ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রাম

বর্ষার আগেই সরিয়ে দেয়া হবে রোহিঙ্গাদের!

১২ অক্টোবর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:১৭


প্রিন্ট
নতুন অতিথির আগমন রোহিঙ্গা শিবিরে, অনেক কষ্টের মধ্যেও আনন্দ

নতুন অতিথির আগমন রোহিঙ্গা শিবিরে, অনেক কষ্টের মধ্যেও আনন্দ

বর্ষার আগেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন অথবা নোয়াখালীর ভাসানচরের মতো নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করা উচিত বলে মনে করছেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ। রোহিঙ্গারা যে যেভাবে পারছেন পাহাড় কেটে ঝুপড়ি তৈরি করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘ মেয়াদে একই স্থানে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের সুবাদে এ অঞ্চলে মিয়ানমারভিত্তিক উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো সক্রিয় হতে পারে। 


ইতোমধ্যে র‌্যাব সদস্যরা কুতুপালং ক্যাম্প থেকে উগ্রপন্থী সংগঠনের সক্রিয় এক সদস্যকে আটক করে উখিয়া থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছেন। উখিয়া থানার অফিসার ইন-চার্জ মো: আবুল খায়ের বলেন, এ ব্যাপারে জঙ্গি তৎপরতা ও সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।

 
সরেজমিন রোহিঙ্গা বসতি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা যে যার মতো করে সরকারি বন, বাগানের গাছপালা ও পাহাড় কেটে ঝুপড়ি নির্মাণ করেছেন। সেনাসদস্যরা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সেখানে রাস্তাও করে দিয়েছেন। অথচ সরকার রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য ৩ হাজার একর বনভূমি বরাদ্দ দিয়েছে। উল্লিখিত এলাকা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সেখানে ৬টি পুলিশ ক্যাম্প করার জন্য সেনাসদস্যরা কাজ করছেন। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় তাদের পুনর্বাসন, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ক্যাম্প এলাকায় অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে ক্যাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন। কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ রেজাউল করিম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিপুল রোহিঙ্গার মধ্যে অপরাধী চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা কঠিন। তবে ক্যাম্পে গোয়েন্দা সংস্থা তৎপর থাকায় অপরাধীরা গা ঢাকা দিয়েছে। 


দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়া চৌধুরী সম্প্রতি ক্যাম্প এলাকা সফরকালে বলেন, ১৯৭৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কুতুপালংয়ের একটি ক্যাম্পে নিয়ে আসা হবে। পরে তাদের উন্নত জীবনযাপনের জন্য নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। 


জাতিসঙ্ঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াটকিনস কুতুপালং সফরকালে বলেছেন, এক স্থানে মাত্রাতিরিক্ত মানুষ থাকার ফলে অনৈতিকতা বৃদ্ধি পায়। প্রাণঘাতী রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অগ্নিকাণ্ড ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে। তিনি সব রোহিঙ্গাকে ভাসানচরের মতো নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তর করার পরামর্শ দেন। তবে তুমব্রু জিরো পয়েন্ট এলাকায় আশ্রিত প্রায় ৭ হাজার রোহিঙ্গা কুতুপালং ক্যাম্পে আসতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। সেখানে থাকা আরাকানের তুমব্রু গ্রামের সেলিম নামে এক বিত্তশালী রোহিঙ্গা জানান, মিয়ানমারের অবস্থান নমনীয় হলে তারা তাদের গ্রামে ফিরে যাবেন। তাই তারা যেখানে আছেন সেখানেই থাকতে চান। 

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা এ রকম ছাউনির তলে রোহিঙ্গাদের কত দিন থাকতে হবে জানতে চাইলে ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: আবুল কালাম বলেন, রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য পরিবেশসম্মত শেড নির্মাণের কাজ চলছে। নিজ দেশে ফিরে না যাওয়া অথবা ভাসানচরে স্থানান্তর না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের এভাবে থাকতে হবে। 


উল্লেখ্য, উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়া ৫ লাখ ১৯ হাজার রোহিঙ্গার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ভাসানচরকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। পুরো দ্বীপটিকে রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযোগী করে তোলার জন্য নৌবাহিনী কাজ শুরু করেছে। 


উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় রোহিঙ্গাদের বসবাস হওয়ার সুবাদে তারা সীমান্তরক্ষীর অগোচরে মিয়ানমারে আসা যাওয়া করছেন। এ নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে তিক্ততা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এসব রোহিঙ্গাকে অতিসত্বর ভাসানচরে স্থানান্তর করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন ও দেশে ফেরা ঠেকাতে পরিকল্পিত হামলা চালাচ্ছে মিয়ানমার সেনারা

আলজাজিরা
 
মিয়ানমারের রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের জন্য পরিকল্পিতভাবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী হামলা চালাচ্ছে এবং বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা যাতে সেখানে আর ফিরতে না পারে সেজন্য সুসংগঠিত, সমন্বিত ও পরিকল্পিত হামলা অব্যাহত রেখেছে দেশটির সেনাবাহিনী। গতকাল বুধবার জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনের এক রিপোর্টে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশন আরো জানায়, গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর কারণে সাড়ে ৫ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেখানে সদ্য আশ্রয় নেয়া এমন ৬৫ জন রোহিঙ্গার সাাৎকার নেয় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধি। সেপ্টেম্বরের ১৪ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত যারা রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তারা রাখাইনের পরিস্থিতির বিশদ ব্যাখ্যা করেন।


সাাৎকারে রোহিঙ্গারা জানান, ২৫ আগস্ট পুলিশ পোস্টে হামলার আগেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন শুরু করে। এ সময় সশস্ত্র বৌদ্ধ উগ্রবাদীরাও হামলায় অংশ নেয়। তারা পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের হত্যা ও ধর্ষণ করে। জ্বালিয়ে দেয়া হয় তাদের বসতবাড়ি। প্রায় ৬৫ জনের সঙ্গে সাাৎকারে জাতিসঙ্ঘের প্রতিনিধি জানতে পারেন, মিয়ানমার বাহিনী নিধন অভিযান এমনভাবে পরিচালনা করে, যাতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলেও পরে তারা ভয়ে এবং আতঙ্কের কারণে যেন তাতে আগ্রহী না হয়।


রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এমন অভিযানকে পাঠ্যপুস্তকে স্থানযোগ্য জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে অভিহিত করেছেন জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের প্রধান জাইদ আল-হুসেইন। জেনেভা অফিসের সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ইঙ্গিত দেয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী উদ্দেশ্যমূলকভাবে রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি ধ্বংস করছে, ঘরবাড়ি ও পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শুধু রোহিঙ্গাদের উৎখাত করতে নয়, যাতে তারা আর ফিরে আসতে না পারে তা নিশ্চিত করতেই সেনাবাহিনী এই কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী শুধু রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়নের উদ্দেশ্যেই সামরিক অভিযান চালায়নি। বরং বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা যাতে মিয়ানমারে ফেরত যেতে না পারে সেই ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে।


প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমারের সেনা অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আর সাড়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। জাতিসঙ্ঘ সেনাবাহিনীর এই অভিযানকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। অভিযানে অংশ নেয়া সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও নারীদের ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছে জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫