ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

আরাকানের মেয়ে

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

১৪ অক্টোবর ২০১৭,শনিবার, ১৭:০৮


প্রিন্ট
ছবি প্রতীকি...

ছবি প্রতীকি...

মেয়েটিকে দেখে সুমন ‘থ’ মেরে হঠাৎ (!) ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। পা চলে না। জমিনের সাথে পা জোড়া যেন আটকে যায়। খানিকটা চমকেও যায়। আকাশে বিজলি চমকানোর মতো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। এক জোড়া শীতল চোখ পলকে দেখে নেয়। আহ! কী শান্ত ও গভীর মায়াময় নিষ্পাপ চাহনি। হালকা কালো মেরুণ রঙের সেলোয়ার-কামিজ পরিহিতা মেয়েটি। মাথায় ধবধবে সাদা ওড়না। ত্রাণবাহী লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আঁটসাটো ও জড়সড় হয়ে। সুমন দুই হাতের উলটো পিঠ দিয়ে নিজের দুই চোখে আলতোভাবে ডলা দেয়। তারপর চোখ মেলে আবার তাকায়। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। এ কাকে দেখছে? সম্ভিত ফিরে পায় বন্ধু অনিকের কনুইয়ের মৃদু ধাক্কায়।

-কিরে, দাঁড়িয়ে পড়লি কেন? মেয়েটার হাতে ত্রাণের প্যাকেটটা তুলে দে?
-অনিক, বুশরা!
-বুশরা! বুশরা কে?
-ওই তো...দ্যাখ।
সুমন ডান হাতের তর্জনী উঁচিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখিয়ে দেয়। অনিক এই প্রথম চোখ ফেলে বুশরার ওপর। ভালো করে তাকায় মেয়েটির দিকে। সেও বুশরাকে চিনতে পারে। সুমনের ফেসবুক বন্ধু। অনেক পুরনো বন্ধু। সে সুবাদে অনিকেরও খুব জানাশোনা। এভাবে চোখের সামনে বুশরাকে দেখে অনিকও রীতিমতো ঘাবড়ে যায়। অনিক নিজেকে দ্রুত সামলে নেয়। কিন্তু সুমন ভ্যাবাচ্যাকা দাঁড়িয়েই থাকে। দু’জন দু’জনার দিকে গভীর দৃষ্টিতে পলকহীন চেয়ে থাকে। অনেকক্ষণ কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই। অথচ কিছু দিন আগেও ফেসবুক আর মেসেনজারের বেশিভাগজুড়ে ছিল বুশরার পদচারণা। একটি দিনও কেউ কাউকে চোখে হারাত না। সকাল-সন্ধ্যে কিংবা রাতজুড়ে ছিল দু’জনের খুনসুটি ও আড্ডা। যদিও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বুশরাকে ঠিকঠাক ফেসবুকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সুমন অনেক চেষ্টা করেছিল বুশরার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে, পারেনি। উচ্ছ্বল ও প্রাণবন্ত স্বভাবের মেয়েটি চোখের সামনে এখন নীরব, নিথর ও জড়সড়। সুমন অজান্তেই নিজের শরীরে চিমটি কাটে। চোখের সামনে যা দেখছে সব সত্যি তো! স্বপ্ন নয়তো! অস্ফুটস্বরে মুখ খোলে সুমন।
-বুশরা! তুমি..?!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুশরা। মুখে কথা নেই। রাজ্যের অবাক দৃষ্টিতে সুমনের দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে আছে। শীতল আর গভীর দৃষ্টি। মুখ ফুটে কথা নয়, আর্তনাদ বের হতে চায়। নিয়তি দু’জনকে এভাবে প্রতিকূলগামী এক্সপ্রেসে দাঁড় করিয়ে দেবে, কোনো দিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

।২।
সুমন একজন এনজিও কর্মী। দেশের স্বনামধন্য একটা বেসরকারি এনজিওতে কর্মরত রয়েছে দুই বছর ধরে। বন্ধু অনিকও চাকরি করছে একই এনজিওতে। গত কিছুদিন থেকে কক্সবাজারের উখিয়া শরণার্থী ক্যাম্পে শতাধিক এনজিও কর্মীর সাথে সুমন ও অনিক কাজ করছে। মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন, খাদ্য, চিকিৎসা ও পয়ঃনিষ্কাশনসহ বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছে। চোখের সামনে মানবতার এই দীর্ঘ মিছিল ও রক্তক্ষরণ প্রতিনিয়ত তারা দেখে অভ্যস্ত। মিয়ানমারের আরাকানের মেয়ে বুশরা। সামরিক জান্তার চলমান নৃশংসতা ও উগ্রবাদী পাপিষ্ঠ বৌদ্ধদের নির্যাতন ও বর্বরতার মুখে বুশরা একমাত্র ভাই ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। বুশরাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে উখিয়া শরণার্থী শিবিরে। এই মুহূর্তে সুমন বুশরাকে নিয়ে মুখোমুখি বসে আছে। পাশে বুশরার ছোট ভাই ও বৃদ্ধা মা। নৃশংস ও বর্বরোচিত নির্যাতনের কথা বুশরা টানা বলে যাচ্ছে। চোখের জলে আবেগে গলা ধরে আসে। তবুও বলে চলে বুশরা। নিজের বাবাকে হারানোর ভয়াবহ নির্মমতার কাহিনী সুমনকে ছুঁয়ে যায়। সুমন বুশরার ছোট ভাইটাকে পরম মমতায় বুকে টেনে নেয়। আবেগে চোখ মুছে। এক আবেগঘন ভারী পরিবেশের সৃষ্টি হয় ক্যাম্পের ভেতর।

।৩।
বদলে গেছে সুমনের বর্তমান দিনলিপি। নিজের দায়িত্ব ঠিক রেখে সকাল-বিকেল দু’রেবলা নিয়ম করে বুশরাকে দেখে আসছে। বুশরার বৃদ্ধা মা ও তার ছোট ভাইকেও নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে সর্বোচ্চ উজাড় করে দিচ্ছে। এতো দিন পর্যন্ত বুশরাকে ফেসবুকে বাংলাদেশ সম্পর্কিত অনেক মজার সুন্দর সুন্দর কথা শুনিয়েছে। যখন তখন আপলোড দিয়েছে সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশের অনেক দৃষ্টিনন্দন রূপময় ছবি। এদেশে মাটি ও মানুষকে নিয়েও বলেছে অনেক বাহারি গালগল্প। আজ চোখের সামনে বুশরাকে এভাবে অসহায় অবস্থায় দেখে মানবিকতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত দেখানো সুমনের জন্য দায়িত্ব হয়ে গেছে। যদিও সুমন জানে না- এভাবে কতদিন ওদের পাশে থাকতে পারবে। সাধ ও সামর্থ্যরে সমন্বয়ে ওদের জন্য কতটুকুইবা তার পক্ষে করা সম্ভব। সুমন চাইলেও বুশরাদের নিজ হেফাজতে রাখার কোনো সুযোগ নেই। জগতের সবকিছু অনেক কঠিন নিয়মের বেড়াজালে চলে। রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা ও শর্তাধীনের আওতায় বুশরা ও তার পরিবারকে থাকতে হবে। নিয়তি তাদেরক এক অনিশ্চিত জীবনের কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেটা কতদিন ও কতকাল চলবে, কেউ জানে না। নিয়তির ওই উচ্চ আসনে যিনি, সব কিছু তিনিই দেখছেন। তিনি মহাপরাক্রমশীল। ত্রিকালদর্শী। দৃষ্টির আড়ালে ঘটে যাওয়া জগত সংসারের অনিশ্চিত ও অমীমাংসিত জটিল বিষয়গুলোর সমাধানও তিনিই ভালো জানেন। সৃষ্টির নগণ্য জীব হিসেবে সুমন আর বুশরার পক্ষে জানার কথা নয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫