ঢাকা, বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

নিরাপত্তাহীন এক মায়ের আর্তনাদ

রুখসানা আমিন সূরমা

০৯ অক্টোবর ২০১৭,সোমবার, ১৮:২৬


প্রিন্ট
নিরাপত্তাহীন এক মায়ের আর্তনাদ

নিরাপত্তাহীন এক মায়ের আর্তনাদ

‘আমার সন্তান মো: সোহান খান। বয়স ১৫ বছর। উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি লম্বা। ওজন ৫৩ কেজি। গায়ের রঙ উজ্জ্বল। চেহারাটা বেশ সুন্দর। খিলগাঁও নন্দীপাড়া ব্রিজ ব্যাংক কলোনি নন্দীপাড়া আইডিয়াল স্কুলে পড়তো অষ্টম শ্রেণীতে। গত ১ সেপ্টেম্বর কোরবানির ঈদের আগের রাতে আমার ছেলে কোরবান হয়ে গেল। আমার স্বামী মারা গেছে প্রায় দেড় বছর আগে। ছেলেটাকে নিয়ে আমি বেঁচে ছিলাম। ছেলে আমাকে বলল, আম্মু, আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। আমি বসে আছি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চারটি ছেলে এসে আমাকে ডাকল। বলল, আমাদের সাথে আপনাকে যেতে হবে। আমি বললাম, তোমরা কে? ওরা আমাকে বলল, আমরা সোহানের বন্ধু। আমি বললাম, সোহানের বন্ধুদের তো আমি চিনি। তোমাদের চিনি না। তোমরা আসলে কে, সোহান কোথায়, আমাকে কোথায় যেতে হবে? ওরা বলল, আপনাকে নেওয়াজ বাগ যেতে হবে। আমি তাড়াহুড়া করে ছুটতে লাগলাম ওদের সাথে।

পনেরো মিনিটের মতো লাগল আমি পৌঁছালাম একটা মার্কেটের গলিতে। দেখলাম এক দেড় শ’ লোকের সমাগম। আমি গিয়ে একটা চেয়ারে বসলাম। দেখলাম আমার সোহান মাথা নিচু করে বসে আছে তার দিকে তাকিয়ে আমার বুকটা আতকে উঠল। আমার সোহানের চুলগুলো খুব এলোমেলো। শার্টের বোতামগুলো খোলা। দুপায়ের ট্রাউজারে হাঁটুতে কাদা। খুব বিধ্বস্ত অবস্থা। আমার খুব খারাপ লাগছিল বেশ কিছু লোকজন মাতবরের মতো ভাব ধরে পায়ের ওপর পা দিয়ে সিগারেট খাচ্ছিল।

কালো মোটা এক লোক তার নাম বলল ওমর আলী, সে বলল আপনার ছেলের এই এলাকায় একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক। প্রায় সময় দেখা সাক্ষাৎ করে এর আগেও নিষেধ করেছি শুনেনাই আজ আবার এসেছে তাই ধরে আপনাকে ডাকলাম। আমি বললাম আপনি বিচার করার কে? বলল যেই মেয়ের সাথে সম্পর্ক সেই মেয়ে আমার বাসায় ভাড়া থাকে, আরেক লোক দিদার আলী সে বলল, ছেলেকে যদি সুস্থ দেখতে চান ভালো রাখতে চান তাহলে এই এলাকা ছেড়ে চলে যাবেন । ওমর আলী আমার লিখিত নিলো যে, ‘আমি আমার ছেলেকে বুঝিয়া পাইলাম’। আরো বলল আর কোনো দিন আপনার ছেলে এই এলাকায় আসবে না সেই ব্যবস্থা আপনাকে করতে হবে।

‘যেই মেয়ের সাথে আমার সোহানের সম্পর্ক ছিল তার নাম দিশা। ওরা একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়তো। আমি মেয়েকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম যা শোনলাম তা কি সত্যি তুমি বলো তো, মেয়ে সবার সামনে বলল না এসব কথা মিথ্যা। আমি বললাম তাহলে আপনি মিথ্যা বলছেন কেন? আমি আমার সোহানকে জিজ্ঞেস করলাম কি হইছে তুমি কিছু বলো তো। সোহান মাথা নিচু করে বসে থাকল, মাথা উঠাচ্ছে না বিধায় আমি কিছুই বুঝতে পারি নাই। আমি সোহানকে নিয়ে চলে এলাম ওকে বাসায় রেখে বললাম তুমি বাসায় থাকো কাল সকালেতো ঈদ আমার একটু বাজারে যাওয়া দরকার তাড়াতাড়ি আসব তুমি বাসায় থাকো এই বলে আমি সাড়ে ৭টায় বাজারে গেলাম ঠিক সাড়ে ৮টায় ফিরে এলাম। দরজা আর খোলে না; কিন্তু আমি বার বার সোহানের রুমে ওর চেয়ারের শব্দ পাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর বাসার পাশের মহিলা আর তার মেয়ে এলো তারাও ডাকল এবং মেয়েটাও বলল আন্টি চেয়ারের শব্দ হচ্ছে। চিন্তা করবেন না সোহান মনে হয় রাগ করে বসে আছে তখন আমার কাছে অস্থির লাগছিল।

আমাদের বাড়িওয়ালা নাই কেয়াটেকার আছে, তাকে বললাম যত তাড়াতাড়ি পারেন দরজাটা ভেঙে দেন কি হলো আমার তো খুব খারাপ লাগছে দেরি করবেন না তাড়াতাড়ি দরজা ভাঙেন। উনি বলল মনে হয় ঘুমাইছে এই কথা বলে এদিক ওদিক ঘুরা ফেরা করছে প্রায় ঘণ্টা হয়ে এলো একপর্যায় দেখলাম বাড়ি উপচে পড়ছে মানুষের ভিড় আমি চিৎকার করে কাঁদতে থাকলাম আর বললাম কি হইছে আপনারা কি বলাবলি করছেন দরজা কেন ভাঙছেন না তখন বলল পুলিশ লাগবে পুলিশ খবর দেয়া হইছে অপেক্ষা করেন আমি বললাম কেন কি হইছে আপনারা আগে দরজা ভাঙেন এই বলে চিৎকার করে যখন কাঁদতে থাকলাম তখন কিছু লোক আমাকে জোড় করে ধরে টেনেহেঁচড়ে একটা ঘরে নিয়ে দরজা আটকিয়ে রাখলো।

আমি বসে বসে কাঁদছি আর আমার আত্মীয়স্বজনকে ফোনে এসব বলছি ঘণ্টাখানেক পর আমাকে বের করা হলো আমি এসে দেখলাম পুলিশ এবং লোকজনের ভিড়। রুমের দিকে তাকাতেই দেখি আমার সোহানের পা মাটিতেই ঝুলে আছে। সোহানের দেহটা বিছানায় রাখল আমি চেয়ে দেখলাম তার কপালটা ঘাটাচ্ছে বুকে দুইটা ছিদ্র আমি আমার বড় ভাইয়ের হাত ধরে কাদলাম, আর বললাম আপনারা ডাক্তার আনেন ওকে হাসপাতালে নেন ও বেঁচে যাবে ও মরে নাই ও মরতে পারে না আমার ভাই বলল, লাভ হবে না ও মরে গেছে।

‘একপর্যায়ে পুুলিশ সোহানের দেহটা নিয়ে চলে গেল। আমি সারা রাত বসে কাঁদছিলাম। সব লোক আত্মীয় সবাই একপর্যায় চলে গেল। পরদিন ঈদের দিন ভোর বেলায় আমি খিলগাঁও থানায় চলে গেলাম সেখানে কাজ সেরে দুপুরে গেলাম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হসপিটাল। সেখানে সব কাজ শেষ করে সন্ধ্যার সময় সোহানের লাশটা নিয়ে এলাম, উত্তরায় সোহানের নামাজে জানাজা দাফন কাফন শেষ হলো। রাত সাড়ে ১০টায় কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে শুধু কাঁদলাম। তারপর দুই দিন ওর কবরের কাছে যেতে পারিনি।

‘কয় দিন পর আমি আমার আম্মাকে নিয়ে উত্তরা থেকে আমার বাসা খিলগাঁও চলে এলাম যেখানে ঘটনা। আমি আসতেই জনতার ঢল নামল আমার বাসায় এসে সবাই বলছে। মামলা করুন, এভাবে ছেড়ে দেবেন না। ওদের শাস্তি দেবেন না। লোকজন মুখ খুলতে শুরু করল- বলল, সেদিন রহমত আলী কফিল ওকে খুব পিটাইছে এবং ওমর আলী ও ওকে মারছে এবং এরা সবাই ওকে খুব নোংরা আজে বাজে কথা বলে অপমান করছে লজ্জা দিছে। বিচারের নামে অবিচার করছে এবং আপনাকে ডেকে নিয়ে ওকে অসম্মান করছে, তাই সোহান সহ্য করতে না পেরে পৃথিবী ছেড়েছে। শোনার পর মনে হলো, ওর মৃত্যুর চেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছি সহ্য করতে পারছি না মাথা ঘুরছে পা টলছে তারপরও বাইরে গেলাম এলাকার বড় ভাই জামান ওকে সব জানালাম। উনি একজনকে জিজ্ঞাস করল, বলল হ্যাঁ সব সত্য আমিও শুনেছি এবং একজন সাক্ষীর জবানবন্দী রেকর্ড করেও আমি জামান ভাইকে শুনালাম উনি বলল ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসুক সত্য হলে বিচার পাবেন। এবং উনি রহমত আলীকে ডেকে জিজ্ঞাস করল সে অস্বীকার করল।

‘যারা বিচারের নামে অবিচার করেছে তাদের বাড়িতে গেলাম এবং এলাকার লোকজনের সাথে কথা বললাম। যতটুকু জানলাম ঘটনা সত্য, ওরা সোহানকে খুব মারধর করেছে, লজ্জা দিয়েছে ও অপদস্থ করেছে। অনেকে বলে, ওরা আওয়ামী লীগের লোক। ওদের বিচার কে করবে? আপনি বিচার পাবেন না। ওরা খুব খারাপ। ওরা আপনারও ক্ষতি করবে। ওরা এভাবেই অন্যায় করে আর অস্বীকার করে, ওদের কেউ কিছু বলে না।’ 

লেখক : বিচারপ্রার্থী একজন মা
E-mail: ruksanasurma@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫