ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

প্রিয়জন

কষ্ট

মু: নজরুল ইসলাম

১৪ অক্টোবর ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট


শ্রাবণ মাসের এক রাত। পরিবারের সবাইকে আমি চিৎকার করে ডাকছি। কেউ আমার কোনো কথাই শুনতে পায় না। আমার কথা বুঝতে পারে না। শুধু আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আমি শত চেষ্টা করেও যখন ওদেরকে মনের কথাগুলো বোঝাতে পারি না, তখন যেন আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। তখন আমার একমাত্র ভাষা হয়ে যায় চোখের জল। আমি অঝোরে কাঁদতে থাকি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি।
প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই যেন পরিবারে ঈদের আনন্দ নেমে আসে। কাল শুক্রবার, হুররে কি মজা হবে। সবার ছুটি কী মজা বলে সাত বছরের ছোট্ট শিশুটি আনন্দে নাচানাচি করছে। বাবা, কাল সবাই মিলে বেড়াতে যাব। অনেক মজা হবে। সারাদিন পার্কে বেড়াব, তারপর সন্ধ্যায় সবাই মিলে চাইনিজ খাব। কি মজা। বাবা তুমি প্রমিজ করো! আচ্ছা ঠিক আছে যাব, হলো! তারপর আবার নাচানাচি।
তখন রাত ৩টা কি সাড়ে ৩টা। বাথরুমে যাওয়ার জন্য বেড থেকে নামতেই মাথায় আচমকা একটা চক্কর মেরে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি ধপাস করে পড়ে যাই মেঝেতে। বস্তা পরার মতো একটা শব্দ হয়। আমার স্ত্রী হুড়মুড় করে উঠে বসে। রাফির বাবা বলে, আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি রাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। চুলগুলো এলোমেলো। চোখে মুখে রাজ্যের আতঙ্ক। ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল রাবুকে। আমি শরীরের সব শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। বাম পাশটায় কেন যেন কোনো শক্তি পাচ্ছি না। আমি ডান হাত দিয়ে রাবুর হাতটা শক্ত করে ধরে আছি। রাবু কাঁদতে কাঁদতে বলে, রাফির বাবা, কি হলো তোমার? ওঠো! আমি পারি না। রাবুর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। যেন আজ প্রথম দেখছি রাবুকে। রাবুর কান্নার শব্দে শিশু দু’টি উঠে পড়ে। ওরা এসে ওদের মায়ের কান্না দেখে ওরাও কান্না শুরু করে দেয়। আমি ওদের বলি কেঁদো না। ওরা কেউই আমার ভাষা বুঝতে পারে না। আমি হাত দিয়ে ওদের ইশারা করে থামতে বলি। ওরা শব্দ থামিয়ে ফোঁপাতে থাকে।
পরদিন সকালেই আমাদের বাসায় অনেক মেহমান আসে। আমাকে দেখতে আসে। অনেক ফলমূল নিয়ে এসেছে। রোগী দেখতে গেলে ফলমূল নিতে হয়। সবাই আমার মুখের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আহারে কত জোয়ান মানুষ! মুহূর্তে কি হয়ে গেল! আমি ওদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি, পারি না। কথা বোঝাতে না পারলেই কান্না।
এখন বিছানাই আমার জগৎ। এভাবে দিন যায়, মাস যায়। আস্তে আস্তে সব কিছু স্বাভাবিক হতে থাকে। পৃথিবী কারো জন্য থেমে থাকে না। শিশুরা স্কুলে যায়। রাবু কলেজে ক্লাস নিতে যায়। রাবু যাওয়ার আগে আমার অনেক সেবাযতœ করে। আমি একা একা বিছানায় পড়ে থাকি। একটু পানি পিপাসা লাগলে আমি উঠে খেতে পারি না। রাবু যাওয়ার সময় এক লিটারের একটা বোতল ভরে আমার ডান পাশে রেখে যায়। সবাই যখন বাসা থেকে চলে যায়, আমি তখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। চার তলার খোলা জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে ভালো লাগে। দূরের আকাশে একদল পাখি উড়ে বেড়ায়। উড়তে উড়তে পাখিরা দূর আকাশে মিলিয়ে যায়। পাখিদের আকাশে উড়তে দেখে আমারও খুব পাখি হতে ইচ্ছে করে। দূর আকাশে উড়তে ইচ্ছে করে। রাতের বেলায় দূর আকাশে তারা দেখি। কত রকমের তারা!
চিত হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে আমার বাম পাশটায় ঘা হয়ে যাচ্ছে। রাবু একটা মিল্লাত পাউডার কিনেছে। কলেজে যাওয়ার সময় ঘা তে লাগিয়া দিয়ে যায়। গন্ধ দূর হয়। আরামও পাওয়া যায়। এখন আর আগের মতো আত্মীয়স্বজন আমাকে দেখতে আসে না। ক’দিনই বা আসবে। সবাই তো ব্যস্ত। গত কয়েক দিন যাবৎ ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তার ওপর আবার মশার উপদ্রব। ভ্যাপসা গরমে মশারি খাটানোর জো নেই। রাবু বিছানার পাশে কয়েল ধরিয়ে দেয়। মাঝরাতে কখন যে কয়েল এসে বিছানার সাথে লাগে বুঝতেই পারি না। আমি জেগেই ছিলাম। ধোঁয়া দেখেই আমি চিৎকার করে ডাকতে থাকি। কয়েলের আগুন তোষক থেকে আমার শরীরে লাগতে থাকে। আমার চিৎকার ওরা কেউ শুনতে পায় না। রাবু বেচারা রাত জেগে খাতা দেখে ঘুমিয়েছে। কিছুই টের পায় না সে। আগুন আস্তে আস্তে আমাকে পোড়াতে থাকে। আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাকতে থাকি। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে আমি পুড়তে থাকি। সে যে কি কষ্ট! আস্ত মানুষ পোড়ার ভয়াবহ দুর্গন্ধে রাবু পাশের ঘর থেকে দৌড়ে আসে। আমার সন্তান দু’টি উঠে আসে রাবুর সাথে। রাবু পাগলের মতো দৌড়ে বাথরুম থেকে পানি এনে আমার শরীরে ঢালতে থাকে। আমি কথা বলার চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। আমি নীরব। রাবু আমার ডান হাত ধরে টান দেয়, রাফির বাবা কথা বলো। আমার হাতটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। আমার স্ত্রী আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার দেয়। মায়ের সাথে শিশু দু’টিও কেঁদে ওঠে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ঠিক আমার মতোই একজন মানুষ নিথর হয়ে পড়ে আছে বিছানায়।
গভীর রাতে রাবু আর সন্তানদের কান্নার শব্দে প্রতিবেশীরা ভিড় জমায় বাসায়। আহারে! কত কষ্ট পেয়ে যে মানুষটা মরে গেছে! খুব ভালো মানুষ ছিল লোকটা। সবসময় মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটত।
ভোর হতে না হতেই আত্মীয়স্বজনেরা বাসায় চলে আসে। সবাই বলাবলি করছে, লাশ বেশিক্ষণ ঘরে রাখতে নেই। যত তাড়াতাড়ি দাফন করা যায়, ততই ভালো। তা না হলে মুর্দার রূহ কষ্ট পায়। রাবুর ভাই-ভাবীরা সংবাদ পেয়ে আগেই মাইক্রোবাস ঠিক করে নিয়ে এসেছে। আত্মীয়স্বজনদের কাছে পেয়ে রাবু আর সন্তান দু’টি আরো তুমুল বেগে কাঁদতে থাকে। আমি কত করে বলি রাবু, কাঁদছ কেন, কী হয়েছে আমার? রাবু আমার কথা বুঝতে পারে না। ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা শেষ দেখা দেখতে আসে। আহারে, লোকটা কত ভালো ছিল। দেখা হলে কী সুন্দর করে সালাম দিত। হাসি ছাড়া কথা বলত না। সন্তান দু’টি কেমন অল্প বয়সে এতিম হয়ে গেল।
সবাই মিলে ধরাধরি করে মানুষটাকে গাড়িতে তোলে। তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। বিছানার চাঁদর দিয়ে মানুষটাকে ঢেকে দেয়া হয়েছে। রাবুর দুই ভাই মুখ ভার করে গাড়িতে বসে আছে। আমি সবকিছু খেয়াল করছি। রাবু আমার কোনো কথাই শুনছে না। গাড়ি চলছে গ্রামের উদ্দেশে। আমার স্ত্রী আর সন্তানেরা এখন থেমে থেমে কাঁদছে। গ্রামের আত্মীয়স্বজনদের আগেই খবর দেয়া হয়েছে। তারা নাকি কবর খুঁড়ে রেখেছে। বাড়ির উঠোনে নামানোর পর ভাইবোন সবাই গড়াগড়ি করে কাঁদছে। কিন্তু আশ্চর্য, মাকে দেখলাম একটুও কাঁদছে না। বলছে, তোরা সবাই থাম, আমার রাজপুত্রকে একটু সাজিয়ে দেই। আমার মতোই দেখতে মানুষটাকে মা চোখে সুরমা লাগিয়ে দেয়, সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দেয়। আমি বললাম মা, আমার কী হয়েছে? আবার আশ্চর্য হলাম, শুধু মা আমার কথা বুঝতে পারল। বলল, বাজান আজ তুমি তোমার আসল বাড়িতে যাচ্ছো। তুমি ভেবো না বাজান, আমি তাড়াতাড়িই তোমার সাথে দেখা করব।
কেন্দ্রীয় প্রিয়জন, ঢাকা

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫