ঢাকা, মঙ্গলবার,২১ নভেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

ক্যামেরা সমাচার

মীর মোহাম্মদ ফারুক

২১ অক্টোবর ২০১৭,শনিবার, ১৬:৫০


প্রিন্ট

টেলিভিশন সাংবাদিকের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট হলো ভিডিও ক্যামেরা। এটা সব সময়ই সাথে রাখতে হয়। বিশেষ করে মফস্বলে কর্মরত টেলিভিশন সাংবাদিকদের। মুফতি হান্নানের মামলার আপডেট নিয়ে নিউজ করতে সেদিন সকালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে ছবি তুলছিলাম। হঠাৎ আমার ক্যামেরাটি নষ্ট হয়ে গেল। সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলার ঘটনায় মুফতি হান্নানকে দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রিভিউ পিটিশন উচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে গেছে। এখন রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাওয়া আর ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে পড়া হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানের সামনে- এ দুটো কাজই বাকি। সমগ্র বাঙালি জাতি মুফতি হান্নানের মৃত্যুদণ্ডের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। এ মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ইস্যুই মুফতি হান্নান। প্রতিদিনই এ সম্পর্কে রিপোর্ট করতে হবে। এ অবস্থায় ক্যামেরা নষ্ট হওয়া মানে টেলিভিশনে কর্মরত মফস্বলের সাংবাদিক হিসেবে আমি একদম পচা কাঁঠাল।

বাধ্য হয়ে বৃহস্পতিবার সকালে ক্যামেরা মেরামত করতে ছুটলাম রাজধানীর বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম মার্কেটে। বন্ধন ইলেকট্রনিকসের মালিক ও রিপেয়ারার বিপ্লব কুমার প্রামাণিক ওরফে বাবু সারা দেশের টেলিভিশন সাংবাদিকদের পরিচিত মুখ। সবাই তাকে বাবু ভাই নামেই চেনে। প্রিন্সসহ আরো দু-একজন রিপেয়ারার আছে স্টেডিয়াম মার্কেটে। হাতযশের কারণে বাবুর পরিচিতিই বেশি।
প্রথমে হেলপার ক্যামেরা নাটবল্টুসহ খুলে ফেলল। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখল টেবিলের ওপর। যেন অপারেশন থিয়েটারে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে রোগীকে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে ব্যস্ত সার্জনের অপেক্ষায়। বিখ্যাত বাবু ভাই দোকানে এলেন পৌনে ১১টার দিকে। বাবু একবার ঝালাই দেন তো একবার গরম হাওয়া দেন। এটা বদলান, ওটা খুলে নেন। স্পিরিট দেন আর তুলা দিয়ে মোছেন। এভাবেই চলল ৫-৬ ঘণ্টা। মেরামত করতে পারলেন না তিনিও। অবশেষে বিকেল ৪টার দিকে বাবু জানালেন, মেরামত করতে আট হাজার টাকা খরচ করতে হবে। তদুপরি ক্যামেরা রেখে যেতে হবে এক সপ্তাহের জন্য। কিন্তু কত দিন টিকবে, সেটা নিশ্চিত নয়। এ ধরনের ঘটনায় আমার বাজে অভিজ্ঞতা রয়েছে। ক্যামেরা ১০০ ভাগ রিপেয়ার হয় না। এক দিক মেরামত হলে আরেক দিক নষ্ট হয়ে যায় বা নষ্ট করে দেয়া হয়।

যানজটের শহরে বারবার স্টেডিয়াম মার্কেটে দৌড়াতে দৌড়াতে সাংবাদিকের হয় বেদিশা অবস্থা। এর চেয়ে খারাপ পরিস্থিতিও হয় অনেক সময়। রেখে যাওয়া ক্যামেরা আর কখনোই ফেরত পাওয়া যায় না। তখন বাধ্য হয়ে রিপেয়ারারকে আমি ক্যামেরা বিক্রির প্রস্তাব দিলে তিনি সাত হাজার টাকা দিতে চাইলেন। দর কষাকষিতেও লাভ হলো না। ৫০ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা ক্যামেরা প্রায় আড়াই বছর বিশ্বস্ততার সাথে সার্ভিস দিয়েছে। ওটা বিক্রি করতে কষ্ট হচ্ছিল। অবশেষে সাত হাজার টাকায়ই বিক্রি করে দিলাম আমার প্রিয় ক্যামেরাটি।

এবার ক্যামেরা কেনার পালা। ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিং মল আর বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটেই মূলত ভিডিও ক্যামেরার দোকান বেশি। বর্তমানে দেশে যে ২৪-২৫টি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে, তাদের সবগুলোতেই HD ক্যামেরা ব্যবহার হয়। HD ক্যামেরার মধ্যে আমাদের দেশে SONY ও PANASONIC কোম্পানির ক্যামেরা বেশি প্রচলিত।

ঢুকলাম বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটে পূর্বপরিচিত ক্যামেরার দোকান সোহেল ইলেকট্রনিকসে। দোকানির নাম প্রদীপ কুমার বসাক। এক যুগ আগে যেমন দেখেছিলাম, এখনো ঠিক তেমনি আছেন। কাঁচাপাকা চুল, আদি ঢাকাইয়া বেঁটেখাটো মানুষটি চলন-বলনেও ঠিক আগের মতোই। ২০০৫ সালে টেলিভিশন সাংবাদিকতার হাতেখড়ি নেয়ার সময় যে ক্যামেরা কিনেছিলাম, সেটাও এই দোকান থেকেই কেনা। ফজলুল হক মোড়ল ভাইকে সাথে নিয়ে ২৫ হাজার টাকায় জাপানি PANASONIC ক্যামেরা কিনেছিলাম। তারপর কত ক্যামেরা কিনলাম আর রিপেয়ার করালাম তার ইয়ত্তা নেই। ক্যামেরা কিনে নেয়ার পর এক মাসও ব্যবহার করতে পারিনি, সে অভিজ্ঞতাও আছে। সে আমলে ক্যামেরায় মিনি ডিবি ক্যাসেট ব্যবহার হতো।

২০১১-১২ সালের দিকে বাজারে আসে আধুনিক মেমোরি কার্ড সিস্টেম ক্যামেরা। ২০১০-১১ সালের দিকে সিডি সিস্টেমের ক্যামেরা বাজারের এসেছিল। অবশ্য টেলিভিশন সাংবাদিকেরা সিডি সিস্টেম ওই ক্যামেরাগুলো ব্যবহার করেননি। ২০০৯-১০ সাল পর্যন্ত ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে টিভি স্টেশনে ক্যাসেট পাঠাতে হতো। সে সময়ের কষ্টের কথা বললে এ যুগের সাংবাদিকেরা কেউ বিশ্বাস করবেন না। দিনে পাঁচটি ঘটনা ঘটলে পাঁচবার পাঁচটি ক্যাসেট নিয়ে ঢাকায় দৌড়াতে হতো। তারপর ডাটা ট্রান্সফারের পদ্ধতি বের হলো। ডাটা ক্যাবল ব্যবহার করে ক্যাসেট টু ক্যাসেট ফুটেজ কপি করার পদ্ধতি চালু হলো। একটা করে নতুন টেলিভিশন চালু হওয়ার সাথে সাথে যোগাযোগের একেকটা নতুন দিগন্ত আমাদের সামনে উন্মোচন হয়। এখন তো ই-মেইল, এফটিপি, আপলোডসহ নানা উপায়ে ভিডিও ফুটেজ টেলিভিশনে পাঠানো যায়। সর্বশেষ চালু হয়েছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পাঠানো ফুটেজ সরাসরি সম্প্রচার করা।

সোহেল ইলেকট্রনিকস থেকেই ৪৫ হাজার টাকায় কিনে ফেললাম SONY XR 500 হ্যান্ডিক্যাম HD ক্যামেরা। নানা কসরত করে সাথে মেমোরি কার্ড, ফ্লাশ গান, বেল্ট পাওয়া গেল। আমার ৩২ জিবি প্রয়োজন হলেও পাওয়া গেল TOSHIBA ১৬জিবি মেমোরি কার্ড। বায়তুল মোকাররম মসজিদের মাইকে তখন মাগরিবের আজান হচ্ছে। গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হতে প্রায় ৭টা বেজে গেল। নতুন পণ্য ক্রয়ের পর বারবার দেখতে হয়। গাড়িতে বসে ক্যামেরা অন করলাম। যাহ! ক্যামেরা মেমোরি কার্ড এক্সেপ্ট করে না। আবার দোকানে ছুট লাগাতে হলো। দোকানি প্রদীপ বাবু কায়দা করে ২জিবি মেমোরি কার্ডটিই গছিয়ে দিলেন। তার মানে হলো, মেমোরি কার্ড কেনার জন্য বায়তুল মোকাররমে আবার আসতে হবে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার কোনো জেলার সাংবাদিকেরা ক্যামেরা নিয়ে কতটা ভোগান্তি পোহায় ভাবা যায়?

ক্যামেরা বা ইলেকট্রনিকস যেকোনো সামগ্রীই কিনতে চান, দোকানদারের ঈমান আর নিজের ভাগ্যের ওপর ভরসা করেছেন তো ঠকেছেন। ক্যামেরা ব্যবহার করেন, এমন একজন অভিজ্ঞ মানুষকে সাথে নিয়ে যেতে হবে ক্যামেরা কেনার সময়। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক।

সাংবাদিক, বিশ্ব ভ্রমণকারী ও স্কাউটার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫