ঢাকা, বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

উড়ছে ঘুড়ি নীল আকাশে

হাসান মাহমুদ রিপন

০৭ অক্টোবর ২০১৭,শনিবার, ১৭:৫৭


প্রিন্ট

নীল আকাশে উড়ছে ঘুড়ি । হচ্ছে কাটাকাটির খেলা আর ডানপিটে ছেলেরা ‘বাকাট্টা’ বলে উল্লাসধ্বনি করছে। কেউ ছুটে চলছে কেটে যাওয়া ঘুড়ির পেছনে। কেউ ঘুড়ি উড়ায় আবার কেউ ঘুড়ি লুট (ধরে) করে। এমন দৃশ্য এখন গ্রাম ও শহর এলাকায় দেখা মেলে।

ঘুড়ি, আবহমানকাল থেকে আমাদের ঐতিহ্যের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। একসময় ছেলে বুড়ো সবার কাছে ঘুড়ি উড়ানোর জনপ্রিয়তা ছিল তুমুল। পৃথিবীর অনেক দেশেই ঘুড়ি উড়ানো হয়। এশিয়ার মধ্যে চীন, জাপানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার এবং ইউরোপ ও আমেরিকার বেশ কিছু দেশেও ঘুড়ি উড়ানো হয়, যা শৈল্পিক বর্ণাঢ্য নকশার নিদর্শন।

আজকাল যত রকমের ঘুড়ি দেখা যাচ্ছে সেগুলো কখন, কোথায় এবং কে প্রথম বানিয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। জানা গেছে, ৪০০ খ্রিষ্টপূর্ব গ্রিস দেশে বিশ্বের প্রথম ঘুড়ি তৈরি হয়েছিল। ঘুড়িটি উড়িয়েছিলেন বিজ্ঞানী আর কিয়াটাস। আবার অনেকের ধারণা, ৬০০ খ্রিষ্টপূর্ব চীন দেশে প্রথম ঘুড়ি তৈরি হয়েছিল। সেই ঘুড়িটি তৈরি করেছিলেন সেনাপতি হানসিন।

ঘুড়ির বর্ণবৈচিত্র্য দেখতে হলে আমাদের যেতে হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং কোরিয়া হলো বর্ণময় ঘুড়ির পীঠস্থান। শুধু চীনেই আছে ৩০০ রকমের ঘুড়ি। প্রজাপতি, মাছ, পাখি, মৌচাক, ড্রাগন, চিল, মানুষসহ আরো কত রকমের ঘুড়ি যে আছে তার ইয়ত্তা নেই। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের দিকে চীন দেশের মানুষ প্রথম কাগজ আবিষ্কার করে। এ থেকে অনেকেই মনে করেন যে, ঘুড়িও সম্ভবত চীন দেশেই প্রথম তৈরি হয়েছে। কিন্তু চীনা ঘুড়ি নির্মাতাদের দাবি- ঘুড়ি এ দেশেই প্রথম তৈরি হয়েছে এবং পরে তা অন্যান্য দেশে চলে গেছে। যাদের ধারণা, ঘুড়ি চীনেই প্রথম তৈরি হয়েছে তাদের মতে, চীন থেকে জাপান এবং পরে অন্য অনেক দেশ ঘুরে তা বাংলাদেশে এসেছে। এটা একটা অনুমান মাত্র। কারো দাবির সপক্ষে লিখিত কোনো প্রমাণ নেই। এ অনুমানকেই মেনে নিতে হলে ঘুড়ির জন্মতারিখ পিছিয়ে কাগজের জন্মের পরে আনতে হয়। কিন্তু সুতোর কাপড়ের বা সিল্কের কাপড়ের ঘুড়ি অবশ্যই ভাবিয়ে তোলে যে, কাগজ আবিষ্কারের অন্তত কয়েক হাজার বছর আগেই ঘুড়ির জন্ম হয়েছে। নৌকার পাল, নিশান ও গেড়ে দেয়া কাপড় বাতাসে উড়তে দেখেই তো কাপড়ের ঘুড়ি জন্ম নিলো।

কাগজ আবিষ্কারের পরে একদিন কাগজের টুকরো অসাবধানতার জন্য বাতাসে উড়িয়ে নিলো আর কাগজের টুকরোটা কতকটা ঘুড়ির মতোই উড়তে উড়তে কিছু ডানপিটে দুষ্ট ছেলের চোখে পড়ল এবং ওই কাগজটি ধরে তারা ভাবল ঘুড়িকে কাপড়ের বদলে কাগজ দিয়ে ছেয়ে নিলে আরো হালকা হবে এবং খরচও কম হবে। হয়তো উড়বেও ভালো। যেই ভাবা সেই কাজ। সে দিনই কাগজে ছাওয়া ঘুড়ি উড়িয়ে দিলো আকাশে। ওদের আবিষ্কার সফল হলো। এভাবেই কাপড়ের ঘুড়ি থেকে কাগজের ঘুড়ি জন্ম নিলো।

ঘুড়ি নিয়ে বিশ্বে রেকর্ড হয়েছে অনেক। ১৯৬৭ সালের ২৯ নভেম্বর প্রফেসর ফিলিপ আর কুনজ এবং জেপি কুনজ উয়োমিং-এর লারামি থেকে ২৮ হাজার ফুট উঁচুতে ঘুড়ি উড়িয়ে বিশ্ব রেকর্ড করেছিলেন এবং ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত একটানা সাত দিন অর্থাৎ ১৬৯ ঘণ্টা ঘুড়ি উড়িয়ে রেকর্ড করেছিল ফ্লোরিডা শহরের ল্যান্ডার ভিলে ‘দ্য সানরাইজ ক্লাব’। ১৯৩৬ সালে জাপানের নারুতা শহরে তৈরি হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘুড়ি। ওই ঘুড়ির ওজন ছিল প্রায় সাড়ে ৯ টন। তিন হাজার ১০০ টুকরো কাগজ দিয়ে ঘুড়িটি তৈরি হয়েছিল।

বাংলাদেশে এখন এ মওসুমে ঘুড়ি উড়ানোর ধুম পড়ে গেছে। গ্রামাঞ্চল ও শহরের নীল আকাশে এখন শুধু ঘুড়ি উড়ছে। ডানপিটে ছেলেরা ‘বাকাট্টা’ বলে উল্লাসধ্বনি করছে। কেউ কেটে যাওয়া ঘুড়ির পেছনে আবার কেউ ঘুড়ি উড়ায় আবার কেউবা ঘুড়ি লুট (ধরে) করে। আমাদের দেশে বিভিন্ন এলাকায় ঘুড়ি খেলার (ঘুড়ির লুট) প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আগে গ্রামাঞ্চলে ঢাকঢোল পিটিয়ে আনন্দঘন উৎসবে ঘুড়ি খেলার প্রতিযোগিতা হতো। কেউ ছিল লাল দলে, কেউবা কালো কিংবা নীল দলে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো দু’দলের মধ্যে। এখন ওই আগের মতো আর গ্রামগঞ্জে ঘুড়ির প্রতিযোগিতা চোখে পড়ে না। গ্রাম থেকে হারিয়ে গেছে ঘুড়ি প্রতিযোগিতা (লুট)। তবে ডানপিটে ছেলেদের ঘুড়ি উড়াতে দেখা যায়। আমাদের দেশে ঘুড়ি প্রতিযোগিতা অন্যান্য দেশের মতো অতটা জমজমাট নয়। এ মওসুমের শেষ দিনে আকাশজুড়ে ঘুড়ি উড়াতে দেখা যায়। আবার পুরান ঢাকায় এখন ঘুড়ি উৎসব পালন করে পুরনো ঢাকাবাসী সংগঠন। এ ছাড়া শহরের অন্যান্য এলাকাতে ছোট ছোট ছেলেরা ঘুড়ি উড়িয়ে থাকে। প্রতিটি বাড়ির ছাদে দেখা যায় ডানপিটে ছেলে নাটাই হাতে ঘুড়ি উড়াচ্ছে। এ রকম দৃশ্য গ্রামেও কমবেশি দেখা মেলে।

পুরান ঢাকায় ঘুড়ি উৎসব পালন হয় সবচেয়ে বেশি। ঘুড়ি উৎসবের দিনে সুতোর মাঞ্জা দিয়ে রঙ-বেরঙের নানা বৈচিত্র্যের ঘুড়ি নিয়ে আকাশে ঘুড়ির লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের দেশে কবে ঘুড়ি এসেছিল সে বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সুতোয় মাঞ্জা দিয়ে ঘুড়ির প্যাঁচ খেলা শুরু হয়েছিল প্রথম শাহ আমলে। মোগল আমলে ঘুড়ি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল একটু বেশি।
এখন আকাশে সবসময় দেখা যায় ঘুড়ি উড়ছে। ডানপিটে ছেলেরা সারা দিন রোদ উপেক্ষা করে ঘুড়ি নিয়ে মেতে থাকে। সুতোয় মাঞ্জা দেয়ার প্রতিযোগিতা চলছে, কার মাঞ্জা কতটুকু ধার হবে। যেসব ঘুড়ি উড়তে দেখা যায় তার আকার-আকৃতি আগের মতোই আছে। রঙে বৈচিত্র্য এসেছে। তবে আকারের পরিবর্তন হয়নি। ঘুড়ি উড়ানো ছিল নিছক শখ এবং মানুষের খেলার সাথী, উৎসবের প্রতীক হয়েছিল। আগে লোকের অভাব ছিল কম, মনে ছিল শান্তি আর তাই কত শখই তাদের মনে জাগত। এই শখ মেটাতে গিয়েই গ্রামের সাধারণ মানুষের মাথায়ও খেলত নতুন বুদ্ধি। বানাত কত নতুন খেলনা। এখন আর আগের মতো ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা (লুট) চলে না। গাঁও গেরামে শোনা যায় না ডানপিটে শিশুদের উল্লসিত ধ্বনি ‘বাকাট্টা... বাকাট্টা’। আজ আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঘুড়ি উড়ানোর মনোরম এই ঐতিহ্য।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫