ঢাকা, বুধবার,১৮ অক্টোবর ২০১৭

বিবিধ

গানের ভুবনে পরিভ্রমণ

রাযী-উদ-দীন কুরেশী

১২ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৫৪


প্রিন্ট

সুরেলা কণ্ঠস্বর হোক আর মধুর বাদ্যধ্বনি হোক, অন্তরে সহজে প্রবেশ করে। অন্তরে প্রবেশ করা কোনো কিছু অন্তরে টিকে থাকে, কখনো কখনো অনন্তকাল।
বাল্যকালে গ্রামের বাড়িতে অবস্থানকালে পার্শ্ববর্তী ধানের মাঠে ‘গ্রামের নওজোয়ান’দের গাওয়া একটা গান শুনেছিলাম :
‘নয়া বাড়ি বান্ধ্যারে বাদ্যা লাগায় সাধের কলা,
সেই কলা বেচিয়া দিবো চন্দ্রার গলায় মালারে;
দিন আমার যায় যায় রে।’
ঘাটুর গান, নাকি বাদ্যার গান ছিল আট-দশ বছর বয়সে শোনা সেই গ্রাম্য গান, যা আশি বছর অতিবাহিত হলেও ভুলে যাইনি।
প্রায় সেই বয়সেই সিলেট শহরে বাঈজীর কণ্ঠে শোনা গান
‘নারী নিন্দা না কর সাধু,
নারী জগত কা মাতা’
মুগ্ধ করেছিল। মামার সঙ্গে সিলেট পুলিশ লাইনে দুর্গাপূজা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সেই গান শুনেছিলাম। আরো মনে আছে এখন থেকে সাত দশকেরও আগে আমার কৈশোরে সিলেট শহরের একটা বাসার পাশ দিয়ে যাওয়ার কালে একজন নব্যযুবকের কণ্ঠের একটা গান :
‘দূর দেশসে এক পন্ছি আয়া
রহ্নে কো এক রাত,
বাদল বিজলী আরো ঘটায়ে,
মওসুম হায় বরসাত।’
গানটা মনে গেঁথে ছিল। শুনলাম গায়ক একজন ছাত্র, নাম সাইফুর রহমান; আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো চল্লিশ বছর পর, উত্তরায়। উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরে বাড়ি করে আমার আসার পর তিনিও বাড়ি করে আসলেন। পরিচয় হলো, আর ঘনিষ্ঠতা হলে জানলাম তিনিই ছিলেন সেই ‘দূর দেশকা পনছি’। তিনি ইতোমধ্যে পরবর্তী জগতে পাড়ি জমিয়েছেন, স্মৃতিটা অবশ্যই রেখে গেছেন।
একটা গ্রাম্য গান :
আষাঢ় মাসের বৃষ্টিরে, ঝমঝমাইয়া পড়েরে,
বন্ধু আমার রইলো বৈদেশ গিয়া, রইলো বৈদেশ গিয়া।
হয়ত অদ্ভুত বাক্যস্রোতের কারণে মন থেকে মুছে যায়নি।
চট্টগ্রামের দই প্রথিতযশা স্থানীয় সঙ্গীতশিল্পী একদা তাদের গানে মোহিত করতেন। একজন শেফালী ঘোষ গাইতেন ‘ও’রে শাম্পান ওয়ালা, তুই আমারে করলে দিওয়ানা’; আর গাইতেন ‘যদি একখান সুন্দর মুখ পাইতাম, মহেশখালীর পান খিলি তারে বানাই খাওয়াইতাম’। আরেক জন শ্যামসুন্দর বৈরাগীর;
‘ও ভাই জলদি আয়েন, জলদি আয়েন
গাড়িয়ে হুইৎ কচ্ছে,
ইস্টিশন মাস্টরে ভাই সব
ডেউয়া কাইৎ কচ্ছে’
সে কি ভোলা যায়।
একজন অতি জনপ্রিয় শিল্পী আবদুর রহমান বয়াতী টেলিভিশনে গাইতেন :
‘মন আমার দেহ ঘড়ি
সন্ধান করি
কোন মিস্তরি বানাইয়াছে,
একটা চাবি মাইরা
দিছে ছাইড়া
জনম ভরে চলতে আছে।’
এই একটা গান মনের গভীরে অনেক ভাবনার জন্ম দিত, এখন স্মরণে আসলে দেয়। একজন বড় কারিগর, যিনি আমাদের ‘বানাইয়াছেন’, তাঁর কথা যে!
টেলিভিশনে শোনা কলকাতার একটা গান :
‘বলি ও ননদী আর দুমুঠো চাল ফেলেদে হাড়িতে
ঠাকুর জামাই এলো বাড়িতে।’
হাসির উদ্রেক করত।
তেমনি করে সিনেমার হিন্দি গান :
‘দেখ তেরা সংসার কি হালৎ,
কেয়া হো গাই ভগবান,
কেতনা বদল গায়া ইনসান।’
ভগবানের সংসার!
১৯৪৭ সনে পাকিস্তান হওয়ার পর ‘রেডিও সিলোন’ (তখনকার সিংহল, এখনকার শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে) পরিবেশিত হিন্দি উর্দু গান সবার কাছে খুব আকর্ষণীয় ছিল। এ উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিন্দি, উর্দু গানের কণ্ঠশিল্পী কুন্দন লাল সাইগলের ‘সু জা রাজকুমারী সু জা’, ‘আয় কাতিবে তক্বদির’, ‘দুনিয়া রঙ্গে রঙ্গিলী বাবা’ ইত্যাদি গান সব জনসাধারণের প্রিয় ছিল। তাঁর ‘দেবদাস’ ছবির গান ‘গোলাপ হয়ে উঠুক ফোটে তোমার রাঙ্গা কপোলখানি’, আধুনিক গান ‘নাহিবা ঘুমালে প্রিয়, রজনী এখনো বাকি’ ইত্যাদি গান অতি আকর্ষণীয় ছিল। কলকাতায় চাকরিজীবী পাঞ্জাবের লোক কে, এল, সাইগল বাংলা, হিন্দি, উর্দু ছায়াছবির একজন অতি জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতেও পারদর্শী ছিলেন। বাংলা গানের শ্রেষ্ঠ গায়িকা ছিলেন কানন বালা দেবী। তার গাওয়া বাংলা, হিন্দি গান তখনকার মানুষকে মুগ্ধ করে রেখেছিল। কানন দেবীর ‘আমি বন ফুল গো’, ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’, ‘আয় চান্দ ছুপনা যানা’ ইত্যাদি গান যে একবার শুনেছে, সে কি কখনো তা আর ভুলতে পারে। যখন সাইগল কানন যুগল কণ্ঠে কোনো গান গাইতেন, কোনো সিনেমায়, সারা ভারতে আলোড়ন সৃষ্টি হতো।
হিন্দি উর্দু গানে এককালে ভারতের মানুষকে মুগ্ধ করতেন নূর জাহান, শামশাদ বেগমরা। গানের সম্রাজ্ঞী নূর জাহানের ‘ধমা ধম্ মস্ত কলন্দর’, দেহ মনে শিহরণ জাগাত। শামশাদ বেগমের ‘আয়া ইয়ে বুলাওয়া মুজে দরবারে নবিসে’ মনটাকে আকুল করে রাখত নবীজীর উল্লেখে, আকর্ষণে। হিন্দি সিনেমা নবযৌবনে অনেক দেখেছি, আর সেকালের অতি জনপ্রিয় গানগুলোর অনেকেই স্মৃতিতে অমøান রয়ে গেছে, এখনো মনে দোলা দেয়। সিকান্দার ছবির গান ‘জিন্দেগি হায় প্যয়ারসে, প্যয়ার মে বিতায়ে জা’, মেঘদূতের ‘ও র্বসা কে পয়লে বাদল, মেরা সন্দেসা লে জানা’ আর ঝোলা ছবিতে হিন্দি সিনেমা জগতের অতি জনপ্রিয় বাঙালি অভিনেতা অশোক কুমারের ‘না জানি কিদর আজ মেরি নাও চলিরে’, মোহাম্মদ রফির গাওয়া বাইজু বাওরা ছবির গান ‘তু গঙ্গাকে মওজ, ময় যম্না কা ধারা’, অনেক কাল বাজিয়ে শুনেছি, এখন কদাচিৎ।
পল্লীগীতি সম্রাট আব্বাসউদ্দীনের গানে আমি চিরকালই মোহিত ছিলাম। তাঁর অনেক গানই আমার কণ্ঠস্থ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর দুটো গানের উল্লেখ করছিÑ একটা অল্প পরিচিত, আর একটা অতি পরিচিত। তার অল্প পরিচিত গান :
‘ঐ যে ভরা নদীর বাঁকে,
কাশের বনের ফাঁকে ফাঁকে;
দেখা যায় যে ঘরখানি,
সেথায় বধূ থাকে লো- সেথায় বধূ থাকে’।
বর্ষাকালের বাংলার প্রাকৃতিক মানচিত্রটা চোখের পাতায় এঁকে দেয়। আর অতি পরিচিত গানটা, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের প্রথম লিখিত ও সুরারোপিত ইসলামি গান আর আব্বাস উদ্দীনেরও প্রথম গাওয়া ইসলামি গান :
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে,
এল খুশীর ঈদ।’
বাংলার মুসলমান যত দিন রোজা রাখবে, ঈদ করবে, তত দিন গাইবে।
নজরুলের আরেকটা বেদনাবিধূর গান, যা এ যুগের অনেকেই শোনেননি; ছিল :
‘এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে,
এই ত নদীর খেলা;
সকাল বেলা আমির রে ভাই,
ফকির সন্ধ্যা বেলা।’
কোনো একটা গ্রামোফোন কোম্পানি ‘নবাব সিরাজুদ্দৌলা’ নামের একটা নাটক বহু যুগ আগে রেকর্ড করেছিল, আর নজরুল সেই নাটকের জন্য গানটা লিখেছিলেন ও সুর দিয়েছিলেন। পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সিরাজুদ্দৌলা যখন মুর্শিদাবাদ হতে নৌকাযোগে অন্যত্র চলে যাচ্ছিলেন, তখন নৌকার মাঝি এ গানটা গেয়েছিল যাত্রীর পরিচয় না জেনেই।
বিদেশী গানও অনেক শুনতাম, পছন্দ করতাম। জন ডেনভারের ‘কান্ট্রি রোড টেইক্ মি হোম’, নীনা নাহিদের ‘ইয়া মুস্তাফা, ইয়া মুস্তাফা’, বনী এম এর ‘রা রা রাসপুটিন’ ইত্যাদি গান বড়ই পছন্দনীয় ছিল।
সুরেলা কণ্ঠস্বরের ভক্ত যে ছিলাম তা অনেক কথায় লিখেছি। বাদ্যধ্বনিও যদি মধুর হয় আর নিরিবিলিতে শ্রবণে আসে, তাও সুখকর হয়। রাত্রে দেরি করে ঘুমানোর আগে কোনো কোনো দিন দূরদর্শন, কলকাতার উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে মোহিত হতাম। বাঁশির সুর প্রাণ উচাটন করে না এমন মানুষ বিরল। আর তা যদি হয় কুমার শচীন দেব বর্মণের পছন্দের সেই বাঁশি :
‘বাঁশিতে রন্ধ্র আছে সাত,
কোন রন্ধ্রে কোন গান ধরে-
দেখবো আজি রাত।
কোন রন্ধ্রেতে যায় রূপসী-
জল ফেলে জল আনিতে,
আজ নিশি বাজাইয়া দেই, নিও প্রভাতে’।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫