ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

প্রাণি ও উদ্ভিদ

বিপন্ন বলধা গার্ডেন : প্রতিনিয়তই সৌন্দর্য হারাচ্ছে!

নাজমুল হোসেন

১৬ অক্টোবর ২০১৭,সোমবার, ১৮:০০


প্রিন্ট

বলধা গার্ডেন ঢাকার বুকে একখণ্ড সবুজ স্বর্গলোক। ১৯০৯ সালে এই বাগান প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন বলধা এস্টেটের জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী। নারায়ণ রায় মারা যাওয়ার পর ১৯৪৩ সালে কলকাতার হাইকোর্ট ট্রাস্টের মাধ্যমে বাগানের দেখাশোনা করা শুরু করে। পরে ১৯৬২ সালে বন বিভাগকে বলধা গার্ডেনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়। এই নান্দনিক বাগানটি বর্তমানে উন্মুক্ত পতিতাপল্লীতে পরিণত হয়েছে! হারিয়ে গেছে দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির অনেক গাছ। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরের আদর্শ স্থানের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে বখাটে, মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে। লিখেছেন নাজমুল হোসেন

জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ৩৪ বছরে অপার মমতায় গড়ে তুলেছিলেন জীবন্ত উদ্ভিদের জাদুঘর বলধা গার্ডেন। বলধা গার্ডেনে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে প্রায় ৮০০ প্রজাতির ১৮ হাজার উদ্ভিদ সংরক্ষণ আছে। আর বর্তমানে অযত্ন-অবহেলা আর অদূরদর্শিতায় সঙ্কটাপন্ন বলধা গার্ডেন। এখানে তিনি দু’টি উদ্যান তৈরি করেন। প্রথম উদ্যানটির নাম রাখেন ‘সাইকী’ অর্থ ‘আত্মা’। দ্বিতীয় উদ্যান ‘সিবলী’ অর্থ ‘প্রকৃতির দেবী’। পরবর্তী সময়ে এ দুয়ের সম্মিলনে পূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করে ‘বলধা গার্ডেন’ নামে। এই বাগানের আয়তন ৩.৩৮ একর। প্রকৃতপক্ষে এটিকে দুর্লভ গাছের স্টোর হাউজ বলা যেতে পারে। সে সময় দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিরা এই বাগান দেখতে আসতেন।

রাজধানী সুপার মার্কেট পেরিয়ে হাটখোলার রাস্তা ধরে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই পুরান ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত বলধা গার্ডেনে ঢুকেই চোখে পড়বে প্রশস্ত রাস্তা। দুই ধারে অসংখ্য প্রজাতির দেশী-বিদেশী গাছ। চওড়া রাস্তা দিয়ে বাগানটি দু’ভাগে বিভক্ত। ঢুকে কিছুদূর গেলেই হাতের বামে পড়বে শঙ্খনদ-পুকুর। চার ধারে বসে আড্ডা দেয়ার মতো বেশ জায়গা। আছে পাকা সিঁড়ি, ধাপ নেমে গেছে পানি পর্যন্ত। অনেকেই পুকুরের পানিতে গোড়ালি ডুবিয়ে সেখানে বসে গল্প করছেন।
শঙ্খনদ লাগোয়া দোতলা বাড়ির নাম ‘জয় হাউজ’। পুরনো কাঠামোতে দোতলায় ওঠার সিঁড়িটা লোহার, সামনে তিন দিকে খোলা বারান্দা। সেখানে প্রকৃতির নির্মল বাতাসে জিরিয়ে নেয়ার মতো পরিবেশ।

অসংখ্য বিরল ও দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে আছে অর্কিডের বৃহৎ ভাণ্ডার। নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদের মধ্যে শাপলা, নীলপদ্ম, হলুদ শাপলা, কচুরিপানা এবং সুদৃশ্য আমাজান লিলি। ২ মিটারের বেশি ব্যাসার্ধের থালার মতো দেখতে এর পাতা অনেক পুরু ও শক্ত। লিলি ফুল খুবই আকর্ষণীয়, সন্ধ্যায় ফোটে। ক্যাক্টাস হাউজে রয়েছে বিচিত্র ধরনের মনোমুগ্ধকর ফণিমনসা গাছ।

এ ছাড়া বাগানে রয়েছে দুর্লভ পামপ্রজাতির উদ্ভিদের এক বিশাল সংগ্রহ। রয়েছে হরেক রকমের লতা, গুল্ম, ঔষধি ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। এই বাগানে দেখা যায় দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির গাছ শারদমল্লিকা, লতাজবা, ক্যানাংগা, কনক সুধা, কণ্টক লতা, প্যাপিরাস, ধূপগাছ, শ্বেত শিমুল, হিং, উভারিয়া, রুপেলিয়া, কর্ডিয়া, অঞ্জন, গড়শিঙ্গা, অক্রকারপাস, পোর্ট ল্যান্ডিয়া, ওলিয়া ইত্যাদি।

নরেন্দ্র নারায়ণের মৃত্যু হলে কলকাতা হাইকোর্টের নিয়ন্ত্রণে একটি ট্রাস্টের অধীনে বাগান ন্যস্ত হয়। ১৯৫১ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এর তত্ত্বাবধানে ছিল পাকিস্তান সরকারের কোর্ট অব ওয়ার্ডস। বন বিভাগ এর নিয়ন্ত্রণ পায় ১৯৬২ সালে। বর্তমানে বাগানটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব বাংলাদেশ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান কর্তৃপক্ষের। প্রবেশ টিকিটের দায়িত্ব ইজারাদারের। প্রবেশ ফি ৩০ টাকা। সিবলী অংশ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। সাইকী অংশ সংরক্ষিত। শুধু বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে দেখার সুযোগ রয়েছে। বলধা গার্ডেনে যে গাছপালা আছে, তা শুধু এ দেশের জন্যই নয়, বিশ্বের উদ্ভিদ বিশারদদের কাছেও অমূল্য সম্পদ। সরকার ঘোষিত ৯৩টি হেরিটেজের মধ্যে বলধা গার্ডেন অন্যতম।

বর্তমান প্রেক্ষাপট: প্রতিটি গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে লাগানো আছে টিনের নামফলক। বাদুড় অতি পরিচিত একটি প্রাণী হলেও শহরের প্রকৃতি থেকে আজ উধাও। তবে এই গার্ডেনে আজও দেখা মেলে শত শত বাদুড়ের। এলাকাবাসীর মতে, শতবর্ষ ধরে এ উদ্যানে বাদুড়ের বসবাস। 

ওয়ারী ও এর আশপাশের এলাকাকে একসময় অভিজাত এলাকা হিসেবে গণ্য করা হতো। আর এ অভিজাত এলাকার আভিজাত্য অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল বলধা গার্ডেন। অপ্রিয় হলেও সত্য, বেশ কিছুকাল ধরে এখানে প্রকৃতি-প্রেমিক ও রুচিশীল দর্শনার্থীদের আনাগোনা দেখা যায় না। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরের আদর্শ স্থানের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে বখাটে, মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে।

দিনের পর দিন এখানে বেড়ে চলছে নানা রকম অসামাজিক কার্যকলাপ। পার্কটি এখন প্রেমিকযুগলদের নোংরামি আর মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এখন আর কোনো ভদ্র, রুচিশীল মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে ঘুরতে আসার সাহস করছেন না। পার্কে প্রবেশ করলে যে কাউকেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এমন দৃশ্য চোখে পড়ে যা হয়তো বাইরে প্রকাশ করতেও অনেকে কুণ্ঠাবোধ করেন।

এ দিকে গার্ডেনের চলাচলের রাস্তা অপরিষ্কার, একটু বৃষ্টি হলে বাগানের ভেতরের রাস্তায় পানি জমে থাকে। বসার জায়গাগুলোও অপরিষ্কার। পড়ে থাকে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। স্কুল ফাঁকি দিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের ঢুকতে দেয়ায় দিন দিন বাড়ছে তাদের সংখ্যা। অভিযোগ রয়েছে গেটের বাইরে এসব যুগলের কাছ থেকে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করে। বাগানে গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসে থাকতে দেখা যায় ড্রেসপরা স্কুলছাত্রী ও কলেজপড়–য়া শিক্ষার্থীদের। শুধু তাই নয়, পদ্মদীঘির পাড়, শতায়ু উদ্ভিদের আড়াল, গোলাপ বাগান, আঙুর বাগান বা বাঁশঝাড়ের আড়ালে জোড়া জোড়া তরুণ-তরুণীর দৃষ্টিকটু আচরণ চোখে পড়ে।

বর্ষায় গাছগুলো সবুজাভ হয়ে উঠলেও অযত্ন-অবহেলার ছাপ ও পরিচর্যার অভাব সুস্পষ্ট। চার পাশের উঁচু দালানে প্রায় ঢাকা পড়েছে বাগানটি। দিনের আলোয়ও পেছনের দিকটা বেশ অন্ধকার। সূর্যের আলোর পরশ থেকে বঞ্চিত বৃক্ষ, উদ্ভিদরাজি উঠে আর দাঁড়াতেই পারছে না। পরিবেশের দূষণ থেকেও নিজেদের রক্ষা করার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। চার পাশে উঁচু ভবন ও রাস্তা নির্মাণ হওয়ার কারণে বাগানের জমি নিচু হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আশপাশের বর্ষার জলের সঙ্গে বর্জ্যও ঢোকে বাগানে। পরবর্তী সময় পানি শুকিয়ে গেলেও বর্জ্যগুলো রয়ে যায় বাগানেই। এসব কারণে বলধা গার্ডেনের উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

এরই মধ্যে অনেক দুষ্প্রাপ্য প্রজাতি হারিয়ে গেছে। গোলাপের বাগানে ছিল প্রায় ২০০ জাতের গোলাপ। এর বেশির ভাগই এখন বিলুপ্ত। বিরল সংগ্রহের একমাত্র প্যাপিরাস গাছটিও আর নেই। বাগানের ভেতর জলাবদ্ধতার কারণে বৃষ্টির পানির সঙ্গে আসা পয়োনিষ্কাশন নালার ময়লা গাছের গোড়ায় জমে গাছটির মৃত্যু হয়েছে। একসময় দুষ্প্রাপ্য সুপারপাইন ছিল দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ। সেটিও এখন নেই। উদ্ভিদবিজ্ঞানী, গবেষক ও পরিবেশবিদদের দাবি, বলধা গার্ডেন আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সেখানে যা কিছু এখনো অবশিষ্ট আছে, তার পরিপূর্ণ সুরক্ষা নেয়ার সময় এখনই। এই বিশেষায়িত উদ্যানকে ইজারা দেয়া এবং টিকিটের বিনিময়ে তা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই বাগানে এমন অনেক গাছ রয়েছে, যার দ্বিতীয়টি কোথাও সংরক্ষিত নেই। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ মোতাবেক মাটি ভরাট করে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নতুন নতুন চারা রোপণ, সযত্ন রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারির মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটির যত্ন নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উদ্ভিদ সম্পর্কে জানতে পারবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫