ঢাকা, বুধবার,১৮ অক্টোবর ২০১৭

স্বাস্থ্য

নারীদেহের প্রজননতন্ত্র বা তলপেটের প্রদাহ : কী এবং কেন

ডা: জ্যোৎস্না মাহবুব খান

১০ অক্টোবর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৪:৪৩


প্রিন্ট
নারীদেহের প্রজননতন্ত্র বা তলপেটের প্রদাহ : কী এবং কেন

নারীদেহের প্রজননতন্ত্র বা তলপেটের প্রদাহ : কী এবং কেন

নারীদেহের প্রজননতন্ত্র বা তলপেটের মারাত্মক প্রদাহের মধ্যে পিআইডি বা পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ অন্যতম। বেশির ভাগ মহিলাই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ দিন কষ্ট ভোগ করে। এ প্রদাহ দুই রকম হতে পারে- প্রথমত, জননাঙ্গের নিচের দিকের প্রদাহ। দ্বিতীয়ত, জননাঙ্গের ওপরের দিকের প্রদাহ।

কারণ
এ রোগের অনেকগুলো কারণের মধ্যে যৌন রোগ, যেমন- গনোরিয়া ও ক্ল্যামাইডিয়া সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য। স্বামীর যদি যৌন রোগ থাকে তাহলেও হতে পারে। ৬০-৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে পিআইডি যৌন রোগের সাথে সম্পর্কযুক্ত। জননাঙ্গে যক্ষ্মার জীবাণুর সংক্রমণেও পিআইডি হতে পারে। মদপান, ড্রাগ আসক্তি ও একাধিক যৌনসঙ্গীর কারণে পিআইডি হয়ে থাকে। অন্যান্য কারণের মধ্যে অল্প বয়সে যৌনজীবন শুরু, মাসিকের সময় সহবাস, অস্বাস্থ্যকর ও অদক্ষভাবে গর্ভপাত করা এবং ডেলিভারি করানো, ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে কনডম ব্যবহার না করা, স্ত্রী জননাঙ্গের কোনো অপারেশনের পর লুপ বা কপারটি পরানোর পর এ প্রদাহ হতে পারে।

সাধারণত ১৪-২৫ বছর বয়সের মহিলারা পিআইডিতে বেশি আক্রান্ত হয়। অশিক্ষিত ও দরিদ্র মহিলাদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি, কারণ তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা খুবই কম।

লক্ষণ
তলপেটে তীব্র ব্যথা হওয়া। এ ব্যথা কোমর ও বাহুতে বিস্তার করতে পারে। তলপেট ভারী অনুভব করা। সহবাসে এবং জরায়ু ও জরায়ুমুখ স্পর্শ করলে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করা। যোনিপথে দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব বা পুঁজ নির্গত হওয়া। মূত্রনালীর চারপাশের গ্রন্থিতে বা বারথোলিন গ্লান্ডে সংক্রমণ থাকে ফলে প্রস্রাব করার সময় ব্যথা ও জ্বালা-যন্ত্রণা করতে থাকে। মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে। শরীরে সব সময় জ্বর থাকতে পারে। মাথাব্যথা, বমি ভাব, পেট ফাঁপা, খেতে অরুচি ও স্বাস্থ্য ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে।

পরীক্ষা
রক্তের রুটিন পরীক্ষা করতে হবে। জরায়ুমুখের রস পরীক্ষা করলে গনোরিয়ার জীবাণু পাওয়া যেতে পারে। বাওল সাউন্ড কম থাকলে পেটের এক্স-রে করার প্রয়োজন হতে পারে। ট্রান্স ভ্যাজাইনাল আলট্রাসনোগ্রাম ও ল্যাপারোস্কপি করলে আরো সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।
কিছু কিছু সমস্যা আছে, যাদের লক্ষণ পিআইডির মতো মনে হতে পারে যেমন- একিউট এপেন্ডিসাইটিস, মূত্রনালীর তীব্র প্রদাহ, জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ বা অক্টোপিক প্রেগনেন্সি, সেপটিক অ্যাবরশন বা গর্ভপাত ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা করে সঠিক কারণ নির্ণয় করতে হবে।

চিকিৎসা
পিআইডির লক্ষণগুলো দেখা গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগে চিকিৎসা করতে হবে। অবস্থা জটিল হলে প্রয়োজনে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করাতে হবে। মুখে খাওয়ার জন্য ট্যাবলেট ওফ্লক্সাসিন ৪০০ মিলিগ্রাম ১২ ঘণ্টা পরপর ১৪ দিন, এর সাথে ট্যাবলেট মেট্রোনিডাজল ৪০০ মিলিগ্রাম ১২ ঘণ্টা পরপর ১৪ দিন খেতে হবে। যদি দেখা যায়- মুখে ওষুধ খাওয়ার তিন দিন পরও লক্ষণগুলো প্রশমিত হচ্ছে না বা রোগীর অবস্থার অবনতি হচ্ছে, তবে তৃতীয় জেনারেশন সেকালোস্পোরিন বা ইনজেকশন সেফটিয়াক্সন ২৫০ মিলিগ্রাম মাংসপেশিতে এককমাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে, তার সাথে ডক্সিসাইক্লিন ১০০ মিলিগ্রাম ১২ ঘণ্টা পরপর ১৪ দিন মুখে খেতে হবে।

পিআইডি রোগীর যৌনসঙ্গীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও যৌন রোগ নির্ণয় করে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। যৌনসঙ্গীর সঠিক চিকিৎসা না হলে রোগিণী আবার আক্রান্ত হয়ে পড়বে।
গর্ভাবস্থায় পিআইডি হলে গর্ভবতীকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি রেখে ইনজেক্টেবল অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে। গর্ভবতীর দ্রুত এবং সঠিক চিকিৎসা না হলে মা ও শিশু নানা রকম জটিলতার শিকার হবে, এমনকি শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।

প্রতিরোধ ব্যবস্থা
পিআইডি রোগীর উপযুক্ত চিকিৎসা করা না হলে পরবর্তীকালে বন্ধ্যাত্ব এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়, যেমন- পেলভিক পেরিটোনাইটিস বা পেলভিক সেলুলাইটিস, টিউবো-ওভারিয়ান অ্যাবসেস, পেলভিক অ্যাডহেশন, পরিপাকতন্ত্রের অ্যাডহেশন, গনোকক্কাল আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি। সে জন্য যৌন রোগগুলোর প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা দিলে পিআইডি হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব। সন্তান হওয়ার পর বা গর্ভপাতের পর বিশেষ পরিচ্ছন্নতা দরকার। মাসিকের সময় কাপড় বা ন্যাপকিন যাই ব্যবহার করা হোক না কেন, তা অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। একবার ব্যবহার করা জিনিস কখনোই দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিবার বাথরুমে যাওয়ার পর যৌনাঙ্গ ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সহবাসে কনডম ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কনডম সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেট ডিজিজ থেকে রক্ষা করে যৌন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
লেখক : জেনারেল প্রাকটিশনার (মহিলা ও শিশু)
মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ

আলসারের সমস্যা : জেনে নিন কিছু জরুরি বিষয়

ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত নাম পেপটিক আলসার। পেপটিক আলসার আসলে কী? পাকস্থলী থেকে নিঃসৃত হাইড্রোক্লোরিক এসিড এবং পেপসিনের ক্রিয়ার ফলে পরিপাকতন্ত্রের কোনো স্থানে ক্ষত বা ঘা সৃষ্টি হলে তাকে পেপটিক আলসার বলে। পেপটিক কথাটি মূলত এসেছে পাকস্থলীর প্রোটিন পরিপাকে সাহায্যকারী এনজাইম ‘পেপসিন’ থেকে। 

কোথায় কোথায় পেপটিক আলসার হয়
- ডিওডেনামের প্রথম অংশে
- পাকস্থলী যেখানে বাঁক নিয়েছে সেই ক্ষুদ্রতর অংশে
- খাদ্যনালীর নিচের অংশে
- অপারেশন করে ক্ষুদ্রান্ত্রের সাথে পাকস্থলীর সংযোগ ঘটালে সেই সংযোগস্থলে (জেজুনামে)।
- কালেভদ্রে মেকেলস ডাইভারটি ক্যুলামে।

পেপটিক আলসার সচরাচর বেশি হয় ডিওডেনাম ও পাকস্থলীতে। অতিরিক্ত এসিড নিঃসরণের জন্য ডিওডেনামে আলসার হয়। ডিওডেনাম হলো ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ। এখানে আগে থেকে অগ্ন্যাশয়ের ক্ষারীয় রস এসে থাকে, যা পাকস্থলী থেকে আগত এসিড মিশ্রিত খাদ্য থেকে ডিওডেনামকে রক্ষা করে। কিন্তু যদি ক্ষারীয় অগ্ন্যাশয়ে রস পর্যাপ্ত না আসে তাহলে অতিরিক্ত এসিডের জন্য ডিওডেনামে ঘা হতে পারে। একে বলে ডিওডেনাল আলসার। ওই দিকে, পাকস্থলী থেকে অতিরিক্ত হাইড্রোক্লোরিক এসিড নিঃসৃত হলে পাকস্থলীর ঝিল্লি আবরণী পর্দাটি নষ্ট হয়ে সেখানে ঘা হতে পারে। একে বলে গ্যাস্ট্রিক আলসার।
গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং ডিওডেনাল আলসার- এ দুটোকে একত্রে পেপটিক আলসার বলে।

পেপটিক আলসারের কারণ
পেপটিক আলসারের প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত অ্যাসিড নিঃসরণ এবং পাকস্থলীর ঝিল্লি আবরণী বা মিউকাস মেমব্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া। বিভিন্ন কারণে এটা হতে পারে। পেপটিক আলসার হওয়ার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো-

বংশগত
পেপটিক আলসারের রোগীদের ক্ষেত্রে বংশগত প্রভাব লক্ষ করা যায়। দেখা গেছে বাবা-মায়ের পেপটিক আলসার থাকলে তা সন্তান-সন্ততিরও হচ্ছে। এ ছাড়া দেখা গেছে যাদের রক্তের গ্রুপ ‘ও’ তারা বেশি ভোগেন ডিওডেনাল আলসারে।

অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়া
ঠিকমতো খাবার চিবিয়ে না খেলে কিংবা অনিয়মিত খাবার খেলে পেপটিক আলসার হয়। আমাদের শরীর মূলত বায়োলজিক্যাল ঘড়ি। খাওয়া-দাওয়ার বেলায় সাধারণত আমরা একটা নিয়ম মেনে চলি। অর্থাৎ সকালে নাশতা, দুপুরে ভাত, বিকেলে নাশতা, আবার রাতে ভাত। এই খাদ্যাভ্যাস অনুসারে পাকস্থলীতে এসিড নিঃসৃত হয়। অর্থাৎ যে যেভাবে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলবেন তার এসিড নিঃসরণের ব্যাপারটা সেভাবে ঘটবে। যারা উপরি উক্ত অভ্যাসে অভ্যস্ত তারা যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান অর্থাৎ দুপুরের খাবার বিকেলে কিংবা রাতের খাবার নির্দিষ্ট সময়ে না খেয়ে আরো পরে খান, তাহলে এসিড নিঃসরণের ফলে দেখা দেবে জটিলতা। দেখা যায় পাকস্থলীর যে নিঃসরণ তা যথাসময়েই হচ্ছে কিন্তু ওই সময় পাকস্থলীতে খাবার না থাকার দরুন নিঃসৃত এসিড পাকস্থলীর দেয়ালকে পুড়িয়ে দেয়। এভাবেই সৃষ্টি হয় আলসার।

ধূমপান
ধূমপানের প্রভাবে পাকস্থলীর আবরণী ঝিল্লি নষ্ট হয় এবং এসিড নিঃসরণের মাত্রাও বেড়ে যায়। ফলে অনিবার্যভাবে সৃষ্টি হয় আলসার।

মসলাযুক্ত খাবার
অতিরিক্ত তেল, ঝাল এবং মসলাযুক্ত খাবার এসিড নিঃসরণের মাত্রা বাড়িয়ে পেপটিক আলসার তৈরিতে সাহায্য করে। বাসি খাবারও তাই।

চা, কফি কিংবা অ্যালকোহল পান
এসব পানীয় পেপটিক আলসারের অন্যতম কারণ। যারা চা, কপি কিংবা অ্যালকোহলে আসক্ত তাদের পেপটিক আলসার হবেই।

দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ
দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপে পাকস্থলীতে এসিড নিঃসরণ সর্বদা বেশি হয়। আর তাই পেপটিক আলসার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি থাকে।

ব্যথার ওষুধ
পেপটিক আলসারে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দীর্ঘ দিন ব্যথার ওষুধ খাওয়া। ব্যথার ওষুধ খালিপেটে খেলে কিংবা এই ওষুধের সাথে অ্যান্টাসিড বা রেনিটিডিন জাতীয় ওষুধ না খেলে পেপটিক আলসারে আক্রান্ত হতে হয়। এসব ব্যথার ওষুধের মধ্যে রয়েছে-
প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন, ডাইক্লোফেনাফ সোডিয়াম, ইনডোমেথাসিন, ফেনাইল বিউটাজন, স্টেরয়েড প্রভৃতি।

হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরি
অন্ত্রের জীবাণু হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরির সংক্রমণে পেপটিক আলসার হয়। দেখা গেছে অনেক মানুষ অজ্ঞাতে এই জীবাণুটি বহন করে চলেছেন। আলসার রোধের প্রধান ওষুধগুলো আলসারের লক্ষণ বিলুপ্ত করলেও হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরি নামক ব্যাকটোরিয়াজনিত ক্ষতে সেখানে সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং পুনরায় আলসারের উৎপত্তি হয়।

রোগের উপসর্গ
পেপটিক আলসারের রোগীদের দীর্ঘকালব্যাপী ক্ষুধামন্দা থাকে। পেট ফাঁপা থাকতে পারে, বুক জ্বালাপোড়া, সেই সাথে টক ঢেঁকুর হতে পারে।
পেটে ব্যথা পেপটিক আলসারের প্রধান লক্ষণ। ব্যথা সাধারণত পেটের উপরিভাগে হয়। অনেক সময় চিনচিনে যন্ত্রণা হয়। ডিওডেনাল আলসারের রোগীদের ব্যথা হয় খালিপেটে, শেষ রাতের দিকে ব্যথা বেড়ে যায়- অনেক সময় ব্যথায় ঘুম ভেঙে যায়, তবে অ্যান্টাসিড কিংবা খাবার খেলে ব্যথা চলে যায়। কিন্তু গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগীদের খাবার পর ব্যথা বেড়ে যায়, পেট জ্বলে যেতে থাকে।

গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগীদের বমি হয় কিন্তু ডিওডেনাল আলসারের রোগীদের সাধারণত বমি হয় না- তবে দীর্ঘকাল ডিওডেনাল আলসারে ভুগলে বমি হয়, একপর্যায়ে পেটে এত অস্বস্তি হয় যে, মুখে আঙুল দিয়ে বমি করে রোগী স্বস্তি পেতে চায়। দীর্ঘস্থায়ী পেপটিক আলসারে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। এ সময়ে বমির সাথে রক্ত যেতে পারে, পায়খানা হতে পারে আলকাতরার মতো কালো। দীর্ঘস্থায়ী পেপটিক আলসারের রোগীর বমির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এদের বমির সাথে কয়েক দিন আগের জমা খাবার বেরিয়ে আসে।

গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগীরা খাবার খেতে ভয় পায়, কারণ খাবার খেলে তাদের ব্যথা বেড়ে যায় কিন্তু ডিওডেনাল আলসারের রোগীদের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটে। এদের ক্ষুধা বেশি থাকে।
গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগীদের শরীরের ওজন কমে যায়, কিন্তু ডিওডেনাল আলসারের রোগীদের শরীরের ওজন কমে না বরং বেশি বেশি খাদ্য গ্রহণের জন্য ওজন অনেক সময় বেড়ে যায়।

কিভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়

পরিপাক তন্ত্রের উপরিভাগের এনডোস্কপি
রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি এটা। এ ক্ষেত্রে একটি সরু নলের মাধ্যমে, পাকস্থলী ও ডিওডেনামের ভেতরের অবস্থা সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায়। পাকস্থলী ও ডিওডেনামের ঝিল্লির স্বাভাবিক বর্ণ লালচে ও মখমলের মতো। কিন্তু আলসার হলে সেখানটা ফ্যাকাসে ও সাদা হয়ে যায়।

বেরিয়াম মিল এক্স-রে
এ ক্ষেত্রে রোগীকে বেরিয়াম সালফেট খাওয়ানোর পর পাকস্থলী ও ডিওডেনামের এক্স-রে করা হয়। এক্স-রেতে আলসার থাকলে তা ধরা পড়ে, তবে অনেক সময় ধরা নাও পড়তে পারে।

এইচ পাইলোরি পরীক্ষা
হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরি, সংক্ষেপে এইচ পাইলোরি উপস্থিত থাকলে তা র‌্যাপিড ক্লো টেস্ট অথবা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে।

পেপটিক আলসারের রোগীর চিকিৎসা
পেপটিক আলসারের রোগীর চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাকে উপসর্গের হাত থেকে রেহাই দেয়া এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘা সেরে তোলা। পেপটিক আলসারের রোগীকে অবশ্যই রুটিনমাফিক শৃঙ্খলিত জীবনযাপন করতে হবে এবং ঠিকমতো ওষুধ খেতে হবে।

বিশ্রাম
ব্যথা বেড়ে গেলে রোগীকে বিছানায় পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে।

অ্যান্টাসিড থেরাপি
ব্যথা না কমা পর্যন্ত রোগীকে ২ ঘণ্টা অন্তর ১৫-৩০ মিলি তরল অ্যান্টাসিড খাওয়াতে হবে। ব্যথা কমে গেলে আহারের ১ ঘণ্টা পরে প্রতিবার ২ চা-চামচ এবং রাতে শোয়ার সময় ২ চা-চামচ দেয়া যেতে পারে। এভাবে ৪-৬ সপ্তাহ চলবে। তবে এরপরও পেটে ব্যথা কিংবা অস্বস্তি হলে অ্যান্টাসিড খেতে হবে।

আলসার উপসমকারী ওষুধ
৩০০ মি.গ্রা. রেনিটিডিন দিনে একবার অথবা ১৫০ মি.গ্রাম রেনিটিডিন দিনে দুইবার অথবা ৪০ মি.গ্রাম ফ্যামোটিডিন দিনে একবার অথবা ২০ মি.গ্রা. ফ্যামোটিডিন দিনে দুইবার অথবা ১ গ্রাম সুক্রালফেট দিনে চার বার নিয়মিতভাবে ১-২ মাস সেবন করলে শতকরা ৯০ ভাগ রোগী ভালো হয়। কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে এসবের চেয়ে ‘ওমিপ্রাজল’ দ্রুত কাজ করে। এ ক্ষেত্রে ২০ মি. গ্রাম ওমিপ্রাজল দৈনিক একবার এক মাস খাওয়া যেতে পারে। ওমিপ্রাজলের মতো প্যানটোপ্রাজল, ইসোমেপ্রাজল বা র‌্যাবেপ্রাজল একই মাত্রায় খাওয়া যেতে পারে।

ট্রিপল থেরাপি
হেলিকো ব্যাক্টর পাইলোরিক জীবাণু উপস্থিত থাকলে তিনটে ওষুধ প্রয়োগ করে আলসারের চিকিৎসা করা হয়। একে ট্রিপল থেরাপি বলে। এই তিনটে ওষুধ হলো এমোক্সিসিলিন, মেট্রোনিডাজল ও বিসমাথ। তিনটে ওষুধই একমাত্র দুই সপ্তাহ খেতে হয়।
তবে বর্তমানে জনপ্রিয় ট্রিপল থেরাপি হলো একটি প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (ওমিপ্রাজল বা ইসোমোপ্রাজল) ও দু’টি অ্যান্টিবায়োটিক- ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন ও এমোক্সিসিলিন। এগুলো ওষুধ দৈনিক দুইবার সাত দিন গ্রহণ করতে হয়। 
এর পরিবর্তে ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন, মেট্রোনিডাজল ও ল্যানসোপ্রাজলের কম্বিনেশন (পাইলোপ্যাক) গ্রহণ করতে পারেন। অথবা এমোক্সিসিলিন, ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন ও র‌্যাবে প্রাজলের কম্বিনেশন (পোইলো কিওর) গ্রহণ করা যেতে পারে। অথবা এমোক্সিসিলিন, ক্ল্যারিথ্রোমাইসিন ও ল্যানসোপ্রাজলের কম্বিনেশন (পাইলোট্রিপ) গ্রহণ করতে পারেন।

প্রশান্তিদায়ক ওষুধ
দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, বিশ্রামহীনতা প্রভৃতিতে আলসার বেড়ে যায় বলে এ সময়ে দৈনিক রাতে ৫ মি. গ্রাম ডায়াজিপাম খাওয়া যেতে পারে।

উপদেশনামা
পেপটিক আলসারের রোগীকে অবশ্যই কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে, নইলে রোগ মুক্তি কিছুতেই ঘটবে না।
- ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন করতে হবে।
- সময়মতো আহার করতে হবে।
- সাধারণ খাবার খেতে হবে। যেসব খাবার খেলে অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয় তা বাদ দিতে হবে।
- মসলাযুক্ত ও ঝাঁঝাল খাবার পরিহার করতে হবে।
- চা ও কফি এড়িয়ে চলতে হবে।
- মানসিক চাপ, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা প্রভৃতি ঝেড়ে ফেলতে হবে।
- যেসব ওষুধ আলসার তৈরি করে তা পরিহার করতে হবে।

শল্যচিকিৎসা
যখন পেপটিক আলসারের রোগীর অপারেশন প্রয়োজন হয়
- যদি ওষুধের মাধ্যমে আলসার নিয়ন্ত্রণ করা না যায়
- যদি আলসারের কারণে রোগীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়
- যদি আলসারের কারণে বিভিন্ন জটিলতা (যেমন অন্ত্র ফুটো হওয়া, অন্ত্রে প্রবেশের দ্বার সরু হওয়া, রক্তক্ষরণ হওয়া) দেখা দেয়। 
- যদি ক্যান্সার সন্দেহ করা হয়।

লেখক : স্বাস্থ্য নিবন্ধকার, কথাসাহিত্যিক ও সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। 
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি:, ২, ইংলিশ রোড, ঢাকা। ফোন : ০১৭১৬২৮৮৮৫৫

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫