ঢাকা, সোমবার,২০ নভেম্বর ২০১৭

বরিশাল

নৌকায় জন্ম, নৌকায় মৃত্যু!

রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা

১০ অক্টোবর ২০১৭,মঙ্গলবার, ২০:৪৪


প্রিন্ট
নৌকায় জন্ম, নৌকায় মৃত্যু!

নৌকায় জন্ম, নৌকায় মৃত্যু!

সন্ধ্যা হলে শত প্রদীপের আলোতে আলোকিত হয়ে ওঠে বুড়াগৌরঙ্গ নদীর তীর।  গোধুলির শেষ লগ্নের লালবর্ণ আকাশ যেমন পাল্টে দেয় সন্ধ্যা তাঁরায়। একইভাবে কৃত্রিম আলোর পশরায় এক নিপুন সন্ধ্যা নেমে আসে বঙ্গোপসাগরের মোহনায়। ক্লান্তি চোখ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে নদীর পাড়ের দিঘল এই আলোর পশরায়। সমাজ ও সভ্যতা থেকে ছিটকে পরা এই দারিদ্র জনগোষ্ঠির নাম মান্তা।

সর্বহারা কিংবা নিঃস্ব বলে সমাজে আখ্যায়িত হলেও-নিজেদের মান্তা জনগোষ্ঠি বলে দাবী করেন তারা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকার নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এই পরিবারগুলো এখন বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ন এলাকায় বসবাস করছেন।  জন্মসুত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হলেও অন্যদের মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে অক্ষম এই জনগোষ্ঠি।

পটুয়াখালীর জেলার বিচ্ছিন্ন বেশ কয়েকটি দ্বীপের মধ্য রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়ন আরো একটি অন্যতম দ্বীপ। ৯০ ভাগ মানুষ কৃষি ও মৎস্য পেশায় নির্ভর। পটুয়াখালী জেলার শেষ এবং পূর্ব-দক্ষিণ প্রান্ত রাঙ্গাবালী উপজেলার বঙ্গোপসাগরের কুল ঘেষা চরমোন্তাজ ইউনিয়নের বুড়াগৌরঙ্গ নদীর তীরে এই দারিদ্র জনগোষ্ঠির বসবাস। কখন কোন ঋতু কিংবা বর্ষা মৌসুম-  এমন হিসাব-নিকাশ নাই পরিবারগুলোর। কাঠের তৈরী ছোট্ট একটি নৌকা নিয়ে  স্থানীয় নদ-নদী গুলোতে মাছ শিকার করাই এদের মুল লক্ষ্য। নৌকায় শুধু মাছ ধরা নয়, নৌকায় জন্ম, নৌকায় শৈশব আর নৌকায় এদের মৃত্যু হয়। পরিবারের সবাই মিলে নৌকায় বসবাস করে আসছেন জন্ম থেকে। সারাদিন রোদে পুরে অথবা বর্ষায় কাক ভেজা দিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসে বুড়াগৌরঙ্গ নদীর কিনারে। দিনভরের রোজগার দিয়ে সন্ধ্যায় চুলা জালায় নৌকার ছাউনিতে। রাতেই হয় ভোজন। এভাবেই বসবাস করে আসছেন ওই নদীর কিনারে শতাধিক মান্তা পরিবার। 

শিক্ষা বলতে বাবা-মায়ের সাথে শিশু-কিশোরদের মাছ ধরা অথবা মাছ ধরার কাজে সাহায্য করা। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো দূরের কথা, নাই স্বাস্থ্য  সেবা অথবা পরিবার পরিকল্পনা এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি জানে না তারা। রোগ-বালাই সারতে দৌড়ে যায় স্থানীয় কবিরাজ, বৈদ্যের কাছে। জন্ম সুত্রে বাংলাদেশী অথবা মুসলীম দাবী করলেও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি থেকে রয়েছে তাদের প্রতি চরম অবহেলা। গ্রাম পর্যায়ে সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সাহায্য দেয়া হলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভূমিহীন অথবা নদীতে বসবাস কারীদের জন্য কোনো সাহায্য দেয়া হয় না,  তাড়িয়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ তাদের।

কথা হয় তিন পুত্র সন্তানের জননী পান্তা জনগোষ্ঠি পরিবারের সদস্য রোকেয়া বেগমের সাথে। তিনি জানান, পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কালাইয়া বন্দরের আদিবাসী ছিলেন। নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে শত বছর আগে তার পূর্ব পুরুষ চরমোন্তাজ ইউনিয়নের বুড়াগৌরঙ্গ নদীর কিনারে ঘাটি বাধে। তারপর থেকেই এই নদীর কিনারে তাদের বসবাস। বাবা সালাম সরদার ও মা রাহিমা অনেক আগেই মারা গেছেন। স্বামী আলতাব সরদার এবং শাকিব ও আখিদুল ও নাজিম নামে তিন সন্তান নিয়ে মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। শিক্ষা, পরিবার-পরিকল্পনা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অথবা সমাজের বিন্দু সভ্যতা-আচারের ছোঁয়া লাগে না এদের গায়ে। সাগরের নোনা জল যেমন জীবন বাচায়, তেমনি সাগরের এক-একটি ঢেউয়ের সাথে ক্ষয়ে যায় তাদের ছোট-ছোট স্বপ্ন। শিশু দুই সন্তানও তাদের সাথে মাছ ধরার কাজে সাহায্য করছেন। গৃষ্ম কিংবা শীত নাই। দিনরাত মাছ ধরে বাজারে বেচে দিয়ে সওদা করতে হবে, এমন চিন্তা ছারা সমাজের নূন্যতম সভ্যতা-আচার জানে না তারা।

এসময় আরো কথা হয় মান্তা পরিবারের সদস্য পারুজান বিবির (৪০) সাথে রুবেল, সোহেল, জুয়েল, খলিল, জামুজান এবং লিপিসহ ছয় সন্তানের মা তিনি। অন্যদের মত জাল নাই তার। বরশি দিয়ে মাছ ধরেন তিনি। ছয় সন্তান নিয়ে ছোট্ট একটি নৌকার ছাউনিতে সকলের বসবাস। অর্থ সঙ্কটে জাল কেনা হয়নি তার। তাই আয়-রোজগার কম। কিন্তু পরিবারের সদস্য সাত জন। এভাবেই চরমোন্তাজের বুড়াগৌরঙ্গ নদীর কিনারে শতাধিক নৌকায় নারী-পুরুষ,শিশুসহ অন্তত পাঁচ শতাধিক মানুষের বসবাস। মৌলিক চাহিদা বলতে সাগরের নোনা জলে গোসল করা এবং মাছ ধরে চরমোন্তাজের বাজারে বেচে দিয়ে চাল-ডাল কিনে পরিবার নিয়ে বেচে থাকা। এভাবেই শত-শত শিশুর জন্ম হয়েছে কাঠের নৌকার ছাউনিতে। সমাজের নূন্যতম আচার-সভ্যতা ছারাই বেড়ে ওঠে এই পরিবারের সদস্যরা।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫