ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

বিমান দুর্ঘটনায় জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে

জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী

২৫ অক্টোবর ২০১৭,বুধবার, ১৪:১১ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০১৭,বুধবার, ১৪:৫৪


প্রিন্ট
বিমান দুর্ঘটনায় জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে : যেভাবে বেঁচে গেলেন জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী

বিমান দুর্ঘটনায় জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে : যেভাবে বেঁচে গেলেন জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী

পরিকল্পনা মোতাবেক বাংলাদেশী গেরিলাদের সাথে নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী অতর্কিতে সরাসরি যশোর সীমান্তে আক্রমণ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পর্যদুস্ত করে। যৌথ কমান্ড বাহিনীর অন্যতম মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ককে যশোর পরিদর্শন বাধা সৃষ্টি করা হলে জেনারেল (অব:) ওসমানী ছাত্রনেতা কে এম ওবায়দুর রহমান ও আমাকে ৫ ডিসেম্বর ’৭১ তারিখে যশোরের অবস্থা দেখে আসার জন্য নির্দেশ দেন। ওই দিনই আমরা যশোর ক্যান্টনমেন্ট পৌঁছে হতভম্ব হয়ে যাই। ভারতীয় সেনারা একের পর এক অফিসারদের বাসস্থানের এসিসহ বিভিন্ন সামগ্রী, অস্ত্রাগার, এমনকি যশোর সিএমএইচের যন্ত্রপাতি লুট করছে। বলছে, ‘বেঙ্গল রেজিমেন্ট এত বৈভব ও আরাম আয়েশে ছিল, কেন বিদ্রোহ করেছো? বিষয়টা ফোনে ওসমানী সাহেবকে জানানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে ৭ ডিসেম্বর আমি কলকাতা ফিরে আসি। ওবায়দুর রহমান তার জেলা ফরিদপুরের পথে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। কলকাতায় পৌঁছে সাথে সাথে আমি পুরো বিষয়টি ওসমানী সাহেবকে জানানোর পর, তিনি আমাকে সাথে নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদকে অবহিত করেন। অত্যন্ত দুঃখের সাথে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘তাহলে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তফাৎ কোথায়’? ওসমানী সাহেব বললেন, ‘বুঝতে পারছেন, ভারতীয়রা আমাকে কেন সরাসরি সমরাঙ্গনে যেতে দিচ্ছে না, তাদের উদ্দেশ্য ভালো না’।

কয়েক দিন অক্লান্ত চেষ্টার পর, কুমিল্লা হয়ে সিলেট পরিদর্শনের জন্য একটি বড় হেলিকপ্টার সম্ভবত এম-৮ দেয়া হলো ব্রিগেডিয়ার গুপ্তের তত্ত্বাবধানে। বিকেলে কুমিল্লা পৌঁছি। বিশ্রামের জন্য কুমিল্লা সার্কিট হাউজে পৌঁছে আমরা হতভম্ব হয়ে পড়ি। ওসমানী সাহেবকে হাত বাড়িয়ে ‘রিসিভ’ করছেন কয়েকজন ভারতীয় বাঙালি। একে একে পরিচয় দিলেন, ‘আমি মুখার্জি, IAS, আমি গাংগুলি IPS ইত্যাদি। বললেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে গত পরশু এখানে পৌঁছেছি কুমিল্লা মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে আমরা শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। অবশ্যই এখনো কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে যুদ্ধ চলছে’। ওসমানী সাহেব ভারতীয় অফিসারদের সাথে সার্কিট হাউজে রাত্রি যাপন করতে রাজি না হওয়ায়, আমরা ওয়াপদা গেস্ট হাউজে যাই। পরের দিন ভোরবেলা থেকে ওসমানী সাহেব কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা পরিদর্শনে বিভিন্ন পথে গেরিলাদের পাঠান এবং বেঙ্গল রেজিমেন্ট ইপিআর সেনাদের সম্মুখ আক্রমণে উৎসাহিত করতে থাকেন। ফলে পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল ভেঙে যায়। পরের দিন তারা আত্মসমর্পণ করে। খবর পাই, ঢাকায় পতন আসন্ন। আমরা ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকি।

১৬ ডিসেম্বর সকালে ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত জানালেন, আজ ঢাকায় পাকিস্তান সেনারা আত্মসমর্পণ করবে। ভাবলাম নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের কাছে। আশ্চর্য, ওসমানী সাহেব একবারে চুপ, কোনো কথা বলছেন না বিষয়টাতে খটকা লাগল।
জেনারেল ওসমানীর এডিসি আমাদের প্রিয়নেতা শেখ মুজিবুরের বড় ছেলে শেখ কামাল আমাকে বলল, ‘স্যার কখন রওনা হবে, তা তো বলছেন না। জাফর ভাই আপনি যান, জিজ্ঞেস করে সময় জেনে নিন। অধীর আগ্রহে আমরা সবাই অপেক্ষা করছি।’ আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করায় ওসমানী সাহেব বললেন, ‘I have not yet received order to move to Dhaka,’ ‘ঢাকার পথে রওনা হওয়ার জন্য কলকাতা থেকে তাজউদ্দীন সাহেবের কোনো নির্দেশ পাইনি’।

আমি বললাম, ‘আপনাকে অর্ডার দেবে কে? আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক’। ওসমানী বললেন, I decide tactics, my order is final for firing, but I receive orders from the cabinet through PM Mr. Tajuddin Ahmed.’

যুদ্ধক্ষেত্রে আমি সর্বেসর্বা কিন্তু মূল আদেশ আসে মন্ত্রিসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমদের বরাতে। কথাগুলো বললেন অত্যন্ত বিষণœ মনে। পরিষ্কার হলো উনি আসন্ন ঢাকা পতনের সংবাদ জানেন এবং প্রবাসী সরকারের নির্দেশের অপেক্ষা করছেন।

আমাদের অস্থিরতা দ্রুত বাড়ছে আর বাড়ছে। শেখ কামাল বারে বারে আমাকে চাপ দিচ্ছে আবার ভালো করে বুঝিয়ে বলে ওসমানী সাহেবকে রাজি করাতে, ঢাকা রওনা হওয়ার জন্য।
ঘণ্টাখানেক সময় পরে, আবার ওসমানী সাহেবের সামনে দাঁড়ানোর পর জেনারেল ওসমানী অত্যন্ত বেদনাতারিত কণ্ঠে যা বললেন তার মমার্থ হলো, ‘আমার ঢাকার পথে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ নেই। আমাকে বলা হয়েছে পরে প্রবাসী সরকারের সাথে একযোগে ঢাকা যেতে, দিনক্ষণ তাজউদ্দীন সাহেব জানাবেন। গণতন্ত্রের আচরণে যুদ্ধের সেনাপতি প্রধানমন্ত্রীর অধীন, এটাই সঠিক বিধান’। মনে হলো, উনি জেনেশুনে বিষপান করছেন। পরে ব্রিগেডিয়ার গুপ্তকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সিলেটের কী অবস্থা’? ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত জানালেন ‘সিলেট ইজ ক্লিয়ার’। ওসমানী বললেন, ‘তাহলে চলুন আমরা সিলেট যাই, সেখানে গিয়ে আমার পিতামাতার কবর জিয়ারত করব, শাহজালালের পুণ্যমাজারে আমার পূর্বপুরুষরা আছেন।’ ওসমানী সাহেব শেখ কামালকে ডেকে সবাইকে তৈরি হতে বললেন। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমরা আকাশে, নিরূপদ্রুব যাত্রা। ভারতীয় এম-৮ বিমানে সিলেটের পথে চলেছি। পরিষ্কার আকাশ। প্লেনের যাত্রী জেনারেল ওসমানী ও তার এডিসি শেখ কামাল, মুক্তিবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল এম এ রব, এম এন এ, রিপোর্টার আল্লামা, ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত, ভারতীয় দুই পাইলট এবং আমি। কেউ কথা বলছে না, সবাই নীরব।

অতর্কিতে একটি প্লেন এসে চক্কর দিয়ে চলে গেল। হঠাৎ গোলা বিস্ফোরণের আওয়াজ, ভেতরে জেনারেল রবের আর্তনাদ, পাইলট চিৎকার করে বললো, ‘উই হ্যাভ বিন এটাকড’। রবের উরুতে আঘাতের পরপরই তার কার্ডিয়াক এরেস্ট হলো। আমি এক্সটার্নাল কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দিতে শুরু করি। পাইলট চিৎকার করল, অয়েল ট্যাংক হিট হয়েছে, তেল বেরিয়ে যাচ্ছে, আমি বড়জোর দশ মিনিট উড়তে পারব বলে গুনতে শুরু করল ওয়ান, টু, থ্রি... টেন... টোয়েন্টি... থার্টি... ফোরটি... ফিফটি... নাইন (Gone) সিক্সটি-ওয়ান মিনিট গান, এভাবে মিনিট গুনছে উদ্বিগ্ন চিন্তিতসহ পাইলট। ধীরস্থিরভাবে পাইলটের আসনে বসা অন্য পাইলট। ওসমানী সাহেব লাফ দিয়ে উঠে, অয়েল ট্যাংকের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন, ‘জাফরুল্লাহ্, গিভ মি ইয়োর জ্যাকেট’। আমি আমার দামি জ্যাকেটটা ছুড়ে দিলে, ওসমানী সাহেব ওটা দিয়ে তৈলাধারের ছিদ্র বন্ধের চেষ্টা করতে থাকলেন। বললেন, Do not worry my boys, I know Sylhet like the palm of my hands.’-ভয় পেয়ো না আমি সিলেটকে আমার হাতের তালুর মতো চিনি। কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি ভাবছিলাম, আজ ১৬ ডিসেম্বর, দেশ স্বাধীন হবে। কিন্তু আমরা আজ সবাই কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাব। আগামীকাল পত্রিকায় Obituary কলামে কী লেখা হবে? বীরের মৃত্যু, অপঘাতে মৃত্যু? কার গোলাতে এই দুঘর্টনা? পাকিস্তানের সকল বিমান তো কয়েক দিন আগে ধ্বংস হয়েছে কিংবা গ্রাউন্ডেড করা হয়েছে। তাহলে আক্রমণকারী বিমানটি কাদের? গোলাছুড়ে কোথায় গেল? গৌহাটির পথে? চিন্তা বিঘ্নিত হলো ওসমানী সাহেবের চিৎকারে। নিচে একটা জায়গার দিকে আঙ্ল দেখিয়ে বললেন, ‘Land here’ এখানে নামো।

আরো বললেন, ‘Let me land first to taste the enemy attack if there is’ শত্রুর গুলির স্বাদ নেয়ার জন্য আমাকে প্রথম নামতে দাও, যদি কোনো শত্রু এখনো থেকে থাকে। উনি লাফ দিয়ে নামলেন, ধরুন বলে আমি জেনারেল রবকে ছুড়ে দিলাম, সাথে নামলাম আমি। আমার পেছনে পেছনে অন্যরা লাফিয়ে নামলেন। প্লেনটা আমাদের চোখের সামনে দাউ দাউ আগুনে পুড়ছে।
হঠাৎ গ্রামবাসী এসে ওসমানী সাহেবকে ঘিরে ধরল ‘দুষমন আইছে রে বা দুষমন আইছে, দুষমনরে ধর। পরপরই ভালো করে তাকিয়ে দেখে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল ‘আমাদের, কর্নেল সাব বারে’ এবং তারপর তাকে নিয়ে নাচতে শুরু করল।
জনতার বিজয় উল্লাসে যেন জেনারেল রবের ঘুম ভাঙল, উনি চোখ খুলে তাকালেন দেখলেন আমার মুখে হাসি। জেনারেল রব সবাইকে বলতেন, ডা: জাফরুল্লাহ্ আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছেন। প্লেনে ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত ও শেখ কামালও সামান্য আহত হয়েছিলেন।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কখনো এই ঘটনার তদন্ত প্রকাশ করেননি। ভারত সরকার সবসময় এই ঘটনায় নীরব, মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছেন।

স্বাধীনতার বিজয় উল্লাসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এই দুর্ঘটনার তদন্তের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপলব্ধি বোধ করেননি। সবাই উদ্বিগ্ন, প্রাণপ্রিয় নেতা জীবিত শেখ মুজিবুর দেশে প্রত্যাবর্তনের কামনায়।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫