ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

গল্প

অন্ধকার নামা গ্রাম

কাজুও ইশিগুরো, অনুবাদ : সায়ীদ আবুবকর

১২ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৩২


প্রিন্ট

একটা সময় ছিল যখন সপ্তাহের পর সপ্তাহ ইংল্যান্ডে ভ্রমণ করলেও আমি ক্লান্ত হতাম না। কিন্তু এখন আমার বয়স হয়ে গেছে, অল্পতেই আমি হয়রান হয়ে যাই। এ কারণে অন্ধকার নামার পর যখন আমি গ্রামে এসে পৌঁছলাম, তখন সবকিছুতেই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না, যে-গ্রামে কিছু দিন আগেও আমি বসবাস করতাম, সেখানে ফিরে এসেছি আবার।
গ্রামের কিছুই আমি চিনতে পারছিলাম না। রাস্তাঘাটগুলো এত ছোট ছোট লাগছিল যে, মনে হচ্ছিল আমি বোধহয় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাব। আমি হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে পথ চলছিলাম আর ভাবছিলাম যদি এভাবে চলতে চলতে গ্রামের মাঝ-চত্বরে এসে পড়ি তাহলে হয়তো কূল-কিনারা খুঁজে পাব, পরিচিত কারো মুখোমুখি নিশ্চয়ই হব। অনেকক্ষণ ধরে এভাবে চলতে চলতে যখন ক্লান্তি এসে আমার ওপর ভর করল, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম আমার জন্য ভালো হবে কারো কুটিরে গিয়ে দরজায় নক করা। আমার বিশ্বাস, সে-দরজা এমন একজন কেউ খুলে দেবে, যে আমাকে দেখে চিনতে পারবে।
আমি একটা জীর্ণশীর্ণ বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরোজার ফুটোফাটার মধ্য দিয়ে ঘরের নিবু নিবু আলো লিক হয়ে বাইরে আসছিল। ভেতরে আমি কথাবার্তা ও হাসাহাসি শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি খুব জোরে দরজায় নক করতে লাগলাম যাতে কথাবার্তার মধ্যেও তারা আমার ডাক শুনতে পায়। কিন্তু তখনই আমার পেছন থেকে কেউ বলে উঠল, ‘হ্যালো।’
আমি পেছনে ফিরে দেখি বিশ বছর বয়সী একজন তরুণী জীর্ণশীর্ণ জিন্স ও ছেঁড়া জাম্পার পরে একটু দূরে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।
সে বলল, ‘কতবার আমি আপনাকে ডাকলাম, তবু আপনি আমাকে পার হয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা এখানে চলে এলেন।’
‘তাই নাকি? দুঃখিত। আমি আসলে মোটেই রুক্ষ আচরণ করতে চাইনি।’
‘আপনি তো ফ্লেচার, তাই নয় কি?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তাই।’
‘ওয়েন্ডি মনে করেছিল এটা আপনিই যখন আপনি আমাদের কুটিরের পাশে গিয়েছিলেন। আমরা সবাই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। আপনার সাথে আরো ছিল ডেভিড ম্যাগিস এবং আরো অনেকে।’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তা-ই। সাথে ম্যাগিসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ছিল।’ আমি অনেক নাম বললাম। মেয়েটি দেখলাম সবাইকে চিনতে পারল। আমি বললাম, ‘কিন্তু এসব ঘটনা তো তোমার জন্মের অনেক আগে ঘটেছিল। আমি অবাক হচ্ছি যে, তুমি এসব বিষয় সম্পর্কে জানো।’
‘হ্যাঁ, এটা আমাদের সময়ের অনেক পূর্বেকার ঘটনা। তবু আমরা আপনাদের সম্পর্কে অনেক অভিজ্ঞ। আমরা তখনকার বৃদ্ধদের চেয়েও এ সম্পর্কে ভালো জানি। ওয়েন্ডি তো আপনার ছবি দেখেই আপনাকে চিনতে পেরেছিল।’
‘আমার ধারণাই ছিল না যে, তোমরা তরুণ প্রজন্ম আমাদের ব্যাপারে এত আগ্রহী। আমি দুঃখিত যে, আমি তোমাকে পার হয়ে আগেই হেঁটে চলে এসেছি। তুমি দেখতেই পাচ্ছ আমার বয়স হয়ে গেছে। যখন আমি ভ্রমণে বের হই তখন আমার সবকিছুতেই তালগোল পাকিয়ে যায়।’
আমি দরজার পেছন থেকে শোরগোলপূর্ণ কথাবার্তা শুনতে পেলাম। অধৈর্য হয়ে আমি দরজার ওপর আরো জোরে আঘাত করতে লাগলাম যদিও আমি চাচ্ছিলাম না যে, মেয়েটির সাথে আমার কথাবার্তা এখানেই শেষ হয়ে যাক।
সে আমার দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকাল, তারপর বলল, ‘আপনাদের সময়ের সবাই প্রায় একই রকমের। ডেভিড ম্যাগিস এখানে কয়েক বছর আগে এসেছিলেন। ’৯৩ কিংবা ’৯৪ সালে। তিনিও ছিলেন ওইরকমই। একটু দুর্বোধ্য প্রকৃতির।’
‘ডেভিড ম্যাগিস এখানে এসেছিল। মজার ব্যাপার তো। তুমি জানো, সে অত গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিল না। যা হোক, তুমি এখন আমাকে বলো তো এ বাড়িতে কারা থাকে।’ আমি দরোজায় আবার ধাক্কাতে থাকলাম।
মেয়েটি বলল, ‘পিটারসন পরিবার। খুব পুরনো বাড়ি। তারা সম্ভবত আপনাকে চিনতে পারবে।’
‘পিটারসন!’ নামটি আমি পুনরাবৃত্তি করলাম কিন্তু এ নামে কাউকে চিনতে পারলাম না।
‘আপনি কেন আমাদের বাড়িতে আসছেন না? ওয়েন্ডি তো একেবারে উত্তেজিত। আমাদের বাড়ির বাকিরাও। আসলে এটা আমাদের জন্য একটা সুযোগ সেসব দিনের একজনের সাথে সরাসরি কথা বলা।’
‘আমিও বিষয়টা পছন্দ করি। কিন্তু মোটের ওপর আমি চাই একজায়গায় আগে স্থির হয়ে নিই। তুমি পিটারসনদের কথা বলছিলে।’
আমি দরজায় আরো জোরে আঘাত করতে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত দরজা খুলে গেল। ঘরের আলো ও ঊষ্ণতা এসে পড়ল রাস্তার মধ্যে। একজন বৃদ্ধ লোক দরজার ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল। সে আমার দিকে সতর্কতার সাথে তাকাল, তারপর বলল, ‘ফ্লেচার না?’
‘হ্যাঁ। এইমাত্র আমি গ্রামের মধ্যে এসেছি। কয়েক দিন ধরে ভ্রমণ করছি আমি।’
সে এক মুহূর্ত এটা নিয়ে ভাবল, তারপর বলল, ‘ভালো করেছ। ভেতরে এসো।’
আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটি সঙ্কীর্ণ অপরিচ্ছন্ন রুমে, যেটি কাঠ ও ভাঙা ফার্নিচার দিয়ে ভরা। একটা কাঠের গুঁড়ি আগুনে জ্বলছিল। তার আলোতে আমি দেখতে পেলাম রুমের ভেতরে আরো অনেক লোক রয়েছে। বৃদ্ধ লোকটি আমাকে আগুনের পাশে একটি চেয়ার টেনে দিল বসার জন্য। ক্লান্তিতে আমার শরীর ভেঙে আসছিল। আমি চেয়ারে বসে আরাম বোধ করতে লাগলাম। লোকজন সব চুপচাপ হয়ে আছে। মনে হলো আমার উপস্থিতি তাদের এক অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
আমি অর্ধনিমিলিত চোখে আমার অতীতের দিকে তাকালাম। আমার মনে হলো এরকম একটি কুটিরেই একদিন আমি বাস করতাম। জানালা খুলে দিয়ে আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বসন্তের বাতাস ফুরফুর করে আমার ঘরে ঢুকে পড়ত। সেখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আমি বইপুস্তক পড়তাম। মুহূর্তের মধ্যে আমি আমার ঝাপসা হয়ে যাওয়া অতীতের কাছে ফিরে গেলাম।
আমি বৃদ্ধ লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘দ্যাখো, আমি অনেক পথ হেঁটে এসেছি। আমার একটু ঘুমানোর দরকার। কয়েক মিনিটের জন্য হলেও আমার একটু চোখ বোজার প্রয়োজন। তারপর আমি তোমাদের সাথে কথা বলতে পারব।’
ঘরের লোকজন আমার জন্য জায়গা করে দিলো। নতুন একজন কেউ বলল, ‘যান শুয়ে পড়–ন গে। আমাদের নিয়ে মাইন্ড করবেন না।’
আমি একটা স্যাঁতসেঁতে বেডে এসে শুয়ে পড়লাম। বেডে এসে গা এলিয়ে দিতেই, শুনতে পেলাম বৃদ্ধ লোকটা তাদের বলছে, ‘এই সে ফ্লেচার। হায় খোদা, সে কত বুড়ো হয়ে গেছে!’
একটি নারীকণ্ঠ বলল, ‘আমরা কি তাকে এভাবে ঘুমিয়ে পড়তে দেবো? সে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘুম থেকে জেগে উঠবে। তারপর আমরা তার সাথে থাকতে পারবো।’
একজন বলল, ‘তাকে ঘণ্টাখানেকের মতো ঘুমাতে দাও। সে যদি এক ঘণ্টার পরও ঘুমিয়ে থাকে তাহলে তাকে আমরা ডেকে তুলব।’
এটা কোনো একটানা কিংবা আরামদায়ক ঘুম ছিল না। আমি মূলত আধা-ঘুম ও আধা-জাগরণের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিলাম। রুমের মধ্যে তারা কী কথাবার্তা বলছিল, সে সম্বন্ধে আমি পূর্ণ সচেতন ছিলাম। একপর্যায়ে আমি শুনতে পেলাম, একজন মহিলা বলছে, ‘আমি জানি না সে কিভাবে আমাকে এমন জাদুগ্রস্ত করে রেখেছিল। তাকে দেখে আজ কেমন নোংরা কুৎসিত মনে হচ্ছে।’
যখন আমি পুরোপুরি জেগে উঠলাম তখন, আমি অস্বস্তি বোধ করলাম সবার মধ্যে এরকম অবস্থায় শুয়ে থাকার জন্য। একজন মহিলা আমার সামনে ঝুঁকে পড়ল। রুমের সামান্য আলোয় আমি সবাইকে পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছিলাম না। সে বলল, ‘ফ্লেচার, এখনই আমাদের কথা বলার সময়। আমি দীর্ঘদিন ধরে তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। আমি প্রায়ই তোমার কথা ভাবতাম।’
আমি তাকে আরো স্পষ্টভাবে দেখার চেষ্টা করলাম। মনে হলো তার বয়স চল্লিশের কোটায়। তার চোখে এক ধরনের বিষণœতা দেখতে পেলাম। কিন্তু তার মুখ কিছুতেই আমার স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে পারল না।
আমি বললাম, ‘দুঃখিত, তোমার ব্যাপারে আমার কিছুই মনে পড়ছে না। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিও, যদি এর আগে তোমার সাথে আমার দেখা হয়ে থাকে। আজকাল আমার আর কিছুই মনে থাকে না।’
‘ফ্লেচার’, সে বলল, ‘যখন আমরা পরস্পরকে চিনতাম তখন আমি ছিলাম তরুণ এবং সুন্দরী। তুমি ছিলে আমার আদর্শ। তোমার সবকিছুই ছিল আমার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর। অনেক বছর ধরেই আমি তোমাকে বলতে চেয়েছি যে, তুমি আমার জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছ।’
‘তুমি তো খুব অশোভন অচরণ করছ। তুমি যা বলছ তা ঠিক নয়।’
‘ফ্লেচার’, সে বলল, তার কণ্ঠ আরো নরম হয়ে উঠল, ‘এটাই হলো তোমার সেই রুম। এই রুমে প্রায়ই তুমি আমার সাথে প্রণয় নিবেদন করতে। আমি তোমার কাছে ছুটে আসতাম। আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না কোন আকর্ষণে তোমার কাছে আমি আমার নিজেকে সঁপে দিয়েছিলাম। আজ তোমার কী অবস্থাÑ সারা শরীর দিয়ে তোমার দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। ছেঁড়া নোংরা তেনার মতো হয়ে গেছ তুমি। কিন্তু আমি দ্যাখো এখনও কতটা আকর্ষণীয় রয়ে গেছি। সাজগোজ করে রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটি, লোকজন আমার দিকে হা-করে তাকায়। লোকেরা এখনও আমাকে কামনা করে। কিন্তু কোনো মহিলাই আজ তোমার দিকে ফিরেও তাকাবে না। তুমি আজ হয়ে গেছ দুর্গন্ধযুক্ত ছেঁড়াখোড়া মাংসের স্তূপ।’
আমি বললাম, ‘তোমার কথা আমার কিছুই মনে নেই। এখন আমার সেক্স-ফেক্স নিয়ে ভাবার কোনো সময়ও নেই। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরো অনেক বিষয় আছে যা নিয়ে আমি ভাবি ও দুঃখ করি।’
সে হঠাৎ করে তার আঙুল দিয়ে আমার চুলে বিলি কাটতে থাকল। সে বলল, ‘এভাবে আমি তোমার চুলে বিলি কাটতাম। এখন দেখি তুমি কেমন নিঃসাড় হয়ে গেছো।’ সে হাত দিয়ে আমাকে উত্তেজিত করতে চাইল। কিন্তু কামতাড়িত হওয়ার পরিবর্তে আমি ভীষণ ঘুমকাতর হয়ে পড়তে লাগলাম। সে হঠাৎ করে থেমে গেল এবং আমার কপালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো, ‘তুমি কেন আমাদের সাথে যোগদান করছ না? অনেক তো ঘুমালে!’ এই বলে সে উঠে দাঁড়াল এবং চলে গেল।
প্রথমবারের মতো আমি একটু নড়েচড়ে উঠে রুমের চার পাশটা পরখ করতে থাকলাম। দেখলাম সেই মহিলাটা গজগজ করে হাঁটতে হাঁটতে আগুনের পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়ল। আরেকজনকে আমি চিনতে পারলাম। সে হলো সেই বৃদ্ধ লোকটা, যে দরজা খুলে দিয়েছিল। কাঠের ওপর বসে থাকতে দেখলাম আরো দুজন মহিলাকে, দেখতে চেয়ারে বসা মহিলারই মতো।
বৃদ্ধ লোকটা লক্ষ করল যে, আমি নড়াচড়া করছি। সে অন্যদেরকে ইশারায় বলল যে, আমি তাদের দেখছি। আমি বুঝতে পারলাম, আমি যখন ঘুমিয়ে ছিলাম তারা আমাকে নিয়েই আলোচনা করছিল।
বৃদ্ধ লোকটা তাদের বলল, ‘তরুণ প্রজন্ম দেখি তার কথা শোনার জন্য আগ্রহী হয়ে পড়েছে। আমি দেখেছি যুবতী মেয়েটা কেমনভাবে তার দিকে তাকাচ্ছিল ও আলাপ করছিল। একসময় সে আমাদের ব্যবহার করেছে। এবারও সে আগের মতোই করবে। সে তরুণ প্রজন্মকে তার স্বার্থেই ব্যবহার করবে।’
আমি দূর থেকে লক্ষ করলাম তারা কেমন অপরাধীর মতো চুপচাপ বসে আছে, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আগুনের দিকে। একটু পর আমি উঠে দাঁড়ালাম। তারা চারজন আমার দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিয়েছে। আমি কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করলাম দেখার জন্য যে, তারা আমাকে কিছু বলে কিনা। অবশেষে আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয় আমি জেনে গেছি তোমরা কী বলাবলি করছিলে। তোমরা জেনে নাও যে, তোমরা যে জিনিসের ভয় করেছিলে আমি তা-ই করতে যাচ্ছি। এই মুহূর্তে আমি চলে যাচ্ছি তরুণ প্রজন্মের বাড়িতে। আমি তাদের বলতে যাচ্ছি তাদের শক্তি, তাদের সব স্বপ্ন ও তাদের চিরস্থায়ী ভালো করার স্পৃহা দিয়ে এ জগতে কী করতে হবে।’
বৃদ্ধ লোকটা অন্যদের বলল, ‘আমাদের উচিত তাকে থামানো কিন্তু আমরা কী করতে পারি?’
আমি রুম থেকে বের হয়ে কাঁধে ব্যাগ তুলে নিলাম ও অন্ধকারের মধ্যে হাঁটতে লাগলাম। মেয়েটা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখে মনে হলো সে আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে আমাকে রাস্তা দেখিয়ে সামনে নিয়ে চলল। সে বলল, ‘ওয়েন্ডি আপনাকে দেখে খুব খুশি হবে। সে আপনার জন্য সব মানুষ ডেকে জড়ো করে আনবে। সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকবে।’
‘তোমরা কি ডেভিড ম্যাগিসকেও এরকম অভ্যর্থনা জানিয়েছিলে?’
‘হ্যাঁ। তিনি যখন এসেছিলেন, আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম।’
‘আমি নিশ্চিত সে এতে খুব তৃপ্তিবোধ করেছিল। সে সবসময় নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করতো।’
‘ওয়েন্ডি বলে ডেভিড ম্যাগিস খুবই মজার মানুষ, কিন্তু আপনি হলেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে বাস্তবিকই আপনাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মনে করে।’
আমি এটা নিয়ে এক মুহূর্ত ভাবলাম।
হঠাৎ আমার মনে হলো একজন মধ্য-বয়স্ক লোক আমাদের সামনে এগিয়ে আসছে। সে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার সাথে হ্যান্ডশেক করল। সে বলল, ‘ও, তুমি এখানে।’
শেষ পর্যন্ত আমি লোকটাকে চিনতে পারলাম। দশ বছর বয়স হওয়ার পর থেকে তাকে আর আমরা দেখিনি। তার নাম রোগার বাটন। সে আমার সাথে একই ক্লাসে পড়ত যখন আমরা ক্যানাডাতে থাকতাম। তখনো আমরা ইংল্যান্ডে আসিনি।
আমি বললাম, ‘দ্যাখো রোগার, আমি এই তরুণ ভদ্রমহিলার বাড়িতে যাচ্ছি। সেখানে তারা আমাকে অভ্যর্থনা দেবে।’
আমরা চলতে চলতে অনেক কথা বললাম। একসময় রোগার বলল, ‘তুমি খুব রোগা হয়ে গেছ। স্কুলে কত শক্তসমর্থ ছিলে। সত্যি বলতে কী, তুমি একেবারে বুড়ো হয়ে গেছ। কিন্তু দ্যাখো, এখনও আমি কেমন বলিষ্ঠ আছি।’
আমি বললাম, ‘তুমি কি এখানে অনেক দিন ধরে আছো?’ আমি আসলে বিষয়টা পরিবর্তন করতে চাচ্ছিলাম।
সে বলল, ‘প্রায় সাত বছরের মতো।’
হঠাৎ আমরা খেয়াল করলাম আমাদের সামনে খোলা মাঠ। আমরা থমকে দাঁড়ালাম। আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় দেখা যেতে লাগল সবুজ অবারিত মাঠ। কিন্তু সেই তরুণ মেয়েটা? আমার ভয় হলো আমরা তাকে হারিয়ে ফেলেছি। সত্যি বলতে কী, অনেকক্ষণ হলো, আমরা কথা বলতে বলতে হেঁটে এসেছি কিন্তু মেয়েটির দিকে একবারও খেয়াল করিনি।
আমি বললাম, ‘তারা আমাকে অভ্যর্থনা জানাবে। ওয়েন্ডির বাড়ির দিকেই আমি যাচ্ছিলাম।’
রোগার বলল, ‘ওয়েন্ডির বাড়ি তো অনেকদূর। তোমাকে একটা বাস ধরতে হবে। দুই ঘণ্টার জার্নি। তবে মন খারাপ কোরো না, আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব কোথা থেকে তুমি বাসে উঠবে।”
রোগার বাটন এক জায়গায় এসে থামল। ‘এখানে। তুমি যদি এখানে দাঁড়িয়ে থাকো, তাহলে একটা বাস পাবে। তবে যেমনটি আমি বলেছি, এটা কিন্তু ছোট জার্নি নয়। প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। তবে মন খারাপ কোরো না। আমি নিশ্চিত তোমার তরুণ বন্ধুরা তোমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকবে।’
আমরা হাত মিলালাম। সে ঘুরে দাঁড়াল ও হাঁটতে শুরু করল। আমি দেখলাম সে দুটি কুটিরের মাঝখানে অন্ধকারের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি আমার ব্যাগ ল্যাম্পপোস্টের পাদদেশে রেখে কান পেতে শুনতে থাকলাম দূর থেকে ছুটে আসা গাড়ির শব্দ। আমি চিন্তা করছিলাম সেইসব তরুণদের কথা যারা আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে চায় এবং আমি আমার বুকের ভেতরে অনুভব করতে লাগলাম আশাবাদের মৃদৃ জাগরণ।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫