ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রাম

নাফনদী সাঁতরে আসা ১১ রোহিঙ্গা যুবকের মুখে করুণ বর্ণনা

গোলাম আজম খান, কক্সবাজার (দক্ষিণ)

১৩ অক্টোবর ২০১৭,শুক্রবার, ১২:২৩


প্রিন্ট
সাঁতরে আসা সেই ১১ যুবক

সাঁতরে আসা সেই ১১ যুবক

পিঠে জারিকেন বেঁধে নাফ নদী পাড়ি দেয়া মিয়ানমারের বাসিন্দা ১১ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমারে তাদের অবস্থার করুণ বর্ণনা দিয়েছেন। 

মিয়ানমারে আরকান রাজ্যে সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও হত্যার হাত থেতে রেহাই পাওয়া জন্য প্রাণে বাঁচতে তেলের জারিকেনের সহযোগিতায় সাঁতরিয়ে নাফনদী পাড়ি দেওয়া ১১ রোহিঙ্গা পুরুষকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফে শাহপরীরদ্বীপ জেটি সংলগ্ন নাফ নদী থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে তাদের বিজিপির নিকট হস্তান্তর করা হয়।

বাংলাদেশ কোস্টগার্ড বাহিনী শাহপরীর দ্বীপ স্টেশন কমান্ডার লে. জাফর ইমাম সজীব বলেন, ‘বুধবার ১১ অক্টোবর সকাল ১০ টার দিকে নাফনদীতে হলুদ রংয়ের তেলের খালী জারিকেন নিয়ে কয়েকজন লোককে ভাসমান দেখে কোস্টর্গাড সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে সকাল ১১টার দিকে জেটিতে নিয়ে আসে। উদ্ধার করা রোহিঙ্গাদের চিকিৎসার জন্য বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে’।

টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘জারিকেনের সাহায্যে নাফনদী সাঁতরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১১ রোহিঙ্গাকে কোস্টগার্ডের কাছ থেকে পাওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর দুপুরে তাদের সাবরাং হারিয়াখালী সেনাবাহিনীর ত্রাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে তাদের জন্য নির্ধারিত অস্থায়ী ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে’।

এদিকে সাঁতরে আসা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা দুই কিশোর মোহাম্মদ রিয়াজ (১২) এবং হামিদ হোছন (১৫) সেদেশের জুলুম-নির্যাতনের লোমহর্ষক করুণ বর্ণনা দিয়েছে। মোহাম্মদ রিয়াজের (১২) বাবা কালা মিয়া, মা আমিনা খাতুন।

মোহাম্মদ রিয়াজ জানায়, তাদের বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুচিডং শহরের পুঁইমালি গ্রামে। বাবা কৃষিকাজ ও ক্ষেত খামার করে সংসার চালাতেন। পরিবারের একমাত্র ছেলে হলেও তার ৪ বোন। মাহমুদা বেগম (২৮), এলম বাহার (২৬), নুর বেগম (১৮) ও কামরুন নাহার (৭)। তার মধ্যে বড় বোন মাহমুদা ও মেঝ বোন এলম বাহারের বিয়ে হয়েছে। কোরবানি ঈদের ৪ দিন পর বড় বোনের স্বামী নুর মোহাম্মদকে বলিপাড়া তাদের বাড়ি থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে যায়। এসময় আরও অনন্ত ৩১ জনকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর বড় বোন আমাদের বাড়িতে চলে আসেন।

মিয়ানমারের বুচিডং এলাকার বলিপাড়া, পুঁইমালিসহ বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দাদের এক মাসের বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গাদের ঘর থেকেও বের হতে দিচ্ছিল না। এ কারণে গ্রামের খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। তখন খাবারের অভাবে ওইসব গ্রামের বাসিন্দাদের মারা যাবার উপক্রম দেখা দেয়। খাবার আনার জন্য গ্রামের কয়েকজন লোক পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাজারের যাবার চেষ্টা করলে সেনা সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে মেঝ বোন এলম বাহারের স্বামী মো: আয়াসসহ ২১জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তখন তাদেরকে আল-ইয়াক্বিনের সদস্য বলে প্রচার করে সেনাবাহিনী।

গত এক সপ্তাহ আগে গ্রামে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে গ্রামগুলো খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বাবা কালা মিয়াসহ আরও প্রায় অর্ধশত লোকজনকে ধরে নিয়ে একটি পাহাড়ে পাদদেশে আটকে রাখে। যাবার সময় আমাদের গ্রামের কয়েকটি বাড়িঘরের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় সেনারা। এরপর তাদের বিনা খাবারে চারদিন ধরে বেঁেধ রেখে মারধর ও নিযার্তন করা হয়। তখন তাদের বলা হয় শুধু গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। পাঁচ দিনের মাথায় শর্ত দিয়ে ছেড়ে দেন তাদের। শর্তটি ছিল গ্রাম ছেড়ে পালানোর।

এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পালানোর জন্য রাতের আঁধারে প্যারাবনের ভিতর দিয়ে কোন রকমে মংডু শহরের ফাতংজা গ্রামে চলে আসি। কিন্তু সেখানে এসে দেখা গেল তিন হাজারের মতো রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষ জড়ো অবস্থায় রয়েছে। তারা নৌকা না থাকায় বাংলাদেশে পাড়ি দিতে পারছে না। সেখানে খাবারের জন্য হাহাকার করছে রোহিঙ্গারা। জড়ো হওয়া লোকজনের মধ্যে আমরা ১১জন বুধবার সকাল ৭টা সময় মিয়ানমার ফাতংজা থেকে শরীরের সঙ্গে জারিকেন বেঁধে সাঁতার কাটা শুরু করে সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ জেটির কাছাকাছি চলে এলে কোস্ট গার্ড সদস্যরা নাফনদী থেকে আমাদের উদ্ধার করে।

ওরা ১১ জন হচ্ছেন, বুচিডং পেরাংপুরুর কামাল হোসেন (১৫), আনছার উল্লাহ (১৫) সিংডংয়ের ফয়েজ উল্লাহ (১৭), ইসমাইলপাড়ার হামিদ হোসেন (১৩), হামজ্জাপাড়ার সৈয়দ হোসেন (৩০), তেরংপাড়ার আবদুল মতলব (৩০), হাইরমোরা পাড়ার মোহাম্মদ উল্লাহ (২৬), হাজুরীপাড়ার মোহাম্মদ আলম (১৮), পুইমালির মোহাম¥দ রিয়াজ (১২), ইমাম হোসেন (১৮) ও রমজান আলী (৩০)।

অপর কিশোর হামিদ হোছেন (১৫) বাবা পেঠান আলী, মা সেতেরা বেগম। হামিদ হোছেন জানায়, তাদের বাড়ি মিয়ানমারের বুচিডং পেরাংপুরু গ্রামের। সে মংডু শহরের সিকদারপাড়া বাজারের একটি দর্জির দোকানে মাসিক ৩৬ হাজার কিয়েটে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতো। তার বাবা পঙ্গু ছিলেন বিদায় পুরো সংসার চালাত তার রোজগার দিয়ে।

গত মাসে মংডু শহরের রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে ফেলে সেনাবাহিনী। চলাফেরা করতে দিচ্ছিল না রোহিঙ্গাদের। এ অবস্থায় দোকানে মালিকের ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিস্তু মালিকের দোতলা কাঠের বাড়িটি না পোড়ানোর জন্য সেনাবাহিনীকে ৮০ লাখ কিয়েট দিয়েছেন। বাজারের রোহিঙ্গাদের দোকানপাট বন্ধ এবং কোনো রোহিঙ্গাকে বাজারে একা ফেলে গলা কেটে হত্যা করছে নতুবা মারধর করে ছেড়ে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন। সেদেশে যেন কোনো সরকার নেই। আছে শুধু সেনাবাহিনী। তাদের কথাই সব কিছুই হচ্ছে।

শ্বাসরুদ্ধকর এ পরিস্থিতিতে পালানোর কোন সুযোগ না পাওয়ায় মঙ্গলবার রাতে প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে কোন রকমে নাফনদীর প্যারাবন দিয়ে ফাতংজা গ্রামে চলে আসি। এসে দেখি কোনো নৌকা নেই। আমার মতো আরও শত শত রোহিঙ্গা অপেক্ষা করছে পালানোর জন্য। তাই আমরা ১১জন নৌকা নেওয়ার জন্য জারিকেনের সহযোগিতায় সাঁতরিয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ আসার চেষ্টা করি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল নৌকা নিয়ে গিয়ে অপেক্ষমান রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে নিয়ে আসা। কিন্তু পারলাম না। প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা মতো সাঁতরিয়ে আসার সময় তিন-চারজন অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর আমরাও ধরা পড়ি।

রোহিঙ্গারা বলেন, ‘আমাদের মা-বাবা এবং আত্মীয়-স্বজন সকলে মিয়ানমারের বিভিন্ন গ্রামে। আমাদের এলাকায় চরমভাবে খাদ্য সংকট চলছে। বাংলাদেশ থেকে কোনো নৌকা গত কয়েক দিন ধরে রোহিঙ্গাদের আনার জন্য মিয়ানমারে যাচ্ছে না। একদিকে খাদ্য সংকট, অন্যদিকে মৃত্যু ভয়। আমাদের মা-বাবা এবং আত্মীয়-স্বজন সকলে পাহাড়ে জঙ্গলে ধানখেতে লুকিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে কোনো রকম প্রাণ নিয়ে বেঁচে আছে।

ওপারে নাফ নদী এবং সাগর তীরের কাছাকাছি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও মগদের চোখ এড়িয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু বাংলাদেশে চলে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্ত ট্রলারের অভাবে আসতে পারছে না। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পাড়ি দিতে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ এবং চেষ্টা করেও বাংলাদেশী ও আমাদের দেশের নৌকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। আমরা মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া থেকে নৌযান না পেয়ে সাঁতার কেটে বাংলাদেশে এসেছি।

এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁতার কেটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার কারণ জানতে চাইলে সাঁতরে আসা রোহিঙ্গা যুবকরা বলেন, মিয়ানমার বাহিনী ও মগদের বহুমুখী নির্যাতন আর সহ্য করা যাচ্ছে না। এতদিন যারা চলে আসেনি তাদের উপরও নির্যাতন চলছে। উপরন্ত কাগজপত্র এবং ডকুমেন্টগুলো কেড়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশে এসে মা-বাবা ভাই-বোন এবং আত্মীয়-স্বজনদের আনার কোনো ব্যবস্থা করতে পারি কিনা চেষ্টা করতে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলে এসেছি।

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫