ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

মতামত

রোহিঙ্গা সমস্যা : সমাধান কোন পথে

আবুল হাসান চৌধুরী

২৫ অক্টোবর ২০১৭,বুধবার, ১৭:৫৮ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০১৭,বুধবার, ১৮:১৫


প্রিন্ট
রোহিঙ্গা সমস্যা : সমাধান কোন পথে

রোহিঙ্গা সমস্যা : সমাধান কোন পথে

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে প্রায় চার দশক ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর নানা দমন-পীড়ন নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে বারবার রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসঙ্ঘে এ ব্যাপারে আলোচনা হয়ে থাকলেও কোনো পদক্ষেপ তারা নিতে পারেনি। মূলত ভেটো প্রদানকারী দেশগুলোর বিভক্তির কারণে চীন এবং রাশিয়ার সমর্থন মিয়ানমারের জন্য একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। ইদানীং ভারতও মিয়ানমারকে তুষ্ট করার জন্য কোনোরকম বলিষ্ঠ চাপ থেকে বিরত আছে। ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী যাদের প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলমান তারা আবার বাংলাদেশে আসা শুরু করে। যে পাশবিক নির্যাতন এবং বর্বরোচিত ব্যবহার তাদের সাথে করা হয়, সেটা হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কলঙ্কজনক অধ্যায়কে ছাপিয়ে গেছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বিশ্বের কাছে প্রশংসিত হয়েছে এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী নন্দিত হয়েছেন।

সেই সময়কার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত মাসে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি উন্মুক্ত আলোচনা হয়। সেখানে সংস্থাটির মহাসচিব রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে জরুরি শরণার্থী সমস্যা হিসেবে অভিহিত করে একে মানবতা ও মানবাধিকারের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন হিসেবে চিহ্নিত করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যাতে নিরাপদে নিজ দেশে ও নিজ ঘরে ফিরতে পারে সে জন্য জাতিসঙ্ঘের সর্বোচ্চ উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন। এ জন্য সুনির্দিষ্ট পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। একই সাথে তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সমস্যাসহ বিভিন্ন জরুরি ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান। তিনি বিশ্বসংস্থায় বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে বক্তব্য রেখেছেন বিশ্বনেতার মতোই। তিনি সঙ্কটের সময়ে সাধারণ পরিষদ অধিবেশনকে সঠিকভাবেই কাজে লাগাতে পেরেছেন। জগৎসভায় বাংলাদেশ যে আর পিছিয়ে থাকবে না, সেটা নিশ্চিত হয়ে গেল নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরের অধিবেশন কক্ষে।

রোহিঙ্গা সমস্যা নতুন না হলেও বর্তমানে এর তীব্রতা অনেক বেশি। ১৯৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নানা রকম উৎপীড়ন-নিপীড়নের কারণে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের যাদের বেশি ভাগই মুসলমান, তারা বারবার বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। নব্বইয়ের দশকে আলোচনার মাধ্যমে তাদের একটা বড় অংশকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এবার যে পৈশাচিক বর্বরতার শিকার প্রায় পাঁচ লাখ শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া হয়েছে, তার জন্য আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাতে হয়। বলা যায়, পৃথিবীর সব জনগণকে দক্ষিণ আমেরিকায় রেখে দিলেও ঘনবসতির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তাদের অবস্থান থেকে অনেক ভালো থাকত।

এ বাস্তবতাকে মেনে নিলেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়াটা নৈতিক দিক থেকে সঠিক হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ এই উদারনীতিকে সমর্থন জানিয়েছে। এক দিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি এক মারাত্মক হিংসারঙ্গে মেতে ওঠা সামরিক জান্তার পুতুলে পরিণত হয়েছেন, অন্য দিকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারো বিশ্বের জনগণকে তার গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে জানিয়েছেন এবং বুঝিয়েছেন, বাংলাদেশ একটি উদার শান্তিকামী এবং মানবতার পক্ষের শক্তি। রোহিঙ্গারা এবারই বাংলাদেশে প্রথম আসেনি। জাতিগত বিদ্বেষ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৯৭৮, ১৯৯২ ও ২০১৬ সালে তিন দফায় তিন লাখ করে শরণার্থী বাংলাদেশে এসেছিল।

১৯৭৮ সালে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের ১৯৭৯ সালে ফেরত নেয়া হয়। ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন হওয়ার আগে তারা ছিল সে দেশের নাগরিক। ১৯৯২ সালে আসা রোহিঙ্গাদের প্রায় ৩০ হাজার এখনো রয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে আসা টেকনাফ উপত্যকায় অনিবন্ধিত হয়ে বসবাস করছে আরো ৭০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা। এ ছাড়া ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, আরো তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের মূল স্রোতে মিশে গেছে।

উল্লেখ্য, এ বছরের ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখনো করছে। অপেক্ষায় আছে আরো আড়াই লাখ। গত সপ্তাহে অং সান সু চির দফতরের একজন মন্ত্রী এ দেশে এসে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। যদিও তার বাংলাদেশে অবস্থানের সময় প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। উল্লেখ্য, সে দেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ সংখ্যা ছিল ১০ লাখের কিছু ওপরে।

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, তারা রোহিঙ্গাদের সে দেশ থেকে স্থায়ীভাবে বিতাড়নের চেষ্টা করছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম ও পরিকল্পিত হামলা চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের গ্রাম ও ফসলের জমি এমনভাবে ধ্বংস করছে, যাতে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীরা আর কোনো দিন সেখানে ফিরতে না পারে। এ রিপোর্টে জাতিসঙ্ঘ থেকে আরো বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ওপর সমন্বিত হামলা শুরু হয় ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা পুলিশ ফাঁড়ির ওপর হামলা চালানোরও আগে।

বাংলাদেশ প্রথম থেকেই মিয়ানমার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের স¤পৃক্ততা চায়। বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থাকে সম্পৃক্ত করে একটি কৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি চালানো হবে। গঠন করতে হবে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ। কিন্তু মিয়ানমার এতে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ চায় না। দেশটি চায় ১৯৮২ সালের চুক্তির আলোকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন। এর অধীনে শুধু গত বছর অক্টোবরের পর থেকে আসা রোহিঙ্গাদের তারা ফেরত নিতে চায়। কিন্তু এর আগে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণপত্রও চায় তারা।

প্রধানমন্ত্রী আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছেন, অবিলম্বে জাতিসঙ্ঘের একটি দল বাংলাদেশে পাঠানো হোক। আমি আশা করব, সেই দলের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যাদের মধ্যে রাশিয়া ও চীনও আছে, তাদের প্রতিনিধি আসবেন ও বর্তমান দুর্বিষহ অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করবেন।

জাতিসঙ্ঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক আমাদের ওপর নির্যাতনের কথা আছে। আমরা এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, শরণার্থী হওয়ার দুঃখ-বেদনা প্রত্যেক বাংলাদেশী হৃদয় দিয়ে অনুভব করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তার মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি ওআইসি সদস্যদেশগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। আইওএম প্রধানের সাথে তার আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথেও এ ব্যাপারে তার কথা হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স মিয়ানমারের সমালোচনা করেছেন। আমি মনে করি, জাতিসঙ্ঘ সফর প্রধানমন্ত্রী বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন। একই সাথে আমি এটাও আশা করব, প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই চীন, ভারত ও রাশিয়া সফর করবেন এবং আসিয়ানের নেতাদের সাথেও এ ব্যাপারে আলোচনা করবেন। প্রতিটি বিষয়ে আসিয়ান একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়ে থাকে। বর্তমানে মিয়ানমার কর্তৃক সৃষ্ট সঙ্কটে আসিয়ানের প্রভাবশালী দুইটি দেশ যেমন- মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। আশিয়ানের এই দুই প্রভাবশালী দেশ আমাদের প্রতি যথেষ্ট নমনীয়। তাদের দিয়েও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। ভারতকে বোঝাতে হবে, বিশেষ ও ঐতিহাসিক বন্ধু বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতের বর্তমান অবস্থানের কারণে এ ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে।

চীনের এখন সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট হচ্ছে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড। চীনকে বোঝাতে হবে, এ সংযোগ পরিকল্পনা একটি অস্থিরতার ভেতর কোনো দিনই কার্যকর করা সম্ভব না।
পরিশেষে একটি কথাই বলা, আমাদের দেশ একটি উদার অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এই পরিস্থিতির যেন কোনো পরিবর্তন না হয়। ধর্মীয় আবেগ থাকতেই পারে, কিন্তু সবার ওপরে যে কথাটা উপলব্ধি করতে হবে, তা হলো- রোহিঙ্গারা মানুষ এবং সেভাবেই মানবতাবোধ নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নতুবা বাংলাদেশকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে, যা কখনোই আমাদের কাম্য নয়।

একই সাথে আমি আশা করব, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের যারা নির্যাতিত হচ্ছেন, তাদের ৯৯ শতাংশ মুসলমান এবং স্বাভাবিকভাবেই একটা ধর্মীয় আবেগ থাকবেই। এটা বাস্তবতা। কিন্তু মূলত বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে একটা উদারনীতি গ্রহণ করেছে। কারণ সেটাই মানবতার দাবি। খুব বেদনাদায়ক যে, বর্তমানকালে আমাদের শান্তি এবং সৌহার্দ্যরে ধর্ম ইসলামের সাথে জঙ্গিবাদকে সম্পৃক্ত করা হয়। আমার মনে হয়, সময় এসেছে বিশ্বের তথাকথিত উন্নত দেশগুলো জঙ্গিবাদকে জঙ্গিবাদ হিসেবেই আখ্যায়িত করা এবং এর সাথে ইসলাম অথবা অন্য কোনো ধর্মের স্বাভাবিক সংযোগ দেখাবে না। এটাই হবে বিশ্বজনীন জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়ার উত্তম উপায়। একই সাথে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর নেতাদের আচার-আচরণ ও ব্যবহারে পৃথিবীর মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে আমাদের ধর্মের মূলমন্ত্র। একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল।
লেখক : সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫