ঢাকা, মঙ্গলবার,২১ নভেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

ইভটিজিং শাস্তি পায় নিরীহ মেয়েরা

মোহাম্মদ আবু নোমান

২৪ অক্টোবর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৭:০৭ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৯:৪১


প্রিন্ট
ইভটিজিং শাস্তি পায় নিরীহ মেয়েরা

ইভটিজিং শাস্তি পায় নিরীহ মেয়েরা

রাজধানীর চামেলীবাগে স্ত্রীসহ পুলিশের পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান দম্পতির কিশোরী মেয়ে ঐশী জড়িত থাকার অভিযোগ নাড়া দিয়েছিল গোটা দেশকে। ঐশীর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে। সেখানকার নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন তার ভালো লাগেনি। ঐশী ছিল বাবা-মায়ের আদরের মেয়ে। তাই তার সব আবদার পূরণের চেষ্টা করতেন। সাধ্য, সামর্থ্য, নৈতিকতা শিক্ষার কোনো চিন্তা না করে ঐশীকে ধানমণ্ডির অক্সফোর্ড স্কুলে ভর্তি করে দেন বাবা-মা। অক্সফোর্ডে ভর্তি হয়েই পাল্টে যায় কিশোরী ঐশী। বেপরোয়া জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত প্রেম ও ইয়াবার মতো জঘন্য মাদক সেবনে ডুবে যায় সে। মাসে দেড় লাখ টাকার অধিক ছিল ঐশীর হাত খরচ। তাহলে পরিবারটি চলত কত খরচে? বিলাসবহুল ফ্লাটে ভাড়াই জুটত কিভাবে? সরকারি চাকরি করে এত বিলাসিতা কিভাবে সম্ভব?

একজন এসআইয়ের যদি এত বিশাল পরিমাণ মাসিক অবৈধ অর্থের পার্মানেন্ট সোর্স থাকে, তাহলে তার ওপরের যারা কর্তা আছেন, তাদেরও তো নিশ্চয় ভাগ দিয়েই চলতে হয়। নাকি কেউ টেরই পায় না কিছু? এ কথা ঠিক যে, এদের কর্মকাণ্ড তাদের ওপরের অফিসারদের প্রশ্রয় ছাড়া সম্ভব নয়, অন্তত এটা কারোই বুঝতে কষ্ট হয় না। অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন, বেহিসেবী জীবনযাপন কখনোই ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। ঐশী ও আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের পরিবারটিই তার উদাহরণ।


সমাজের ধনিক শ্রেণী বৈধ-অবৈধ পন্থায় টাকা রোজগার এবং ভোগবিলাসেই মত্ত থাকে বেশির ভাগ সময়। সন্তানের চাহিবামাত্র টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড়, দামি মোবাইল, গাড়ি ইত্যাদি কিনে দিয়েই খালাস। অন্ধস্নেহে সন্তানের কোনো ভুলত্রুটি মা-বাবার চোখে ধরা পড়ে না। অভিভাবকেরা এসব ব্যাপারে আগের মতো সচেতন নন, তারা কেবল অর্থের পেছনে ছুটছেন। ধর্ম-কর্ম, নীতি-নৈতিকতা গৌণ হয়ে গেছে। নিজেদের ব্যবসা, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও পদোন্নতির চিন্তায় ব্যস্ত। সন্তানদের সময় দেয়ার সময় নেই, সন্তানও তাই কথা শুনছে না।


রাষ্ট্র ও প্রশাসনসহ বখাটেদের নির্মূলে সব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিষদ, গ্রাম ও মহল্লার সালিশি পরিষদ, শহর-ওয়ার্ড ও পৌর এলাকার পঞ্চায়েত ও ওয়ার্ড কমিশনারদের নেতৃত্বাধীন কমিটি বা পরিষদ বখাটেদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিলে তাদের উৎপাত অচিরেই বন্ধ ও নির্মূল হবে বলে আশা করি। জনতার ঐক্যশক্তি পারে না এমন কোনো অসাধ্য কাজ নেই। তাদের চিহ্নিত করতে হবে সমাজ, রাষ্ট্র থেকে। তাদের শিকড় যত বড়ই হোক না কেন, তা উৎপাটন করতে হবে। শুধু আইনের ভয় ও প্রশাসনের ভূমিকায় বখাটেদের দমন সম্ভব নয়। এর জন্য সামাজিক ঐকমত্যের সাথে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা চালু করতে হবে।


আমরা সভ্যতার মুখোশ পরলেও প্রকৃত অর্থে সভ্য নই। জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে বিশ্ব অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করলেও এখনো কিছু কিছু নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা মানবসমাজকে পীড়া দেয়। এর একটি হচ্ছে ইন্টারনেট, যা সমগ্র পৃথিবীকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। ইন্টারনেটের অনেক ভালো দিক রয়েছে, যা ব্যবহারের ফলে আমাদের জানার পরিধি বেড়ে যায়। কিন্তু এর খারাপ দিক মোটেই উপেক্ষা করার মতো নয়।

পর্নোগ্রাফি তেমনি একটি খারাপ দিক, যা শিশুসহ যুবক-যুবতীদের ঠেলে দিচ্ছে ভয়াবহ বিকৃতির দিকে। অশ্লীল ভিডিও দেখার ফলে একজন তরুণ হয়ে উঠছে যৌন অপরাধী। এতে তরুণ-তরুণীদের স্বাভাবিক কর্মতৎপরতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এ পরিস্থিতি আমাদের দেশের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, আমাদের সমাজ কাঠামোর জন্য ভয়াবহ অভিশাপ ও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


ল্যাপটপ বা কম্পিউটার নিয়ে আমাদের ছেলে-মেয়েদের গভীর মনোনিবেশ দেখে মনে হতেই পারে ওরা প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে। জ্ঞান অন্বেষণ করছে। যা খুবই ভালো দিক। প্রযুক্তি সুফলের পাশাপাশি কুফল যে কত মারাত্মক যার প্রমাণ মেলে একটু গভীরভাবে ওইসব ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও মোবাইলের ওপর চোখ রাখলে। ভাবলেও শিউরে উঠতে হবে। সব পর্দায় ভাসছে পর্নোগ্রাফি। একবার ভেবে দেখেছেন আপনার ছোট্ট সোনামণি ছেলে অথবা মেয়েটি মোবাইলে অনলাইন গেম খেলছে, এমন সময় তার মোবাইল স্ক্রিনে পর্নোসাইটের লিংক বা নোংরা ছবি চলে এলে আপনার কেমন লাগবে?


সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে পিতা-মাতাকে। আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা বখাটেপনার জন্য দায়ী। নারীদেরও উচিত পোশাকে রক্ষণশীল হওয়া। এখন ফ্যাশনের নামে মেয়েদের পুরুষদের মতো প্যান্ট-শার্ট, গেঞ্জি, টি-শার্ট পরানো হচ্ছে এবং মেয়েদের পোশাক থেকে ওড়না দূর করে দেয়া হয়েছে, যা তাদের বুক ঢাকার জন্য ব্যবহার করা উচিত ছিল। নিজেদের রূপ সৌন্দর্য উজাড় করে প্রদর্শনের জন্য রাস্তায় নেমে আসে।

উঠতি মেয়েরা রূপান্তরিত হয়ে জৈবিক কামনা ও যৌনতার খোরাকে রূপ নেয়। নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে আজ শুধু পণ্য নয়, পণ্যের পণ্য করা হচ্ছে। নারীকে মডেল, ভোগ্যপণ্য, কলগার্লের সাথে আপনহারা-বাঁধনহারা করার প্রচেষ্টা চলছে। পুঁজিবাদীরা পণ্য বিক্রি ও ব্যবসায় জৌলুশ বৃদ্ধির জন্য নারীদের অনুগত পুতুল বানাচ্ছে। পারিবারিক বন্ধনকে ধ্বংস করে দিয়ে তারা নারীদের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ক্রেতা আকৃষ্ট করার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলছে। শুধু স্মার্ট ও সুন্দরী নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিয়োগের আবেদন করা হয়। বিশেষত নারীকে পণ্য করে বাজারে তোলার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে এটাও নারী নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ, নারী ধর্ষণ, নারীর শ্লীলতাহানির অন্যতম কারণ।

দেখা যায়, একটি টুথপেস্ট, গামছা বা লুঙ্গির বিজ্ঞাপনেও নারীকে খোলামেলাভাবে নাচানো হয়। পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে ব্যবহার, ইন্টারনেট ও গণমাধ্যমে নারীকে যৌন আবেদনময়ী করে উপস্থাপন নারীর যৌন হয়রানিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫