রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে মার্কিন মিত্ররা : বদলে যাচ্ছে সমীকরণ
রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে মার্কিন মিত্ররা : বদলে যাচ্ছে সমীকরণ

রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে মার্কিন মিত্ররা : বদলে যাচ্ছে সমীকরণ

নয়া দিগন্ত অনলাইন

সম্প্রতি রাশিয়া থেকে অত্যাধুনিক এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে তুরস্ক। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিকবাহিনীর দেশ তুরস্ক গত এক বছর ধরেই সিরিয়ায় মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে রাশিয়ার সাথে সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড করছে। একইভাবে সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ সম্প্রতি ঐতিহাসিক এক সফরে মস্কো গিয়ে বেশ কিছু সহযোগিতার চুক্তি সম্পাদন করেছেন। তিনিও তার দেশের জন্য রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ক্রয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক পুরনো মিত্র পাকিস্তান মস্কোর সহযোগিতায় ৬০০ মেগা ওয়াটের বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে সম্মত হয়েছে, রাশিয়া থেকে হেলিকপ্টার ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী কিনেছে এবং যৌথ সামরিক মহড়া করেছে রুশ বাহিনীর সাথে।


অথচ এই তিনটি দেশই স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে ওয়াশিংটনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছে। দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের ছায়া হিসেবে কাজ করেছেন ও ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রেখেছেন।


ওয়াশিংটন-আঙ্কারা সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বুঝতে একটি উদাহরণই যথেষ্ট যে, তুরস্কের ইনজারলিক বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন বোমারু বিমান সিরিয়ায় বোমা ফেলছে। ঘাঁটিটিতে প্রায় ৫০টি বি-৬১ বোমারু বিমান ও হাইড্রোজেন বোমা মোতায়েন রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘাঁটিটির নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য ২০১৬ সালে জুলাইয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ঘাঁটির কমান্ডার জেনারেল বেকির এরকান ভ্যানসহ ৯ কর্মকর্তাকে অভ্যুত্থান চেষ্টায় সমর্থনের দায়ে গ্রেফতার করেছিল তুরস্ক।

ঘাঁটির লোকদের বাইরে আসা-যাওয়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছিল। সে সময় ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। একইভাবে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বুঝতে একটি বিষয় জানা দরকার যে, স্নায়ুযুদ্ধের সময় আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের গোয়েন্দা শক্তি ও উপসাগরীয় অর্থ কাজে লাগিয়েছে ওয়াশিংটন।


এটা ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্র মিলিশিয়াদের সহায়তা করেÑ তবে তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য। যেমন জেনেভা চুক্তি অনুযায়ী আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার করার পর আফগান মুজাহিদদের আর সহায়তা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।


মস্কোর সাথে আঙ্কারার সম্পর্ক বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় পাওয়া তুর্কি নেতা ফতহুল্লাহ গুলেনের অনুসারীদের দ্বারা অভ্যুত্থান চেষ্টা। তবে এই সম্পর্ক উন্নয়নের শিকড় আরো গভীরে, যেখানে আছে সিরিয়া নীতি নিয়ে তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিভক্তি। ২০১৪ সালে আইএস ইরাকের বেশ কয়েকটি শহর দখল করে নেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের সিরিয়া ও ইরাক নীতিতে কুর্দিদের অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। মনে রাখা দরকার যে, সিরিয়া ও ইরাকের সঙ্ঘাত মূলত তিনপক্ষীয়Ñ সুন্নি আরব, শিয়া আরব ও সুন্নি কুর্দি। আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের শিয়া সরকারে সহযোগিতা নিয়েছে, যদিও শিয়া আরবদের ওপর তাদের আস্থা কম। কারণ শিয়া আরবরা সব সময়ই ইরানপন্থী হিসেবে পরিচিত।


সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের আঞ্চলিক দলগুলোর উদ্বেগ ছিলো যে, সৌদি আরব, জর্ডানসহ অন্যান্য উপসাগরীয় আরব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সিরিয়া ও ইরাকের কুর্দিদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার বিষয়ে আপত্তি করবে না। কারণ যেকোনো মূল্যে ওই অঞ্চলে ইরানের হুমকি মোকাবেলা করতে চায় ওই দেশগুলো। অন্য দিকে ইরানের হুমকির চেয়েও দক্ষিণাঞ্চলীয় কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিষয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিল তুরস্ক। বিশ্বের সমালোচনা সত্ত্বেও কুর্দিরা স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করার পর যা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। কামাল আতাতুর্কের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তুর্কি ক্ষমতাসীনদের। কিন্তু কুর্দিদের সমর্থনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে তুরস্কের একে পার্টির সরকার হয়তো স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার প্রতিপক্ষ রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছে।
ইনফরমেশন ক্লিয়ারিং হাউজ

তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি ভিসা বাতিল

আলজাজিরা ও বিবিসি

নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে পারস্পরিক ভিসা বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক। গত সপ্তাহে তুরস্কে মার্কিন মিশনের এক কর্মকর্তাকে আটকের অভিযোগে তুর্কি নাগরিকদের ভিসা বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র। এর কিছুক্ষণ পরই তুরস্ক থেকেও আসে একই ঘোষণা। 


যুক্তরাষ্ট্র মিশন থেকে বলা হয়, তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে তুরস্ক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের সেই প্রতিশ্রুতির পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভিসা সার্ভিস সীমিত করে আনা হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রোববার ওয়াশিংটনে অবস্থিত তুরস্কের দূতাবাসও একই সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ‘নন-ইমিগ্রান্ট’ ভিসা সার্ভিস স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এ বিষয়ে ওয়াশিংটনে তুরস্কের দূতাবাস থেকে একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ফলে তুরস্ক সরকার তার মিশন এবং এতে নিযুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে তুরস্ক সরকার।


গত সপ্তাহে মার্কিন কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তাকে ইস্তাম্বুল থেকে আটক করা হয়। তুরস্কের গত বছরের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় ওই কনস্যুলেট কর্মীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সন্দেহ থেকেই তাকে আটক করা হয়। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আনাদোলু নিউজ এজেন্সির এক খবরে জানানো হয়েছে, আটক হওয়া ওই কনস্যুলেট কর্মী তুরস্কের নাগরিক। তবে এ অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা জানায় এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এ পদক্ষেপে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.