ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

নারী

যে মেয়েটা রোজ রাতে, বদলায় হাতে হাতে

আব্দুর রাজ্জাক ঘিওর, মানিকগঞ্জ

২২ অক্টোবর ২০১৭,রবিবার, ১৭:৪৪ | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০১৭,সোমবার, ০৭:০৪


প্রিন্ট
যে মেয়েটা রোজ রাতে, বদলায় হাতে হাতে

যে মেয়েটা রোজ রাতে, বদলায় হাতে হাতে

দিনের আলো নিভে গেল; রাত নেমেছে। আস্তে আস্তে অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে চার পাশ। ছুটে চলা গাড়ির হর্ন আর রেলের ঝিকঝিক ছন্দে গন্তব্যে যাচ্ছে ক্লান্ত মানুষেরা। শুধু ক্লান্তি নেই এই জনপদের বাসিন্দাদের। এখানে রাত নামে না, নামে হাজারো স্বপ্নের কফিন। হাজারো দীর্ঘশ্বাসের দেহপসরার বিকিকিনি। ব্যস্ত তারা পসরা আকর্ষণীয় সস্তা মেকাপের প্রলেপে। প্রেমহীন এই জনপদের সবাই ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। 

এই জগতের বাসিন্দাদের কোনো ভেদাভেদ নেই। তারা টাকার বিনিময়ে নতুন করে বাসর সাজায়। সোহাগ বিক্রি করে। সমাজ যাকে ডাকে পতিতা বলে। রোজ রাতে হাতে হাতে বদল হওয়া এমনি একজন স্বপ্না (ছদ্মনাম)। বয়স আর কত হবে? ২০-২২। অভাবের তাড়নায় ১৫ বছর বয়সে এক গার্মেন্টে কাজ শুরু করেন। সেই বেতনের টাকাতে অনেক কষ্টে চলত তার আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবন। একমাত্র ভাই ভিটেবাড়ি বিক্রি করে ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বিদেশ পাড়ি জমায়। কিন্তু তার আর কোনো খোঁজ পায়নি তার পরিবার। বাধ্য হয়েই সংসারের হাল ধরতে হলো মেয়েটিকে। এলাকার এক আপা গার্মেন্টে চাকরি করত। তার সাথেই গার্মেন্টে চাকরিতে যোগ দেয় স্বপ্না। বছরখানেক পরে ভালো বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে এক দালাল তাকে ধরে এনে বিক্রি করে দেয় দৌলতদিয়ার এই পতিতালয়ে। এর পর থেকেই সে অন্ধকার জগতের বাসিন্দা। এভাবেই কেটে যাচ্ছে তার জীবন নামের রেলগাড়িটা।

নারী পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে টাঙ্গাইলের এক পতিতালয়ে বিক্রি হওয়া একজন কিশোরী রানী (ছদ্মনাম)। জন্মের পর বাবা-মা আদর করে একটি নাম রাখলেও সেটি হারিয়ে গিয়েছিল নারী পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে। পতিতালয়ে ওকে দেয়া হয়েছিল এই রানী নামটিই। প্রায় ছয় মাস এই পতিতালয়ের চার দেয়ালের মাঝে প্রতিদিন ভোগের পণ্য হয়ে বন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। অবশেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অদম্য বাসনায় মুক্তি মিলেছে তার। সম্প্রতি স্থানীয় সাংবাদিকের হস্তক্ষেপে অভিভাবকদের হাত ধরে তিনি ফিরে গেছেন তার আপন ঠিকানায়। তার পিতা নিশ্চিত করেছেন তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা। তবে তার জীবনে আবার স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে কি না এটিই সময়ের প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

রানীদের মতো আরো শত শত মেয়ে এখনো প্রতিদিন বোবাকান্না করে যাচ্ছেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে। পতিতালয়ের চার দেয়ালে বন্দী ওদের কান্না শোনার মতো যেন কেউ নেই। মুক্তির পর রানীর জবানবন্দীতে জানা গেছে এসব তথ্য।
রানীর ভাষ্য মতে, মোবাইল ফোনে পরিচয়, প্রেম; অতঃপর বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে সাভারের আশুলিয়া এলাকায় সংসার পাতেন রানী। ছেলেটির বাড়ি টাঙ্গাইল সদরে, শুধু এটুকুই জানতেন রানী। বিয়ের সপ্তাহখানেক পরে তার স্বামী বলে তাদের বিয়ে তার পরিবার মেনে নিয়েছে। তাই আজ রাতেই তারা টাঙ্গাইল যাবে। খবরটি শুনে আনন্দে রানীর চোখে জল এসে যায়। কারণ প্রতিটি নারীই চান তার স্বামী, শ্বশুরবাড়ি আর সংসার নিয়ে সুখে থাকতে। তার স্বামী আর তার এক বন্ধু মিলে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে তারা রওনা হয়, রাত গভীর হয়ে আসে, গাড়ির ঝাঁকুনিতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আসে রানী। টাঙ্গাইল ঠিকই গেলেন রানী কিন্তু শ্বশুরবাড়ি নয়; পতিতালয়ে। পতিতালয়ের সর্দারনীর কাছে বিক্রি করা হয় এক লাখ টাকায়। এরপর চলে ভয়ভীতি দেখিয়ে পোষ মানানোর প্রক্রিয়া।
রানীর মতো এমন অনেক কিশোরীর বুকভরা ভালোবাসার সলিল সমাধি হয় প্রতি রাতে। নারীপাচারকারী, দালাল ও পতিতা সর্দারনীদের ভয়ভীতির মুখে তারা কাউকে সহজে জানাতেও সাহস পান না তাদের বন্দিদশার কথা। রোজ রাতে হাতে হাতে বদলায়।

এখানে নারীরা দুর্বল, আবার কেউ কেউ ক্ষমতাধর। সবচেয়ে খারাপ সময় কাটে যখন প্রথম তারা এখানে প্রবেশ করেন। অনেকেই আসে নারী পাচারচক্রের মাধ্যমে, যাদের বিক্রি করে দেয়া হয় পতিতালয়ের কোনো এক সর্দারনির কাছে। নতুন আসা বেশির ভাগেরই বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছর। পাচারচক্র সর্দারনির কাছ থেকে নেয়া টাকাটা সর্দারনিকে শোধ করে দেয়ার আগে তাদের কাজের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। আর বাইরে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই তাদের। সুযোগ নেই খদ্দের বাছাইয়ের।

আরেক কিশোরী শেফালী (ছদ্মনাম)। তার মতো অনেক মেয়ের স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর বয়স হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে, ফাঁদে পা ফেলে তারা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে অন্ধকার গলির পথ। পরিণত বয়স না হলেও তাদেরকে ‘মাসিরা’ রাতারাতি বড় করে তুলছে গরু মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত ওষুধ খাইয়ে। এর ফলে খুব দ্রুত শেফালীদের শরীরের বৃদ্ধি ঘটে। দিন-রাতে তাদেরকে প্রায় ১০ জন খদ্দেরকে সামাল দিতে হয়। কখনো তারও বেশি। প্রতিজন খদ্দের থেকে তারা আয় করে প্রায় ১০০ থেকে ৫০০ টাকা। এ পেশা থেকে তাদের বেরিয়ে আসায় মানা নেই। কিন্তু সমাজ ও পরিবার তাদেরকে মেনে নিতে চায় না। ফলে অন্ধকারেই জীবন কেটে যায় তাদের।

কোনো মেয়েই খারাপ হয়ে জন্মায় না। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা, পক্ষপাতদুষ্ট সামাজিক নিয়ম, পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব ইত্যাদি পরিস্থিতির স্বীকার হয়েই একটা মেয়ে বেছে নিতে বাধ্য হয় এই ঘৃণিত জীবন। এটা কোনো মেয়েরই কাম্য জীবন নয়।
একটা মেয়ের পতিতা হয়ে উঠার পেছনের কাহিনী যাই হোক এটা ঠিক যে, কোনো মেয়েই স্বেচ্ছায় পতিতার জীবন বেছে নেয় না। কিন্তু প্রায় সব সময়ই যে বা যারা এই মেয়েটিকে অন্ধকার জীবনে ঠেলে দিচ্ছে তারা রহস্যময়ভাবে থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে পুরুষটি তাকে ব্যবহারের মাধ্যমে পতিতার সিলমোহর লাগিয়ে দিচ্ছে সে-ও সমাজের বুকে কোনো নারীর সন্তান, ভাই, স্বামী বা বাবা হিসেবে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫