ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা অঞ্চল সফরের আলোকে-১

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

১৭ অক্টোবর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:০৫ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০১৭,বুধবার, ১৫:৩১


সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

প্রিন্ট

রোহিঙ্গা সমস্যায় আমাদের সংশ্লিষ্টতা

৭ এবং ৮ অক্টোবর ২০১৭ শনি ও রোববার, বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বে রোহিঙ্গা অঞ্চলে কাটালাম। রোহিঙ্গা অঞ্চল বললাম এ জন্য যে, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার অরিজিনাল জনসংখ্যা যত, গত ৯ সপ্তাহে প্রায় ততসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী ওই উপজেলায় আশ্রয় নিয়েছে। এটার নিকটবর্তী প্রভাব আছে, দূরবর্তী প্রভাব আছে; এ প্রসঙ্গে আলোচনা টেলিভিশন টকশোগুলোতে করেছি, এই পত্রিকাতেই গত চার সপ্তাহের মধ্যে প্রতি বুধবার করেছি; তাই আজ এ নিয়ে আলোচনা করব না; ভবিষ্যতে করব। আজকের আলোচনা আমার সফরের পরিপ্রেক্ষিতে, কিছু অভিজ্ঞতা কিছু অনুভূতিবিনিময়। গত সাত সপ্তাহ ধরে রোহিঙ্গা সমস্যাটি, বিপুল সংখ্যক সচেতন বাংলাদেশী নাগরিকের এবং আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের চিন্তাচেতনাকে আবৃত করে রেখেছে। সফরের উদ্দেশ্য ছিল দেখা, জানা এবং অনুভব করা। ওই জানা দেখা এবং অনুভবের কেন্দ্রীয় ফোকাস হলো রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলুক বা না বলুক, ‘শরণার্থী’ বা রিফিউজি ব্যতীত অন্য কোনো একক বাংলা শব্দ নেই, যা দিয়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়। তারা অবশ্যই বিপর্যস্ত, তারা মানসিকভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, তারা আশ্রয়প্রার্থী, তারা উদভ্রান্ত এবং তারা তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই বলছি এবং লিখছি। সারা বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের মতো তাদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করায়, ত্রাণ পৌঁছানোয় শরিক হয়েছি। চট্টগ্রাম মহানগরে একটি সামাজিক ও সেবামূলক সংগঠন আছে যার নাম ‘আমরা চাটগাঁবাসী’। এটির উপসংগঠন আছে ১৮-২০টি, ভিন্ন ভিন্ন নামে ক্লাবের মতো। এই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে আমিও আছি। লায়ন অ্যাডভোকেট ইমরান এই সংগঠনের সেক্রেটারি। চার বছর আগে আমরা চট্টগ্রামে শুরু করেছিলাম প্যালেস্টাইন সলিডারিটি কাউন্সিল। সেটাকে পরিবর্ধন করে, ‘হিউম্যানিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ নাম করা হয়েছে। হিউম্যানিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন মানবাধিকার এবং মানবসেবার ব্রত নিয়ে কাজ করে; এবং একজন প্রবীণ সাংবাদিক ওসমান গণি এটির সেক্রেটারি। এই উভয় সংগঠনে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি যথা ডাক্তার, প্রকৌশলী, অ্যাডভোকেট, মসজিদের ইমাম, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পুরুষ ও মহিলা সদস্য হিসেবে আছেন। সশরীরে চট্টগ্রাম গিয়ে এবং থেকে, ত্রাণ সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছি, যোগাযোগ করেছি। উভয় সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে চট্টগ্রাম মহানগর থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেগুলো বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছানো হয়েছে, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে যেতে পারিনি।

ফেসবুকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টতা
২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ছিল কোরবানির ঈদের দিন। ওইদিন বাংলায় এবং ইংরেজিতে আলাদা আলাদাভাবে আড়াই-তিন মিনিটের আহ্বান জানিয়েছি পৃথিবীর মানুষের কাছে, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে। ফেসবুকের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ লোকের কাছে এই আহ্বান পৌঁছেছে এবং দেশ-বিদেশ থেকে শত শত মানুষ উদ্দীপ্ত হয়ে যোগাযোগ করেছেন। ১১ সেপ্টেম্বর সকালে প্রচণ্ড বৃষ্টি-বাদল-তুফান এবং ট্রাফিক জ্যাম সত্ত্বেও আমরা একটি গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করেছিলাম। আমি ছিলাম আহ্বানকারী এবং সঞ্চালক। আমরা মানে কিছুসংখ্যক সমমনা, রোহিঙ্গাদের প্রতি সহমর্মী এবং বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন মানবতাবাদী বন্ধুবান্ধব। আলোচনার ব্যানারের নাম ছিল ‘ন্যাশনাল সলিডালিরিটি ফর দি রোহিঙ্গা’। ৬০-৭০ জন গণ্যমান্য জ্ঞানী সুপরিচিত ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন, ২২-২৩ জন বক্তব্য রাখেন; সময়ের অভাবে অন্যরা শুধু সহমত প্রকাশ করেছেন। আলোচনাটি ফেসবুকে লাইভ-স্ট্রিমিং করা হয়েছিল এবং এখনো ইংরেজি ভাষায় এই নামের ফেসবুক আইডিতে গেলে বা এই নামের ইউটিউবে গেলে সবার বক্তব্য শোনা যাবে।

অতএব
এরূপ প্রেক্ষাপটে এবং ভবিষ্যতের কথা খেয়াল করে, অতি আবশ্যক হয়ে পড়েছিল সরেজমিন দেখতে যাওয়া। আমি একজন মানুষ; একজন মুসলমান; একজন বাঙালি; একজন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা; একজন বাংলাদেশী; একজন সাবেক সেনাকর্মকর্তা, একজন পত্রিকায় কলাম লেখক; একজন টকশো অংশগ্রহণকারী। আমি একজন ক্ষুদ্র মাপের গবেষক এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী। আমি মানবতাবাদী উদারপন্থী রাজনৈতিক কর্মী; দ্বীন ইসলামের মূল্যবোধের বিশ্বাসী এবং জ্ঞানের জগতে এখনো একজন ছাত্র। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যগুলো কী কী ছিল সে প্রসঙ্গে সচেতন আছি (যথা- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা)। অতএব আমি বিশ্বাস করি, সমন্বয় করেই আমাকে চলতে হবে। অনেক বছর বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর, চার-পাঁচ বছর আগে অং সান সু চি বলেছিলেন, আমাকে মানবতাবাদী ব্যক্তি বা মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বিবেচনা করবেন না, আমাকে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেই বিবেচনা করবেন। আমি (ইবরাহিম) ওই রকম বলব না। আমাদের রাজনৈতিক দলের নাম কল্যাণ পার্টি। অতএব কল্যাণ শব্দটির সঙ্গে এবং এর তাৎপর্যের সঙ্গে আমাদের ওঠাবসা। আমাদের সাধ্য কম হলেও সাধ এবং প্রচেষ্টায় কোনো কমতি নেই। রোহিঙ্গা সমস্যায় আমার সংশ্লিষ্টতা সবার ওপরে একজন মানুষ হিসেবে। আমার দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোনো কিছুর জন্য আহ্বান জানাইনি।

সরকারি সিদ্ধান্তের পরিবর্তনের রূপ
অতীতে অনেকবার রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে কিন্তু এবারের ঘটনাটি এবং এবারের ব্যাপকতা প্রচণ্ড এবং বিশাল। ২৫ আগস্ট ২০১৭ এর পরপরই রোহিঙ্গা আসা শুরু হয়। বাংলাদেশ সরকার দোদুল্যমান ছিল, তাদের বাংলাদেশে ঢুকতে দেবে কী দেবে না। বিজিবিকে বলা হয়েছিল তাদের প্রবেশ ঠেকাতে। পত্র-পত্রিকায় ছবি এসেছে বিপর্যস্ত রোহিঙ্গারা পানিতে ভাসছিল। বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া তাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলেছিল। আমরা এরূপ সিদ্ধান্ত ও আচরণের তীব্র প্রতিবাদ এবং নিন্দা করেছিলাম। সরকার সমর্থক কিছু সুপরিচিত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব রোহিঙ্গাদের বিপজ্জনক গোষ্ঠী, অনাকাক্সিক্ষত গোষ্ঠী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা সম্ভাব্য সন্ত্রাসের উৎস ইত্যাদি বলতেন। যা হোক, ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়া সরকারের ভূমিকা, মালয়েশিয়া সরকারের জোরালো প্রতিবাদী ভূমিকা এবং তুরস্ক সরকারের প্রতিবাদী ও গঠনমূলক কূটনেতিক ভূমিকা সমস্যাটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপন করে ফেলল। বাংলাদেশ চাক বা না চাক, পৃথিবী রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কথাবার্তা বলা এবং চিন্তা শুরু করল। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের পতœী রোহিঙ্গাদের দেখতে এলেন এবং তার এই সফর আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মানবতাবাদে বড় রকমের অনুঘটকীয় ভূমিকা পালন করল। তাই ১০-১২ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি বদলাল। অভ্যন্তরীণ জনমতের চাপে হোক, অথবা অদৃশ্য বিদেশি পরামর্শে হোক অথবা নিজের বিবেকের তাড়নায় হোক, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসতে দেয়া হবে এবং অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেয়া হবে। সেই থেকে শুরু। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পরিবর্তিত সিদ্ধান্তের জন্য পৃথিবী ধন্যবাদ জানিয়েছে, আমরাও জোরালো ধন্যবাদ জানিয়েছি এবং জানাব। এখানে দলীয় রাজনীতির কোনো জায়গা নেই। এখানে বাংলাদেশের মানচিত্র, বাংলাদেশের স্বার্থ- দুটোই মুখ্য।

সামরিক-বেসামরিক সহযোগিতা প্রশংসনীয়
আমাদের সবার আহ্বান সার্বিকভাবেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। সরকার উদ্যোগ নিয়েছে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেয়ার এবং তাদের দেখাশোনা করার। এই ব্যবস্থাপনার কাজে সেনাবাহিনীকে যেন নিয়োগ করা হয় তার জন্য অনেক লোক সোচ্চার ছিল, আমরাও সোচ্চার ছিলাম। সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিগত ৭-৮ অক্টোবর আমি (বা আমদের পাঁচজনের ক্ষুদ্র দলটি) বিভিন্ন ক্যাম্পে সফরের সময়, পথের আশপাশে মানুষের সাথে কথা বলার সময়, ক্যাম্পের ভেতরে সচেতন শরণার্থীদের সাথে কথা বলার সময়, তাদের মুখ থেকে সেনাবাহিনীর জন্য প্রশংসা ও দোয়া উন্মুক্তভাবে এসেছে। একজন সাবেক সৈনিক হিসেবে অত্যন্ত আনন্দ অনুভব করেছি। একবাক্যে সবাই বলেছেন, সেনাবাহিনী মোতায়েনের আগে কিছু কিছু হয়েই গিয়েছে এবং মোতায়েন না হলে বিশৃঙ্খলার কারণেই আরো অনেকে মারা যেত, আরো অনেক মহিলার সম্মানহানি হতো এবং আরো অনেক গরু ও অন্যান্য সম্পদ লুটপাট হতো। সেনাবাহিনী মোতায়েন হলেও বেসামরিক প্রশাসন ওতপ্রোতভাবে এবং নিবিড়ভাবে জড়িত। সেনাবাহিনীর ভূমিকাটি সহায়ক ভূমিকা। মূল কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব বেসামরিক প্রশাসনের। আমার সংক্ষিপ্ত সফরের সময় উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি তারা পারস্পরিকভাবে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মাধ্যমে পরিশ্রম করে এই দায়িত্ব পালন করছেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে, রামুতে অবস্থিত পদাতিক ডিভিশনকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নিজেদের ডিভিশনে নিত্যনৈমিত্তিক দায়িত্ব পালনের পরও, এতবড় কাজটি যেন স্বাচ্ছন্দ্যে সম্পন্ন করা যায়, তার জন্য বাংলাদেশের অন্যান্য সামরিক অঞ্চল থেকে, অনেক কনিষ্ঠ সেনা অফিসারকে এখানে অস্থায়ী কর্তব্যে নিয়োগ করা হয়েছে। অর্থাৎ কক্সবাজার অঞ্চলের অরিজিনাল সেনাবাহিনী ছাড়াও, বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের সেনাবাহিনীও পরোক্ষভাবে জড়িত। একই কথা বেসামরিক প্রশাসন, পুশিল ও আনসার প্রশাসনের জন্য প্রযোজ্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সমবায় মন্ত্রণালয়, ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় ইত্যাদির সমন্বয় ধীরে ধীরে উন্নত হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ের অফিসার এবং ঢাকাসহ অন্যান্য জেলা থেকে ডেপুটি সেক্রেটারি বা তৎকনিষ্ঠ বহু সংখ্যক অফিসারকে এখানে আনা হয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনকে শক্তিশালী বা রি-ইনফোর্স করার জন্য। যে যেখান থেকেই আসুক না কেন, নিজেদের কষ্টটাকে সাময়িকভাবে ভুলে তারা বিপর্যস্ত মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের প্রতি অভিনন্দন এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

প্রতিকূল আবহাওয়া
বিগত ৭ এবং ৮ অক্টোবর আবহাওয়া আমাদের সফরের অনুকূলে ছিল না। কিন্তু মহান আল্লাহর অনুগ্রহে ঐতিহ্যবাহী বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সাবেক সৈনিক ও রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধার জন্য এরূপ বৃষ্টি-বাদল কোনো বিষয়ই নয়; বৃষ্টি-বাদল অগ্রাহ্য করেই যতটুকু সম্ভব ততটুকু ঘুরে দেখেছি, মেলামেশা করে দেখেছি; কিন্তু যারা ত্রাণকাজে নিয়োজিত, নিরাপত্তায় নিয়োজিত এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর মানুষগুলো বৃষ্টিবাদলে নিদারুণ কষ্ট পাচ্ছিল। তাদের ক্যাম্পগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পাহাড়ের ঢালে এবং পাহাড়ের নিচে সমান জায়গায়। বৃষ্টি এলে সেই বৃষ্টি তাদের অস্থায়ী কুঁড়ে ঘরে ঢুকে পড়ে, খোলা জায়গাগুলো পানিতে ডুবে যায়। সব দিকে কাদা হয়ে যায়। পাকা রাস্তা ছেড়ে গাড়ি অন্য কোথাও ঢুকতে পারে না। ফলে গাড়ি থেকে মালামাল লোডিং এবং আনলোডিং কষ্টকর হয়ে যায়। সৈনিকরা, পুলিশ, আনসার সদস্যগণ, শ্রমিকরা, স্বেচ্ছাসেবকেরা সবাই ভিজে ভিজে কাজ করছে- সেটাই দেখলাম। অল্পসংখ্যক ছাতা থাকলেও, ছাতার শক্তির তুলনায় পাহাড়ে বৃষ্টির শক্তি বেশি। এই মুহূর্তের চলমান প্রতিকূল আবহাওয়ার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। তবে শীতকালের প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে এটা সবাই উপলব্ধি করছেন।

ক্যাম্পগুলোর অবস্থান
পাঠককে জানিয়ে রাখি, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাওয়ার যে প্রধান সড়ক বা জাতীয় সড়ক, সেটা উখিয়া উপজেলায় প্রবেশের পর থেকেই, পূর্ব দিকে মিয়ানমার সীমান্ত পায়। উখিয়ার দক্ষিণে, টেকনাফ উপজেলায় প্রবেশের পরেও একইরূপ পরিস্থিতি থাকে। বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে সীমান্ত কিছু অংশ ভূমির ওপরে তথা ল্যান্ড বাউন্ডারি এবং কিছু অংশ নদীর মধ্য রেখা দিয়ে তথা রিভার বাউন্ডারি। কোনো কোনো জায়গায় প্রধান সড়ক থেকে সীমান্তরেখা পাঁচ-সাত কিলোমিটার দূরে, কোনো কোনো জায়গায় এক কিলোমিটার দূরে। ইংরেজি ভ্যালি শব্দের অন্যতম একটি বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে উপত্যকা। উপত্যকা মানে দুই পাহাড়ের মাঝখানে বা দুই সারি পাহাড়ের মাঝখানে যেই সমতল ভূমি সেটা। কিছু রোহিঙ্গা ক্যাম্প প্রধান সড়ক থেকে একটু ভেতরে পাহাড়ের ঢালে এবং উপত্যকায়। কিছু রোহিঙ্গা ক্যাম্প প্রধান সড়কের কাছেই বা লাগোয়া। প্রধান সড়কের পূর্ব পাশে যে ক্যাম্পগুলো ছিল, সেগুলোকে ধীরে ধীরে সড়কের পশ্চিম পাশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মানে হলো, প্রধান সড়ক এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত রেখার মাঝখানে কোনো ক্যাম্প না থাকলে এটা নিরাপত্তার জন্য অনুকূল। যে ক্যাম্পগুলো পশ্চিম পাশেই স্থাপিত হয়েছে, সেগুলোর তাঁবু বা কুঁেড়ঘর যেগুলো রাস্তার বেশি কাছে সেগুলোকে দূরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাও নিরাপত্তার জন্যই মাত্র। যা হোক, যতগুলো ক্যাম্প বা আশ্রয় শিবির এখন পর্যন্ত হয়েছে, কোনোটিই স্থায়ী নয়। স্থায়ী ক্যাম্পের জন্য স্থান নির্বাচন হয়েছে, সেই স্থানে যাওয়ার জন্য যোগাযোগ সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। সেই নতুন স্থানে পরিকল্পিতভাবে কুঁড়েঘরগুলো বা তাঁবুগুলো স্থাপন করা হবে। তার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা, বাংলাদেশ সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সেবায় নিয়োজিত সেনাবাহিনী একসঙ্গে কাজ করছেন। শীতকাল নিবিড়ভাবে এসে পড়ার আগেই এটা সম্ভব না-ও হতে পারে।

রূঢ় বাস্তবতা
বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের উপজেলার নাম টেকনাফ; এই উপজেলার সর্ব দক্ষিণের ইউনিয়নের নাম সাবরাং; ওই ইউনিয়নের সর্ব দক্ষিণের তিনটি ওয়ার্ড হচ্ছে শাহপরীর দ্বীপ (স্থানীয় ভাষায় বলে শাহপুরদিয়া)। শাহপরীর দ্বীপ আসলেই একটি দ্বীপ, নদীর কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এবং চতুর্দিকে পানি। শাহপরীর দ্বীপে যেতে পারিনি, নিকটতম পয়েন্টে গিয়েছি। উলুবুনিয়ায় গিয়েছি। এসব রাস্তা দিয়ে প্রচুর শরণার্থী এসেছে। একটু দূরে এবং উত্তরে নাফ নদীর তীরবর্তী উলুবুনিয়া গ্রাম দিয়েও অনেক এসেছে। তমব্রু-ঘুমধুম দিয়েও এসেছে প্রচুর। আরো অন্যান্য জায়গা দিয়ে এসেছে। আসার পর তাদের অস্থায়ীভাবে একরাত দু’রাত স্কুলে মাদ্রাসায় পরিত্যক্ত ঘরে যেকোনো প্রকার আশ্রয়ে রেখে অতঃপর ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। অথবা তাৎক্ষণিকই ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। রোহিঙ্গা আসছে, ক্যাম্পে অস্থায়ী কুঁড়েঘর বানানো হচ্ছে, টিউবওয়েল বসানো হচ্ছে, লেট্রিন বা পায়খানা বানানো হচ্ছে, খাদ্যদ্রব্য বিতরণ হচ্ছে, অসুস্থকে চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে এবং সন্তান সম্ভবা মহিলাকে সন্তান প্রসবেও সাহায্য করা হচ্ছে। সব কাজই একই সাথে হচ্ছে। এরই মধ্যে বৃষ্টি-বাদল হয়েছে, সন্তান প্রসব হয়েছে, কেউ না কেউ মারা গেছে, ছোটখাটো ঝগড়াঝাটি হয়েছে, রোহিঙ্গাদের গরু পানির দরে কিনে নিয়েছে স্থানীয় দালালরা, যেখানে যত প্রকারের বাঁশ ছিল, বেশির ভাগ কেটে ক্যাম্প বানানোর জন্য নিয়ে আসা হচ্ছে। সব কাজ একসাথে হচ্ছে। কোনো কাজ হঠাৎ করে ঠেকানো যায় না, কোনো কাজ বিদ্যুৎ বেগে শেষও করা যায় না। অতএব কষ্ট হতে বাধ্য। সেবা দানকারীদেরও কষ্ট, সেবা গ্রহণকারীদেরও কষ্ট। কিন্তু সুসংবাদ হলো, প্রথম সাত দিনের পর একটু উন্নতি হয়েছে, আবার সাত দিন পর আরেকটু উন্নতি হয়েছে, সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর উন্নতি ধারাবাহিকভাবে হচ্ছে এবং এখনো উন্নতির লক্ষ্যে কাজ হচ্ছে। এটাই বাস্তবতা। হাজার হাজার রোহিঙ্গা দিন-রাতে বাংলাদেশে এসেছে, বন্যার পানির মতো মানুষের বন্যা হয়েছে। তাদের সামাল দেয়া, যৎকিঞ্চিৎ আশ্রয় দেয়া এটাও একটি বিরাট সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল এবং ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ ছিল। বাংলাদেশের বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসন এটা পেরে উঠেছে। তার জন্য ধন্যবাদ জানাই এবং আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করি।

মগদের অত্যাচারে প্রতিবাদী রোহিঙ্গা
আমি রোহিঙ্গাদের মোট তিনটি ক্যাম্পে গিয়েছি; একটি মাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প আছে, সেইটিসহ। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দশ-বিশজন রোহিঙ্গার সঙ্গে মেশামেলা করেছি। কিছু কিছু ছবি আমার ফেসবুকে দিয়েছি; ইংরেজি অক্ষরে আমার নামের তিনটি অক্ষর (সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম) নাম বানান করলে ফেসবুকে আমার টাইমলাইনে যেতে পারবেন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভাষার সঙ্গে, চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল বা দক্ষিণ অঞ্চলের ভাষার কিছুটা মিল আছে। মনোযোগসহকারে শুনলে আমাদের মতো চাটগাঁইয়াদের বুঝতে কষ্ট হয় না। আমার বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায়। তাই আমি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে রোহিঙ্গা পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। আমরা যাদের শুদ্ধ বাংলায় বা ভদ্রভাবে বলি ‘মিয়ানমারের সৈনিক’, ক্যাম্পের মধ্যে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গারা তাদের ডাকে মগ। ক্যাম্পের মানুষগুলোকে দেখেছি শোকে পাথর। নিজের মনকে যারা একটুখানি শক্ত করতে পেরেছে, তাদের দেখেছি প্রতিবাদী। যা হোক, এ প্রসঙ্গে আগামী কলামে আরেকটু লিখব।

সৈনিক সমাচার ও আমার পরিচয়
বিগত ৭ এবং ৮ অক্টোবর সফরের সময়, সরকারি-বেসরকারি অনেক লোকের সাথে কথা বলেছি, তাদের সবার প্রতি সম্মান ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার রাজনৈতিক পরিচয়টিকে গৌণ এবং উহ্য রেখেছি ইচ্ছাকৃতভাবে। কারণ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সরকারের রোষানলে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল বা থাকে। আমার সাবেক সৈনিক পরিচয়কে সর্বদা গৌণ রেখেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার দয়ায় এবং বিগত অন্তত ৩০ বছরের (যার মধ্যে ২১ বছর অবসর জীবন) পরিশ্রমের কারণে, আমার চেহারা এবং নাম সাধারণভাবেই বা অনেকাংশেই পরিচিত। সাধারণত সামরিক বাহিনীর চাকরিরত অফিসার ও সৈনিকদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা থাকে, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সাথে মেলামেশা করার ওপর; কিন্তু বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের রেওয়াজ হলো, সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী হলে তারা ধোয়া তুলসীপাতার মতো অথবা আসমান থেকে নেমে আসা ফেরেশতার মতো। বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের রেওয়াজ হলো, সরকারের বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী হলে তারা সামরিক বাহিনীর জন্য সর্ব অবস্থায় পরিহার্য, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পশুপাখি থেকেও মূল্যহীন বা ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের মতো। বাংলাদেশের এই দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক রেওয়াজ অত্যন্ত গর্হিত রেওয়াজ। বর্তমানে সেই রেওয়াজটি তুঙ্গে আছে। আমি এই রেওয়াজটির সম্পূর্ণ বিরোধী। এতদসত্ত্বেও আমি বলতে বাধ্য যে, বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেখানেই পুলিশের ব্যক্তি অথবা বিজিবির ব্যক্তি অথবা সেনাবাহিনীর সৈনিকেরা সামনে পড়েছেন, সেখানেই তারা সম্মান দেখিয়েছেন আন্তরিকভাবে এবং পরিস্থিতি বুঝতে সহায়তা করেছেন। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তাদের কাছে আমি রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম না বরং একজন সাবেক সেনাসদস্য যিনি সেনাবান্ধব, যিনি নির্যাতনবিরোধী একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি বাংলাদেশবান্ধব, যিনি স্পষ্টবাদী, যিনি সৌজন্যপ্রিয়। আমি সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ, বিজিবি সদস্য ও সেনাসদস্যদের জন্য তথা বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর জন্য দোয়া করতেই থাকব।

অসমাপ্ত কথা সমাপ্ত করতে হবে
সাধারণত প্রতি বুধবার এই বহুল প্রচলিত পত্রিকায়, আমার লেখা কলাম প্রকাশিত হয়। বছরে দু’-একবার এর ব্যতিক্রম হয়। এবারো একটু ব্যতিক্রম হবে। আজকেরটি ছাড়া গত চারটি কলাম প্রতি বুধবারে বের হয়েছে, কিন্তু প্রথম দু’টি এবং শেষের দু’টি একই বিষয় ছিল তথা জোড়া ছিল। পাঠকের মতামত হলো, সাত দিন পরে চিন্তাধারা মিল রাখা এবং স্মৃতিশক্তিতে আনা কঠিন হয়ে যায়। তাই পাঠকের অনুরোধ, যদি কোনো বিষয় একাধিক কলামে বিস্তৃত হয়, তাহলে সেই কলামগুলো পরপর ছাপালে ভালো। ওই পরিপ্রেক্ষিতেই, আজকের কলামের অবশিষ্ট অংশ বা দ্বিতীয় এবং শেষ অংশ আগামীকাল ১৯ অক্টোবর (বৃহস্পতিবারই) প্রকাশ হবে।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
যোগাযোগ : mgsmibrahim@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫