ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

মতামত

আগামী সাধারণ নির্বাচন এবং আগামী বছর

এমাজউদ্দীন আহমদ

২৫ অক্টোবর ২০১৭,বুধবার, ১৭:২৪ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০১৭,বুধবার, ১৮:০৪


প্রিন্ট
আগামী সাধারণ নির্বাচন এবং আগামী বছর

আগামী সাধারণ নির্বাচন এবং আগামী বছর

আগামী সাধারণ নির্বাচন কি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হবে? পারবেন কি ভোটদাতারা তাদের ইচ্ছামতো প্রার্থীকে ভোট দিতে? ভোটপ্রার্থীরা কি পারবেন তার নির্বাচনমণ্ডলীর সাথে নিরাপদে যোগাযোগ স্থাপন করতে?

এসব প্রশ্নের সার্থক উত্তর এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে দেয়া সম্ভব নয়, তবে কিছু ধারণা দিয়ে আগামী সাধারণ নির্বাচনের গুরুত্ব বর্ণনা করার ক্ষুদ্র প্রয়াস রয়েছে এতে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে ক্ষমতাসীনদের ৩০০ আসনের ১৫৩টিতে যা হয়েছিল তা হয়তো ভবিষ্যতে আর কোনো দিনই হবে না, কিন্তু এর ছায়াও যেন এ দেশের কোনো নির্বাচনে আর না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে এবং করতে হবে দেশের রাজনীতিকদেরই। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হলে রাজনীতিকেরাই প্রশংসিত হবেন। শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, বিশ্বের সর্বত্রই। বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে রয়েছে বিশ্ববাসীর দৃষ্টিতে। ছোট্ট ভালো কাজটি তাদের চোখে দেখা দেবে অনন্য কর্মরূপে, একটি অনুকরণীয় উদ্যোগরূপে। তাই এ বিষয়ে কলম ধরেছি।

আমাদের সৌভাগ্য, বাংলাদেশের জনগণের কাছে গণতন্ত্রের আবেদন অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গণতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা তারা বরাবর উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সৈনিকরূপে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ত্যাগ স্বীকারও করেছেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশীদার হয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রণোদনা লাভ করেন পাকিস্তানের বলদর্পী শাসনকারী এলিট গোষ্ঠী যখন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার পথ রুদ্ধ করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এভাবে, যখন পেশিশক্তির মাধ্যমে জনগণের রায়কে বিধ্বস্ত করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এখন পর্যন্ত গণতন্ত্র রয়ে গেছে জনগণের আকাঙ্ক্ষায় (in their hope), তাদের প্রত্যাশায়। শুধু বিদ্যমান রয়েছে তাদের দুই চোখ ভরা স্বপ্নে। ‘গণতন্ত্র তাদের নিকট সেই সোনার হরিণ। আকর্ষণীয়, কিন্তু বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। কাক্সিক্ষত, কিন্তু তাদের জীবনকে স্পর্শ করেনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তাদের হতাশার মূল কারণ এই যে, তখনকার ৯ কোটি ১৯ লাখ ভোটারের মধ্যে চার কোটি ৮৩ লাখ ভোটার ভোটদানে বঞ্চিত হন।

পাশ্চাত্যের উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্র সফল হয়েছে প্রধানত দুটি কারণে। এক. যে সামাজিক উপত্যকায় গণতন্ত্রের সুর ঝঙ্কৃত, তা মোটামুটিভাবে মসৃণ এবং সমতল। বৈষম্য, তা সম্পদসৃষ্ট হোক আর জাতিগত বা ধর্মের ভিন্নতা হেতু হোক, ওই সব সমাজে অনতিক্রম্য নয়। নয় অজেয়। আজ যিনি নির্ধন, আগামীকাল সমাজপ্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার ফলে তিনিও শীর্ষ অবস্থানে যেতে সক্ষম। জাতি-ধর্ম বা নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা তার অগ্রগতির অভিযাত্রা রুদ্ধ করতে পারে না। তাই সমতল সমাজভূমিতে নাগরিকদের জীবন হয়ে উঠেছে শ্যামল, সমৃদ্ধ, সুষমামণ্ডিত। দুই. ওই সব সমাজে অর্থনৈতিক সুখ-সুবিধাও এমনভাবে বিন্যস্ত যে, প্রত্যেকেই জীবনের সর্বনিম্ন চাহিদা মিটিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন। দেশের আইন এমনভাবে কার্যকর যে, আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেই সবাই জীবনযাপন করতে পারবেন। এসব সমাজে কাউকে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হতে হয় না।

সুতরাং উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হোন, দেখবেন গণতন্ত্রকে সফলভাবে বাস্তবায়নের সব শর্তই প্রায় সামাজিক, রাজনৈতিক নয়। কার্যত পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের জন্য হয়েছিল সামাজিক এক ব্যবস্থা হিসেবে। সমাজেই তার দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। পরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার সার্থক প্রয়োগ ঘটে। আগে সমাজ গণতান্ত্রিক হয়েছে। পরে রাষ্ট্র হয়েছে গণতান্ত্রিক। বাংলাদেশে বিশেষ করে, বিশ্বের এই অংশে রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বৈষম্যক্লিষ্ট, হাজারো প্রকরণে বিভক্ত, জাতি-ধর্মের ভিন্নতা-পীড়িত সমাজে। এসব সমাজে সামাজিক মূল্যবোধ এখনো গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি পারস্পরিক সমঝোতা ও সহিষ্ণুতার অমৃত রসে সিক্ত। সহনশীলতার পাঠ সমাজজীবনে এখনো শুরু হয়নি। তাই এসব গণতান্ত্রিক সামাজিক মূল্যবোধহীন জনপদে রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতি পদে হোঁচট খাচ্ছে। টিকে রয়েছে টলটলায়মান অবস্থায়।
হাজারো অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। তাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার নির্দেশনা হলো- সৃজনশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের গতিশীল নেতৃত্বের আলোকে গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য সমাজে গণতন্ত্রের উর্বর ক্ষেত্রে রচনা করা।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এখনো তেমন সৃষ্টিশীল উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। গণতন্ত্রের এমন মহামূল্যবান মণিমুক্তা তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতাকে (Political Power) তারা শুধু দেখেছেন ব্যক্তিগত এবং দলীয়পর্যায়ে প্রভাব-বৈভব অর্জনের মাধ্যম হিসেবে। কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেননি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সমগ্র সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। যারা ক্ষমতাসীন তারাও এই ভুল করেছেন।

যারা ক্ষমতা দখলে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তারাও এ বিষয়ে সজ্ঞাত নন। পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য জনগণের সচেতনতা যতটুকু দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দৃঢ় সঙ্কল্প এবং সৃজনশীল মনমানসিকতা। বাংলাদেশে প্রথমটি বিদ্যমান থাকলেও দ্বিতীয়টির আকাল চোখে পড়ার মতো।

গণতন্ত্রে নির্বাচনের মাধ্যমেই কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন হয়। গণতান্ত্রিকব্যবস্থায় জনগণই ক্ষমতার উৎস। জনগণই রাজনৈতিক ক্ষমতার মালিক-মোক্তার। যারা ক্ষমতাসীন হলেন জনগণের সম্মতি নিয়েই ক্ষমতাসীন হলেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। ওই সময় অতিক্রান্ত হলে জনগণের কাছেই ফেরত যেতে হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণই নির্ধারণ করেন কারা ক্ষমতাসীন হবেন সেই সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তাই বলা হয় সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকপর্যায়ে গ্রহণযোগ্য করা। কোনো রাষ্ট্রে জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা বা জাতীয় সংসদ (আমাদের ক্ষেত্রে) সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী নয়। একথা সর্বদা স্মরণযোগ্য। বাংলাদেশের সংবিধানে কিভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে তারও সুস্পষ্ট বিধি প্রণীত হয়েছে।

সেই বিধিমালার দিকে দৃষ্টি দেয়ার আগে ভেবে দেখতে হবে সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ কি বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে? রয়েছে কি শুধু মেধা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে সুসংগঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা? কালো টাকার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে একটি শক্তিশালী এবং নিরপেক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশন আছে কি? আছে কি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ মানবাধিকার কমিশন? নির্বাচন কমিশন তৈরি হয়েছে বটে, কিন্তু তার ক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার পরীক্ষা এখনো হয়নি। সন্ত্রাস রোধে দেশে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য শক্তিশালী এবং নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে কি?

ধরে নিলাম সব ঠিক আছে। তার পরেও দৃষ্টি দিন নির্বাচনের সময়ের দিকে। সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদের (ক) অনুযায়ী যদি জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে’ তাহলে ওই নির্বাচন কিছুতেই সুষ্ঠু, অবাধ এবং গ্রহণযোগ্য হবে না, কারণ নির্বাচন তো একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা- তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিরপেক্ষতার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো ক্ষেত্রে সমান সুযোগ (Level Playing Field)। সব পক্ষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া। সংসদীয় ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর দিকে তাকালেও অনুধাবনে এতটুকু অসুবিধা হবে না যে, যে সংসদ বা প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা পূর্বাহ্নেই ভেঙে দেয়া হচ্ছে, কেননা যারা এই সংসদের সদস্য পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাদের কেউ সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন আর কেউ কেউ একেবারে নতুন। উভয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা অসম এবং অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বে উল্লেখযোগ্য সংসদীয় ব্যবস্থার কয়েকটি দেশের দিকে তাকান তাহলেই সব সুস্পষ্ট হবে। জাপান, জার্মানি, ভারত, কানাডা ও ব্রিটেন। নির্বাচনকালে এসব রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান হিসেবে দৈনন্দিন কাজকর্মের সাথে রুটিন ওয়ার্কে জড়িত থাকেন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। তিনি ইচ্ছা করলে অন্যান্য দলের প্রতিনিধিরও সহায়তা লাভ করতে পারেন। এই প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ১২৩(৩) এর (খ) বিধির প্রয়োগ অধিক উপযোগী বলে মনে হয়।

সংবিধানের ১২৩(৩) এর (খ) বিধির প্রয়োগ ঘটাতে হলে সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তনের দরকার নেই। দরকার শুধু এটুকু যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় স্বার্থে, বিশেষ করে বাংলাদেশের আগামী দিনের সুস্থ এবং সৃজনশীল রাজনীতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করতে পারেন জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে। এর ফলে নির্বাচনের ক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনও সম্ভব হবে। এই পদক্ষেপ শুধু বর্তমানের জন্য শুভ হবে না, ভবিষ্যতের জন্যও হবে এক মাইলফলক। এই ব্যবস্থা সংবিধানসম্মতও।

গণতন্ত্র শুধু এক শাসনব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্র এক ধরনের নৈতিকতা। একধরনের পরিশীলিত কর্মপ্রবাহ। রুচিকর এবং সবার চোখে গ্রহণযোগ্য যৌথ উদ্যোগ। পরিচ্ছন্ন এবং সচেতন কল্যাণমুখী এক কর্মকাণ্ড। গোপনীয়তার জমাট বাঁধা অন্ধকার ছাপিয়ে গণতান্ত্রিক কার্যক্রমের সূচনা হয় সর্বসাধারণের সমক্ষে, মুক্ত আলোয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মান অনেক অবনত। পারস্পরিক সন্দেহ এবং অবিশ্বাস জমাট বাঁধা পাথরের মতো আটকে রেখেছে সমষ্টিগত জীবনের সহমিলনের উৎসবকে। ব্যক্তিগত এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থের অন্ধকারে নিমজ্জিত সামষ্টিক স্বার্থের চেতনা। পেশির সর্বগ্রাসী দাপটে নিস্তেজ হয়ে রয়েছে অন্তঃকরণের কল্যাণময়ী প্রত্যয়। আবেগের প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে যুক্তিবাদিতার গণমুখী ভাবনা, সৃজনশীলতার সার্বিক কলাকৌশল। সব কিছু ভাঙার প্রবণতা নিঃশেষ করেছে গড়ার প্রতিভাকে। ‘আমার’ সুকৌশলী চিন্তাসূত্র প্রতিনিয়ত ছিন্ন করছে ‘আমাদের’ ব্য্যাপকভিত্তিক কল্যাণবোধকে। এই অবস্থা আর যাই হোক স্থিতিশীল গণতন্ত্রের উপযোগী নয়।

সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট নয়, যদিও তা অপরিহার্য। এর কয়েকটি কারণও রয়েছে। এক. নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক, দেশের প্রায় সাড়ে নয় কোটি ভোটদাতা এবং প্রায় ৬০ কি ৭০ হাজার ভোটকেন্দ্র তদারক করার ক্ষমতা এককভাবে নির্বাচন কমিশনের নেই। কমিশনকে দেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহায়তা গ্রহণ করতেই হবে। সহায়তা গ্রহণ করতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। প্রশাসনিক ব্যবস্থার যে গুণপনা অর্থাৎ নিরপেক্ষতা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বীকৃত, গত কয়েক বছরে অনেকেই বলে থাকেন তার বৃহৎ এক অংশ হারিয়ে গেছে। দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে এসব ব্যবস্থার এক বৃহৎ অংশ নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। দুই. বাংলাদেশে নির্বাচন ভীষণভাবে প্রভাবিত হয় কালো টাকা এবং সন্ত্রাসের দ্বারা। যদি দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন আরো একটু শক্তিশালী হতো তাহলে কালো টাকার এবং সন্ত্রাসের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেত। তিন. সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য চাই an air of neutrality (নিরপেক্ষতার এক আবহ)। নিরপেক্ষতার আবহ তৈরি করতে পারেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। যেভাবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরত্বপূর্ণ সদস্যের সাথে আলোচনা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের কিছু সদস্যের সাথে এ বিষয়ে আলোচনায় বসতে পারেন। জাতীয় স্বার্থে, বিশেষ করে গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।

গণতন্ত্রের পথ সব সময় বন্ধুর। তাই এ পথে চলতে চলতে মাঝে মধ্যেই নেতৃত্বের সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হয়। এই সঙ্কট নিরসনের পন্থা কিন্তু আলোচনা-পর্যালোচনা এবং এরই মাধ্যমে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কিছুটা সম্মান দেখানো যায়। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবে চিহ্নিত এ দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছেন : ‘গণতন্ত্রের অর্থ হলো জনসমূহের মধ্যে ঐকমত্য, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্রে তোমাদের কিছু দিতে হবে এবং কিছু নিতে হবে’ (Democracy means agreement between people, friendship and co-operation. In democracy you will have to give and take)।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫