ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

জিঘাংসার ফল ভালো হয় না

আবুল হাসান

০৭ অক্টোবর ২০১৭,শনিবার, ১৯:১৯


প্রিন্ট

ইতিহাস ঐতিহ্য খ্যাত ওলি-আওলিয়ার দেশ বাংলাদেশ। দয়া, অনুগ্রহ, ক্ষমা আর আতিথেয়তার দেশ বাংলাদেশ। যেকোনো দেশে গেলে বাংলাদেশের মানুষের কাজের প্রশংসা শোনা যায়। বাংলাদেশের মানুষ হয়তো গরিব, শিক্ষার মানও হয়তো তাদের কম, তাতে চারিত্রিক ত্রুটি-বিচ্যুতিও কিছুটা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সততা ও আনুগত্যের দিক দিয়ে তাদের তুলনা হয় না। এ মাটিতে শুয়ে আছেন হাজারো ওলি-আওলিয়া, পীর মাশায়েখ ও আলেম ওলামা।

অতীতে রাজনৈতিক ময়দানে শালীনতা, মার্জিত ব্যবহার, পরমত সহিষ্ণুতা, সামাজিক বন্ধন, অপরের মতামতকে সম্মান দেখানো ইত্যাদি দৈনন্দিন জীবনে চোখে পড়ত। তর্কের জওয়াব যুক্তিতে, আলোচনার জওয়াব আলোচনায়, পল্টনের বক্তব্যের জওয়াব সেরকম ভাষায়, কলমের জওয়াব কলমের ভাষায় দেয়া হতো। তখন রাজনীতিবিদদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্যরে অভাব ছিল না।
তখনকার রাজনীতিবিদেরাও মিথ্যা বলতেন কোনো কোনো সময়ে। তবে আজকের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের মতো এমন অসত্য কথা বাংলাদেশের মানুষ আগে শুনেছে বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক মাঠে, দলীয় আন্দোলনে দেশের লোক বিভক্ত ছিল কিন্তু দেশের জন্য, জাতীয় আন্দোলনে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে বিভক্তি ছিল না। সত্তর সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সর্বাধিক আসন পায়। কিন্তু ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করছিলেন।

মুজিব সাক্ষাৎ করেছেন বড় বড় বিশ্ব নেতাদের সাথে। শিখেছেন রাজনৈতিক শিষ্টাচার আরো অনেক কিছু। শুধু ভদ্রতার খাতিরেই নয়, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সম্মান দেখাতে গিয়ে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন তাদের সাথেও তিনি রাজনীতি করেছেন। কিন্তু কারো ওপর ‘থুথু ফেলেননি’। দেশের সব দলের রাজনৈতিক নেতাদের তিনি সম্মান দেখিয়েছেন। অথচ তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন।

তিনি উড়ে এসে রাজনীতি শিখেননি। রাজনৈতিক মাঠের যাবতীয় ঝড় সাঁতরিয়ে মাড়িয়ে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানীর মতো জাঁদরেল নেতাদের সংস্পর্শে থেকে রাজনীতি শিখেছেন বলে তার অন্তর ছিল বটগাছের মতো বড়। শেখ মুজিব রাজনীতি জানতেন এবং বুঝতেন বলেই এই কথা বিশ্বাস করতেন যে, আট কোটি মানুষের একটা সমস্যাধীন দেশ চালাতে হলে সবাই মিলেই চালাতে হবে। বিভক্তি আর বিভাজন দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যায়, দেশ গড়া যায় না।
কিন্তু আজ বাংলাদেশে আমরা কী দেখছি? একটি হাদিসে বলা হয়েছে ‘অসৎ নেতৃত্ব অসৎ সমাজ গঠন করে, সমাজের মানুষকে অসৎ বানায়।’

২.
নেতানেত্রী অসৎ হলে, চোর বাটপার হলে সে দেশের মানুষও চোর বাটপার হয়, অসৎ হয়। গত সাত আট বছরে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা কোথায় নেমে গেছে তা কি কল্পনা করা যায়? অতীতেও এ দেশে চুরি-ডাকাতি হতো। তবে রাহাজানি, ছিনতাই, টেন্ডারবাজি কদাচিৎ হলেও সামাজিক ব্যাধি হিসেবে প্রকাশ পায়নি। সেই দেশে আজ মা তার সন্তানকে হত্যা করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।
হাজারো ওলি-আওলিয়ার দেশে এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু লেপনভ এমন হচ্ছে? আসলে শক্তি আর ক্ষমতার দাপটে জুলুমের পরিণাম অন্ধকার ছাড়া কিছুই হয় না। অন্ধকার সমাজে যা কিছু আগে হতো তা ইতিহাসে পড়েছি। সেটাই আমাদের বাংলাদেশে এখন হচ্ছে। দেশ ও দেশের মানুষের কী হবে চিন্তা ক্ষমতাসীনদের নেই। তাদের চিন্তা হলো গদি রক্ষা করতে হবে। গদি রক্ষার জন্য এমন অপকর্ম নেই, যা তারা করতে পারে না। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না।

ইন্দোনেশিয়ার এককালের লৌহমানব প্রেসিডেন্ট, ফিলিপাইনের ডিক্টেটর মারকোস, ইরানের রেজা শাহ পাহলভি, মিসরের হোসনি মোবারক ও লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফি প্রমুখ। দেশকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে গদিতে চিরস্থায়ী থাকার জন্য কম চেষ্টা করেননি। তাদের শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে বা দুনিয়া ছেড়ে যেতে হলো। তাদের শক্তিমত্তা কম ছিল না। কিন্তু ফলাফল কারো ভালো হয়নি। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার।’ কিন্তু ডিক্টেটর আর জালেমদের শেষ ভালো হয়েছে বলে মানব সভ্যতার ইতিহাসে নজির নেই।

৩.
ভারত তার পঁয়তাল্লিশ বছর আগের পরিকল্পনামতো সুদে-আসলে চুকিয়ে নিচ্ছে। সরকার থাবা মারল ২০১৩ সালের মে মাসের ৫ ও ৬ তারিখে ঢাকার মতিঝিলে হেফাজতকর্মীদের ওপর। রাতের অন্ধকারে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে কচি লাউয়ের মতো নিরীহ নিষ্পাপ হাজার হাজার কুরআনে হাফেজ ও আলেমদের হত্যা নির্যাতনের শিকার করা হলো। একটি স্বাধীন দেশে নিকৃষ্ট হত্যাযজ্ঞ ছিল এটা। এর কোনো বিচার হয়নি। মানুষ তা ভুলে যায়নি।
স্বাধীনচেতা বাংলাদেশের জনগণ অন্যায় ও নির্যাতনের জবাব কিভাবে দেয় সেটাই দেখার বিষয়। তবে ঢাকার এক রিকশাওয়ালার বক্তব্য ‘অপেক্ষা করেন সময় আসুক, দেখবেন পাবলিক পিটাইয়া মারবে, জানাজা পড়বে না।’

ভাজিনিয়া, ইউএসএ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫