ঢাকা, সোমবার,১১ ডিসেম্বর ২০১৭

মতামত

বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলা

মোহাম্মদ আবু তাহের

২৩ অক্টোবর ২০১৭,সোমবার, ১৯:৩৭


প্রিন্ট

দৈনিক শুভ প্রতিদিনের ১৯ সেপ্টেম্বরের প্রকাশিত একটি সংবাদ শিরোনাম হলো ‘তিন ছেলে পুলিশ অফিসার মা করেন ভিক্ষা’ এখানেই শেষ নয়, মেয়েও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। অথচ তাদের গর্ভধারিণী মা দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করছেন। জানা যায়, বর্তমানে তিনি এতটাই মানবেতর জীবনযাপন করছেন যে দিনে একবেলাও ভাত জুটছে না তার। ঘটনাটি বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলা ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামের মৃত আইয়ুব আলী সরদারের স্ত্রী মনোয়ারা বেগমের। তার বয়স ৭০ বছর। আইয়ুব আলী মনোয়ারা দম্পতির ছয় সন্তানের মধ্যে তিন ছেলে ফারুক হোসেন, নেছার ও জসিম উদ্দিন পুলিশে কর্মরত আছেন। মেয়ে মরিয়ম সুলতানা শিক্ষকতায় নিয়োজিত। অন্য দুই সন্তান শাহাব উদ্দিন ব্যবসা এবং গিয়াস উদ্দিন নিজের ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের মা’কে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে। মনোয়ারা বেগম স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না। চার-পাঁচ মাস আগে ভিক্ষা করতে যেয়ে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছে। সেই থেকে বাবুগঞ্জের স্টিল মিলের পাশে একটি খুপরি ঘরে বিনা চিকিৎসায় দিনাতিপাত করছেন। মনোয়ারা বেগমের ছেলে ইজিবাইকচালক গিয়াস উদ্দিন জানান, আমার সাধ্যমতো আমার মাকে চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করছি। আমি অসহায় সম্বলহীন, তাই বৃদ্ধ মা আজ বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুপথযাত্রী। আমার ভাইয়েরা পুলিশ বিভাগে চাকরি করে। তারা তাদের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যত্র থাকে, মায়ের কোনো খোঁজখবর নেয় না। 

বেশ কিছু দিন আগে মোহাম্মদ শাহেদ নামে একজন ব্যবসায়ীর ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে এক হতভাগ্য পিতার কথাও জানা গিয়েছিল। ভদ্রলোক ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। পুত্র-কন্যাদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছিলেন। ঢাকার উত্তরায় ছিল তার পাঁচতলা বাড়ি; কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সে বাড়িতে তার ঠাঁই হয়নি। অসুস্থ এই বৃদ্ধ মানুষটি কখনো ফুটপাথে, কখনো মসজিদের বারান্দায় রাত কাটাতেন। অসুস্থ এই বৃদ্ধকে এনে ভর্তি করালেন উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে, ওই হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ শাহেদ। বৃদ্ধের কাছ থেকে জেনে নিলেন তার পরিচয়, ছেলেমেয়েদের ঠিকানা। শাহেদ সাহেব তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু বৃদ্ধের প্রতিষ্ঠিত অকৃতজ্ঞ সন্তান সাড়া দিলো না। কিছু দিন পরে বৃদ্ধ মারা গেলেন। মোহাম্মদ শাহেদ আবারো যোগাযোগ করেন বৃদ্ধের পুত্রের সঙ্গে। জানালেন পিতার মৃত্যুর সংবাদ, বললেন পিতার লাশ দাফনের ব্যবস্থা করতে, ব্যবসায়ের কাজে অতি ব্যস্ত পুত্র জানালো, আসা সম্ভব নয়। তাহলে পিতার লাশের কী হবে জানতে চাইলে বললো লাশটা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে দিয়ে দিতে। শাহেদ লাশটি আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কাছে না দিয়ে পরম মমতায় নিজেই দাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন। শাহেদের মতো মানুষ এ সমাজে যত বেশি হবে, এ সমাজ ও দেশ ততই এগিয়ে যাবে।

বর্তমান সরকার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১১ প্রণয়ন করেছে। এ আইন প্রণয়ন সরকারের নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে মনে করি। ‘ভরণ-পোষণ’ অর্থ খাওয়াদাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সুবিধা এবং আইন অনুযায়ী বিধানাবলি নিম্নরূপ-

ধারা ০৩ মতে:
১. প্রত্যেক সন্তানকে তাহার পিতামাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করিতে হইবে। ২. কোন পিতামাতার একাধিক সন্তান থাকিলে সেইক্ষেত্রে সন্তানগণ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করিয়া তাহাদের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করিবে। ৩. কোন সন্তান তাহার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তাহার বা ক্ষেত্রমত তাহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন বৃদ্ধনিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদা আলাদাভাবে বসবাস করিতে বাধ্য করিবে না। ৪. প্রত্যেক সন্তান তাহার পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখিবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করিবে। ৫. প্রত্যেক সন্তান তাহার পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখিবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করিবে, সেবা ও পরিচর্যা করিবে। ৬. পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তান হইতে পৃথকভাবে বসবাস করিলে, সেইক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিতভাবে তাহার বা ক্ষেত্রমত তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে হইবে। ৭. কোন পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তানদের সহিত বসবাস না করিয়া পৃথকভাবে বসবাস করিলে, সেইক্ষেত্রে উক্ত পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তাহার দৈনন্দিন আয়-রোজগার বা ক্ষেত্রমত মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয়ের কমপক্ষে ১০% আয় পিতা বা মাতাকে নিয়মিত প্রদান করিবে।

ধারা ০৪ মতে
০১. পিতামাতার অবর্তমানে দাদা-দাদী, নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রত্যেক সন্তান তাহার (ক) পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদীকে এবং (খ) মাতার অবর্তমানে নানা-নানীকে, ধারা ০৩ এ বর্ণিত ভরণ-পোষণে বাধ্য থাকিবে এবং ভরণ-পোষণ পিতামাতার ভরণ-পোষণ হিসাবে গণ্য হইবে।

ধারা ০৫ অনুসারে :
০১. কোন সন্তান কর্তৃক ধারা ০৩ এর যেকোন উপধারার বিধান কিংবা ধারা ৪ এর বিধান লংঘন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ০৫ (পাঁচ লক্ষ) টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবে বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ছয় মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবে। ০২. কোন সন্তানের স্ত্রী বা ক্ষেত্রমত স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোন নিকটআত্মীয় ব্যক্তি (ক) পিতা-মাতার ভরণ-পোষণে বাধা প্রদান করিলে বা (খ) পিতা-মাতার ভরণ-পোষণে অসহযোগিতা করিলে, তিনি এই আইনের অধীনে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করিয়াছে গণ্যে উপধারা (১) এ উল্লিখিত দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।
এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলার অবসান ঘটত বলেই আমার বিশ্বাস। 

লেখক : ব্যাংকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫