ঢাকা, শুক্রবার,১৯ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা অঞ্চল সফরের আলোকে-২

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

১৮ অক্টোবর ২০১৭,বুধবার, ১৬:৫৭ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৪৭


সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

প্রিন্ট

মেরিন ড্রাইভ

এই কলামের শিরোনামে ‘রোহিঙ্গা অঞ্চল’ শব্দযুগল কেন ব্যবহার করলাম- সেটি উল্লেখ করেছি গতকাল ১৮ অক্টোবর ২০১৭ তারিখের কলামে। কক্সবাজার থেকে দক্ষিণ দিকে যাওয়ার দুটো রাস্তা আছে। একটি হচ্ছে ৭০-৮০ বছরের পুরনো জাতীয় সড়ক বা ন্যাশনাল হাইওয়ে, যেটার নাম চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ রোড বা আরাকান রোড। আরেকটি রাস্তার নাম মেরিন ড্রাইভ। এটি নবনির্মিত; বাস-ট্রাকের জন্য নিষিদ্ধ। মেরিন ড্রাইভ রোড নির্মাণ করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। প্রথমে বেসামরিক সড়ক ও জনপথ বিভাগের ওপর দায়িত্ব ছিল, পরবর্তীকালে সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয় এটি নির্মাণের। সরকার তথা বেসামরিক বিভাগ সহযোগিতা করেছে। কক্সবাজার-কলাতলী পয়েন্ট থেকে দক্ষিণ দিকে এক কিলোমিটার নবনির্মিত মেরিন ড্রাইভ কয়েক বছর আগে সমুদ্রের পানির ধাক্কায় ভেঙে বিলীন হয়ে গেছে; ওইটুকু জায়গা শহরের পুরনো অংশ দিয়ে যেতে হয়। কক্সবাজার কলাতলী পয়েন্ট থেকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার যাওয়ার পরই, নবনির্মিত মেরিন ড্রাইভ সাড়কটি সমুদ্রের পানির কাছে আসে এবং এরপর সোজা দক্ষিণ দিকে যেতে থাকে। এর নির্মাণ ছিল একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ; রাস্তার পূর্ব পাশে পাহাড়ের সারি ও পশ্চিম পাশে সমুদ্রের পানি। এখনকার চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- এই সড়ককে সমুদ্রের ঢেউয়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। যত দূর দেখলাম, রক্ষণাবেক্ষণ সফল হচ্ছে। সড়ক মসৃণ ও যেকোনো গাড়ির যাত্রীর জন্য চক্ষু শীতল করা প্রাকৃতিক দৃশ্য। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত সরেজমিন দেখার অভিজ্ঞতা পেতে হলে কক্সবাজার থেকে গাড়িতে করে ৮০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সর্বদক্ষিণে যেতে হবে। আমি (তথা আমাদের ক্ষুদ্র দলটি) মেরিন ড্রাইভের সর্বদক্ষিণ পয়েন্ট সাবরাং টি জংশন পর্যন্ত গেলাম। তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে আবার উত্তর দিকে এসে সংযোগ সড়কের মাধ্যমে পূর্ব দিকে টেকনাফ উপজেলা সদর দফতরে গেলাম। এটা গত ৮ অক্টোবরের কথা।


বিদেশী ও দেশী ত্রাণকর্মী
৭ অক্টোবর দেখা, স্বল্প পরিচয় ও স্বল্প আলাপ হয়েছিল সাউথ আফ্রিকা থেকে আগত তিনজন মুসলমান মুসাফিরের সাথে। তাদের পূর্বপুরুষ বর্তমান ভারতের গুজরাটের অধিবাসী। ওই তিনজনই ব্যবসায়ী, ব্যবসায়িক সংগঠনের পক্ষ থেকে এসেছেন ত্রাণ দিতে। তারা সরকারি পদ্ধতিতে টাকা এনেছেন, যেটা খরচ করে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে কাজ করবেন। তারা ইংরেজি বলতে পারেন ভালো। তারা তাইনখালী ক্যাম্পেই মোটামুটি এস্টাবলিসমেন্ট করতে চান বলে ওইদিন জেনেছিলাম। পরে দেখেছিলাম, তাইনখালী ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন সাহেবের সাথে আলাপ করছেন। আলাপের সময়েই দেখলাম একটি নবজাতক শিশু। আমরা দেখার এক ঘণ্টা আগে অস্থায়ী প্রসূতি কক্ষে (একটি কুঁড়েঘর) শিশুটির জন্ম হয়েছিল। ওই সাউথ আফ্রিকানরা বলাবলি করছিলেন, তারা একটি ম্যাটারনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করবেন। আমার বা আমাদের মনে (উত্তরবিহীন) প্রশ্ন ঘুরছিল, যদি ক্যাম্প এখান থেকে সরে যায়, তাহলে মানবিক বিনিয়োগ আংশিকভাবে হলেও তো নষ্ট হবে। ৮ অক্টোবর সকালবেলা, চা-নাশতা খাওয়ার সময় দেখা, স্বল্প পরিচয় ও স্বল্প আলাপ হলো চেচনিয়া থেকে আগত দু-তিনজন মুসাফিরের সাথে। যেহেতু তারা ইংরেজিতে দুর্বল, যতটুকু স্বল্প আলাপই হোক না কেন, সেটা করতে হলো বাংলাদেশী ইন্টারপ্রেটর বা দোভাষীর মাধ্যমে। তারাও এসেছেন ত্রাণ দিতে একটি দাতব্য সংগঠনের পক্ষ থেকে। ৮ অক্টোবর ২০১৭ দুপুর, প্রধান সড়কের ওপর অবস্থিত সাবরাং প্রাইমারি স্কুলের ছাদের তলে দেখা, স্বল্প পরিচয় ও স্বল্প আলাপ হলো দুইজন মার্কিন নাগরিকের সাথে। ওই দুইজনের মধ্যে একজন পেনসিলভানিয়া স্টেটের অধিবাসী। দুইজন আমেরিকানের মধ্যে একজন ছিলেন ডাক্তার। তিনি আমাদের সেনাবাহিনীর ডাক্তারের সাথে পেশাগত বিষয়ে আলাপ করছিলেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে বা আর্মির ত্রাণশিবিরে বহু বাঙালি বা বাংলাদেশী ত্রাণ প্রদানকারী দেখলাম। চট্টগ্রামের খুলশী, মাদারীপুর ও পঞ্চগড় থেকে গিয়েছেন- এ রকম মানুষের সাথে সাক্ষাৎ হলো। ৮ অক্টোবর বিকেলে দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে যতই আসছিলাম, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন ক্যাম্পের কাছাকাছি এলাকায় ত্রাণবাহী ট্রাক বা মিনি ট্রাক দেখছিলাম। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রতি যে সহমর্মিতা ও সাহায্যের মনোভাব আছে, সেটি ধরে রাখা। অবশ্যই স্মরণীয়, আগস্টের ২৫ তারিখের পর প্রথম ৮-১০ দিন সরকারিভাবে বেশি কিছু করা সম্ভব হয়নি। ওই এলাকার মানুষ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বলেই রোহিঙ্গারা অনাহারে মারা যায়নি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অবশ্যই অপুষ্টিতে ভুগছে, কিন্তু একনাগাড়ে অনাহারে থাকছে না।


ত্রাণ বিতরণ
যারাই ত্রাণ দিতে আসেন তারা প্রথমে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে রিপোর্ট করেন। সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ত্রাণের আইটেমগুলো কী প্রকারের ও বৈশিষ্ট্য কী, সেটা জেনে নেন। তারপর ত্রাণগুলোকে সংশ্লিষ্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেন অথবা কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করেন। উখিয়া ডিগ্রি কলেজের মাঠে বিশাল জায়গা নিয়ে কেন্দ্রীয় ত্রাণ সংরক্ষণাগার বানানো হয়েছে বড় আকারের আধুনিক তাঁবু দিয়ে। সেখানে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাপ্ত খাদ্যশস্য যেমন রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে, তেমনি অন্যান্য আইটেম যথা ল্যাট্রিন বানানোর সরঞ্জাম, টিউবওয়েল, ওষুধ ইত্যাদিও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। এখানে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষও আছে, বিভিন্ন র‌্যাংকের অফিসার ও সৈনিকেরা দায়িত্ব পালন করছেন সুচারুভাবে। দেখলাম অনেক ট্রাক ঢুকছে, আবার বের হচ্ছে। এই ক্যাম্প থেকে বা যেকোনো জায়গা থেকেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যা কিছু পাঠানো হয়, সেগুলো বিকেলের মধ্যেই। কাজ যদি বাকি থাকে, সেটা পরের দিন সকালে করা হয়। অর্থাৎ রাতে বড় কাজ করা হয় না। কারণ, দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প যেসব জিনিস দিয়ে বানানো হয়েছে, সেগুলো অগ্নিরোধক নয়। অর্থাৎ অতি সাবধান না থাকলে সেখানে ভীষণ সর্বনাশ ঘটতে পারে। সব রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই সেবা প্রদানের তদারকিতে ও সশরীরে ত্রাণ বিতরণে সেনা সদস্যরা আছেন। কিন্তু অপরাহ্ণ ৫টা থেকে ৬টার পরপরই ক্রমান্বয়ে সেনা সদস্যরা বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে চলে আসেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর দায়িত্ব ও শৃঙ্খলা রক্ষার কাজটি রোহিঙ্গা মাঝিদের মাধ্যমে করা হয়। একেকজন ছোট মাঝির অধীনে ২৫টি পরিবার থাকে ১০০ অথবা ১২৫ পরিবারÑ অর্থাৎ চার-পাঁচজন ছোট মাঝির ওপরে থাকে একজন বড় মাঝি; এবং পাঁচ-ছয়জন বড় মাঝির ওপরে থাকে একজন হেডমাঝি। এই মাঝিরা রোহিঙ্গাদেরই একজন। মাঝিরা নিজেদের লোককে চিনে এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধা জানে। দু-চারজন মাঝির সাথেও দেখাসাক্ষাৎ ও কথা হয়েছে।


মগদের অত্যাচার ও প্রতিবাদ সমীক্ষা
ওরা বলে মগ। ‘মগের মুল্লুক’ শব্দটির সাথে আমরা পরিচিত। কিন্তু সাধারণ বাঙালি এর বিস্তারিত প্রেক্ষাপট জানেন না। রোহিঙ্গা মানবিক বিপর্যয়ের কারণে আজ অবধি কমবেশি সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে; দুই বছর বা ১০ বছর আগের রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে। আশ্রয়শিবিরগুলোতে মহিলা ও বৃদ্ধদের সাথে আলাপ করার সময় দেখলাম, কেউই বলে না মিয়ানমারের মিলিটারি বা বার্মার সেনাবাহিনী ইত্যাদি। সবাই বলে মগ বা মগেরা। কারা মেরেছে, কারা করেছে? উত্তর, মগেরা। আলাপের মাধ্যমে জানতে পারলামÑ কী রূপ নির্মমভাবে, কী রূপ পৈশাচিকভাবে মগেরা রোহিঙ্গা মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে, ঘরে ঘরে আগুন দিয়ে গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, বড় বড় দা, ছুরি বা কিরিচ দিয়ে মানুষের হাত-পা কুপিয়েছে এবং মৃতপ্রায় মানুষকে হয় আগুনে পুড়িয়েছে অথবা মাটিতে পুঁতে ফেলেছে; গণকবর দিয়েছে। গ্রাম থেকে, পরিবার থেকে যুবতী-কিশোরী নারীদের বের করে এনে প্রকাশ্যে পরিকল্পিতভাবে অত্যাচার করেছে, ধর্ষণ করেছে; কোনো প্রকার পর্দা আব্রু লজ্জা শরম না রেখে। সেই নির্যাতিত মহিলাদের প্রাণই শুধু আছে; তাদের আত্মা তাদের সম্মান তাদের স্বপ্ন সবই মৃত। উল্লেখ্য, আশ্রয়শিবিরে যুবক কম, বেশির ভাগ যুবককে মগেরা মেরে ফেলেছে। অতএব, বাংলাদেশে এসেছে তাদের পরিবারের কান্নামাখা স্মৃতি।


মগদের অত্যাচারের আরো দুটি আঙ্গিক
মিয়ানমার নামক রাষ্ট্রের সর্ব পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে যে প্রদেশ, এর নাম রাখাইন প্রদেশ। আগে নাম ছিল আরাকান প্রদেশ। রাজধানীর নাম ছিল আকিয়াব। মুসলমানদের নাম চিহ্ন গন্ধ মুছে ফেলার নিমিত্তে, বার্মার সামরিক সরকারগুলো সব নাম বদলিয়ে ফেলেছে। এই রাখাইন প্রদেশের উত্তরে অর্ধেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাস। ভূমির তুলনায় মানুষ কম। রোহিঙ্গারা লেখাপড়ায় অনগ্রসর; পরিবারপিছু শিশু ও জনসংখ্যা অনেক। প্রচুর ভূমি, গবাদিপশু, কৃষিকাজ, ফসল ইত্যাদি নিয়ে তারা সন্তুষ্ট থাকত। মগেরা শুধু মানুষকে পোড়ায়নি, গবাদিপশুও হত্যা করেছে। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা পরিবার সচ্ছল ছিল। কৃষির বাইরে মাছ চাষ আর আহরণ ছিল তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেশা। অতি অল্পসংখ্যক পরিবার কুটিরশিল্পে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল। এই সবকিছু মগেরা ধ্বংস করেছে। মনে করুন, একটি পরিবার যাদের আনুমানিক ২৫ একর জমি ছিল, যাদের শতাধিক গাভীসহ গরু-মহিষ ছিল, যাদের গোলাভরা ধান থাকত, তারা এখন বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয়শিবিরে ১২-১৪ ফুট বাই ছয় ফুট একটি কুঁড়ে ঘরে ১৫ সদস্যের পরিবার নিয়ে কোনো মতে দিনাতিপাত করছেন। যেসব রোহিঙ্গা পরিবার রাখাইনে নিজেদের গ্রামে অন্যদের উদার হস্তে দান করত, তারা এখন ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছে। তাই রোহিঙ্গা সমস্যাটি শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, হাজার হাজার পরিবারের জন্য মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ও বটে। এ সবই হয়েছে মগদের অবর্ণনীয় অত্যাচারের কারণে; মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানের কারণে। রাখাইন অঞ্চলে মগদের অত্যাচারের বর্ণনা শুনে আমি নিজেই অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েছি। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বলেছেন, ‘ইট ইজ এ টেক্সটবুক কেইস অব এথনিক ক্লিনজিং’; অর্থাৎ পাঠ্যপুস্তকে পড়ার মতো এটি একটি উদাহরণ নৃতাত্ত্বিক নিধনপ্রক্রিয়ার। অর্থাৎ সাঙ্ঘাতিক জঘন্য কাজের জ্বলন্ত উদাহরণ। পত্রিকায় পড়েই যাচ্ছিলাম এবং পড়েই যাচ্ছি, টেলিভিশনের মাধ্যমে শুনেই যাচ্ছিলাম এবং শুনেই যাচ্ছি। সরেজমিন গিয়ে যত অল্প পরিসরেই হোক না কেন, শুনে আসলাম ও জেনে আসলাম।


মইনুদ্দিন খান বাদল এবং অন্যরা
মগদের অত্যাচার দেখে বা শুনে কোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষে অশ্রু সংবরণ করা কষ্টকর। এ ধরনের অত্যাচার, নির্মমতা ও পৈশাচিকতা নিজের চোখে দেখেছে, এমন যেকোনো রোহিঙ্গা যুবকের পক্ষে বিক্ষুব্ধ- না হওয়াটাই ব্যতিক্রম, প্রতিবাদী হওয়াটা স্বাভাবিক। ১৯৭১ সালে আগ্রাসী ও আক্রমণকারী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার প্রেক্ষাপটে বাঙালি যুবকেরা এভাবেই প্রতিবাদী হয়েছিল। এখন থেকে আনুমানিক তিন সপ্তাহ আগে রাত সাড়ে ১১টার সময়, এসএটিভি চ্যানেলে টকশোতে উপস্থিত ছিলাম। আরো দুইজন মেহমান ছিলেন। একজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অপর জন ছিলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও জাসদ নেতা মইনুদ্দিন খান বাদল। বাদলের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলায় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণে বোয়ালখালি উপজেলায়। অর্থাৎ ওই দিনের টকশোতে আমরা দুইজন ছিলাম চাটগাঁইয়া। রোহিঙ্গা বিষয়ে আমাদের স্পর্শকাতরতা এবং অনুভূতি অন্যদের তুলনায় ভিন্ন প্রকৃতির। সেদিন এক ঘণ্টা ১৫ মিনিটের টকশোর শেষদিকে মইনুদ্দিন খান বাদল একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অনেকটা এরকম : ‘যেসব তরুণের সামনে তাদের মা-বোনকে বেইজ্জত করা হয়েছে, তাদের পরিবারের মানুষকে খুন করা হয়েছে, তাদের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে, সেসব তরুণ যদি এই অত্যাচার ও নিমর্মতার প্রতিবাদ করে, তা হলে কি তাকে আপনি সন্ত্রাসী বলবেন?’ বাদল আরো বলেন, ‘বড় বড় জায়গায় বসে একে-ওকে সন্ত্রাসী বলা খুব সহজ; কিন্তু রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতিতে, যুবকদের পক্ষে প্রতিবাদী হওয়াটাই স্বাভাবিক; প্রতিবাদী না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। পৃথিবী যা-ই বলুক, আমি প্রতিবাদীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলতে পারব না।’ মইনুদ্দিন খান বাদলের কথা উদ্বৃত করতে গিয়ে ছোটখাটো ভুল থাকলে মাফ করে দেবেন। ফেসবুকের পর্দায় আরো বহু লোক বিভিন্ন বক্তব্য লিখছেন। কোনো কোনোটিতে প্রাধান্য পায় ধর্মীয় আবেগ, কোনো কোনোটিতে কূটনৈতিক আবেগ, কোনো কোনোটিতে প্রাধান্য পায় সশস্ত্র প্রতিবাদের আবেগ। কেউ কেউ বলতে চান, কেন বাংলাদেশ রোহিঙ্গা তরুণদের ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে পারবে না; বাংলাদেশের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে বা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য বা কূটনীতির বিকল্প হিসেবে; স্থানাভাবে এ আলোচনা দীর্ঘ করছি না।


পর্যালোচনা-১
গত ছয়-সাত সপ্তাহ ধরে, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে বা রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গে, মিয়ানমারের শাসনপ্রক্রিয়া নিয়ে, মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি প্রসঙ্গে, রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক (প্রাথমিক) বিপর্যয় প্রসঙ্গে, বাংলাদেশের বহুল প্রচারিত বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর ডিগবাজি, জাতিসঙ্ঘের ভূমিকা, বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা এবং কক্সবাজার জেলার পরিবেশ প্রসঙ্গে প্রচুর টকশো, গোলটেবিল আলোচনা এবং কলাম লেখালেখি হচ্ছে। বিদেশী টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও সংবাদ ও পর্যালোচনা পরিবেশন করছে। আমার নিজের পক্ষ থেকে এই পত্রিকাতেই ১৩ সেপ্টেম্বর, ৪ অক্টোবর, ১১ অক্টোবর এবং গতকাল ১৮ অক্টোবর কলাম লিখেছি। আজকের কলামটি, গতকালকের কলামের ধারাবাহিকতাতেই লেখা। হয়তো আরো লিখব ভবিষ্যতে। তবে বলে রাখতে হয়, রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় বা রোহিঙ্গা সমস্যার একাধিক আঙ্গিক আছে। একটি আঙ্গিক হলো মানবিক দিক। আরেকটি আঙ্গিক বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সম্পর্ক। মানবিক দিক কী অথবা মানবিকতা কী, এর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা কী, এ ব্যাপারে কিঞ্চিত আলোচনা করা যেতেই পারে। এই আলোচনা ১৩ সেপ্টেম্বর তারিখের কলামে করেছি এবং ৪ অক্টোবর ও ১১ অক্টোবর তারিখের কলাম দুটিতে করেছি। আজকের জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাখ্যা বা জাতীয় নিরাপত্তার সাথে রোহিঙ্গা মানবিক বিপর্যয়ের কী সম্পর্ক থাকতে পারে বা কী সম্পর্ক হতে পারে, সেটা তাত্ত্বিকভাবে আলোচনা করব না।

পর্যালোচনা-২
১১ অক্টোবর গোলটেবিল আলোচনার পূর্ণ বিবরণ ‘ন্যাশনাল সলিডারিটি ফর দ্য রোহিঙ্গা’ নামক ফেসবুক আইডি বা ইউটিউবে পাওয়া যাবে। সেখানে উঠে এসেছিল এবং আমরা কলামেও লিখেছি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে কতদিন থাকতে পারেন। সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছি, তারা সহসাই ফেরত যাবে না, কারণ তাদের সহসা ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না। কারণ মিয়ানমার সহসা তাদের নেবে না। তাদের ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমার তাদের বাংলাদেশে পাঠায়নি। মিয়ানমার কী উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছে, সেটি কৌশলগত বা স্ট্র্যাটেজিক আলোচনা, এই অনুচ্ছেদে তা করছি না। বাংলাদেশ সরকারের গোয়েন্দা ও কূটনেতিক অবহেলার কারণে, নাফ নদীর পূর্বে রাখাইন প্রদেশে কী হচ্ছিল বা কী হতে যাচ্ছিল সে সম্পর্কে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এবং বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে কোনোই সচেতনতা ছিল না। মেহেরবানি করে খেয়াল করুন, জুন-জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বরব্যাপী আলোচনার জগতের ‘মধ্যমণি’ ছিল ষোড়শ সংশোধনী ও সেটা বাতিলের রায় এবং নির্বাচন কমিশন।

পর্যালোচনা-৩
অতএব, মিয়ানমারের রাখাইন পরিস্থিতি আগ্নেয়গিরির মতো হলেও, অগ্নুৎপাত না হওয়া পর্যন্ত (ইংরেজি পরিভাষায় ভোলকানিক ইরাপশন) আমাদের ঘুম ভাঙেনি। মাঠে যখন কৃষক কাজ করে, তখন যদি কৃষকের কাছে কোনো বজ্রপাত ভূমিতে আঘাত করে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কৃষক মারা যান। বড়-ছোট যেকোনো বিল্ডিংয়ে আজকাল বজ্রপাতরোধক ব্যবস্থা থাকে যাতে করে ওই বিল্ডিংয়ের ওপর বজ্রপাত স্পর্শ করলে, বিল্ডিংটি যেন ধ্বংস না হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দু-চার লাখ তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। ১০-১৫ বা ২০ বছর পর এই গাছগুলো লম্বা হবে। লম্বা তালগাছ বজ্রপাতকে শোষণ করে নেয়। আমরা ঘরের চালা দেয়ার জন্য বা নৌকা বানানোর তক্তা খুঁজতে গিয়ে, দেশের তালগাছ শেষ করেছি। এখন সংশোধন করছি। রোহিঙ্গা মানবিক বিপর্যয়টিও একটি বজ্রপাতের মতো। ইংরেজি পরিভাষায় বাক্যটি এরকম : ‘উই ডিড নট আস্ক ফর ইট, ইট হ্যাজ বিন থ্রাস্ট আসন আস।’ তলে তলে যখন সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন আমরা ঘুমাচ্ছিলাম, এখন আমাদের ভুল সংশোধন করতে হবে।

পর্যালোচনা-৪
আগস্টের শেষ সপ্তাহে রোহিঙ্গাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হলেও, চূড়ান্তপর্যায়ে, তাদের ফেরত দেয়ার কোনো রাস্তা ছিল না বলেই আমার অনুভূতি। জনমতের চাপে হোক বা বিবেকের তাড়নায় হোক, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন তাদের গ্রহণ করার জন্য। এখন চিন্তার বিষয়Ñ তাদের কোথায় রাখা যায়, তাদের কারণে পরিবেশের ক্ষতি কীভাবে ন্যূনতম রাখা যায় এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া কী নিয়মে ত্বরান্বিত করে তাদের ফেরত পাঠানো যায়।

পর্যালোচনা-৫
যদি কূটনৈতিকপ্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানো না যায়, তা হলে কী করণীয়? আমরা তথা বাংলাদেশ কি চীন, রাশিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব ও মিয়ানমারকে বোঝাতে পারব যে, তাদের ফেরত না নিলে আপনাদেরই ক্ষতি। তাদের ফেরত না নিলে আপনারা কি বাংলাদেশকে স্পর্শকাতর অবস্থানে ফেলে দেবেন না? স্পেন দেশের কাতালোনিয়া অঞ্চলের মানুষ, যুক্তরাজ্য নামক দেশের স্কটল্যান্ডের মানুষ, ভারতে নাগাল্যান্ড অঞ্চলের মানুষ, মিয়ানমারের অন্তত ১১টি অঞ্চলের মানুষ হয় রাজনৈতিক অথবা সশস্ত্র বিদ্রোহ করছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ৮-১০ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে কী করবে এবং কী করতে পারে, এই প্রশ্ন থেকেই যায়। মানবিকতার জন্য, বাংলাদেশ এক শ’তে এক শ’ নম্বর পাবে, কূটনীতিতে কত পায়, সেটা দেখার বিষয়। কূটনীতিতে যদি ৩৩ পারসেন্টের নিচে পায়, তা হলে কী করণীয় সেটাও দেখার বিষয়। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই এখনো আলাপ করছি এবং করব। পরবর্তী দুইটি বিকল্পে আমাদের পদচারণা দুষ্কর। অতএব, বাংলাদেশের সুশীলসমাজের কাছে, সচেতন নাগরিকদের কাছে আবেদন থাকবে যেন আমরা যা-ই বলি না কেন, সেটার প্রভাব ইতিবাচক হয়, সেটার প্রভাব যেন সাবধানতামূলক হয়, সেটার প্রভাব যেন ধৈর্যশীলতার বাহক হয়। আমি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান হতে পারি তথা একজন রাজনৈতিক কর্মী হতে পারি, কিন্তু আমি বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক কর্মী, তাই বাংলাদেশের স্বার্থই আমার কাছে বড়।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব.);
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
যোগাযোগ : mgsmibrahim@gmail.com

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫