ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

প্রাণি ও উদ্ভিদ

সুন্দরবন এলাকায় ডলফিন বিপন্ন

এরশাদ আলী খুলনা ব্যুরো

২০ অক্টোবর ২০১৭,শুক্রবার, ০৬:২৪


প্রিন্ট
সুন্দরবন সংলগ্ন নদীতে মোহনীয় ভঙ্গিতে ডলফিন

সুন্দরবন সংলগ্ন নদীতে মোহনীয় ভঙ্গিতে ডলফিন

‘ডলফিন’ শব্দটি শুনলেই নদী ও সাগরের এক মনোরম প্রাণীর নাম সবার চোখে ভেসে ওঠে। পানিতে প্রাণবন্ত ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন করে মানুষের মন ভরিয়ে তোলায় যেমন তার নাম আছে, তেমনি সাগরে বিপদগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করার নজিরও তাদের রয়েছে। বাংলাদেশের নদনদীতেও ডলফিনের বিচরণ রয়েছে। এখানে তারা শুশুক, শোষ প্রভৃতি নামে পরিচিত।

আমাদের সুন্দরবনের নদীগুলোতেও ইরাবতি ও গঙ্গার ডলফিন নামে সুন্দর দুই প্রজাতির ডলফিন যথেষ্ট সংখ্যায় রয়েছে। ইদানীং বেশ কিছু কারণে সুন্দরবন এলাকায় ডলফিনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। ডলফিন এবং একই প্রজাতির প্রাণী তিমি সংরক্ষণে সরকারিভাবে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা ও শিকার নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন হয়েছে। সেই সাথে সুন্দরবন এলাকায় ডলফিনসহ এগারো ধরনের জলজ প্রাণী রক্ষায় তাদের জন্য সংরক্ষিত এলাকা আরো সম্প্রসারণে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইউএনডিপির সহযোগিতায় বন বিভাগ ‘গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য রক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ’ নামের এ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা।


বন বিভাগ সূত্র জানায়, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের নদ-নদীতে ইরাবতি ও গাঙ্গেয় ডলফিনসহ মিষ্টি পানির ১১ প্রজাতির জলজ প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। এর মধ্যে ডলফিন আছে সাত প্রজাতির, তিমি তিন প্রজাতির ও ডলফিন গোত্রীয় প্রাণী এক প্রজাতির। সুন্দরবনের নদ-নদী ইরাবতি ও গাঙ্গেয় ডলফিনের বিচরণের জন্য বেশ সহায়ক। কিন্তু বর্তমানে সুন্দরবন এলাকায় তারা বিলুপ্তির হুমকির মুখে পড়েছে।


সুন্দরবন বন বিভাগ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সুন্দরবনে ডলফিন বিলুপ্তির জন্য প্রাথমিকভাবে কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সুন্দরবনের নদ-নদীতে চলাচলরত নৌযানের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত পর্যটনের কারণে ক্রমবর্ধমান পর্যটক সংখ্যা, তাদের ব্যবহৃত বর্জ্য দ্রব্য নদীতে নিক্ষেপ ও বিভিন্ন জলযানের তেল নিঃসরণের কারণে পানিদূষণ, মৎস্য শিকারিদের মাত্রাতিরিক্ত সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, মাছ শিকারের জন্য নদ-নদীতে বিষ প্রয়োগ ও জালের ব্যবহার এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পদ্ধতি প্রয়োগ।
বন বিভাগ সূত্র মতে, সুন্দরবনের চাঁদপাই, দুধমুখী ও ঢাংমারী এলাকায় সবচেয়ে বেশি ডলফিন বিচরণ করে। এ তিনটি স্থানকে ডলফিন হটস্পট বলা হয়। কিন্তু সুন্দরবনের এই তিনটি এলাকাতেই নৌযান চলাচল বেশি করে থাকে। সুন্দরবনে বর্তমানে বড় বড় জাহাজসহ ১৭ ধরনের নৌযান চলাচল করে। এ সব যানবাহনের মধ্যে ৯৫ শতাংশই চলাচল করে ডলফিনের উপরোক্ত তিনটি হটস্পট দিয়ে। এমনকি গত বছর শেলা নদীতে একটি তেলবাহী জাহাজ ডুবির যে ঘটনাটি ঘটে সেটি ছিল ডলফিন হটস্পটের একবারে মাঝখানে।


বন বিভাগ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, সুন্দরবনের নদ-নদী থেকে যদি ডলফিনের বিচরণের জন্য ক্ষতিকর কারণসমূহ দূর করা না যায়, তাহলে এসব জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বর্তমানে গাঙ্গেয় ডলফিনের অস্তিত্ব ঝুঁকিপূর্ণ ও ইরাবতি ডলফিনের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ডলফিনের জন্য মোট ছয়টি সংরক্ষিত এলাকা ও তিমি শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ২০১২ সালে প্রণীত আইন অনুযায়ী কেউ ডলফিন অথবা তিমি শিকার করলে তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেয়া হবে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে।


বর্তমানে সুন্দরবনে ১০.০৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ডলফিনের জন্য তিনটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। সরকার ডলফিন রক্ষায় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এটির নাম দেয়া হয়েছে, ‘গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য রক্ষিত এলাকা সম্প্রসারণ’ প্রকল্প। গৃহীত প্রকল্পের আওতায় সংরক্ষিত এলাকার আয়তন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ডলফিনের আশ্রয়কেন্দ্রের ‘ডেটাবেজ’ তৈরি এবং সুন্দরবন সন্নিহিত এলাকার মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করারও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।


এটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৮৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা। অর্থায়ন করছে গ্লোবাল এনভারেন্টমেন্টাল ফ্যাসিলিটি। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বন বিভাগ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং এসব প্রাণীর বিলুপ্তি রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের জুলাইতে প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হলেও এর মূল কার্যক্রম শুরু হয় গত ১৭ অক্টোবর থেকে। এদিন খুলনা মহানগরীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো: লোকমান হোসেন মিয়া। প্রকল্পে জনবল নিয়োগ সম্পন্ন করে কার্যক্রম শুরু করতে প্রকল্পের মেয়াদের ১৩ মাস সময় চলে গেছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫