ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

মতামত

বেলফোর ঘোষণা : ফিলিস্তিন ধ্বংস করলেও পারেনি ফিলিস্তিনি জনগণকে

রামজি বারুদ

১৩ অক্টোবর ২০১৭,শুক্রবার, ২০:২৯ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০১৭,শনিবার, ১৬:০৯


প্রিন্ট
বেলফোর ঘোষণা : ফিলিস্তিন ধ্বংস করলেও পারেনি ফিলিস্তিনি জনগণকে

বেলফোর ঘোষণা : ফিলিস্তিন ধ্বংস করলেও পারেনি ফিলিস্তিনি জনগণকে

কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল এবং তা রক্ষাও করা হয়েছিল; বাকিগুলো অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু যেসব প্রতিশ্রুতি আর্থার বেলফোর ১০০ বছর আগে জায়নবাদী ইহুদিদের নেতাদের দিয়েছিলেন তার সুপরিচিত ‘বেলফোর ঘোষণা’র মাধ্যমে, তার সামান্য অংশই মেনে চলা হয়েছে : এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় ইহুদিদের জন্য রাষ্ট্র এবং পদক্ষেপ নেয়া হয় ফিলিস্তিনি জাতিকে ধ্বংসের।
আসলে ব্রিটেনের তৎকালীন ফরেন সেক্রেটারি বেলফোর তার ৮৪ শব্দের ঘোষণা দেন ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বরে। তা দেয়ার সময় তার অনেক সমকক্ষের মতোই তিনি ছিলেন অ্যান্টি-সেমিটিক তথা ইহুদিবিরোধী। তিনি কমই তোয়াক্কা করতেন ইহুদি সমাজের পরিণতি সম্পর্কে। অথচ যে ভূখণ্ডটিতে ইতোমধ্যে জনবসতি গড়ে উঠেছে এমন একটি লড়াকু জাতির এবং যে জাতির শিকড় ঐতিহাসিকভাবে অনেক গভীরে প্রোথিত রয়েছে, সে ভূখণ্ডটিতে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দেন এই রেলফোর। এর একমাত্র কারণ ছিল, তিনি চেয়েছিলেন ব্রিটেনের ইসরাইলের সম্পদশালী ইহুদি নেতাদের সহায়তায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি বড় সামরিক শক্তি গড়ে তোলা।
বেলফোর তা জানুন আর নাই জানুন, ব্রিটেনের ইহুদি সমাজের নেতা ওয়াল্টার রথচাইল্ডের কাছে দেয়া তার এই সংক্ষিপ্ত বিবৃতির ব্যাপ্তি ছিল এমন যে, এটি মূলোৎপাটন করবে পুরো ফিলিস্তিনি জাতিটিকে তাদের পৈতৃক বাড়িঘর থেকে এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে অব্যাহতভাবে চলবে ফিলিস্তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংসের কাজ অমীমাংসিতভাবে। আসলে তার জোরালো সমর্থনের বিষয়টি ধরে নিয়ে তার উত্তরসূরিরা অব্যাহত রাখল ইসরাইলের প্রতি সেই সমর্থন। যে কেউ অনুমান করতে পারেন, তিনিও ইসরাইলের ব্যাপারে গর্ববোধ করতেন ফিলিস্তিনিদের দুঃখজনক পরিণতি দেখে।

এক শ’ বছর আগে যে বেলফোর ঘোষণাটি লেখা হয়েছিল সেটি ছিল এমন :
“His Majesty’s government views with favor the establishment in Palestine of a national home for the Jewish people, and will use their best endeavors to facilitate the achievement of this object, it being clearly understood that nothing shall be done which may prejudice the civil and religious rights of existing non-Jewish communities in Palestine, or the rights and political status enjoyed by Jews in any other country. I should be grateful if you would bring this declaration to the knowledge of the Zionist Federation.”

সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তৃতায় ফিলিস্তিনি অধ্যাপক রশিদ খালিদি এই ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতিকে বর্ণনা করেছেন এমন একটি ঘটনা হিসেবে, যা সূচনা করে ফিলিস্তিনে শতাব্দীব্যাপী এক ঔপনিবেশিক যুদ্ধের, যাতে সহায়তা জুগিয়েছে বেশ কয়েকটি বাইরের শক্তি। আর এই সহায়তা এখনো অব্যাহত। কিন্তু মাঝেমধ্যে কখনো কখনো সাধারণীকৃত শিক্ষায়তনিক ভাষা ও পরিশোধিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সাধারণ মানুষের বর্ণিত তাদের জীবনের দুঃখজনক ভোগান্তিকে আড়াল করে দেয়।

যখন বেলফোর তার কুখ্যাত কথাগুলো লেখা শেষ করেন, তিনি অবশ্যই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তার ওসমানীয় সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন এক খণ্ড ভূমি দেয়ার রাজনৈতিক কৌশল কতটা কার্যকর হবে জায়নবাদীদের ব্রিটেনের সামরিক অভিযানে তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে। এরপরও তার সুস্পষ্ট কোনো প্রকৃত সম্মান ছিল না লাখ লাখ আরব ফিলিস্তিনিদের প্রতি। মুসলমান ও খ্রিষ্টান উভয়ই সমভাবে যুদ্ধ ও জাতিগত নিধন, বর্ণবাদ ও শতাব্দীব্যাপী চলা অবমাননার নিষ্ঠুরতার শিকার। বেলফোর ঘোষণা কার্যত ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার একটি ডিক্রি। শুধু ফিলিস্তিনে থাকা ফিলিস্তিনিই নয়, অন্য যেকোনো স্থানে থাকা ফিলিস্তিনি বেলফোর ও তার সরকারের ডেকে আনা ক্ষতির হুমকির মুখোমুখি হয়।

তামাম নাসের। এখন তার বয়স ৭৫ বছর। তিনি লাখ লাখ ফিলিস্তিনির একজন, যাদের জীবনকে বেলফোর সারা জীবনের জন্য ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলেন। এই মহিলাকে ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ ফিলিস্তিনের তার জৌলিস গ্রামের বাড়ি থেকে উৎখাত করা হয়। তখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। তামাম এখন তার সন্তান ও নাতি-নাতনীদের নিয়ে গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছেন। দুঃসহ জীবনের চাপে এবং অন্তহীন যুদ্ধের শঙ্কা, দখল, দারিদ্র্যের কশাঘাতের ফলে আজ তিনি তার কুয়াশাচ্ছন্ন অতীতের স্মৃতি খুব কমই মনে করতে পারেন। তিনি সে স্মৃতি আর কোনো দিন ফিরিয়েও আনতে পারবেন না।

এই মহিলা আর্থার জেমস বেলফোর নামের মানুষটি সম্পর্কে খুব কমই জানেন। বেলফোর নাসের পরিবারের ভাগ্যটাকে যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বন্দী করে দিয়েছেন। তাদের জীবনকে ঠেলে দিয়েছেন এক অন্তহীন উচ্ছিন্ন জীবনের দিকে।

আমি কথা বলেছি তামামের সাথে। তিনি উম্মে মারওয়ান (মারওয়ানের মা) নামেও পরিচিত। আমি তার সাথে কথা বলেছি এ কারণে যে, আমি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে ফিলিস্তিনিদের অতীত বিষয়ে একটি প্রামাণ্য দলিল তৈরি করতে চাই। তিনি যখন জন্ম নেন, তখনই ফিলিস্তিনে চলছিল ব্রিটেনের কয়েক দশকের উপনিবেশ। এই উপনিবেশের শুরুটা হয় বেলফোর ঘোষণার মাত্র কয়েক মাস পরেই। তিনি তার নিষ্কলঙ্ক ছলাকলাবিহীন স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন, তখন তারা ব্রিটিশ কনভয়ের পেছনে ছুটতেন ক্যান্ডি-চকোলেট পাওয়ার আশায়। তখন ইহুদিদের চেনা যেত না। হয়তো তিনি পারতেন। অনেক ফিলিস্তিনি ইহুদি দেখতে ছিল ফিলিস্তিনি আরবদের মতোই। ফলে তিনি পার্থক্যটা প্রায়ই ধরতে পারতেন না। এমনকি এই পার্থক্য করার কথা তিনি ভাবতেনও না। মানুষ তো শুধু মানুষই। জৌলিস গ্রামের ইহুদিরা ছিল তাদের প্রতিবেশী। আর এটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফিলিস্তিনি ইহুদিরা বাস করত দেয়াল, বেড়া ও ট্রেঞ্চের পেছনে। তবু এরা কিছু সময়ের জন্য অবাধে হেঁটে চলে আসত ফেলাহিনদের (কৃষক) মাঝে, কেনাকাটা করত বাজারে এবং তাদের সহায়তা চাইত। কারণ, শুধু ফেলাহিনেরাই সেখানকার ভাষা জানত এবং বুঝত বিভিন্ন মওসুমের সঙ্কেত।

তামামদের ঘর ছিল কাদামাটি শক্ত করে তৈরি করা। ঘরের সামনে ছিল ছোট্ট উঠোন। যখন সামরিক কনভয় গ্রামে ঘোরাফেরা করত, তখন তার ছোট ভাইবোনেরা উঠোনের বাইরে যেত না। অল্প দিনেই এদের আনাগোনা বেড়ে যায়। হঠাৎ করেই এরা এসে যেত। তখন থেকে আর যে ক্যান্ডি শিশুদের খুশি করত, সেই ক্যান্ডি দেয়া বন্ধ হয়ে গেল।

এরপর এলো যুদ্ধ। এই যুদ্ধ সব কিছু পাল্টে দিলো। সেটি ছিল ১৯৪৮ সাল। জৌলিসের চার পাশের সব কিছু দ্রুত নিস্তব্ধ করে দিলো। সেখানে ছিল না কোনো দয়ামায়া। কিছু ফেলাহিন সীমান্ত পারি দিয়ে চলে গেল, তাদের আর কখনোই দেখা যায়নি। জৌলিসের যুদ্ধ ছিল স্বল্পস্থায়ী। গরিব কৃষকেরা পাকঘরের ছুরি ও কিছু পুরনো রাইফেল দিয়ে অগ্রসর শত্রুর সাথে পেরে ওঠেনি। ব্রিটিশ সৈন্যরা গ্রামের বাইরে থেকে জায়োনিস্ট মিলিট্যান্টদের সুযোগ করে দেয় গ্রামবাসীর ওপর হামলা করতে। অল্পক্ষণ রক্তাক্ত যুদ্ধের পর এরা গ্রামবাসীদের তাড়িয়ে দেয়। তামাম, তার ভাইয়েরা ও বাবা-মাকে জৌলিস থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এরা আর কোনো দিন তাদের প্রিয় গ্রামটি দেখার সুযোগ পাননি। এরা চলে যান গাজার শরণার্থীশিবিরে। এরপর স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন নুসিইরাতে। একসময় তাদের তাঁবু বদলে তৈরি করা হয় কাদামাটির ঘর।

গাজায় তামামের আছে যুদ্ধের অনেক অভিজ্ঞতা। বোমা বিস্ফোরণ, দখল ও ইসরাইলের নানা যুদ্ধকৌশলের অভিজ্ঞতাও, যা সম্ভবত শুধু ইসরাইলই প্রদর্শন করতে পারে। তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দুর্বলতর করে দিয়েছে তার ভঙ্গুর বয়েসী শরীর এবং তার ভাই সেলিম ও ছোট ছেলে কামালের মৃত্যুর দুঃখভার। সেলিমকে হত্যা করেছে ইসরাইলি সৈন্যরা। যখন ১৯৫৬ সালে এরা গাজা উপত্যকায় স্বল্প সময়ের জন্য অনুপ্রবেশ করে যুদ্ধ চালায়, তার এক দিন পর পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে হত্যা করা হয়। আর কামালকে বন্দী করে বন্দী অবস্থায় তাকে যে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়, এর ফলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর ফলেই সে মারা যায়।

যদি বেলফোর তার ঘোষণা অনুযায়ী আগ্রহী হতেন এ ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে যে : nothing shall be done which may prejudice the civil and religious rights of existing non-Jewish communities in Palestine,’ তবে কেন এত বছর পরও ব্রিটিশ সরকার ইসরাইলের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল থাকবে? এক শতাব্দী আগে বেলফোর ঘোষণার পর আজ ৭০ বছর ধরে কেন ফিলিস্তিনিরা নির্বাসনে থাকবে? কেন ৫০ বছর ধরে ফিলিস্তিনে চলবে ইসরাইলি বাহিনীর দখলদারিত্ব? এসব কি যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে, ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইনেরর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে চলে না। এটি কি প্রমাণ করে না যে, ইসরাইল বরাবর লঙ্ঘন করে চলেছে ফিলিস্তিনিদের মানবিক, নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার?

তামাম যখন বড় হতে লাগলেন, তিনি মানকসিকভাবে ভাবতে শুরু করেছিলেন নিজের গ্রাম জৌলিসে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে। মাঝেমধ্যেই রোমন্থন করেন সুখের স্মৃতিগুলো, সান্ত্বনার মুহূর্তগুলো। গাজায় আটকে পড়া জীবন খুবই কঠিন, বিশেষ করে তার মতো প্রবীণদের জন্য, যারা ভাঙা হৃদয় নিয়ে ভোগছেন নানা জটিলতায়।

বর্তমান ব্রিটিশ সরকারের প্রবণতা হচ্ছে মহাসমারোহে বেলফোর ঘোষণার শতবার্ষিকী পালন। এই ঘটনা আমাদের জানিয়ে দেয়, ১০০ বছরেও ব্রিটিশেরা ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নিতে পারল না। ১০০ বছর আগে বেলফোর তার অশুভ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ফিলিস্তিনিদের নিধন করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। তবে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর জন্য এটিও সত্য, স্বাধীনতার যুদ্ধ অব্যাহত রাখায় তাদের প্রতিশ্রুতি এখনো রয়ে গেছে অপরিবর্তিত। বেলফোর কিংবা ব্রিটেনের সব ফরেন সেক্রেটারি মিলে ফিলিস্তিনিদের সেই প্রতিশ্রুতি থেকে বিন্দুমাত্র সরাতে পারেনি।
এটিও একটি বড় বিবেচ্য।

লেখক : আন্তর্জাতিকভাবে একজন সিন্ডিকেটেড কলামিস্ট, বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক, PalestineChronicle.com-এর প্রতিষ্ঠাতা, তার সর্বশেষ বই My Father Was a Freedom Fighter : Gaza’s Untold Story.
ভাষান্তর : গোলাপ মুনীর

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫