ঢাকা, বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

নারী

ভালো থাকুন প্রবীণারা

আঞ্জুমান আরা

০৮ অক্টোবর ২০১৭,রবিবার, ১৭:৫০


প্রিন্ট

আদমশুমারি অনুযায়ী আমাদের দেশে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবীণ মানুষ রয়েছেন। সংখ্যার দিক দিয়ে প্রায় দেড় কোটি। বর্তমানে দেশে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বেশি হওয়া প্রবীণরা বিশেষ করে প্রবীণ নারীরা হচ্ছেন অবহেলার শিকার। নিঃসঙ্গ জীবন তাদের। অনেকের কোনো প্রিয়জন কাছে থাকেন না। সে ক্ষেত্রে কোনো প্রবীণ নারী যদি নিজের মতো সঙ্গী খুঁজে নেন। তবে সমস্যা কোথায়? কিন্তু সমাজ সংসার সেখানেও বাদসাধে। তবে এখন বোধহয় সময় এসেছে এসব নিয়ে ভাবার।

হাফসা বেগম কুমিল্লা জেলার বালি গ্রামের মুনশিবাড়ির মেয়ে। বাবা অত্যন্ত পরহেজগার সৎ ও আদর্শবান মানুষ। ধর্মীয় অনুশাসনে বেড়ে ওঠা অভাব-অনটনের মাঝে ১০ ভাইবোনের বড় পরিবারের বাবা খুব অল্প বয়সেই তার আট মেয়েকে বিয়ে দেন। সবচেয়ে ছোট্ট মেয়েটি হাফসা বেগম ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী, তাই তাকে বড় ধনী পরিবারে বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পর জানা গেল, পাত্র মৃগরোগী। হঠাৎ হঠাৎ তার এই রোগ দেখা দেয় আর অন্য সময় সে ভালোই থাকে। কী আর করা, পরহেজগার বাবা অত কিছু জেনেও লোকলজ্জার ভয়ে সব মেনে নিয়ে মেয়েকে বুঝিয়ে স্বামীর সংসার করার জন্য তাগিদ দিলেন। বছর ঘুরেই হাফসার কোলজুড়ে এলো সোনার টুকরো ছেলে। পরিবারের সবাই খুশি। মা-বাবাও ছেলের মুখ দেখে আত্মতৃপ্তিতে মন-প্রাণ জুড়িয়ে নেন। কিন্তু কিছু দিন পরই হাফসার জীবনে নেমে এলো এক অমানিশার অন্ধকার। স্বামী ইয়াসিন মুনশিবাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে কখন যে মরে ভেসে উঠেছে কেউ টেরই পাননি। তারপরও সবার অবহেলা আর অনাদরে বেড়ে ওঠে হাফসার ছেলে। মা কোনোমতে শ্বশুরবাড়ির লাড়াঝাড়া খেয়ে জীবনের অনেকগুলো বছর কাটিয়ে দেন। ছেলে লেখাপড়া তেমন করতে পারেনি কিন্তু মানুষ হয়েছে; মায়ের আদর্শের ছেলে হয়েছে। ছোট একটা ব্যবসা করে কোনোমতে বউ ছেলেমেয়ে ও মাকে নিয়ে বসবাস করছে। দুঃখী হাফসা বেগম রোগেশোকে নাতি-নাতনীদের ঘিরে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন কোনোমতে।

সমস্যাটা হয় তখন, যখন হাফসা বেগমের মতো তার সন্তান, নাতি-নাতনীরা কাছে থাকে। বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় দীর্ঘ জীবনসংগ্রাম করে যে সন্তানদের মা মানুষ করেছেন তারা বিয়ে করে নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মাকে দেখার সময় তাদের নেই। বর্তমানে আমাদের দেশে দ্রুততম সময়ে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তর হয়েছে। অন্য দিকে দেশে প্রাবীণের সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়ছে। ফলে অসহায় হয়ে পড়েছেন প্রবীণ মহিলারা।

ঘটনা-১
আল্পনা কবির। মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দেন মা-বাবা ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বিয়ের পর মাস্টার্স কমপ্লিট করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে। মাঝে তিন-ছেলেমেয়ের জন্ম। বিয়ের ১২ বছর পর স্বামী বিয়োগে অল্পনা কবির ভীষণভাবে ভেঙে পড়েন। দীর্ঘ ছয়-সাত বছর প্যারালাইজড স্বামীকে যতœ করতে করতে তিনি পরিবারের সবাইকে চিনতে পারেন কে কতটা তার প্রতি সহানুভূতিশীল। তাই স্বামী অন্তর্ধামের পর আবার নিজেকে সামলে নিয়ে স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটেবাড়ি, ভাড়া দেয়া দোকান, বাড়ি থেকে যে পরিমাণ টাকা পেতেন তা দিয়ে বাচ্চাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ান। উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। মেয়েকে অস্ট্রেলিয়ার নামকরা ‘মোনাস’ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি কমপ্লিট করিয়ে বিয়েও দেন আমেরিকাপ্রবাসী ছেলের কাছে। একমাত্র ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ান ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে। মাস্টার্স ডিগ্রিসহ উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য ছেলেকে পাঠিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়। ছোট্ট মেয়েকে পড়াচ্ছেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিগুলো বাড়িয়ে দ্বিগুণ করেছেন নিজের মেধা দিয়ে। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা নানাভাবে মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছে, কেড়ে নিতে চেয়েছে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদ।

কিন্তু এই সমাজে সবার সাথে লড়াই করে আজ ১৮ বছর আগলে রেখেছেন সব কিছু। কারণ স্বামী মৃত্যুর সাত-আট বছর আগ থেকেই প্যারালাইজড ছিলেন। সুতরাং স্বামী বেঁচে থাকতেই ঘর-গৃহস্থালীর যাবতীয় এক হাতে আগলে রেখেছেন আল্পনা কবির। মাঝে মধ্যে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ইচ্ছে করে কারো আদর-স্নেহে একটু নিশ্চিন্ত ঘুমাতে। কিন্তু সমাজ তা কোনোমতেই মেনে নিচ্ছে না। নিজের মা-ভাইবোনই বাধ সাধছে অন্যরা তো আছেই। কেউ একবারও ভাবছে না, ছোট্ট কিশোরী মেয়েটি আজ ২৮ বছর শুধু সংসারই করলÑ তার কি নিজের বলে কিছু নেই। সে কি কারো কাছে নিজের ভাবনা-চিন্তাগুলো ভাগ করে নিতে পারে না। তার আর একবার বিয়ে নিয়ে একটু গুঞ্জন উঠেছিলÑ বড় মেয়ে ও ছেলে ভীষণভাবে রেগে গেছে। তারা কোনোভাবেই মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে পারবে না। ছোট্ট ১২ বছরের মেয়েটি অবশ্য বলছেÑ নতুন বাবা হলে মন্দ হয় না। কারণ সেও বাবার আদর-স্নেহ-মমতাপ্রত্যাশী।

ঘটনা-২
শায়েলা আহম্মেদ। বয়স ৫২ বছর। বড় ছেলে ইয়াকুব বুয়েট ইঞ্জিনিয়ার, ছোট ছেলে সম্প্রতি গ্র্যাজুয়েশন করে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করেছেন। শায়েলা আহম্মেদের স্বামী মারা গেছেন ১৩ বছর আগে। কলেজ ও স্কুলে পড়া দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি খুব অসহায় বোধ করছিলেন। বাবার বাড়িতে উঠে এসে শেষ রক্ষা হয়। আর্মি অফিসার স্বামী ব্যাংক ব্যালান্স বলতে তেমন কিছু রেখে যেতে পারেননি, তাই মোটামুটি অভাব-অনটনের মধ্যে কোনোমতে ছেলে দুটোকে মানুষ করছিলেন। তখনই আল্লাহর অশেষ রহমতে বিপত্মিক মাহফুজ আহম্মেদের সাথে তার বিয়ে হয়। তারপর তিনি বড় ছেলেকে বিয়ে করান। মায়ের বিয়ের ব্যাপারে ছেলেদের আগ্রহই ছিল বেশি। তা না হলে হয়তো এটা সম্ভব ছিল না বলে তিনি জানালেন। বললেন, আমার হয়তো ভাগ্যটা ভালো। আমার ছেলেরা আমাকে সাপোর্ট করেছে।

ঘটনা-৩
শিউলী আক্তার। বয়স ৫০ বছর। স্বামী বিদেশে থাকেন বিধায় তার সন্তানাদিও হয়েছে বিয়ের ২০ বছর পর। স্বামী পাঁচ-ছয় বছর পরপর দেশে ফিরতেন অল্প ক’দিনের জন্য। সন্তান হয় না বলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে গালমন্দ করতেন। গরিব অসহায় বাবার মেয়ে বলে মুখফুটে কিছুই বলতেন না কাউকে। পাছে দুই বেলা দু-মুঠো খাবার আর সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার অবলম্বনটুকু না হারায়। শেষমেশ বিয়ের ২০ বছর পর শিউলী আক্তারের কোলজুড়ে আসে একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির কেউই তার এই সন্তানকে মেনে নিতে পারছিলেন না। অতএব স্বামী পরিত্যক্ত শিউলী বেগমের ঠাঁই হয় বাবার বাড়িতে। সেলাই-ফোঁড়াই করে শিউলীর জীবন কাটছিল কোনোমতে। এরই মধ্যে মেয়ে তার ষোড়শী হয়ে উঠল। গ্রামের স্কুলে সে ক্লাস এইটে পড়ালেখা করছিল। দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের স্ত্রী বিয়োগ হওয়ায় তার ছেলেমেয়েরা বাবার জন্য বয়স্ক একজন পাত্রী খুঁজতে গিয়ে শিউলী বেগমকে তার মেয়েসহ পছন্দ করে ফেললেন। তবে এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী হয়ে উঠলেন ভদ্রলোকের ছেলের শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরা। তারা ভাবল, ৬২ বছর বয়সের প্রৌঢ় লোকের একজন সঙ্গী দরকার। সুতরাং এই পাত্রীই তার জন্য উপযুক্ত। শিউলী ভদ্রলোকের আগের ঘরের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনীদের নিজের মতো করে ভালোবেসে আদর-যত্ন করতে লাগলেন। এ দিকে শিউলী বেগমের মেয়েকেও ওরা মেনে নিলো সমানভাবে। স্কুলে ভর্তি করে পড়ালেখা করার সুযোগ দিলো। তাই আদর পেয়ে শিউলীর মেয়ে ভদ্রলোককে বাবা বলে সম্বোধন করত। আর ভাইবোনদের নিজের আপন ভাইবোনের মতো সম্মান করত। সুতরাং সব মিলিয়ে শিউলী নতুন করে জীবনের পথে এগোতে লাগল।

বিশেষজ্ঞের মতামত

অধ্যাপক মাহমুদা পারভিন সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

নেপোলিয়ন বোনাপোর্ট বলেছিলেন- ‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো।’ এই বাণীর অন্তর্নিহিত ভাব আমাদের বুঝিয়ে দেয়, জাতির জন্য একজন মা কতটা গুরুত্ব বহন করেন। অথচ বৃদ্ধ বয়সে এই মা-ই হন সবচেয়ে অবহেলিত নিঃগৃহীত। আমরা সমাজবিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত সমাজের নানা দিক নিয়ে ভাবছি, সমাজের পরিবর্তন-পরিবর্ধন তদুপরি উন্নতির জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবীণ নারীদের শেষ জীবনের শান্তির জন্য কোনো ব্যবস্থাই নেই। স্বামীর অন্তর্ধানের পর নিজের সন্তান ও ছেলের বউ দ্বারা নিঃগৃহীত বৃদ্ধাদের সংখ্যা যেন দিন দিন বাড়ছে। আজকাল নিজের সন্তানেরাও বৃদ্ধা মাকে ফেলে চলে যায়। নিজের সংসারে মাকে বোঝা মনে করে। এ ক্ষেত্রে যদি বিধবা মা বা ডিভোর্সি মাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়া যায়, তাহলে ব্যাপারটা মন্দ হয় না। এতে মা তার নতুন সঙ্গীকে নিয়ে ভালো থাকবে আর সন্তানেরাও তাদের নিজের সংসার গুছিয়ে করতে পারবে। কারো জীবনই হ্যাম্পার হবে না।

বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি যদি এই সমাজ তথা ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন উদার মনোবৃত্তি প্রকাশ করে; এতে তাদের পথও সুগম হবে। হতে পারে ২০-৩০ বছর পর তার নিজের জীবনেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। এতে ধীরে ধীরে আমাদের সাধারণ জীবনযাপনে যেসব অসঙ্গতি আছে, তা আমরা উৎরে আসতে পারব। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা বিচার করি, এক হাদিসে বলা আছে- ‘তোমার বিবাহযোগ্যা কুমারী মেয়ের আগে বিধবা মেয়েকে বিয়ে দাও।’

আর বিধবা মেয়েকে যে পুরুষ বিয়ে করে, তার অনেক নেক লেখা যায়। আমাদের সমাজে যেহেতু সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বৃদ্ধাশ্রম নেই, ছেলে-মেয়েরাও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়ার ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই উদাসীন। সুতরাং ৫০-৬০ ঊর্ধ্ব মা-বাবাকে খুব সহজেই বিয়ে দিয়ে সংসারী করে দিতে পারি। যদিও বৃদ্ধ মায়েরা এতে লোকলজ্জার ভয়ে রাজি হতে চাইবেন না। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা পেলে আমাদের এই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আস্তে আস্তে বদলাতে থাকবে। সমাজে শত শত মা-অসহায় জীবনযাপন করছেন। যে মা তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চাকরিসহ ঘরকন্নার কাজ করে নিজের সন্তানের মুখে হাসি ফোটান, সে মা-ই আজ চরম কষ্টে আছেন। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা তেমন কঠিন কাজ নয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫