ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

গরুর গাড়ির হেডলাইট ও রানিং ট্রেন

তৈমূর আলম খন্দকার

১৩ অক্টোবর ২০১৭,শুক্রবার, ২০:০২ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০১৭,শনিবার, ১৬:১৮


 তৈমূর আলম খন্দকার

তৈমূর আলম খন্দকার

প্রিন্ট

একটি জাতীয় পত্রিকায় ‘গরুর গাড়ির হেডলাইট’ শিরোনামে সম্পাদকীয় দেখে আমি মনোযোগের সাথে পড়লাম। কারণ হেডলাইটের Head শব্দটির প্রতি আমার যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে ছাত্রজীবন থেকেই। কারণ ‘হেড’ হওয়ার মজাই আলাদা। যেমন- হেডমাস্টার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট’ প্রভৃতি। নারায়ণগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ের হেডমাস্টার মীর মোয়াজ্জেম আলী একটি বেত নিয়ে স্কুলের বারান্দা দিয়ে যখন এক পাশ থেকে আরেক পাশে হাঁটাহাঁটি করতেন, তখন স্কুলমাঠে বা আনাচেকানাচে দফতরি নিরোধকে পেছনে পেছনে হাঁটতে দেখা ছাড়া আর কাউকে দেখা যেত না। ক্লাস না থাকলেও সবাই দৌড়ে ক্লাসরুমে চলে যেত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে ‘হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট’ যিনি ছিলেন, তিনিই ওই সময়ে আমার কাছে শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে মনে হতো। ফলে তখন থেকেই ‘হেড’ শব্দটির প্রতি আমার ঝোঁক শুরু। তবে সেই সময়ে উপলব্ধি করতে পারিনি, গরুর গাড়িরও ‘হেডলাইট’ থাকতে পারে। হেড শব্দটির বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘প্রধান’। ইংরেজিতে ক্ষেত্রবিশেষে আবার ‘Chief’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন- চিফ জাস্টিস, আর্মি চিফ, চিফ কনস্টেবল ইত্যাদি।

‘চিফ’ হওয়ার পেছনে স্বাচ্ছন্দ্য যেমন আছে, তেমনি বিড়ম্বনাও কম নয়। যেমন- উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনের নির্দেশ মোতাবেক রায় না দেয়ায় চার দিন পর সে দেশের প্রধান বিচারপতির লাশ একটি ড্রেনে পাওয়া যায়। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধিপতি সুলতান সোলায়মান খানের বাল্যবন্ধু ও বিশ্বস্ত সেনাপতি ইব্রাহিমকে ঘুমের মধ্যে ফাঁসি দিয়ে দিলেন তিনি নিজেই। তবে বাংলাদেশের অবস্থা এখনো সে পর্যন্ত গড়ায়নি এ জন্য যে, যারা দণ্ডমূলের কর্তা তারা হয়তো দয়া করে মনে করেছেন, ইদি আমিন বা সুলতান সোলায়মানের মতো ঘটনা ঘটালে কথিত ‘আইনের শাসন’ বা ‘অবাধ গণতন্ত্রের’ ওপরে যদি কালিমা পড়ে যায়। এটি আমার নিছক ধারণা, তবে তা কতটুকু গড়াবে তা এখনো আঁচ করা যাচ্ছে না।

কথাগুলো লিখছিলাম ষোড়শ সংশোধনী ও বিচারপতি এস কে সিনহার ঘটনাবলি নিয়ে। এস কে সিনহা যেদিন প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন, পরম্পরা তথ্য ট্র্যাডিশন মোতাবেক, তার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের বক্তব্যে অ্যাটর্নি জেনারেল সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেছিলেন, ‘বিচারপতি এস কে সিনহার প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হলো।’ বিভিন্ন টকশোতে সরকার ঘরানার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তথা মন্ত্রী, এমপি ও শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা বিচারপতি সিনহার গুণকীর্তনে মগ্ন ছিলেন তো বটেই, পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণতা ও সাহসী সিদ্ধান্তের প্রতি জানিয়েছিলেন শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। কিন্তু বিপত্তি ঘটল একটিমাত্র রায়ে, যে রায় দেয়ার পর বিচারপতি সিনহার ক্যান্সার ধরা পড়ার আগেই প্রকাশ পেল, তিনি ছিলেন রাজাকার সমর্থিত শান্তি কমিটির সদস্য এবং তার অবৈধ কোটি কোটি টাকা ও সম্পদের সন্ধানসহ মি. সিনহা হলেন সরকার ও সরকারি ঘরানার তুলোধুনোর সাবজেক্ট ম্যাটার। তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন কি ছিলেন না, তিনি অবৈধ সম্পদের মালিক কি না বা তার ক্যান্সার হয়েছে কি বা হয়নি (তবে তিনি কোনো রোগে আক্রান্ত হন তা আমি চাই না, হয়ে থাকলে তার সুস্থতা কামনা করি) তা আজকে জাতির সামনে আলোচ্য বিষয় নয়। বিষয়টি হলো- প্রধান বিচারপতি মি. সিনহার প্রতি সরকারের যে আচরণ দৃশ্যমান হলো, তাতে কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো? ব্যক্তি সিনহা না বিচার বিভাগ?

বিচার বিভাগ রাষ্ট্রেরই তিন বিভাগের একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হওয়া সত্ত্বেও একটি রায়কে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতিকে সরকারের এ ধরনের হেনস্তা হতে হবে কেন? এই হেনস্তার জন্য সরকারবিরোধী আইনজীবীরা সোচ্চার হলেও ‘স্বাধীন বিচার বিভাগ’ নীরব দর্শকের ভূমিকায়। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে গত ৩ জুলাই প্রদত্ত এক রায়ে সংবিধান মোতাবেক বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে যে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে, তা নিম্নরূপ-
“The independence of the judiciary is the foundation stone of the constitution and as contempated by article 22, it is one of the fundamental principles of state policy. The significance of an independent judiciary, free from the interference of other two organs of the government as embodied in article 22 has been emphasized in articles 94(4), 116A and 147 of the constitution. There has been a historic struggle by the people of this country for independence of judiciary, to uphold the supremacy of the constitution and to protect the citizens from violation of their fundamental rights and from exercise of arbitrary power..”

সরকারের নির্বাচনী বৈধতা নিয়ে আছে নানা বিতর্ক। এটাই তাদের আতঙ্ক। জানা যাচ্ছে, ‘ষোড়শ’ সংশোধনী বাতিলের রায়েই ১৫৪ জন এমপিকে অবৈধ ঘোষণার বীজ বপন করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় প্রধান বিচারপতি ১৫৪ জন এমপিকে অবৈধ ঘোষণার আতঙ্কে প্রধান বিচারপতির ছুটি নিয়ে সরকার যে নাটকের সৃষ্টি করল, তার যবনিকা টানতে প্রধানমন্ত্রী কতটুকু কৌশলী হচ্ছেন, এটাই এখন দেখার বিষয়।

প্রধান বিচারপতি হয়তো একদিন মুখ খুলবেন। কিন্তু ইতোমধ্যে অনেকেই মুখ খুলেছেন। সরকারি ঘরানার আইনজীবী ও হিন্দু কমিউনিটি নেতা রানা দাসগুপ্ত প্রধান বিচারপতির সাথে মন্দিরে সময় কাটিয়ে দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, ‘মি. সিনহাকে অসুস্থ মনে হয়নি।’ ভারতীয় চ্যানেল জি-নাইন বলেছে, মাইনরিটি কমিউনিটি বলেই প্রধান বিচারপতিকে এভাবে হেনস্তা করা হলো। প্রথিতযশা আইনজীবী নেতারা বলেছেন, এটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হামলা।

প্রচার বা অপপ্রচার যা-ই হোক না কেন, সাধারণ জনগণ মনে করেÑ ছুটির দরখাস্তে মি. সিনহা স্বাক্ষর করেননি বা তাকে জোর করে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। সরকার বিষয়টির সত্যতা নিয়ে জনগণের মনে আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে, সময়ে সময়ে যাদের ব্যবহার করে বঙ্গভবনে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে, তারাই ছুটির দরখাস্তের নাটক মঞ্চস্থ করেছেন, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য জাতিকে আরো অপেক্ষা করতে হবে, তবে ইতোমধ্যে আরো নাটক বা ঘটনা-অঘটন মঞ্চস্থ হয় কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার আগে ও পরে প্রধান বিচারপতি তো বটেই, কোনো বিচারপতিকেই এ ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। তবে ইদি আমিনের রাষ্ট্র হলে তা ভিন্ন কথা। বিচারপতি সিনহা প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেয়ার পর তার অনেক সিদ্ধান্তে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়েছে, দুদক ও পুলিশের ক্ষমতা বেড়েছে, লাভবান হয়েছে সরকার, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনরত বিরোধী দল। তার প্রভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ ক ধারায় প্রদত্ত হাইকোর্টের ক্ষমতাকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে, অ্যান্টিসিপ্যাটরি জামিনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে, হাইকোর্টের দেয়া প্রথিতযশা রাজনীতিবিদদের জামিন স্থগিত হয়েছে এবং সব কিছুতেই তিনি প্রভাব বিস্তার করেছেন। তারপরও মি. সিনহার প্রতি সরকারের এ ক্ষোভ অনেক অর্থ বহন করে, যা মোটা দাগে উপলব্ধি করার কথা নয়।

সরকারের বক্তব্যে মনে হয়, দেশে এখন স্বর্ণযুগ চলছে। যদিও চালের দাম প্রতি কেজি ৬০-৭০ টাকা, কাঁচা মরিচ কেজিপ্রতি ২২০ টাকা, গরুর গোশত ৫০০-৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গ্যাস, বিদ্যুতের মূল্য তো প্রতিদিনই বাড়ছে। দ্রব্যমূল্য জনগণের নাগালের বাইরে। ভূমিদস্যুরা সরকারি দলের লোক। ভূমিদস্যুতা ও ব্যাংক লুটে সরকারি দল সব সময়ের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। পুলিশ লেলিয়ে বিরোধী দলের মুখ বন্ধ করা হয়েছে। বিরোধীদলীয় পাঁচজন লোক একত্র হলেও নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। সংবিধান মোতাবেক জনগণের সভা-সমাবেশ, মুক্তচিন্তা করার যে অধিকার ছিল, তা শুধু বিজি প্রেসে ছাপা হওয়া সংবিধান বইয়ে পাওয়া যাবে, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। মৌলিক অধিকারের কথা জনগণ ভুলতে বসেছে। এ অবস্থার পরও সরকারের মানবাধিকার, গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বয়ান দেশে-বিদেশে চলছে তো চলছেই। বয়ানের গতি দেখে মনে হয়- সরকার যেন একটা রানিং ট্রেন, চলছে তো চলছেই; থামার কোনো লক্ষণ নেই। সরকারকে যদি চলন্ত ট্রেন মনে করি তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিচার-বিশ্লেষণ করব কিভাবে বা এর তুলনা করা যায় কার সাথে। যেমন- সরকারের আকাশচুম্বী বক্তব্য একটি রানিং ট্রেন বলে মনে করছি। ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতার’ বর্তমান অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণের ভার জাতির ওপর রইল। 

লেখক : বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা,
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫