছয় বছর অপেক্ষা করা বদহজমের মতো। আক্কেল আলী বলেন, দুনিয়াতে যারা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক হিসেবি হয়েছে তারা সুবিধা করতে পারেনি। অতি অধ্যয়নের লোকদেরকে তারা ব্যর্থ মনে করে।

কারণ হলো- অধ্যয়ন করে ভালো মুনাফা করা যায় না। তাদের কাছে এফসিএস মানে সনদপ্রাপ্ত অ্যাকাউন্টেট এবং সিএফএ মানে সনদপ্রাপ্ত আর্থিক বিশ্লেষক এরা হলো ফেল করা লোক। আক্কেল আলীরা বলেন, আপনি কি দেখেন কোনো এফসিএ শেয়ারবাজারে ভালো করেছে? এফসিএ-এরা সংখ্যাকে সাজাতে জানে, সংখ্যাকে ম্যানুপুলেট করতে জানে। এর বাইরে বাস্তব জ্ঞানে এরা অতটা অগ্রগামী নয়। সিএফএ’র ক্ষেত্রেও আক্কেল আলীদের ধারণা অনেকটা নেতিবাচক। তাদের কথা হলো সিএফএ-রা সফল বিনিয়োগকারী হলে mutual funds মূল্যের এই করুণ অবস্থা হতো না।
লেখক : পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫