ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

ঢাকা

আধুনিক দাসত্ব চলছে ঢাকায়

সফেদ শিশির

১২ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২২


প্রিন্ট
আধুনিক দাসত্ব চলছে ঢাকায়

আধুনিক দাসত্ব চলছে ঢাকায়

আধুনিক দাস প্রথা নতুনভাবে হাজির হয়েছে একবিংশ শতাব্দীতে। ১৫ লাখ ৩০ হাজার বাংলাদেশি ‘আধুনিক দাসের’ জীবন যাপন করছে বলে বৈশ্বিক দাসত্ব সূচক জরিপে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন দ্য ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন (ওএফএফ)। বাংলাদেশ বেসরকারি খাতে ‘অভাবনীয়’ অর্থনৈতিক অগ্রগতি, রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র বিমোচন, উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পরেও বাংলাদেশের মানুষ ‘আধুনিক দাসত্বের’ ঝুঁকিতে আছে। স্বল্প মূল্যে শ্রম শোষণ করা হচ্ছে। এখনো রাস্তার পাশে প্রতিদিন সকালে জমে উঠছে শ্রমিক বেচা-কেনার হাট।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে শ্রম আইন এবং নাগরিকের সুরক্ষা আইনে ঘাটতি থাকায় এখানে আধুনিক দাসত্বের অবসান ঘটছে না৷ সরকারের এদিকে তেমন কোনো নজরও নেই৷ কারণ যাঁরা এই দাসত্বের শিকার, তাঁরা ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের বাইরে৷ তাই তাঁদের দিকে কেউ নজর দিচ্ছে না৷ এসব কারণেই মানুষকে জোরপূর্বক শ্রম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে কিছু মানুষকে অন্য মানুষের অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। যার ক্ষুধায় অন্ন নেই, প্রয়োজনে বস্ত্র নেই, থাকার জায়গা নেই, জীবিকার নিশ্চয়তা নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই, রোগে চিকিৎসা নেই, সামাজিক কোনো সম্মান-স্বীকৃতি নেই সেতো দাসই। যে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারে না, স্বপ্ন-স্বাদ-আহ্লাদ বলতে কিছু নেই, আনন্দহীন জীবনের মানুষ নয় মুক্ত মানুষ। যে একবেলা খেয়ে আরেক বেলা খেতে পারবে কিনা জানে না, শ্রম বিক্রিতে ইচ্ছুক হয়েও ক্রেতার জন্য রাস্তা-ঘাটে-বাজারে অপেক্ষার পর অপেক্ষা করে - সেতো বাজারের আর দশটি পণ্যের মতোই, যার জীবন পশুর চেয়ে উৎকৃষ্ট বলা যায় না। অনেকে নিরুপায় হয়ে স্বেচ্ছায় আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খলে জড়িয়ে পড়ছেন।

ঋণের জালে আটকানো, জোরপূর্বক শ্রম, মানবপাচার, অর্থের বিনিময়ে যৌন চাহিদা মেটানো তথা বাণিজ্যিকভাবে যৌনকাজে বাধ্য হওয়া ও জোরপূর্বক বা বাধ্যতামূলক বিয়ে এবং রাস্তায় ভিক্ষার পাশাপাশি শিল্পকারখানায় কর্মরতরা অনেকে দাসের জীবন যাপন করছে। অমানবিক পেশায় যুক্ত হয়ে ‘আধুনিক যুগের ক্রীতদাস’ হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাজধানীতে অনেক মানুষ বাধ্যতামূলক শ্রমের শিকার। জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিতদের অনেকে যৌন কাজেও বাধ্য হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমকে আইএলও বলছে স্বেচ্ছায় সম্পাদনে রাজি নয় এমন কাজগুলোকে, যেখানে জবরদস্তি, জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে অথবা ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা দেখানোর হুমকি দিয়ে মানুষকে ওই কাজ সম্পাদনে বাধ্য করা হয়। ঢাকায় এ পরিস্থিতিতে শুধু নিঃস্ব অসহায় মানুষই নয় আছে ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যরাও, যারা পরোক্ষভাবে দাসব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

‘দাসত্বের’ বিভিন্ন দিক তুলে ধরে ওয়াক ফ্রির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রানা প্লাজা ধসে হাজারের বেশি পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক নিপীড়নের বিষয়গুলো সামনে আসে। শ্রমিকদের কম বেতন দেওয়া, অতিরিক্ত কর্ম ঘণ্টা ও নিরাপত্তাহীনতার মতো বিষয়গুলো প্রকাশিত হয়।’  শ্রম শোষণের কারণে অনেক শ্রমিকরা ঋণগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি যৌন হয়রানির শিকার হয়। অনেকেই বাড়তি রোজগারের লোভে, ভালো ক্যারিয়ারের আশায়, কারোর কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে কিংবা স্বামীর অবহেলায় ক্লান্ত হয়ে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে, নামকরা মডেল বা অভিনেত্রী হওয়ার আশায় এই শহরে গোপনে গোপনে নাম লেখাচ্ছেন এসকর্টের খাতায়। 

ওয়াক ফ্রি জানিয়েছে, নারী ও শিশুরা বাণিজ্যিকভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে যৌনতায় বাধ্য করতে ১০ বছরের শিশুদেরও বার, ক্লাব ও নিবন্ধিত যৌনপল্লীতে বিক্রি করা হচ্ছে, যেখানে তাদের আয়ের পুরোটা ‘মালিককে’ দিতে হয়। বিনিময়ে শুধু জীবন চালানোর জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু তাদের মেটানো হয়। বাংলাদেশে ছেলেরাও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। পল্লী এলাকায় পরিবারের মর্যাদা বৃদ্ধি, অস্বচ্ছলতা ঘোচানো ও ঋণ শোধের জন্য নারী ও শিশুদের জোরপূর্বক বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। শিশু শ্রমিকদের দৈনিক বেতন এক ডলারেরও কম, কর্মঘণ্টাও বেশি। শিশুশ্রম চলছে গার্মেন্টস, ওয়ার্কশপ, পরিবহনে। পথশিশু ও পাচারের পণ্যে পরিণত শিশুরা মাদকাসক্ত হচ্ছে, পতিতালয়ে ও গৃহকর্মে সেবাদাসে পরিণত হচ্ছে। যা আধুনিক দাসত্বমূলক পর্যায়ে উপনীত করেছে। বাংলাদেশে মূলতঃ দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কলহ বা পিতা-মাতার অনুপস্থিতি, মৃত্যু বা অন্যত্র বিবাহ  অনেক শিশুর দাসত্বের পরিস্থিতির মূল কারণ।

ঢাকা শহরে স্থায়ী, অস্থায়ী ও ভাসমান- এই তিন ক্যাটিগরির প্রায় দেড় কোটি মানুষ বাস করছেন। এদের মধ্যে ৩৬ থেকে ৪০ লাখ মানুষ ভাসমান। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষ রাজধানীতে আসছেন। এরা ঢাকায় আছেন মূলত কর্মসংস্থানের জন্য। যারা ভাসমান বা পথবাসী হিসেবে পরিচিত। যাদের মাথা গোঁজার কোন ঠাঁই নেই। পলিথিন টাঙ্গিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে ফুটপাথ, লঞ্চ বা ফেরির টার্মিনালে। রেলস্টেশন, বাসস্টেশন, মার্কেট প্লেস, নির্মাণাধীন ভবনের পাশে বা বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কবরস্থানের পাশেই গড়ে উঠছে তাদের জীবন পদ্ধতি, আবাস। ঢাকায় এমন কোন রাস্তা নেই, যেখানকার ফুটপাথে ভাসমান মানুষ ঘুমায় না। এমনকি রাজধানীর প্রতিটি ওভারব্রিজ ও ফ্লাইওভারেও মানুষ রাত কাটায়। খোলা আকাশের নিচেই বসবাস করে রাজধানীতে এমন পথবাসীর সংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজারের মতো। যাদের সুনির্দিষ্ট কোনো আয় নেই। জন্ম ও বেড়ে ওঠা সবই রাস্তায়। রাস্তায় বিয়ে হয়েছে, ছেলেমেয়ে হয়েছে এমনও আছে। যারা প্রতিনিয়ত নিরাপদ পানি ও সঠিক পয়ঃনিষ্কাশনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অনেক সময় ভিজেই রাত কাটাতে হয় এসব অসহায় মানুষকে।

রাজধানীর এসব আধুনিক দাসরা অনেকে তাদের খারাপ অবস্থার জন্যে নিজেদেরকেই দায়ি মনে করে বলেন, ‘অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়’, ‘না জানি কোন পাপের প্রায়শ্চিত্য করতে হচ্ছে’। ‘ভাগ্যের লিখন যায় না খন্ডন’, ‘চার আঙ্গুল কপালের বেশি পাওয়া যায় না’, ‘হায়াত-মউত-রিযিক আল্লাহর হাতে’,-এসব বলে তারা নিজেদের দু:খ কষ্টের জন্যে অন্যকে দায়ি না করে নিজের ভাগ্যের ফল বলে মেনে নেন। নিজেদের অবস্থাকে মানসিকভাবে গ্রহণ করে নিতে বলেন-‘মুখ দিয়েছেন যিনি আহারও জোগাবেন তিনি’, ‘চাইলেই কি আর সব পাওয়া যায়-ত্বকদিরেতো থাকতে অইবো’-বলে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে দোষারোপ না করে তা পরিবর্তনের চেষ্টায় শরিক হওয়া থেকে বিরত থাকেন তারা। ‘দুনিয়াতে যার সম্পদ কম আখেরাতে তার হিসাব সহজ হবে’, ‘কষ্টে চলি তবে সাহেবগো মতো হারাম খাইনা-হালাল খাই’, ‘আজ মরলে কাল দুদিন’, ‘কষ্ট হলেও দু:খ নাই- বেহেশত পাইলেই অইবো’-বলে মনে তৃপ্তি পান তারা। অনেকের মুখে অবশ্য ক্ষোভের কথাও শুনা যায়-‘গরিবের কি আর ভগবান আছে’, ‘আমগো জন্মানোটাই পাপ অইছেরে ভাই’, ‘যদি ভাল মানুষই হইতাম সারাদিন জম্মের মতন খাইট্ট্যাও ভাত মিলবো না ক্যানরে বাপ’, ‘যত বিপদ মুসিবত সব গরিব ম্যানসের লাইগ্যা’, ‘খোদার পরীক্ষা সব আমগো লাগি’।

রাজধানীতে যেসব নি:স্ব মানুষেরা সবচেয়ে বড় বড় বিল্ডিং গড়ছে তাদেরও স্থান বস্তি কিংবা ফুঁটপাতে। যারা শিল্পকারখানায় কাজ করে নিজেদের দুমুঠো অন্ন আর পরিধেয় বস্ত্রের সংস্থান করতে পারে না, যারা রোগে শোকে মরলেও অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে পারে না, সন্তানদেরকে স্কুলে পাঠাতে পারে না, শীতেও গরম কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারে না। অনেক ফোটা গাম, বহু চোখের অশ্রু, শরীরের লাল রক্ত এমনকি মূল্যবান জীবনের বিনিময়ে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের বিত্ত বৈভব- প্রভাব প্রতিপত্তি গড়ে ওঠে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে এদের ভুমিকাকে সবসময় খাঁটো করা হয়। ঢাকার দূষিত বাতাসে তাদের গায়ের রঙ কালো হয়ে গেছে। দুর্গন্ধে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর ‘জার্নাল অব হেলথ, পপুলেশন এন্ড নিউট্রিশন’- এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় বসবাসকারী গৃহহীন তথা ভাসমান মানুষগুলো ভয়ঙ্কর হয়। দু’-তৃতীয়াংশ ঝগড়ার সময়ই পরস্পর কোনো না কোনো বস্তু নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে ৮ শতাংশ ঝগড়ার বেলায় ধারালো অস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। স্বপ্নের নগরী ঢাকায় এসে যখন জীবনযুদ্ধে হোঁচট খায় তখন এসব গৃহহীন মানুষ হতাশা ভুলে যেতে মাদকদ্রব্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এসব মাদকগ্রহীতাদের মধ্যে পুরুষ ৬৯ শতাংশ ও নারী ১ শতাংশ। এদের দু’-তৃতীয়াংশই সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে। রাজধানীতে বসবাসকারী গৃহহীন নারীর দু’-তৃতীয়াংশই যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে। প্রতিপক্ষের দ্বারা নিগৃহীত হয় তিন-চতুর্থাংশ নারী। গবেষণাভূক্ত নারীদের ৮ শতাংশ বলেছে প্রতিদিন নিগৃহীত হয়, ৪৩ শতাংশ সপ্তাহে ২-৩ বার এবং ২৩ শতাংশ বলেছে মাসে ২-৩ বার নিগ্রহের শিকার হয়। লক্ষণীয় ব্যাপার, ৫৩ শতাংশ গৃহহীন নারী স্টেশন মাস্টার ও পুলিশ দ্বারা হয়রানির শিকার হয়।

সচেতন মহল মনে করেন, আধুনিক দাসত্ব মুক্ত ঢাকা চাইলে পারিবারিক দাসত্ব, মানসিক দাসত্ব, মজুরি দাসত্ব, যৌন দাসত্ব, চেতনার দাসত্ব, সামাজিক দাসত্ব, সাংস্কৃতিক দাসত্ব তথা সবধরনের দাসত্ব নিরসনেই নজর দিতে হবে। সকল মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সম্মানবোধ বাড়াতে হবে। মানুষের নূন্যতম মৌল মানবিক চাহিদা পূরণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে। কেউ যাতে অসহায় ও নি:স্ব হয়ে না পড়ে, চরম বিপদে হতাশায় নিরাশার জগতে হারিয়ে না যায় সেজন্য সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। নাগরিক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে, নিম্নবিত্ত সুবিধা বঞ্চিত মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন সৃষ্টির মাধ্যমে আধুনিক দাসত্বকে রুখতে হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫