ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

বিবিধ

বন্যায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে : সিপিডির সংলাপে তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ২০:৪৮


প্রিন্ট

হাওরে আগাম বন্যা ও ৩২ জেলায় মৌসুমী বন্যায় মোট ১৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়াগল (সিডিপি)। হাওরে আগাম বন্যা আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে সময়মত বাঁধ নির্মাণ না করার কারণে সেখানে এধরণের ক্ষতি হয়েছে। অপরদিকে বাকি ৩২ জেলার অনেক বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়। এসব বিষয় উল্লেখ করে সংস্থাটি বলছে, এ হিসাবে হাওর এলাকার বোরো ফসল এবং অন্যান্য বন্যা দুর্গত এলাকার বাড়িঘর, সড়ক, কালভার্ট ও বাঁধের ক্ষতি ধরা হয়েছে। এর বাইরে আরো অনেক ক্ষতি হয়েছে। পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে সেগুলো হিসাবে আনা সম্ভব হয়নি।

তবে এসবের জবাবে পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বাঁধ নির্মাণে কোনো হরিলুট হয়নি। তবে কিছু দুর্নীতি হয়েছে। আর হাওরে বাঁধ ভেঙে নয় অসময়ে বেশি বৃষ্টিপাতের কারণে এমন হয়েছে। আর হাওরে বাঁধ নির্মাণে শত শত কোটি টাকাও বরাদ্দ দেয়া হয় না। মাত্র ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

আজ বৃহস্পতিবার সিপিডি ‘বন্যা ২০১৭ : পরিস্থিতি ও করণীয়’ শীর্ষক এক সংলাপ অনুষ্ঠানে এবছরের ক্ষতির এ চিত্র তুলে ধরে। একইসাথে ত্রাণ, বন্যা পরবর্তী করণীয় নিয়ে সুপারিশ এসেছে সিপিডির পক্ষ থেকে। সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চায়লনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। কৃষি অর্থনীতিবিদ মোঃ আসাদুজ্জামান, পানি বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত, পানি উন্নয়ণ বোর্ডের মহাপরিচালক মাহফুজুর রহমান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক হানিফ মোহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গহর নঈম, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার কৃষক মিয়া হোসেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। রাজধানির সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষক জাফর সাদিক ও ইশতিয়াক বারী।

অনুষ্ঠানের বক্তারা, আগামীতে বন্যা প্রতিরোধে নদী ড্রেজিং করা এবং বাঁধ নির্মাণের পর তার যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি বন্যার ক্ষতি সংস্কারে আগামীতে হরিলুট হওয়ার আশংকাও প্রকাশ করেছেন। যদিও পানি সম্পদ মন্ত্রী বলেছেন, বড়জোর লুট হতে পারে, কিন্তু হরিলুট হবে না। কারণ এসব সংস্কারে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মাত্র ৪২০ কোটি টাকা। এই অর্থ থেকে হরিলুট হওয়ার কিছু নেই। তবে বাঁধ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বন্যায় ক্ষয়-ক্ষতি
সিপিডি হাওরাঞ্চলে মার্চ-এপ্রিলে হওয়া বন্যার ফলে বোরো ফসলের কি ক্ষতি হয়েছে শুধু তা হিসাব করেছে। সিপিডির হিসাবে দেশের উত্তর পহৃর্বাঞ্চলের ছয় জেলায় আগাম বন্যায় ১০ লাখ ৩১ হাজার ৪০৫ পরিবারের ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার ৬২৩ জন মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এতে ১৫ দশমিক আট লাখ টন বোরো ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। যা বোরো ধানের মোট উৎপাদনের আট দশমিক তিন শতাংশ এবং হাওরাঞ্চলের মোট উৎপাদনের ৫২ দশমিক দুই শতাংশ। এ আর্থিক মূল্য পাঁচ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বলে মনে করছে সিপিডি। যা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনের তিন দশমিক সাত শতাংশ। এর পাশাপাশি ৪৬০ হেক্টর জমির শাক সবজি নষ্ট হয়েছে। এ অঞ্চলে ফসলের পাশাপাশি জীবনহানি, ঘরবাড়ি ও পশুসম্পদের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে সড়ক, বাঁধ ও কার্লভার্টের মত অবকাঠামোর।

এদিকে আগস্টের মৌসুমী বন্যায় দেশের ৩২ জেলার ৮২ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। এসব জেলার রোপা আমনের নয় ভাগ জমি বন্যায় তলিয়ে যায়। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। তবে তলিয়ে যাওয়া জমির ৮০ ভাগ পুনরায় রোপন করা গেলে ক্ষতি কমে ৭০০ কোটিতে নামবে। আর ৪০ ভাগ পুনরায় রোপন করা গেলে ক্ষতি হবে ১৮০০ কোটি টাকা। এছাড়া আগস্টের বন্যায় সড়ক, কার্লভাট ও বাঁধের যে ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মূল্য চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বন্যা দুর্গত এলাকায় বাড়িঘরের যে ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক পরিমান দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে আগস্টের বন্যায় চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জিডিপির দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে দশমিক ৪৪ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী, মৎস, পায়খানা, টিউবঅয়েলের কি ক্ষতি হয়ে তা হিসাব করেনি সিপিডি।
সংস্থাটি বলছে, হাওর ও বন্যা দুর্গত অধিকাংশ মানুষকে এখন কিনে খেতে হচ্ছে, এতে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় বাবদ কত ক্ষতি হচ্ছে তাও এ গবেষণায় যোগ করা হয়নি।

এদিকে ত্রাণ তৎপরতা নিয়েও সিপিডর গবেষণা উঠে আসে। গবেষণায় বন্যার্তরা কি পরিমান ত্রাণ পেয়েছে তাও দেখা হয়েছে।

সিপিডি বলছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকলেও মাঠ প্রশাসনের সক্ষমতার অভাবে সকলের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এমনকি দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি। আবার যেসব এলাকায় কম লোক আক্রান্ত হয়েছে সেখানেও ত্রাণ গেছে কম। তবে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সময়মত শুরু হয়েছিল। গবেষণায় বলা হয়, হাওরাঞ্চলের জন্য ত্রাণ হিসেবে চার ৫৪৪ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ থাকলেও তিন হাজার ২৮৭ টন বিতরণ হয়েছে। নগদ টাকার বেলায় একই চিত্র। বরাদ্দ ছিল দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা, সেখানে বিতরণ হয়েছে এক কোটি ৯০ লাখ টাকা। একই অবস্থা মৌসুমী বন্যায় আক্রান্ত ৩২ জেলায়। এসব জেলায় ২৭ হাজার ২০৭ টন চাল বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ হয়েছে ১৭ হাজার ৭২১ টন। আর আট কোটি ৯০ লাখ টাকার মধ্যে বিতরণ হয়েছে পাঁচ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এসব এলাকায় ৩১ হাজার ৯৮০ বান্ডেল টিন বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা করার ক্ষেত্রে পুরানো অভিযোগ এক্ষেত্রে দেখা গেছে বলে অভিযোগ সিপিডির।

সংস্থাটি বলছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ চিহ্নিত হয়নি, আবার একই ব্যক্তি একাধিকবার চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণার উপস্থাপনের পর পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, এবার হঠাৎ করেই হাওরে বন্যা হয়েছে। মাত্র ৫-৬ দিনের ব্যবধানে পানির স্তর সাড়ে চার মিটার বেড়ে গেছে। অন্যদিকে নদীর নাব্যতা কমে গেছে।

তিনি বলেন, বাঁধ ভেঙে পানি হাওরে ঢোকেনি। বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করেছে।

তিনি বলেন, দহৃর্নীতি হয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। অন্যান্য সব জায়গায় যেমন এখানেও তেমন।

তিনি বলেন, পানি নেমে গেলে হাওরে সরেজমিনে গিয়ে সব বাঁধ সংস্কার করা হবে।

তিনি বলেন, হাওরে ফসল বাঁচানোর জন্য কৃষকদের বিআর-২৯ ধানের পরিবর্তে বিআর-২৮ ধান চাষ করার জন্য উদ্ধুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাঁধ নিয়ে হরিলুট হয়নি।

অর্থনীতিবিদ মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, বাঁধ তৈরি বিষয়ে সরকার যত আগ্রহী, বাঁধ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের বিষয়ে ততটা মনোযোগী নয়। ফলে বানরের বাঁশে ওঠার মত দেশও এগিয়ে পুনরায় পিছিয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, এবারের বন্যা পরবর্তীতে সরকারি ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতা ও অব্যবস্থাপনা জোরালো হয়ে উঠেছে। দেশ ডিজিটাল হলেও দুর্যোগের বিষয়ে তা কতটা এগিয়েছে তা দেখা দরকার।

তিনি বলেন, এসডিজি অর্জন করতে হলে দুর্যোগের কারণে দারিদ্র বাড়ে এমন পরিস্থিতি দূর করতে হবে।

আইনুন নিশাত বলেন, বাঁধগুলোর ওপর ব্যাপক অত্যাচার হয়। এখন সময় এসেছে বাঁধ নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়ার।
তিনি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা সংস্কারে হরিলুট হতে পারে আশংকা প্রকাশ করে বলেন, এসব কাজে সংসদ সদস্যদের দূরে রাখতে হবে। তিনি সড়কের সাথে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখারও প্রস্তাব করেন।

সুনামগঞ্জের কৃষক মিয়া হোসেন বলেন, এবছর এত বেশি পানি হয়েছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। নদীগুলোর নাব্যতা হারানোর ফলে হাওর ডুবছে। আগে নদী ৪০ ফুট গভীর ছিল, এখন আছে ২০ ফুট।

তিনি বলেন, সরকার যে ভিজিএফ দিচ্ছে তাতে উপকার হচ্ছে। কিন্তু হাওরবাসী কুলিয়ে উঠতে পারছে না। মানুষ আগামীতে ফসল কিভাবে করবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে।

তিনি বলেন, সরকার পাঁচ কেজি বীজ ধান, এক হাজার টাকা ও ৩০ কেজি সার দেয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে বীজের পরিমাণ বাড়ালে কৃষক উপকৃত হবে। কারণ পাঁচ কেজি বীজে কৃষকের কিছু হবে না।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, বন্যা মোকাবেলায় সমন্বীত পরিকল্পনা জরুরি।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ সবকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, গবেষক ও এনজিও কর্মীরা সংলাপে উপস্থিত ছিলেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫