ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

কর্পোরেট দিগন্ত

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দরিদ্ররা দুর্গতিতে

আবদুল্লাহ আল মাহমুদ

১৬ অক্টোবর ২০১৭,সোমবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০১৭,রবিবার, ২৩:৩৯


প্রিন্ট

কেস স্টাডি-১
রাজধানীর পুরানা পল্টনে কথা হয় রিকশাচালক আজিবরের সাথে। পল্টন মোড় থেকে শাপলা চত্বরের ভাড়া ৩০ টাকা চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মাণ্ডার যে গ্যারেজে থাকি সেখানে ভাড়া বেড়েছে। রিকশার জমা ২০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন গ্যারেজের মালিক। যে মহিলা খাবার সরবরাহ করেন তিনি এখন রোজ ১২০ টাকা করে নেন। এত দিন ১০০ টাকা দিয়ে তিনবেলা ভাত খেতাম। গরিব মানুষের কাছে ভাতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে আজিবর বলেন, চালের দাম যেভাবে বাড়ছে, ভয়ে আছি মহিলা কোন দিন ভাতের দাম আরো বাড়িয়ে দেন। যানজটের কারণে সারা দিন রিকশা চালিয়েও টাকার বরকত হয় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, আপনার কাছে বেশি ভাড়া মনে হলেও সব খরচ দেয়ার পর বউ-সন্তানের জন্য তেমন কিছুই থাকে না।
কেস স্টাডি-২
রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় ছুটাবুয়ার কাজ করেন রিজিয়া বেগম। থাকেন কয়েকজন মিলে মেস করে। স্বামী-সন্তান থাকে ময়মনসিংহের গ্রামের বাড়িতে। এক আঁটি লালশাকের দাম ৩০ টাকা জানিয়ে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা তো মাছ-গোশত চাই না। ৬০ টাকার শাক কিনে তিনজন মানুষ এক বেলাও খেতে পারি না। আগে চাল কিনতাম ৩৬ টাকায়। এখন কিনতে হয় ৫৫ টাকা দিয়ে। বাড়িওয়ালা ক’দিন পরপরই ভাড়া বাড়ায়। সারা মাস মানুষের বাসায় বাসায় ঘুরে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যা পাই, নিজের পেট চালাতেই খরচ হয়ে যায়।
কেস স্টাডি-৩
রাজধানীর মধুবাগ ঝিলপাড়ে অবস্থিত মনিরের গ্যারেজ থেকে ভাড়া নিয়ে রিকশা চালান শহীদুল হক। থাকা-খাওয়া বাবদ দিন শেষে পরিশোধ করতে হয় ১৭০ টাকা। একবেলা রিকশার ভাড়া বাবদ দিতে হয় আরো ৮০ টাকা। পরিবারের সদস্যরা গ্রামে থাকার পরও শহীদুলের দৈনিক খরচ হয় অন্তত ৩০০ টাকা। তার ভাষায়, রিকশা চালিয়ে কোনো কোনো দিন খরচের টাকাটাও তোলা যায় না। শহরে রিকশা ভাড়া অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পরও খরচ তুলতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শহীদুল বলেন, যানজটের কারণে ২০ মিনিটের রাস্তা যেতে আড়াই ঘণ্টা লাগে। বাড়তি সময়ের জন্য তো কেউ বাড়তি ভাড়া দেয় না। তিন-চারটা খেপ মারতেই বেলা শেষ হয়ে যায়। আয় না বাড়লেও খরচ দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কেবল আজিবর, রিজিয়া কিংবা শহীদুল হক নয়, চাল-সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষ। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের নি¤œবিত্ত পরিবারগুলো এখন রীতিমতো বাজার আতঙ্কে ভুগছে। অনেক দরিদ্র মানুষ এখন অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে চোখে সর্ষে ফুল দেখছে তারা। চলমান বাজার পরিস্থিতিতে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে নুন আনতে পান্তা ফুরানো মানুষেরা। কেউ সঞ্চয় ভেঙে আর কেউ সংসার চালাচ্ছে পুঁজি ভেঙে।
রাজধানীর খুচরাবাজারে মোটা চালের কেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা। সরু চাল কিনতে হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়। ৭০ টাকার কমে সবজিও মিলছে না। শাকের কেজিও ৭০ থেকে ৮০ টাকার। ৫৫ টাকায় স্থির হয়ে গেছে পেঁয়াজের দাম। ২৪০ টাকায় উঠেছে কাঁচা মরিচের কেজি। নতুন করে ২০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি ফার্মের মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে দেড় শ’ টাকা। ফার্মের পাঙ্গাশ ছাড়া সব মাছের দামই আকাশছোঁয়া। চাল-সবজির লাগামছাড়া দাম, পেঁয়াজের ঝাঁজ আর মরিচের ঝালে বাজারজুড়ে বিরাজ করছে হাহাকার অবস্থা। এতে সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় পড়েছেন নির্ধারিত ও স্বল্প আয়ের মানুষ।
বাজারের এই অগ্নিমূর্তি দেখে হতাশ বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা মইনুল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের মতো মধ্যবিত্তের তো বাজারে ঢোকার অবস্থাই নেই। তিনি বলেন, চলমান অর্থনৈতিক মন্দায় আয়ের রাস্তাগুলো দিনদিন সরু হয়ে আসছে, অথচ জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হু হু করে। অসাধু ব্যবসায়ীদের ধরতে সরকার সামান্য নড়েচড়ে বসার পরিপ্রেক্ষিতে চালের দাম কিছুটা কমে আবার বেড়েছে মন্তব্য করে মইনুল বলেন, সরকার চালের বাজার এক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক করতে পারে। খোঁড়া অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়া অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যকর অভিযান শুরু করার দাবি জানান তিনি।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সোলায়মান শেখ নয়া দিগন্তকে জানান, মাছ, গোশত কেনা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছেন। ডাল, ডিম, আলু ভর্তাই তার পরিবারের নিত্যখাবার। কেনাকাটার ক্ষেত্রে মহল্লার মুদি দোকানই তার ভরসা। ‘মাসকাবারি’ বাকি খান। বেতন পেয়ে সাধ্যমতো পরিশোধ করেন। ফলে প্রতি মাসেই বাড়তে থাকে বকেয়ার পরিমাণ। পাওনার অঙ্ক বেড়ে যাওয়ায় লজ্জায় জানতেও চান না কোন জিনিসের কত দাম। বলেন, এভাবে চলতে থাকলে ঢাকা শহর ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫