ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

কর্পোরেট দিগন্ত

ব্যবসায়িক মন্দায় গুটিয়ে যাচ্ছে বহু প্রতিষ্ঠান

জিয়াউল হক মিজান

১৬ অক্টোবর ২০১৭,সোমবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০১৭,রবিবার, ২৩:৩৯


প্রিন্ট

রাজধানী ঢাকার ব্যাংকপাড়া খ্যাত মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা। মাত্র কয়েক বছর আগেও এ এলাকায় একটি অফিস স্পেস ভাড়া পাওয়া ছিল রীতিমতো ভাগ্যের ব্যাপার। এখন সময় পাল্টে গেছে। মতিঝিলসহ ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে ঝুলছে ভাড়ার বিজ্ঞপ্তি। পত্রিকার পাতার একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে অফিস ভাড়ার বিজ্ঞাপন। বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর প্রতিটি ভবনেই প্রতি মাসে অফিস ছেড়ে দিচ্ছে কোনো না কোনো কোম্পানি। ভাড়ার হার অনেক কমিয়েও ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না অনেক স্পেসমালিক।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাসা ভাড়াসহ দৈনন্দিন সব খরচই বেড়েছে। বেড়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন, শ্রমিকের মজুরিসহ সব কিছুই। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। সম্প্রসারণ তো দূরের কথা, অনেকের পক্ষে চলমান ব্যবসা ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার আগে খরচ কমাতে অনেকে কর্মচারী ছাঁটাই করছেন, বড় অফিস ছেড়ে ছোট অফিসে যাচ্ছেন কিংবা অফিস ছেড়ে দিয়ে নিজ বাসার একাংশকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করছেন।
মন্দাবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে একটি নামকরা ডেভেলপার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, চার বছর ধরে কোনো ব্যবসা নেই। বেচাবিক্রি প্রায় বন্ধ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ কোনো কাজে হাত দেয়ার সাহস পাচ্ছে না। আট বছর আগে ৪৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরু করি। এখন মাঠে যে পরিমাণ পুঁজি আছে, লোকে পাবে তার চেয়ে অন্তত এক কোটি টাকা বেশি। খরচ কমাতে গিয়ে ১৫ জন কর্মচারীর মধ্যে আটজনকেই ছাঁটাই করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, অফিস ভাড়া অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি বিক্রি করে রিকশায় চড়ছি, কিন্তু কোনোভাবেই ব্যবসা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যবসায়িক মন্দার জন্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি সরকারের ভুল নীতিমালাকে দায়ী করে ওই ব্যবসায়ী বলেন, বিনিয়োগ ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করার পর যে লাভ হবে, তার ৩৫ শতাংশ সরকারকে ট্যাক্স দিতে হবে। ৪০০ টাকার ট্রেড লাইসেন্স ৪০ হাজার টাকা দিয়ে নবায়ন করতে হবে। অফিস ভাড়ার ওপর ভ্যাট দিতে হবে। ব্যবসায়িক কাজে যত মালামাল কিনব সব কিছুর ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হবে। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা কম দিলে সরকারের কাছে জবাব দিতে হবে। আর বেশি দিলে তার ওপর ট্যাক্স দিতে হবে। অথচ হরতাল-অবরোধ বন্ধে সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেবে না। চাঁদাবাজদের অত্যাচার থেকে বাঁচানোর কোনো ব্যবস্থা নেবে না। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়ারও ব্যবস্থা করবে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (পিসিসিআই) সভাপতি হোসেন খালেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, মানুষের হাতে টাকা নেই। যাদের হাতে টাকা আছে, সামগ্রিক বিবেচনায় তারাও বড় কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কটের কারণে অনেকে চাইলেও ব্যবসায় সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। পরপর দুই বছর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী পুঁজিহারা হয়ে গেছেন জানিয়ে তিনি কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ না বাড়িয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের ওপর জোর দেয়ার তাগিদ দেন তিনি। বিদ্যুৎ সমস্যা সম্পর্কে হোসেন খালেদ বলেন, ব্যবসার উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক খরচ কমাতে বিদ্যুৎ সংযোগ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তবে কেবল বিদ্যুৎ দিলেই হবে না, ‘কোয়ালিটিসম্পন্ন’ বিদ্যুৎ দিতে হবে। এ মুহূর্তে বিদ্যুৎ দিলে শুধু চট্টগ্রামেই তিন হাজার শিল্পকারখানা দ্রুত চালু করা যাবে দাবি করে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে উৎপাদনশীল খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্য দিকে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ, নতুন ব্যবসায়িক লাইসেন্স প্রাপ্তি প্রক্রিয়ায় স্তর কমানো ও নীতিমালা সহজীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে রফতানিকারকদের ৪২টি সংগঠনের সমন্বয়ে গড়া ফেডারেশন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশী পণ্য বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রযোজ্য ডকুমেন্টের সংখ্যা ১২টি থেকে কমিয়ে সাতটিতে আনতে হবে। ভারত ও চীনে রফতানির ক্ষেত্রে এ ধরনের ডকুমেন্টের সংখ্যা যথাক্রমে সাতটি ও তিনটি বলে জানান তিনি। প্রস্তাব করেন আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র অনলাইনের মাধ্যমে জমাদানের ব্যবস্থা প্রচলনের।
এ দিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে গত চার বছরে এক হাজার ২০০ তৈরী পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট ও ব্যাংক ঋণে সুদহার বেশি হওয়ায় শিল্পে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ হচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা তৈরি না হওয়ায় বেশি ভাড়া দিয়ে বিমানে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। পোশাক শিল্পকে বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে মন্তব্য করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ইউরোর দরপতন, ব্রেক্সিট এবং গ্যাস সঙ্কটসহ নানা কারণে আমাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১৮ শতাংশ।
বর্তমান পরিস্থিতিকে সঙ্কটময় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ১০ মাসে নতুন বাজারে আমাদের রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র এক দশমিক ২১ শতাংশ। যেখানে বিগত বছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘ দিন ধরে নতুন বাজারে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জাপানের বাজারে অন্প্রুবেশ করা যাচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বাজারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এ অবস্থায় আগামী দুই বছরের জন্য এই খাতে উৎসে কর প্রত্যাহারসহ সব ধরনের সহযোগিতার দাবি জানান তিনি। শিল্পে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে শিল্প ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রাজস্ব নীতিসহ অন্যান্য সব নীতি ও কৌশল পাঁচ বছরের জন্য স্থিতিশীল রাখারও দাবি জানান রফতানি বাণিজ্যে ৮২ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী তৈরী পোশাক শিল্প খাতের এ নেতা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫