ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ নভেম্বর ২০১৭

বিবিধ

রাস্তায় সন্তান প্রসব : পারভিনের ধকল যাচ্ছে আয়ার ওপর দিয়ে বাকি সবাই নির্দোষ!

আবু সালেহ আকন

১৯ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০৭:০২


প্রিন্ট
রাস্তায় সন্তান প্রসব

রাস্তায় সন্তান প্রসব

পারভিনের ধকল যাচ্ছে আয়া সাহেদার ওপর দিয়ে। সাহেদাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। কিন্তু যে ডাক্তার ও নার্সরা চিকিৎসা না দিয়ে পারভিনকে হাসপাতাল থেকে বের করে দিলো তদন্তে তাদের কোনো দোষ ধরা পড়েনি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে সেটিও ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। অন্তঃসত্ত্বা অসহায় পারভিনকে কেনো তারা হাসপাতালে ভর্তি করল না তা দেখারও যেন কেউ নেই।


এ দিকে পারভিনের পাশে কেউ নেই। তার কোনো স্বজন নেই, বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাক্সী নেই, এমনকি না খাওয়া অসুস্থ শরীরে তিল তিল করে গর্ভে যে সন্তানটি ধারণ করেছিল সেটিও নেই। এখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই জিম্মায় পারভিন। তারা বলছে, পারভিনের চিকিৎসা চলছে। অথচ ওই হাসপাতালেই এক দিন আগে কোনো চিকিৎসা না পেয়ে পারভিন হাসপাতালের সামনের রাস্তায় সন্তান প্রসব করে। কর্তৃপক্ষ বলছে, সুস্থ হয়ে উঠলে পুলিশের মাধ্যমে তাকে আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। গতকাল সাংবাদিকদের পারভিনের সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি।


হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, রক্তশূন্যতা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছে পারভিন। গত মঙ্গলবার তিন হাসপাতালে ঘুরেও সেবা না পেয়ে রাস্তায় সন্তান প্রসব করে পারভীন নামের এই কিশোরী মা। প্রসবের পর শিশুটি মারা যায়। তখন প্রত্যক্ষদর্শী পথচারীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এরপরই বাধ্য হয়ে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ পারভিনকে সেখানে ভর্তি করে। সেখানকার চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, পারভীনের রক্তে হিমোগ্লোবিন কম। তাকে রক্ত দিতে হবে। তা ছাড়া, সে তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পারত না। তাই শারীরিক দুর্বলতাও দেখা দিয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পর তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হবে।


এ দিকে পারভীনকে ভর্তি না নেয়ায় ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষের গঠন করা তদন্ত কমিটির তদন্তে এক আয়ার সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ও হাসপাতালটির সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা: রওশন হোসনে জাহান প্রতিবেদনটি তত্ত্বাবধায়ক ডা: ইশরাত জাহানের কাছে জমা দিয়েছেন। ইশরাত জাহান তা পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে পাঠান। প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী, ওই হাসপাতালের আয়া সাহেদাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের পরিচালক (এস সি এইচ সার্ভিসেস) ডা: মোহাম্মদ শরীফ।


তিনি বলেন, হাসপাতালের বাইরে কিছু দালাল আছে জানতাম। কিন্তু তারা যে ভেতরেও দালাল ঢুকিয়ে দিয়েছে তা জানতাম না। সাহেদা হয়তো ওই রোগীকে কিনিকে নিতে চেয়েছিল। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, তাকে (পারভীন)-কে ক্ষতিপূরণ দেবে? সরকার যদি দেয় দেবে! তবে পারভিনকে যে হাসপাতালে নিয়ে ছুটোছুটি করেছেন সেই সোহেলের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেছেন, পারভিনকে তিনি চিনতেন না। গত সোমবার রাতে পারভিনের প্রসব বেদনা উঠলে তার পা জড়িয়ে ধরে তাকে ভাই ডাকে। পারভিন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললে সে পারভিনকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সেখান থেকে মিটফোর্ড হাসপাতাল ও পরে আজিমপুর মাতৃসদনে নিয়ে যায়। প্রতিটি হাসপাতাল থেকে তাদের প্রত্যাখ্যান করা হয়। মাতৃসদন থেকে তাদের টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় নামিয়ে দেয়।


ম্যাটারনিটির তত্ত্বাবধায়ক ডা: ইশরাত জাহান জানান, পারভীন এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়। সরকারিভাবে তার চিকিৎসা চলছে। আশা করছি, দুই-একদিনের মধ্যে তাকে ছেড়ে দেয়া যাবে। তিনি বলেন, ওই নারীর কোনো আত্মীয়স্বজনের খোঁজ গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমরা কার কাছে তাকে হস্তান্তর করব তাও বুঝতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে লালবাগ থানার ওসির সাথে কথা হয়েছে। পারভীন সুস্থ হওয়ার পর পুলিশের উপস্থিতিতে তাকে রিলিজ দেয়া হবে। যাতে করে দ্বিতীয়বারের মতো তাকে ও ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কোনো ধরনের ঝামেলায় পড়তে না হয়। পারভিনের বরাত দিয়ে ইশরাত জাহান বলেন, তার বাবা মানসিক প্রতিবন্ধী। মা জীবিত নেই। ভাইবোন কে কোথায় আছেন, কী করেন তা সে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না।


এসব বিষয়ে পারভিনের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। গতকাল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পারভিনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যুবক সোহেল গত সোমবার থেকেই ম্যাটারনিটির বারান্দায় বসে তার (পারভীনের) সুস্থতার প্রহর গুনছেন। ঘটনার পর থেকে তিনি পারভিনকে দেখতে চাইলেও একটিবারের জন্য তাকে দেখতে দেয়নি চিকিৎসকেরা। তিনি বলেন, পারভিন আমার আপন বোন না হলেও বোনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাকে নিয়ে তিন হাসপাতালে ঘুরাঘুরি করেছি। দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও কেউ এগিয়ে আসেনি। দুর্ঘটনাটির পর ম্যাটারনিটি কর্তৃপক্ষ নিজেদের পাপ মোচনের জন্য এখন দায়সারা চিকিৎসা দিচ্ছে। আমি একাধিবার দেখতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ দেখতে দেয়নি। বরং পুলিশ ও সাংবাদিকদের বিষয়টি জানানোর কারণে তারা প্রতিনিয়ত আমাকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। বলছে, পুলিশে দেবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় যেহেতু পারভিন তার নবজাতক শিশুটিকে হারিয়েছে সেহেতু কর্তৃপক্ষের উচিত পারভিনকে ক্ষতিপূরণ দেয়া, বললেন সোহেল। পারভিনের পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে নিয়ে শঙ্কিত সোহেল। তার মতে, পারভিন সুস্থ হয়ে কোথায় যাবে? তার তো নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই!


এই প্রসঙ্গে ম্যাটারনিটির তত্ত্বাবধায়ক ডা: ইশরাত জাহান বলেন, ওই এলাকায় সমাজসেবা অধিদফতরের আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। আমি পারভিনকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছি, সে চাইলে ওই সব আশ্রয়কেন্দ্রে তাকে পাঠানো হবে। সেখানে সে সিলাইয়ের কাজ শিখতে পারবে। তিন বেলা খেতে পারবে। যেহেতু তার কেউ নেই। কিন্তু সে যেতে রাজি নয়। সে গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজারেই থাকবে। আর এখানে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কোনো কথা নেই। তিনি বলেন, তারা মামলা করলে করবে। সেটি তাদের ইচ্ছা। তবে তার দাবি, ওখানকার দালাল জামাল, আলম, আল জাহিদ ও ইয়ার আলীর তাদের রোগীদের ফুঁসলিয়ে আশপাশের কিনিকে নিয়ে যায়। সম্প্রতি তিনি পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বলে হাসপাতালে আনসার নিয়োগ করিয়েছেন। তাই ওই সব দালালরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে এমনটি ঘটিয়েছে। শুধু তাই নয়; জামাল ও আলমরা ওই হাসপাতালে রাতে মোটরসাইকেল রাখে, ছেলেমেয়েদের নিয়ে হৈ-হল্লা করে জন্মদিন পালন করে। তাদের বারণ করলে বলে, ভাইয়ের লোক, ফোনে ভাইকে ধরিয়ে দেয়। তবে কে এই ভাই তিনি তা নিশ্চিত করতে পারেননি।


এদিকে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হাসপাতালের আয়া সাহেদা জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসা সত্ত্বেও গতকাল হাসপাতালে ডিউটি করতে দেখা গেছে।


জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান ডা: রওশন হোসনেজাহান বলেন, আমরা তদন্ত প্রতিবেদনটি পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে সাহেদার সাসপেন্ডের বিষয়ে কোনো চিঠি আসেনি। তাই সে আজ (গতকাল) অফিস করেছে। চিঠি এলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫